Back to publications
Narrative 2026-03-06

সীমান্তে কত টাকার চোরাচালান?

অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য, সুপারি থেকে গরু, সোনা থেকে ইয়াবা

সীমান্তে কত টাকার চোরাচালান?

পর্ব ১: রাতের সীমান্ত

রাত দুইটা। হিলি স্থলবন্দর, দিনাজপুর। সব শান্ত। বিজিবি চেকপোস্ট থেকে দুইশো গজ দূরে ধানখেতের আলের ওপর দিয়ে ছায়ার মতো হেঁটে যাচ্ছে একদল মানুষ। কাঁধে বস্তা। ভেতরে সুপারি, শাড়ি, কসমেটিক্স। পঁচিশ মিনিটে সীমান্ত পার। ওপাশে ভারতের বালুরঘাটে অপেক্ষা করছে আরেকটা দল। বস্তা বদল হবে। বিনিময়ে আসবে ভারতীয় কাপড়, মশলা, ফেনসিডিল।

এই দৃশ্য প্রতি রাতে ঘটে। হিলিতে, বেনাপোলে, আখাউড়ায়, টেকনাফে। বাংলাদেশের ৪,৪২৭ কিলোমিটার স্থলসীমান্তের প্রায় প্রতিটা অংশে। ভারতের সাথে ৪,১৫৬ কিলোমিটার, মিয়ানমারের সাথে ২৭১ কিলোমিটার। এই সীমান্তের বেশিরভাগ খোলা। নদী, ধানখেত, জঙ্গল, পাহাড়। বেড়া আছে কিছু জায়গায়, কিন্তু বেড়া দিয়ে চোরাচালান থামে না। বেড়ার নিচে সুড়ঙ্গ কাটা হয়। বেড়ার ওপর দিয়ে পণ্য ছুড়ে দেওয়া হয়। বেড়ায় ছিদ্র করা হয়।

তবে সব গবেষকই একমত: পরিমাণটা বিশাল, এবং বাড়ছে। কিন্তু এই সংখ্যাগুলো শুধু আনুমানিক।
২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ
যাদের জীবিকা সীমান্ত
১৭ কোটি মানুষ
আমরা একা নই, কিন্তু পিছিয়ে
প্রায় ৫৫,০০০ থেকে ৮৮,০০
রাতের সীমান্ত

কত টাকার লেনদেন হয় এই অন্ধকারে? বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক সীমান্ত বাণিজ্যের আকার বছরে ৫ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি টাকায়? প্রায় ৫৫,০০০ থেকে ৮৮,০০০ কোটি টাকা। এটা বাংলাদেশের পুরো শিক্ষা বাজেটের চেয়ে বেশি। স্বাস্থ্য বাজেটের তিন গুণ। পদ্মা সেতুর নির্মাণ ব্যয়ের দুই গুণেরও বেশি।

এই চার্টটা দেখুন:

বিশ বছরে অনানুষ্ঠানিক সীমান্ত বাণিজ্যের আনুমানিক আকার। ২০০৫ সালে ছিল ২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। ২০১৫ সালে ৪ বিলিয়ন। ২০২৫ সালে ৫ থেকে ৮ বিলিয়ন, হিসাবের পদ্ধতি অনুযায়ী সংখ্যাটা ভিন্ন হয়। তবে সব গবেষকই একমত: পরিমাণটা বিশাল, এবং বাড়ছে।

কিন্তু এই সংখ্যাগুলো শুধু আনুমানিক। চোরাচালানের প্রকৃত হিসাব কারো কাছে নেই, থাকার কথাও না। যা জানা যায় তা আসে জব্দ করা পণ্যের হিসাব, মিরর স্ট্যাটিসটিকস (দুই দেশের বাণিজ্য পরিসংখ্যানের পার্থক্য), আর মাঠ পর্যায়ের জরিপ থেকে। আর জব্দ হয় মোট চোরাচালানের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ।

তাহলে প্রশ্ন: কী যাচ্ছে এই সীমান্ত দিয়ে? কোন দিকে যাচ্ছে? আর কেন এত বিশাল?


