ইটভাটার ধোঁয়ায় হারাচ্ছি কৃষিজমি ও ফুসফুস
পর্ব ১: রহিমের জমি, ইটভাটার পেটে
রহিম মিয়া গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ছোট কৃষক। তিন বিঘা জমি ছিল তার। ধান ফলাতো, শাকসবজি করতো, পরিবারের পাঁচজনের খাবার জুটতো। ২০১৮ সালে তার জমির পাশে একটা ইটভাটা বসলো।
প্রথম বছরে কিছু বুঝতে পারেনি। দ্বিতীয় বছরে ধানের ফলন কমলো ৩০%। তৃতীয় বছরে জমির ওপরের মাটি ফাটলধরা, শুকনো, ধূসর হয়ে গেলো। ভাটা থেকে ছাই উড়ে এসে ফসলের পাতায় জমে, সালোকসংশ্লেষণ বন্ধ হয়ে যায়। ভাটার জন্য মাটি কাটা হয় আশপাশের জমি থেকে, ফলে জমির উচ্চতা কমে যায়, বর্ষায় জলাবদ্ধতা হয়।
রহিম এখন সেই জমিতে আর চাষ করতে পারে না। জমি বিক্রি করে দিয়েছে, ইটভাটাতেই মজুর হিসেবে কাজ করে। যে জমি তাকে খাওয়াতো, সেই জমির ইটভাটায় সে এখন দিনমজুর।
রহিম একা না। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২,৬০০ একর কৃষিজমি ইটভাটার কারণে চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। আর ইটভাটার সংখ্যা? এই চার্টটা দেখুন:
সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে ইটভাটার সংখ্যা ৮,০০০-এর বেশি। বেসরকারি হিসাবে ১০,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। ২০০০ সালে ছিল ৩,৫০০। মাত্র আড়াই দশকে সংখ্যা তিন গুণ হয়েছে। নগরায়ণের গতি বাড়ছে, নির্মাণের চাহিদা বাড়ছে, ইটের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু প্রতিটা নতুন ইটভাটা মানে আরেকটু কৃষিজমি ধ্বংস, আরেকটু বিষাক্ত বাতাস।
বাংলাদেশ পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম ইট উৎপাদনকারী দেশ। প্রতি বছর প্রায় ২৩ বিলিয়ন ইট তৈরি হয়। এই বিশাল শিল্পের পেছনে কী দাম দিচ্ছে দেশ? চলুন দেখি।
পর্ব ২: ধোঁয়ায় ঢাকা আকাশ
শীতকালে ঢাকার আকাশ ধূসর হয়ে যায়। অনেকে মনে করে কুয়াশা। আসলে এর বড় অংশ ইটভাটার ধোঁয়া। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত ইটভাটা চলে পুরোদমে, আর এই সময়েই বাংলাদেশের বায়ুদূষণ সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছায়।
ইটভাটা বাংলাদেশের বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় একক উৎস। মোট PM2.5 দূষণের প্রায় ৫৮% আসে ইটভাটা থেকে। এই চার্টটা দেখুন:
যানবাহন থেকে আসে ১০%, শিল্পকারখানা থেকে ১২%, গৃহস্থালি রান্না থেকে ৮%, নির্মাণ ধূলি থেকে ৭%, আর বাকিটা অন্যান্য উৎস থেকে। কিন্তু একক উৎস হিসেবে ইটভাটা সবার ওপরে, প্রায় ৫৮%। এই সংখ্যাটা চমকে দেওয়ার মতো। পৃথিবীর খুব কম দেশে একটা মাত্র শিল্পখাত এতটা বায়ুদূষণের জন্য দায়ী।
কেন এত দূষণ? কারণ বাংলাদেশের বেশিরভাগ ইটভাটা পুরনো, অদক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। Fixed Chimney Kiln (FCK) টাইপ ভাটা, যেটা ১৯ শতকের প্রযুক্তি। এগুলোতে কয়লা পোড়ানো হয় খোলা চিমনিতে, ধোঁয়া সরাসরি বাতাসে মেশে, কোনো ফিল্টার নেই, কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
৬০% ইটভাটা এখনো FCK প্রযুক্তি ব্যবহার করে। ২০% ব্যবহার করে উন্নত জিগজ্যাগ প্রযুক্তি, যেটা ৪০% কম দূষণ করে। ১৫% হাইব্রিড হফম্যান কিলন। আর মাত্র ৫% আধুনিক টানেল কিলন বা অটোমেটেড সিস্টেম ব্যবহার করে। মানে বাংলাদেশের ইটশিল্প মূলত ১৯ শতকের প্রযুক্তিতে চলছে ২১ শতকে।
