আপনার প্রবাসী ভাইয়ের টাকা কোথায় যাচ্ছে?
পর্ব ১: টাকার রেখা
রিয়াদে আপনার ভাই থাকে। নাম ধরুন সোহেল। বয়স ৩২। একটা কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে কাজ করে। মাসে বেতন পায় ১,২০০ রিয়াল, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩৫,০০০। এর মধ্যে ২০,০০০ টাকা প্রতি মাসে দেশে পাঠায়।
সোহেল সাতজনের সাথে একটা রুমে থাকে। দিনে ১২ ঘণ্টা কাজ করে। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি ছাড়ায়। ছুটি পায় সপ্তাহে একদিন, কখনো সেটাও পায় না। শেষ কবে বাড়ি গেছে মনে নেই। ভিডিও কলে ছেলেমেয়ের মুখ দেখে, চোখ মোছে, আবার কাজে যায়।
তার পাঠানো ২০,০০০ টাকায় কী হয়? মায়ের ওষুধ কেনা হয়। ছোট ভাইয়ের কলেজের বেতন দেওয়া হয়। বিদ্যুতের বিল, চালের দাম, মেয়ের স্কুলের খাতা-কলম। এই ২০,০০০ টাকা একটা পরিবারের জীবনরেখা।
এখন একটু জুম আউট করুন।
বাংলাদেশে সোহেলের মতো প্রায় ১.৩ কোটি মানুষ বিদেশে আছে। সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইউরোপ, আমেরিকা, পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে। তারা সবাই মিলে ২০২৫ সালে দেশে পাঠিয়েছে প্রায় ২৪.৮ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি টাকায়? প্রায় ২.৭ লাখ কোটি টাকা।
এই সংখ্যাটা কতটা বড়? বাংলাদেশের পুরো শিক্ষা বাজেটের চার গুণের বেশি। স্বাস্থ্য বাজেটের আট গুণ। পদ্মা সেতুর খরচের প্রায় আটাশ গুণ।
এবার এই চার্টটা দেখুন:
বিশ বছরের রেমিট্যান্স প্রবাহ। ২০০৫ সালে ছিল ৪.৩ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫ সালে ১৫ বিলিয়ন। ২০২৫ সালে ২৪.৮ বিলিয়ন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলা সংখ্যা এটা। গার্মেন্টস রপ্তানি ওঠানামা করে, বৈদেশিক সাহায্য কমে আসছে, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এখনো হতাশাজনক। কিন্তু রেমিট্যান্স? প্রতি বছর বাড়ছে।
কিন্তু শুধু সংখ্যা দেখলে আসল ছবিটা বোঝা যায় না। রেমিট্যান্স অর্থনীতির কত বড় অংশ, সেটা দেখতে হলে জিডিপির অনুপাত দেখতে হবে। আর সেখানে বাংলাদেশের তুলনা করতে হবে একই রকম দেশগুলোর সাথে।
এই চার্টটা দেখুন:
চারটা দেশ: বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, নেপাল, পাকিস্তান। সবগুলোই রেমিট্যান্স-নির্ভর অর্থনীতি। বাংলাদেশে রেমিট্যান্স জিডিপির প্রায় ৬%। নেপালে ২৩%। ফিলিপাইনে ৯%। পাকিস্তানে ৮%।
"মাত্র ৬%? তাহলে তো সমস্যা নেই!" এটা ভাবলে ভুল করবেন।
৬% মানে বাংলাদেশের জিডিপি অনেক বড় হয়ে গেছে, তাই অনুপাতটা ছোট দেখায়। কিন্তু পরম সংখ্যায়? ২৪.৮ বিলিয়ন ডলার। এটা নেপালের পুরো জিডিপির প্রায় ৬০%। এই টাকা সরিয়ে নিন। বাংলাদেশের ফরেন রিজার্ভ মাস তিনেকের মধ্যে শেষ। আমদানি বন্ধ। তেল আসবে না, গ্যাস আসবে না, কাঁচামাল আসবে না। কারখানা বন্ধ হবে। গার্মেন্টস বন্ধ হবে। কারণ গার্মেন্টসের কাপড়, সুতা, রং, জিপার, সব আমদানি করতে হয়। ডলার না থাকলে আমদানি নেই, আমদানি না থাকলে রপ্তানি নেই।
রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অদৃশ্য ভিত্তি। এটা শুধু গরিব পরিবারের সাহায্য না। এটা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, টাকার মূল্যমান, আমদানি সক্ষমতা, সবকিছুর ভিত্তি। সোহেলের মতো লাখ লাখ মানুষের ঘাম আর কষ্টের উপর দাঁড়িয়ে আছে এই দেশের অর্থনীতি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো: এই টাকা দিয়ে আমরা কী করছি? এই ২৪.৮ বিলিয়ন ডলার কি দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে? নাকি আমরা একটা আসক্তির চক্রে আটকে গেছি?