পর্ব ২: ভারত সীমান্ত, সুপারি থেকে গরু

বাংলাদেশের চোরাচালানের সবচেয়ে বড় অংশ ভারতের সাথে। ৪,১৫৬ কিলোমিটার সীমান্ত, পৃথিবীর পঞ্চম দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক সীমান্ত। এই সীমান্ত দিয়ে দুই দিকেই পণ্য যায়।

ভারত থেকে বাংলাদেশে কী আসে? তালিকাটা লম্বা। ভারতীয় শাড়ি, কাপড়, কসমেটিক্স, মশলা, ফেনসিডিল (কাশির সিরাপ, নেশার জন্য ব্যবহৃত), পেঁয়াজ (যখন ভারত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দেয়), চিনি, সোনা। ভারত যখন পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে, বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু সীমান্তবর্তী এলাকায়? দাম বাড়ে কম। কারণ চোরাচালানে পেঁয়াজ ঠিকই আসছে।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে কী যায়? সবচেয়ে বড় পণ্য: গরু। বাংলাদেশে গরুর মাংসের বিশাল চাহিদা, বিশেষত কোরবানির ঈদে। ভারতে (বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে) গরু সস্তা। ভারতের অনেক রাজ্যে গো-হত্যা নিষিদ্ধ, ফলে গরু বিক্রির বৈধ পথ সীমিত। চোরাচালানই একমাত্র উপায়। একটা গরু ভারতে ১০,০০০ রুপিতে কেনা যায়, বাংলাদেশে বিক্রি হয় ৫০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ টাকায়। লাভ? বিশাল। ঝুঁকি? বিজিবি বা বিএসএফ ধরলে জরিমানা, কখনো গুলি।

ভারত সীমান্তের শীর্ষ চোরাচালান পণ্যগুলো। গরু সবচেয়ে ওপরে, বছরে আনুমানিক ১ থেকে ১.৫ বিলিয়ন ডলার। তারপর কাপড় ও বস্ত্র, সোনা, মশলা ও খাদ্যপণ্য, ফেনসিডিল ও মাদকদ্রব্য। ওপারে বাংলাদেশ থেকে যায় সুপারি, হিমায়িত মাছ, বিড়ি-সিগারেট।

এবার সব পণ্য একসাথে দেখুন:

চোরাচালান পণ্যের মোট মূল্যের ভাগবাটোয়ারা। গবাদি পশু সবচেয়ে বড় অংশ। তারপর বস্ত্র ও তৈরি পোশাক, সোনা ও মূল্যবান ধাতু, খাদ্যপণ্য (চিনি, পেঁয়াজ, মশলা), মাদকদ্রব্য (ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা), ভোগ্যপণ্য (কসমেটিক্স, ইলেকট্রনিক্স)।

একটা বিষয় লক্ষ করুন: চোরাচালানের বেশিরভাগ পণ্য দৈনন্দিন জীবনের জিনিস। সোনা আর মাদকদ্রব্য বাদ দিলে, বাকিটা কাপড়, খাবার, গরু। এগুলো চোরাচালান হয় কারণ শুল্ক বেশি, আমদানি নীতি জটিল, অথবা আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যে বাধা আছে। একটা গরু বৈধভাবে আমদানি করতে হলে কত কাগজপত্র, কত শুল্ক, কত সময় লাগে? চোরাচালানে? একটা ফোন কল।


পর্ব ৩: মিয়ানমার সীমান্ত, ইয়াবা ও সোনা

মিয়ানমার সীমান্ত ভিন্ন। ২৭১ কিলোমিটার, পাহাড়ি, দুর্গম। কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি। এখানকার চোরাচালান ভারত সীমান্তের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। কারণ এখানকার প্রধান পণ্য: ইয়াবা।

ইয়াবা (মিথাইলঅ্যামফেটামিন ট্যাবলেট) মিয়ানমারের শান রাজ্যে তৈরি হয়। সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীরা ড্রাগ উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি আরো খারাপ করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই, উৎপাদন বেড়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ দপ্তর (UNODC) অনুযায়ী, মিয়ানমার এখন বিশ্বের বৃহত্তম মিথাইলঅ্যামফেটামিন উৎপাদক।

বাংলাদেশ এই মাদকের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। টেকনাফ, উখিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ি দিয়ে ইয়াবা ঢোকে। নৌকায়, পাহাড়ের পথে, রোহিঙ্গা শিবিরের ভেতর দিয়ে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৪ সালে প্রায় ৮ কোটি পিস ইয়াবা জব্দ হয়েছে। জব্দ হয় মোটের ১০ শতাংশেরও কম। মানে বছরে ৫০ থেকে ১০০ কোটি পিস ইয়াবা বাংলাদেশে ঢুকছে।