কিন্তু দূষণ শুধু বাতাসে সীমাবদ্ধ না। ইটভাটা মাটিও ধ্বংস করছে।
পর্ব ৩: মাটি খাচ্ছে ইটভাটা
ইট তৈরির প্রধান কাঁচামাল হলো উপরিভাগের মাটি (topsoil)। কৃষিজমির ওপরের ১ থেকে ৩ ফুট মাটি, যেটা হাজার বছরে তৈরি হয়, সেটা তুলে নিয়ে ইট বানানো হয়। একবার এই মাটি চলে গেলে সেই জমি কৃষিকাজের অযোগ্য হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর কতটা মাটি ইটভাটা গিলে খাচ্ছে? এই চার্টটা দেখুন:
প্রতি বছর প্রায় ২.৬ মিলিয়ন টন উপরিভাগের মাটি ইটভাটায় ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০০৫ সালে এই পরিমাণ ছিল ১.২ মিলিয়ন টন। বিশ বছরে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এই মাটি আর ফিরে আসবে না। প্রকৃতিতে এক ইঞ্চি topsoil তৈরি হতে ৫০০ থেকে ১,০০০ বছর লাগে।
আর এই মাটি কোথা থেকে আসছে? কৃষিজমি থেকে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জমি সংকটে। প্রতি বছর নগরায়ণ, শিল্পায়ন, নদীভাঙনে কৃষিজমি কমছে। তার ওপর ইটভাটা যোগ হয়েছে আরেকটা ধ্বংসকারী শক্তি হিসেবে।
ইটভাটার কারণে গত দুই দশকে প্রায় ৪০,০০০ একর কৃষিজমি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, আর রাজশাহী বিভাগে। যেখানে নগরায়ণ বেশি, সেখানে ইটের চাহিদা বেশি, সেখানে ইটভাটা বেশি, সেখানে জমি ধ্বংস বেশি। একটা দুষ্টচক্র।
কিন্তু জমি আর বাতাসের ক্ষতির চেয়ে আরো করুণ একটা সত্য আছে। সেটা হলো ইটভাটায় কারা কাজ করে।
পর্ব ৪: ছোট হাতে ভারী ইট
ইটভাটায় কাজ করে বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষেরা। ভূমিহীন কৃষক, মঙ্গা-পীড়িত উত্তরবঙ্গের পরিবার, নদীভাঙনে সর্বস্বান্ত মানুষ। আর তাদের সাথে কাজ করে তাদের শিশুরা।
বাংলাদেশের ইটভাটায় শিশুশ্রম ব্যাপক। ILO আর UNICEF-এর যৌথ গবেষণা অনুযায়ী ইটভাটা শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ১৫% শিশু, বয়স ৫ থেকে ১৭ বছর। এই চার্টটা দেখুন:
ইটভাটায় আনুমানিক ১০ লাখ শ্রমিক কাজ করে। তার মধ্যে প্রায় দেড় লাখ শিশু। এরা কাঁচা ইট বহন করে, মাটি মেশায়, ইট সাজায়। দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করে। দৈনিক মজুরি ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা। অনেক ক্ষেত্রে পুরো পরিবার "দাদন" বা অগ্রিম টাকা নিয়ে ভাটায় আসে, ফলে ঋণের বন্ধনে আটকে থাকে পুরো মৌসুম।
এই শিশুরা স্কুলে যায় না। ইটভাটার ধুলো, ধোঁয়া, ভারী বোঝা তাদের শরীর ভেঙে দেয়। শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, হাড়ের সমস্যা, চোখের রোগ, এগুলো ইটভাটা শ্রমিকদের নিত্যসঙ্গী।
ইটভাটার স্বাস্থ্য প্রভাব শুধু শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। ভাটার আশপাশে বসবাসকারী মানুষেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই চার্টটা দেখুন:
ইটভাটার ১ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের রোগের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে ৩.৫ গুণ বেশি। শিশুদের মধ্যে হাঁপানির হার ৪.২ গুণ বেশি। দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। Stanford আর BUET-এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ইটভাটা-ঘন এলাকায় গড় আয়ু জাতীয় গড়ের চেয়ে ৩ থেকে ৫ বছর কম।
পর্ব ৫: ইট ছাড়া কি বাড়ি হয় না?