পর্ব ২: আসক্তি
১৯৬৯ সালে নরওয়ে উত্তর সাগরে তেল পেলো। একটা ছোট, শান্ত স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ হঠাৎ বিশাল সম্পদের মালিক। তারা কী করলো? তেল বিক্রির টাকা দিয়ে ফুটানি করলো? দামি গাড়ি কিনলো? না। তারা Government Pension Fund Global তৈরি করলো। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সার্বভৌম সম্পদ তহবিল। আজ সেই তহবিলের আকার ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। নরওয়ের প্রতিটা নাগরিকের জন্য প্রায় ৩ লাখ ডলার জমানো আছে। তেল ফুরিয়ে গেলেও নরওয়ে ধনী থাকবে।
বাংলাদেশও একটা "তেল" পেয়েছে। আমাদের তেল হলো রেমিট্যান্স। প্রতি বছর ২৪.৮ বিলিয়ন ডলার আসছে। বিশ বছর ধরে আসছে। আমরা এই টাকা দিয়ে কী করলাম?
এবার এই চার্টটা দেখুন, তাহলে বুঝবেন:
রেমিট্যান্সের টাকা কোথায় যায়? ৭৫% ভোগ্যপণ্যে, যেমন চাল, কাপড়, ওষুধ, বাড়ির মেরামত। ১২% জমি বা ফ্ল্যাট কেনায়। ৬% ব্যবসায়। বাকিটা সঞ্চয় বা অন্যান্য। মানে, প্রতি ১০০ টাকা রেমিট্যান্সের মাত্র ৬ টাকা উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে। বাকি ৯৪ টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। এটা জীবনধারণের জন্য দরকারি, সেটা অস্বীকার করছি না। কিন্তু একটা দেশ যদি বিশ বছর ধরে বছরে ১০-২৫ বিলিয়ন ডলার পায় আর তার প্রায় পুরোটাই ভোগে চলে যায়, তাহলে সেটা আর বিনিয়োগ না। সেটা আসক্তি।
নরওয়ে তেল বিক্রি করে ভবিষ্যৎ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ রেমিট্যান্স পেয়ে বর্তমান চালিয়ে যাচ্ছে।
আর এই আসক্তি কতটা গভীর, সেটা বোঝার জন্য একটা ভয়ের পরীক্ষা করি। ধরুন, কাল থেকে রেমিট্যান্স বন্ধ হয়ে গেলো। কোনো কারণে। বৈশ্বিক মন্দা, উপসাগরে যুদ্ধ, যেকোনো কারণে। কী হবে?
এই চার্টটা দেখুন:
দুটো লাইন। নীল লাইন: রিজার্ভ যেমন আছে, রেমিট্যান্স সহ। লাল লাইন: রেমিট্যান্স ছাড়া রিজার্ভ কোথায় যেত। লাল লাইন ছয় মাসের মধ্যে শূন্যের নিচে চলে যায়। মানে রেমিট্যান্স বন্ধ হলে বাংলাদেশের ফরেন রিজার্ভ ঋণাত্মক হয়ে যাবে। আমদানি বিল দেওয়ার টাকা থাকবে না। এটা সিমুলেশন, বাস্তবে এত দ্রুত হবে না। সরকার ঋণ নেবে, আইএমএফের কাছে যাবে, ব্যবস্থা করবে। কিন্তু ঝুঁকির মাত্রাটা বুঝুন। একটা মাত্র আয়ের উৎস বন্ধ হলে দেশ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। এটাই আসক্তির সংজ্ঞা।
আর সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপারটা হলো: এই আয়ের উৎস চিরকাল থাকবে না।
উপসাগরীয় দেশগুলো বদলে যাচ্ছে। সৌদি আরবের Vision 2030 স্পষ্ট বলছে: আমরা তেলনির্ভরতা কমাবো, অর্থনীতি বহুমুখী করবো, নিজেদের নাগরিকদের কাজে লাগাবো। সৌদিকরণ (Saudization) নীতিতে বেসরকারি খাতে সৌদি নাগরিকদের নিয়োগ বাধ্যতামূলক হচ্ছে। আরব আমিরাতে এমিরাতাইজেশন চলছে। কাতার বিশ্বকাপ শেষ, নির্মাণ প্রকল্পগুলো শেষ হচ্ছে। এর সাথে যোগ হচ্ছে অটোমেশন। রোবট দিয়ে নির্মাণ, AI দিয়ে সেবা, মেশিন দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা।