মিয়ানমার সীমান্তের চোরাচালান চিত্র। ইয়াবা সবচেয়ে ওপরে, এরপর সোনা, মূল্যবান পাথর, কাঠ (বিশেষত সেগুন), অস্ত্র। ভারত সীমান্তের চোরাচালান মূলত অর্থনৈতিক, মিয়ানমার সীমান্তেরটা অনেক বেশি অপরাধমূলক।

সোনাও একটা বড় ইস্যু। বাংলাদেশে সোনা আমদানিতে শুল্ক বেশি। মিয়ানমার আর ভারত হয়ে অবৈধ সোনা আসে। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে, টেকনাফে, বেনাপোলে নিয়মিত সোনা জব্দ হয়। ২০২৪ সালে শুধু কাস্টমস আর বিজিবি মিলিয়ে প্রায় ৩০০ কেজি সোনা জব্দ করেছে। বাজারমূল্যে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। আর মোটের কত ভাগ জব্দ হয়? একই নিয়ম: ৫ থেকে ১০ শতাংশ।

এবার বিজিবির জব্দ তথ্য দেখুন:

বিজিবির বার্ষিক জব্দ পরিসংখ্যান। গরু, ফেনসিডিল, ইয়াবা, সোনা, কাপড়। সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এটা দেখে ভাবার কারণ নেই যে চোরাচালান বাড়ছে বলে জব্দ বাড়ছে। বরং দুটোই সত্য হতে পারে: তদারকি বেড়েছে, আবার চোরাচালানও বেড়েছে।


পর্ব ৪: আসল হিসাব, ফর্মাল বনাম ইনফর্মাল

একটা সংখ্যা দিয়ে পুরো সমস্যাটা বুঝুন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার। অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য? ৫ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার। মানে আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যের প্রায় ৩৫ থেকে ৫৫ শতাংশের সমান অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য চলছে। প্রতি ৩ ডলারের বৈধ বাণিজ্যের পাশাপাশি ১ থেকে ২ ডলারের অবৈধ বাণিজ্য।

আনুষ্ঠানিক বনাম অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের অনুপাত। নীল অংশ আনুষ্ঠানিক, লাল অংশ অনানুষ্ঠানিক (অনুমিত)। গত এক দশকে আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য বেড়েছে, কিন্তু অনানুষ্ঠানিকও বেড়েছে। অনুপাতটা প্রায় একই আছে।

এটা কেন সমস্যা? তিনটা কারণে।

প্রথমত, রাজস্ব ক্ষতি। চোরাচালান পণ্যে কোনো শুল্ক, ভ্যাট, বা কর দেওয়া হয় না। বাংলাদেশের গড় আমদানি শুল্ক প্রায় ২৫%। ৫ বিলিয়ন ডলারের চোরাচালানে ২৫% হারে রাজস্ব ক্ষতি মানে বছরে ১.২৫ বিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকা। এই টাকা দিয়ে কী করা যেত? প্রায় ৫০টা সরকারি হাসপাতাল তৈরি করা যেত, অথবা ২০,০০০ কিলোমিটার গ্রামীণ রাস্তা নির্মাণ করা যেত।

দ্বিতীয়ত, দেশীয় শিল্পের ক্ষতি। চোরাচালান পণ্য শুল্কমুক্ত, তাই সস্তা। বৈধভাবে আমদানি করা পণ্য বা দেশে তৈরি পণ্য দামে পেরে ওঠে না। বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্প, কসমেটিক্স শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন বাংলাদেশি কাপড় প্রস্তুতকারক ন্যূনতম মজুরি দেয়, ভ্যাট দেয়, কর দেয়, বিদ্যুৎ বিল দেয়। আর চোরাচালান কাপড়? কিছুই দেয় না।

তৃতীয়ত, নিরাপত্তা ঝুঁকি। যে পথে কাপড় আর পেঁয়াজ আসে, সেই একই পথে ইয়াবা, অস্ত্র, আর জাল টাকা আসে। চোরাচালান নেটওয়ার্ক বহুমুখী। আজ গরু পাচার করছে, কাল ইয়াবা, পরশু অস্ত্র। অবকাঠামো একই, লোকজন একই, পথ একই।

কিন্তু একটু ভিন্নভাবে দেখুন। সীমান্ত বাণিজ্যের সাথে জড়িত মানুষগুলো কারা? তাদের জীবনটা কেমন?