হ্যাঁ, হয়। পৃথিবীর অনেক দেশ ইটভাটা ছাড়াই বাড়ি বানায়। কংক্রিট ব্লক, কম্প্রেসড আর্থ ব্লক (CEB), ফ্লাই-অ্যাশ ব্রিক, হলো ব্রিক, প্রিফ্যাব প্যানেল, এগুলো পরিবেশবান্ধব বিকল্প।
ভারত ২০১৭ সালে ইটভাটা সংস্কার শুরু করেছে। জিগজ্যাগ প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করেছে। ফ্লাই-অ্যাশ ব্রিক ব্যবহারে প্রণোদনা দিয়েছে। চীন আরো আগে, ২০০৫ সালেই অনেক শহরে মাটির ইট নিষিদ্ধ করেছে। ভিয়েতনাম ২০২০ সালে কাঁচামাটির ইট ফেজ-আউট পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
বাংলাদেশেও ২০১৩ সালে "ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন" হয়েছে। ২০২০ সালে "ইটভাটা সংস্কার রোডম্যাপ" ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কতটা বিকল্প প্রযুক্তি গ্রহণ করা হয়েছে? এই চার্টটা দেখুন:
কম্প্রেসড ব্লক আর হলো ব্রিকের মোট বাজার ভাগ এখনো ৫%-এর কম। সরকার টার্গেট করেছে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০% বিকল্প উপকরণ ব্যবহার। কিন্তু বর্তমান গতিতে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন। কেন? কারণ ইটভাটা মালিকরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। স্থানীয় সরকারে তাদের প্রভাব আছে। আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই।
ইটের মোট উৎপাদন প্রবণতাটাও লক্ষ করুন:
২০০০ সালে বাংলাদেশে বার্ষিক ইট উৎপাদন ছিল ৮ বিলিয়ন। ২০২৫ সালে ২৩ বিলিয়ন। প্রতি বছর চাহিদা বাড়ছে, কারণ নির্মাণখাত বাড়ছে। পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, ফ্লাইওভার, নতুন আবাসন প্রকল্প, সব জায়গায় ইট লাগছে। চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু বিকল্প প্রযুক্তি আসছে না। ফলে প্রতিটা নতুন ইট মানে আরেকটু দূষণ, আরেকটু মাটি ধ্বংস।
আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে? এই চার্টটা দেখুন:
ভারত, চীন, পাকিস্তান, ভিয়েতনামের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি মাথাপিছু ইট উৎপাদন সবচেয়ে বেশি, আবার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের হার সবচেয়ে কম। চীন ৮০% আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে। ভিয়েতনাম ৪৫%। ভারত ৩০%। বাংলাদেশ? ৫%। এই ব্যবধান উদ্বেগজনক।
পর্ব ৬: কী করণীয়?
সমাধান জটিল, কিন্তু অসম্ভব না।
প্রথমত, FCK টাইপ ভাটা নিষিদ্ধ করতে হবে, শুধু কাগজে না, বাস্তবে। ২০১৩ সালের আইনে FCK নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু ৬০% ভাটা এখনো FCK টাইপ চলছে। আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নেই, ইচ্ছাও নেই।
দ্বিতীয়ত, বিকল্প নির্মাণ উপকরণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কম্প্রেসড আর্থ ব্লক (CEB) তৈরি করা সহজ, কৃষিজমির মাটি লাগে না, দূষণ অনেক কম। হলো ব্রিক ২৫-৩০% কম উপকরণ লাগে। সরকার যদি এগুলোতে ভর্তুকি দেয়, ট্যাক্স ছাড় দেয়, তাহলে বাজার বদলাবে।
তৃতীয়ত, ইটভাটা শ্রমিকদের সুরক্ষা দরকার। ন্যূনতম মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুশ্রম বন্ধ, এগুলো কার্যকর করতে হবে। ইটভাটায় কাজ করা মানে প্রাণ বিক্রি করা, এটা স্বাভাবিক হতে পারে না।
চতুর্থত, ভারতের মতো ফ্লাই-অ্যাশ ব্রিকে প্রণোদনা দেওয়া যায়। বাংলাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে যে ফ্লাই-অ্যাশ বের হয়, সেটা পরিবেশ দূষণ করছে। সেই ফ্লাই-অ্যাশ দিয়ে ইট বানানো মানে দুটো সমস্যার একটা সমাধান।
আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।
রহিম মিয়া এখন ইটভাটায় কাজ করে। তার ১১ বছরের ছেলে জুয়েলও তার সাথে কাজ করে। সকাল ৫টায় ওঠে, দুপুর পর্যন্ত ইট বহন করে। বিকেলে মাটি মেশায়। স্কুলে যায় না। জুয়েলের বুকে সবসময় একটা শব্দ হয়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কিন্তু ডাক্তার দেখানোর টাকা নেই।
রহিমের জমি এখন ইটভাটার অংশ। সেই জমির মাটি পুড়ে ইট হয়ে যাচ্ছে ঢাকার কোনো বহুতল ভবনের দেয়ালে। আমরা যে বাড়িতে থাকি, সেই বাড়ির প্রতিটা ইটের পেছনে একটুকরো কৃষিজমি আছে, একটা শিশুর হারানো শৈশব আছে, একজন কৃষকের ধ্বংস হওয়া জীবিকা আছে।
বাংলাদেশ প্রতি বছর ২৩ বিলিয়ন ইট বানায়। প্রতিটা ইটের দাম বাজারে ১০ থেকে ১২ টাকা। কিন্তু আসল দাম? সেটা বাজারে লেখা নেই। সেটা লেখা আছে রহিমের হারানো জমিতে, জুয়েলের অসুস্থ ফুসফুসে, ঢাকার ধূসর আকাশে।
প্রশ্নটা সহজ: আমরা কি এই দাম দিতে রাজি? নাকি আমরা ভিন্নভাবে বাড়ি বানাতে শিখবো?