এই চার্টটা দেখুন:
উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা কমছে। ২০১৫ সালের পর থেকে নতুন ভিসা ইস্যু কমে আসছে। কিছু সেক্টরে একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। এই ট্রেন্ড অব্যাহত থাকবে।
আর শুধু চাহিদা কমছে তা না, প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। এই চার্টটা দেখুন:
ভারত, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, সবাই একই বাজারে লড়ছে। ফিলিপাইনের শ্রমিকরা ইংরেজিতে কথা বলতে পারে, তাদের প্রশিক্ষণ ভালো, সরকার তাদের সুরক্ষা দেয়। ভারত সংখ্যায় বিশাল, তাদের শ্রমিকরা প্রযুক্তি খাতেও যাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার সাথে আরব দেশগুলোর সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা আছে। বাংলাদেশের শ্রমিকদের তুলনামূলক সুবিধা কী? সস্তা। শুধু সস্তা। আর "সস্তা" হওয়া কোনো টেকসই কৌশল না।
তাহলে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে? একটা দেশ যার অর্থনীতির ভিত্তি একটা আয়ের উৎসের উপর, সেই আয়ের উৎস কমে আসছে, প্রতিযোগিতা বাড়ছে, আর আমরা এই আয়ের কোনো উৎপাদনশীল ব্যবহার করিনি।
কিন্তু গল্পটা আরো খারাপ। কারণ ২৪.৮ বিলিয়ন ডলার যা আমরা দেখছি, সেটা আসল সংখ্যা না। আসল সংখ্যা অনেক বড়। আর তার মানে হলো, আমাদের অজান্তে একটা বিশাল চুরি হচ্ছে। প্রতিদিন।
পর্ব ৩: চুরি
বাংলাদেশ ব্যাংকের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স এসেছে ২৪.৮ বিলিয়ন ডলার। এটা রেকর্ড। সবাই খুশি। সংবাদপত্রে হেডলাইন: "রেমিট্যান্সে রেকর্ড!"
কিন্তু একটা প্রশ্ন কেউ করে না: ১.৩ কোটি মানুষ বিদেশে আছে, তাদের গড় আয়ের হিসাব করলে মোট কত টাকা দেশে পাঠানো উচিত?
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক মিলিয়ে প্রকৃত রেমিট্যান্স ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। কোনো কোনো হিসাবে ৪০ বিলিয়ন। মানে ১০-১৫ বিলিয়ন ডলার আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের বাইরে দিয়ে আসছে।
এই গ্যাপটাকে বলে হুন্ডি। বাংলাদেশে হাওয়ালা বলেও চেনে।
হুন্ডি কীভাবে কাজ করে? সোজা উদাহরণ দিই। ধরুন, আপনার চাচা আছেন নিউইয়র্কে। উনি সিলেটে আপনার দাদীকে ৫০,০০০ টাকা পাঠাতে চান। ব্যাংকে গেলে ২-৩% ফি, ২-৩ দিন সময়, ফর্ম ভরতে হবে, আইডি লাগবে। বিকল্প? চাচা নিউইয়র্কে একজন "এজেন্ট"-এর কাছে ডলার দেবেন। সেই এজেন্ট সিলেটে তার পার্টনারকে ফোন করবে। পার্টনার একই দিনে দাদীর হাতে টাকা পৌঁছে দেবে। ফি? প্রায় শূন্য। সময়? কয়েক ঘণ্টা। কোনো ফর্ম নেই, কোনো ঝামেলা নেই।
দ্রুত, সস্তা, ঝামেলামুক্ত। তাহলে সমস্যা কোথায়?