পর্ব ৫: যাদের জীবিকা সীমান্ত

হিলি সীমান্তের কাছে বসবাসকারী রহিম মিয়ার বয়স ৪৫। সারাজীবন কৃষি করেছে। কিন্তু তিন বিঘা জমিতে সংসার চলে না। দশ বছর আগে থেকে "ব্যবসা" শুরু করেছে। রাতে সীমান্ত পার করে পণ্য আনে। কখনো সুপারি, কখনো কাপড়। একবার ধরা পড়েছে, বিজিবি মেরেছে, পণ্য জব্দ করেছে। তিন মাস পরে আবার শুরু করেছে। কারণ বিকল্প নেই।

রহিম মিয়ার মতো মানুষ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় লাখ লাখ। সীমান্ত বাণিজ্য (বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে) প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষের জীবিকার উৎস। বাহক (যারা পণ্য বহন করে সীমান্ত পার করে), দালাল (যারা দুই পাশের ব্যবসায়ীদের সংযুক্ত করে), পরিবহনকারী (যারা পণ্য গন্তব্যে পৌঁছে দেয়), আর খুচরা বিক্রেতা (যারা শেষ পর্যন্ত ক্রেতার কাছে বিক্রি করে)।

সীমান্ত বাণিজ্যে জড়িত মানুষের ধরন ও আনুমানিক সংখ্যা। বাহক ও পরিবহনকারী সবচেয়ে বেশি, তারপর খুচরা বিক্রেতা, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী, আর গোডাউন ও সংরক্ষণ কর্মী। এই মানুষগুলোর বেশিরভাগ দরিদ্র। তারা চোরাচালান করে কারণ আর কিছু করার নেই, কারণ সীমান্তের ওপারে পণ্য সস্তা আর এপারে দাম বেশি। তারা ব্যবস্থার শিকার, ব্যবস্থার কারিগর নয়।

আসল কারিগর কারা? বড় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক, দুর্নীতিগ্রস্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। চোরাচালানের শীর্ষে যারা আছে, তারা রহিম মিয়ার মতো রাতে মাঠ পার করে না। তারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে বসে ফোনে হুকুম দেয়।

একটা ইতিবাচক দিকও আছে। সরকার ২০১১ সাল থেকে "বর্ডার হাট" (সীমান্ত বাজার) চালু করেছে। বাংলাদেশ আর ভারতের সীমান্তবর্তী মানুষেরা নির্দিষ্ট দিনে এই বাজারে বৈধভাবে কেনাবেচা করতে পারে। ছোট পরিসরে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।

বর্ডার হাটের বার্ষিক লেনদেন। সংখ্যাটা ছোট, মোট বাণিজ্যের তুলনায় নগণ্য। কিন্তু ধারণাটা গুরুত্বপূর্ণ: অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যকে আনুষ্ঠানিক করার একটা পথ।


পর্ব ৬: আমরা একা নই, কিন্তু পিছিয়ে

বাংলাদেশই একমাত্র দেশ নয় যেখানে সীমান্ত চোরাচালান বড় সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মাদকদ্রব্য পাচার হয়। ভারত-নেপাল সীমান্ত একটা "খোলা সীমান্ত", সেখানে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য আনুষ্ঠানিকের প্রায় সমান। আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে ডুরান্ড লাইন ধরে শত বছরের চোরাচালান চলছে।

কিন্তু পার্থক্য হলো: অনেক দেশ এই সমস্যা মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। আর বাংলাদেশ?

আন্তর্জাতিক তুলনা: আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যের শতাংশ হিসেবে অনানুষ্ঠানিক সীমান্ত বাণিজ্য। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অনুপাতটা সবচেয়ে বেশিগুলোর একটি। মানে আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যের তুলনায় অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের অংশ অস্বাভাবিক রকম বড়।

কেন? কারণগুলো কাঠামোগত।

উচ্চ শুল্ক। বাংলাদেশের গড় আমদানি শুল্ক দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। শুল্ক যত বেশি, চোরাচালানের প্রণোদনা তত বেশি। একটা পণ্যে ৫০% শুল্ক দিতে হলে চোরাচালানে ৫০% সাশ্রয়। এটাই চোরাচালানের মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি।

জটিল আমদানি নীতি। বৈধভাবে আমদানি করতে হলে লাইসেন্স, পারমিট, ছাড়পত্র, পরিদর্শন, কত কাগজপত্র। ছোট ব্যবসায়ীর পক্ষে এই ব্যবস্থায় ঢোকা কঠিন।