সমস্যা হলো যখন টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে আসে, সেটা বাংলাদেশ ব্যাংকের রেকর্ডে যায়। ফরেন রিজার্ভে যোগ হয়। ডলার হিসেবে থাকে, যেটা দিয়ে তেল, গ্যাস, কাঁচামাল আমদানি করা যায়। টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকে।
হুন্ডিতে? টাকা আসে, কিন্তু ডলার আসে না। সেই ডলার থেকে যায় বাইরে। ঘুরতে থাকে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে। বাংলাদেশের রিজার্ভে কিছুই যোগ হয় না।
এবার এই চার্টটা দেখুন:
নীল অংশটা আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স। হালকা লাল অংশটা অনানুষ্ঠানিক (হুন্ডি) প্রাক্কলন। গ্যাপটা দেখুন। প্রতি বছর ১০-১৫ বিলিয়ন ডলার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে ব্যবস্থার বাইরে।
একটা কথা স্পষ্ট করে বলি। এই হুন্ডির সংখ্যাগুলো প্রাক্কলন। সঠিক হিসাব কারো কাছে নেই, থাকার কথাও না, কারণ এটা অনানুষ্ঠানিক। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, আর গবেষকরা বিভিন্ন পদ্ধতিতে হিসাব করেন, সংখ্যা ভিন্ন হয়। কিন্তু সবাই একমত: গ্যাপটা বিশাল।
এই হারানো ডলার যদি আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আসতো, বাংলাদেশের রিজার্ভ কোথায় থাকতো? এই চার্টটা দেখুন:
নীল লাইন: প্রকৃত রিজার্ভ। সবুজ লাইন: হুন্ডির টাকা যদি আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আসতো। পার্থক্যটা দেখুন। প্রায় ১৫-২০ বিলিয়ন ডলার বেশি রিজার্ভ থাকতো। ২০২২ সালে যখন বাংলাদেশ ডলার সংকটে ভুগছিল, এলসি খুলতে পারছিল না, আমদানি আটকে যাচ্ছিল, সেই সময় যদি এই অতিরিক্ত ১৫-২০ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভে থাকতো, কোনো সংকটই হতো না।
তাহলে প্রশ্ন: সরকার কেন হুন্ডি বন্ধ করতে পারে না?
প্রথমত, এটা বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব। হুন্ডি নেটওয়ার্ক শত বছরের পুরনো। দক্ষিণ এশিয়া আর মধ্যপ্রাচ্যে এটা সংস্কৃতির অংশ। কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট লাগে না, কোনো কাগজপত্র থাকে না, ট্র্যাক করার উপায় নেই।
দ্বিতীয়ত, আনুষ্ঠানিক চ্যানেলগুলো এখনো খারাপ। ব্যাংক ট্রান্সফারে ২-৩% ফি লাগে। ২-৩ দিন সময় লাগে। কাগজপত্রের ঝামেলা আছে। কিছু ব্যাংকে ন্যূনতম অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স রাখতে হয়। গ্রামে ব্যাংক নেই, থাকলেও সেবার মান খারাপ। একজন শ্রমিক দিনে ১২ ঘণ্টা কাজ করে, তার পক্ষে ব্যাংকের লাইনে দাঁড়ানো সম্ভব না।
হুন্ডি এজেন্ট ফোনে কল করলেই কাজ হয়ে যায়। ওই এজেন্টকে সে চেনে, বিশ্বাস করে, একই এলাকার লোক। ব্যাংকের ম্যানেজার তার কে?
সরকার মাঝে মাঝে "ক্র্যাকডাউন" করে। কিছু হুন্ডি ব্যবসায়ী ধরা পড়ে। মিডিয়ায় আসে। তারপর? সবকিছু আগের মতো চলে। কারণ মূল সমস্যার সমাধান না করলে শুধু ক্র্যাকডাউন দিয়ে হুন্ডি বন্ধ হবে না। মূল সমস্যাটা কী? আনুষ্ঠানিক চ্যানেল দিয়ে টাকা পাঠানো কঠিন, দামি, আর ধীর। যতদিন না এটা সহজ, সস্তা, আর দ্রুত হচ্ছে, ততদিন হুন্ডি থাকবে।
কিন্তু আমরা শুধু সংখ্যা আর সিস্টেম নিয়ে কথা বলছি। পর্দার পেছনে যারা আসলে এই টাকা পাঠাচ্ছে, সেই মানুষগুলো কেমন আছে? তাদের গল্পটা কী?
পর্ব ৪: যারা টাকা পাঠায়
সোহেলের কথা মনে আছে? রিয়াদে যে ভাই থাকে? সোহেল রিয়াদে যেতে কত খরচ করেছে জানেন?
৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
এটা শুনে আপনি হয়তো ভাবছেন, "এত টাকা!" কিন্তু বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে এটাই গড় খরচ। কখনো ৫ লাখ, কখনো ৬ লাখ। কিছু ক্ষেত্রে ১০ লাখ পর্যন্তও শুনেছি।
এই টাকাটা কোথায় যায়? দালালের পকেটে। সাব-এজেন্টের পকেটে। কখনো কোম্পানির এইচআর ম্যানেজারের ঘুষে। ভিসা ফি, বিমানের টিকিট, মেডিকেল, এগুলো সব মিলিয়ে হয়তো ১ লাখ টাকা। বাকি ৩-৪ লাখ? মধ্যস্বত্বভোগীদের লাভ।
এবার এই চার্টটা দেখুন:
বাংলাদেশ থেকে একজন শ্রমিকের মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার গড় খরচ প্রায় ৪,২০০ ডলার। ফিলিপাইনে? ৫০০ ডলার। ভারতে? ১,১০০ ডলার। ইন্দোনেশিয়ায়? ১,৩০০ ডলার।
পার্থক্যটা আট গুণ। আট গুণ।
ফিলিপাইনে কেন এত কম? কারণ সেখানে সরকার নিজে রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। POEA (Philippine Overseas Employment Administration) সরকারি সংস্থা হিসেবে কাজ করে। সরাসরি বিদেশের নিয়োগকর্তাদের সাথে চুক্তি, সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, স্বচ্ছ ফি কাঠামো। দালালের কোনো জায়গা নেই।
বাংলাদেশে? রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি প্রায় ১,৫০০টা। তাদের নিচে সাব-এজেন্ট আছে হাজার হাজার। প্রতিটা গ্রামে, প্রতিটা ইউনিয়নে কেউ না কেউ আছে যে বলে, "আমি বিদেশে পাঠাতে পারবো।" এরা অনিয়ন্ত্রিত, অনেক সময় প্রতারক। টাকা নিয়ে ভিসা দেয় না, ভুয়া ভিসা দেয়, ভুল দেশে পাঠায়। কিন্তু গরিব মানুষের কাছে বিকল্প নেই।
সোহেল সেই ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা কোথা থেকে জোগাড় করেছে? জমি বিক্রি করেছে। বাবার সঞ্চয় ভেঙেছে। আর বাকিটা? মহাজনের কাছ থেকে ধার। সুদের হার? বছরে ৩০%। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০-৫০%। ব্যাংক ঋণ পায় না। জামানত নেই, কাগজপত্র নেই, ব্যাংকে কাউকে চেনে না।
মানে সোহেল বিদেশে যাওয়ার আগেই ঋণগ্রস্ত। রিয়াদে পৌঁছে প্রথম দুই বছর শুধু ঋণ শোধ করে। তার পাঠানো ২০,০০০ টাকার মধ্যে একটা বড় অংশ যায় মহাজনের সুদে। পরিবার পুরো টাকা পায় না। সোহেলের আসল উপার্জন শুরু হয় তৃতীয় বছর থেকে। যদি চাকরি থাকে ততদিন।
আর বিদেশে গিয়ে কী অবস্থা?
কাফালা ব্যবস্থা। আরবি শব্দ, মানে "স্পন্সরশিপ"। উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রতিটা বিদেশি শ্রমিক একজন স্থানীয় স্পন্সরের অধীনে থাকে। স্পন্সরের অনুমতি ছাড়া চাকরি বদলানো যায় না, দেশে ফেরা যায় না, কোম্পানি বদল করা যায় না। আপনার পাসপোর্ট অনেক সময় স্পন্সর রেখে দেয়। এটা অবৈধ, কিন্তু হরহামেশা হয়।
বেতন কম দিলে প্রতিবাদ করার উপায় নেই। দুই-তিন মাস বেতন আটকে রাখাটা সাধারণ ঘটনা। কেউ কেউ ছয় মাসের বেতন পায় না। অভিযোগ করলে চাকরি যায়, দেশে ফেরত পাঠানো হয়, আর দেশে ফিরলে ঋণের বোঝা অপেক্ষা করছে।
থাকার জায়গা? ১০-১২ জন একটা রুমে। খাবার নিজে রান্না করতে হয়, কারণ কোম্পানি দেয় না বা দিলেও মান খারাপ। কাজের সময় ১২-১৪ ঘণ্টা। নির্মাণ সাইটে নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকে না। গরমে হিটস্ট্রোক হয়। দুর্ঘটনায় আহত হলে চিকিৎসা পাওয়া যায় না সবসময়। আর মৃত্যু হলে?
এই চার্টটা দেখুন:
প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬৮০ জন বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক মারা যায়। কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, হিটস্ট্রোক, হৃদরোগ, আত্মহত্যা। কাতারে ফিফা বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম বানাতে গিয়ে কত বাংলাদেশি শ্রমিক মারা গেছে, তার সঠিক হিসাব আজও নেই। কারণ মৃত্যুর কারণ হিসেবে অনেক সময় লেখা হয় "প্রাকৃতিক কারণে মৃত্যু"। একজন ২৮ বছরের সুস্থ যুবকের "প্রাকৃতিক কারণে" মৃত্যু।
লাশ যখন দেশে আসে, পরিবার পায় কী? যদি ভাগ্য ভালো থাকে, কোম্পানি কিছু ক্ষতিপূরণ দেয়, ৫-১০ লাখ টাকা। অনেক সময় কিছুই পায় না। বিমা? বেশিরভাগ শ্রমিকের বিমা নেই। সরকারি সহায়তা? ক্ষীণ। দালালি ঋণ? সেটা তো মৃত্যুতেও শেষ হয় না। পরিবারকে শোধ করতে হয়।
আমরা একটু থামি আর ছবিটা সম্পূর্ণ দেখি।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় স্তম্ভ হলো রেমিট্যান্স। এই রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে এমন মানুষেরা যাদের দেশ থেকে যেতে ৪-৫ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে, ৩০% সুদে ঋণ নিতে হয়েছে, বিদেশে গিয়ে ১২ ঘণ্টা খাটতে হচ্ছে, কাফালায় বন্দি হয়ে থাকতে হচ্ছে, প্রতি বছর ৬৮০ জন মারা যাচ্ছে। আর আমরা তাদের পাঠানো টাকার ৯৪% ভোগে খরচ করে ফেলছি, ৩০-৪০% হুন্ডিতে হারিয়ে যাচ্ছে, আর একটা পয়সাও ভবিষ্যতের জন্য জমাচ্ছি না।
এই মানুষগুলো পুরো জাতিকে ভর্তুকি দিচ্ছে। আর আমরা তাদের সাথে ব্যবহার করছি "খরচযোগ্য সম্পদ" হিসেবে। যেন তারা মানুষ না, যন্ত্রাংশ। নষ্ট হলে আরেকটা পাঠাও।
কিন্তু যদি আমরা চাইতাম, তাহলে কি অন্যরকম হতে পারতো? হ্যাঁ। আর সেটা কল্পনা না, অন্য দেশেরা করে দেখিয়েছে।
পর্ব ৫: কল্পনা করুন
ধরুন এটা ২০৩০ সাল। চার বছর পরে। বাংলাদেশ তিনটা সংস্কার করেছে। তিনটাই বাস্তবসম্মত, অন্য দেশে পরীক্ষিত, শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার।
সংস্কার ১: রিক্রুটমেন্ট খরচ কমানো, ফিলিপাইন মডেল
ফিলিপাইন যেটা করেছে, বাংলাদেশও করতে পারে। সরকার-থেকে-সরকার (G2G) রিক্রুটমেন্ট চালু করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার সরাসরি সৌদি, আমিরাত, কাতার, মালয়েশিয়ার সরকার ও নিয়োগকর্তাদের সাথে চুক্তি করবে। প্রশিক্ষণ সরকারি কেন্দ্রে হবে। ভিসা প্রক্রিয়া সরকারের মাধ্যমে হবে। দালালের দরকার নেই।
খরচ? ফিলিপাইনের মতো ৫০০-৮০০ ডলার। মানে বর্তমান ৪,২০০ ডলারের বদলে পাঁচ ভাগের এক ভাগ।
একটা পরিবার ৩.৫-৪ লাখ টাকা বাঁচাবে। কোনো মহাজনের কাছে যেতে হবে না। কোনো জমি বিক্রি করতে হবে না। শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার প্রথম মাস থেকেই উপার্জন শুরু করবে, ঋণ শোধ করতে দুই বছর নষ্ট হবে না।
সংস্কার ২: আনুষ্ঠানিক ট্রান্সফার তাৎক্ষণিক ও বিনামূল্যে করা
হুন্ডি কেন জেতে? কারণ দ্রুত আর সস্তা। সমাধান সোজা: আনুষ্ঠানিক চ্যানেলকে হুন্ডির চেয়ে দ্রুত আর সস্তা করুন।
বাংলাদেশে বিকাশ আর নগদ মিলিয়ে প্রায় ২০ কোটি অ্যাকাউন্ট আছে। প্রতিটা গ্রামে, প্রতিটা বাজারে এজেন্ট আছে। প্রযুক্তি আছে, নেটওয়ার্ক আছে। এখন দরকার একটা পদক্ষেপ: বিদেশ থেকে বিকাশ বা নগদে সরাসরি টাকা পাঠানোর সুবিধা চালু করুন। ফি? শূন্য। সরকার ভর্তুকি দেবে। কারণ প্রতিটা টাকা যেটা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আসবে, সেটা রিজার্ভে যোগ হবে, যেটা হুন্ডিতে গেলে হারিয়ে যেত। ভর্তুকির খরচের চেয়ে রিজার্ভে যোগ হওয়া ডলারের মূল্য অনেক বেশি।