সীমান্ত অবকাঠামোর দুর্বলতা। বাংলাদেশের ২৪টা স্থলবন্দরের বেশিরভাগে আধুনিক স্ক্যানিং, পর্যাপ্ত জনবল, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নেই।

দুর্নীতি। বিজিবি, পুলিশ, কাস্টমস, স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা, সবাই "চাঁদা" পায়। চোরাচালান একটা পদ্ধতিগত ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটা স্তরে ভাগ বসানো আছে। রহিম মিয়া পণ্য বহন করে সীমান্ত পার করে, সে পায় ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা। মধ্যস্বত্বভোগী পায় ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা। আর শীর্ষে যারা আছে, যারা সুরক্ষা দেয়, তারা পায় লাখ লাখ টাকা।

গরু পাচারের ট্রেন্ডটা আলাদা করে দেখুন:

গরু পাচারের বার্ষিক আনুমানিক মূল্য ও বিজিবি জব্দ সংখ্যা। ২০১৫ সালের পর ভারতে গো-রক্ষা আন্দোলন ও কড়াকড়ির পরেও পাচার কমেনি, বরং পথ বদলেছে। আগে খোলা মাঠ দিয়ে আসত, এখন নদী পথে আসে। আগে জীবিত গরু আসত, এখন কখনো কাটা মাংস আসে। ব্যবস্থা যতই কঠোর হোক, চাহিদা থাকলে সরবরাহ পথ খুঁজে নেয়।


তাহলে সমাধান কী? শুধু তদারকি বাড়িয়ে কি চোরাচালান থামানো যায়?

ইতিহাস বলে, না। যতদিন চোরাচালানের অর্থনৈতিক প্রণোদনা থাকবে, ততদিন চোরাচালান থাকবে। বিজিবিতে আরো দশ হাজার সৈন্য দিলেও থামবে না। ক্যামেরা, ড্রোন, সেন্সর বসালেও থামবে না। যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলেছে, তবু মাদক ঢুকছে সুড়ঙ্গ দিয়ে, ড্রোন দিয়ে, সমুদ্রপথে।

আসল সমাধান হলো প্রণোদনা পরিবর্তন। শুল্ক কমান, অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের প্রণোদনা কমবে। আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করুন, ছোট ব্যবসায়ীরা আনুষ্ঠানিক পথে আসবে। বর্ডার হাট বাড়ান, বর্তমানে ৪-৫টা আছে, ৫০টা করুন। সীমান্তবর্তী এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ুন, যেখানে দুই দেশের মানুষ বৈধভাবে বাণিজ্য করতে পারবে।

মাদক চোরাচালানের জন্য ভিন্ন কৌশল লাগবে। সেটা আইনশৃঙ্খলার বিষয়, বাণিজ্য নীতির নয়। কিন্তু গরু, কাপড়, পেঁয়াজ, সুপারি? এগুলো অর্থনৈতিক সমস্যা, অর্থনৈতিক সমাধান দরকার।

বাংলাদেশের সীমান্তে প্রতি রাতে যে হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য চলাচল করে, সেটা কোনো রহস্য নয়। সবাই জানে, সবাই দেখে, সবাই চুপ থাকে। কারণ এই ব্যবস্থায় শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সবার ভাগ আছে।

কিন্তু এই ভাগবাটোয়ারায় যারা সবচেয়ে বেশি হারাচ্ছে, তারা হলো সাধারণ মানুষ। রহিম মিয়া যে ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পার করে, সে প্রতি ট্রিপে ৫০০ টাকা পায়। আর যে রাজস্ব হারাচ্ছে, সেটা দিয়ে তার গ্রামে রাস্তা হতো, তার ছেলের স্কুলে শিক্ষক থাকতো, তার মায়ের হাসপাতালে ওষুধ থাকতো।

সীমান্তে কত টাকার চোরাচালান? ৫ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আসল প্রশ্ন: এই চোরাচালান কাদের লাভ আর কাদের ক্ষতি? উত্তর পরিষ্কার। লাভ হচ্ছে কিছু ক্ষমতাবান মানুষের। আর ক্ষতি হচ্ছে ১৭ কোটি মানুষের। প্রতিটা টাকা যেটা অবৈধ পথে যাচ্ছে, সেটা একটা স্কুল না হওয়ার গল্প, একটা হাসপাতাল না হওয়ার গল্প, একটা রাস্তা না হওয়ার গল্প।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50