সৌদি আরবে STC Pay, আমিরাতে Al Ansari, এই প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে সরাসরি ইন্টিগ্রেশন করুন। শ্রমিক তার ফোন থেকে ৩০ সেকেন্ডে টাকা পাঠাবে। মা পাবে তাৎক্ষণিক, বিকাশে।
এটা হলে হুন্ডির মূল আকর্ষণ, গতি আর কম খরচ, দুটোই শেষ। হুন্ডি নিজে থেকেই কমে আসবে, ক্র্যাকডাউনের দরকার পড়বে না।
সংস্কার ৩: রেমিট্যান্স উন্নয়ন তহবিল, ডায়াস্পোরা বন্ড
এখানেই নরওয়ের শিক্ষাটা কাজে লাগে। রেমিট্যান্সের একটা অংশ দিয়ে একটা সার্বভৌম তহবিল তৈরি করুন। নাম দিন "প্রবাসী উন্নয়ন তহবিল"।
কীভাবে? ডায়াস্পোরা বন্ড ইস্যু করুন। এটা নতুন ধারণা না। ভারত এটা করেছে। ১৯৯১ সালে ভারত যখন দেউলিয়া হওয়ার পথে ছিল, তারা রেশম ও ইন্দিরা বিকাশ বন্ড ইস্যু করে প্রবাসী ভারতীয়দের কাছ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার তুলেছিল। পরে আরো বন্ড ইস্যু করেছে। ইসরায়েলও ডায়াস্পোরা বন্ড দিয়ে দেশ গড়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি তুলেছে।
বাংলাদেশের ১.৩ কোটি প্রবাসীর কাছে যদি সরকার বলে, "আপনি ৫০,০০০ টাকার একটা বন্ড কিনুন, ৮% সুদ পাবেন, আর এই টাকা দিয়ে আমরা আপনার গ্রামে সোলার প্ল্যান্ট বসাবো, আপনার উপজেলায় টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার খুলবো, আপনার জেলায় রাস্তা বানাবো", কতজন কিনবে? আমার ধারণা, লাখ লাখ মানুষ কিনবে। কারণ প্রবাসীরা দেশকে ভালোবাসে। তারা টাকা পাঠায় কারণ তারা দেশকে ভালোবাসে। তাদেরকে শুধু একটা নির্ভরযোগ্য, স্বচ্ছ বিকল্প দিতে হবে।
এই তিনটা সংস্কার হলে ২০৩০ সালে বাংলাদেশ কোথায় থাকবে? এই চার্টটা দেখুন:
দুটো লাইন। লাল: বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে কী হবে। রেমিট্যান্স ধীরে ধীরে বাড়বে কিন্তু ঝুঁকি বাড়তে থাকবে, হুন্ডিতে বিলিয়ন হারাতে থাকবো, শ্রমিকরা শোষিত হতে থাকবে। সবুজ: সংস্কার হলে। আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স ৩৫+ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে (কারণ হুন্ডির টাকা আনুষ্ঠানিক হবে), রিজার্ভ ৬০+ বিলিয়ন ডলার হবে, শ্রমিক পরিবারের আয় ৩০-৪০% বাড়বে (কারণ দালালি খরচ কমবে)।
আর ডায়াস্পোরা বন্ডের সম্ভাবনা কতটা? এই চার্টটা দেখুন:
ভারত ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি তুলেছে ডায়াস্পোরা বন্ডে। ইসরায়েল ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। বাংলাদেশ? শূন্য। আমরা কখনো চেষ্টা করিনি। কনজারভেটিভ হিসাবেও, বাংলাদেশ প্রথম ইস্যুতেই ৫-৭ বিলিয়ন ডলার তুলতে পারে। ৫ বিলিয়ন ডলার। মানে প্রায় ৫৫,০০০ কোটি টাকা। একটা পদ্মা সেতু বানাতে ৩০,০০০ কোটি লেগেছে।
আর আমাদের প্রবাসীরা কোথায় আছে? কোন দেশে কত মানুষ? এই চার্টটা দেখুন:
সৌদি আরব সবার আগে, প্রায় ২৫ লাখ বাংলাদেশি। তারপর আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন। ইউরোপে ইতালি, যুক্তরাজ্যে ছড়িয়ে আছে অনেকে। আমেরিকায়ও বাড়ছে। প্রতিটা দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস আছে। কিন্তু কতজন শ্রমিক সেই দূতাবাসের কোনো সহায়তা পেয়েছে? কতজনের বেতন আটকে গেলে দূতাবাস সাহায্য করেছে? কতজনের পাসপোর্ট আটকে গেলে দূতাবাস উদ্ধার করেছে?
সংখ্যাটা লজ্জাজনকভাবে কম।
এখন একটু কল্পনা করুন।
২০৩০ সাল। সোহেল এখনো রিয়াদে আছে। কিন্তু এবার তার ছোট ভাই ফারুকও যাচ্ছে। ফারুক সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ছয় মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এয়ারকন্ডিশনিং মেরামত, ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্ক, বেসিক আরবি। সরকারি G2G প্রোগ্রামে যাচ্ছে, খরচ পড়েছে ৮০০ ডলার, ব্যাংক থেকে সহজ ঋণে। দালালের দরকার হয়নি। ভিসা সরকার থেকে সরকারে। কন্ট্র্যাক্ট স্বচ্ছ, বেতন নির্ধারিত, অভিযোগের জন্য হটলাইন আছে।
ফারুক রিয়াদে পৌঁছে প্রথম মাসেই বিকাশে টাকা পাঠায়। ফি নেই। মা তাৎক্ষণিক পেয়ে যায়। ফারুক প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা "প্রবাসী উন্নয়ন বন্ড"-এ জমা রাখে, ৮% সুদে। পাঁচ বছর পর ফিরে এসে সেই টাকা দিয়ে গ্রামে একটা ইলেকট্রিক্যাল সার্ভিসের দোকান খুলবে।
এটা কি অসম্ভব কল্পনা? না। ফিলিপাইন এটা করছে। ভারত এটা করছে। শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত এটা শুরু করেছে। শুধু বাংলাদেশ করছে না।
আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।
রিয়াদে সোহেল আজ রাতেও ১২ ঘণ্টা কাজ করবে। সাতজনের সাথে রুমে ফিরে ভাত রান্না করবে। ভিডিও কলে মেয়ের মুখ দেখবে। মাস শেষে ২০,০০০ টাকা পাঠাবে।
এই ২০,০০০ টাকায় একটা পরিবার বাঁচে। এরকম লাখ লাখ সোহেলের পাঠানো টাকায় বাংলাদেশ বাঁচে। ফরেন রিজার্ভ টিকে থাকে। টাকার দাম ধরে রাখা যায়। আমদানি চলে। বিদ্যুৎ থাকে। কারখানা চলে।
কিন্তু সোহেলের কষ্টের টাকার ৯৪% ভোগে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ৩০-৪০% হুন্ডিতে হারিয়ে যাচ্ছে। সে বিদেশে যেতে গিয়ে মহাজনের কাছে বন্ধক পড়েছে। কাফালায় বন্দি। প্রতি বছর তার মতো ৬৮০ জন ফিরে আসে কফিনে।
আর আমরা? আমরা রেমিট্যান্স রেকর্ডের খবর দেখে খুশি হই। কিন্তু জিজ্ঞেস করি না: এই টাকা দিয়ে আমরা কী তৈরি করলাম? এই মানুষগুলোকে আমরা কী দিলাম?
সোহেল একটা ভালো ভবিষ্যৎ ডিজার্ভ করে। তার ত্যাগ এই দেশকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। এবার আমাদের পালা তাকে কিছু ফেরত দেওয়ার। শুধু কৃতজ্ঞতা না, ন্যায্যতা।