কেন আপনার ব্যাংক ডিপোজিট ঝুঁকিতে
পর্ব ১: আপনার টাকা কি নিরাপদ?
বাংলাদেশের ব্যাংক থেকে ১,৬০,০০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে যেটা আর কখনো ফেরত আসবে না।
এই সংখ্যাটা এত বড় যে মাথায় ঢোকে না। তাই আরেকভাবে বলি: বাংলাদেশের প্রতিটা পরিবারের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ৪০,০০০ টাকা চুরি হয়ে গেছে। আপনার পরিবার থেকেও। আপনি জানেনই না।
কীভাবে? ব্যাংক আপনার জমানো টাকা দিয়ে অন্যদের ঋণ দেয়। কিছু মানুষ সেই ঋণ নিয়ে ফেরত দেয় না। এটাকে বলে এনপিএল, Non-Performing Loan। তিন মাস কিস্তি না দিলেই ঋণটা এনপিএল। সোজা কথায়, ডুবে যাওয়া টাকা।
এখন এই চার্টটা দেখুন:
লক্ষ্য করুন। ২০১০ সাল থেকে এই সংখ্যা কখনো ৬%-এর নিচে যায়নি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ৫%-এর উপরে মানেই বিপদসংকেত। আমরা সেই সীমা পার হয়েছি ১৫ বছর আগে। আর এখন? ১২.৫%। গত দশকের সবচেয়ে খারাপ।
কিন্তু এই ১২.৫% হলো গড়। আসল ছবিটা আরো ভয়ংকর।
থামুন। এই চার্টটা ভালো করে দেখুন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এনপিএল ২২.৪%। মানে প্রতি ১০০ টাকা ঋণের ২২ টাকা ডুবে গেছে। বেসরকারি ব্যাংকে ৫.৮%। বিদেশি ব্যাংকে মাত্র ৩.১%।
পার্থক্যটা চার গুণ।
আপনার টাকা যদি সোনালী, জনতা, বা অগ্রণী ব্যাংকে থাকে, তাহলে আপনি এমন একটা ব্যাংকে টাকা রেখেছেন যেটা প্রায় প্রতি পাঁচ টাকা ঋণের একটা হারিয়ে ফেলছে।
"কিন্তু আমার আমানত তো সরকার গ্যারান্টি দেয়!" হ্যাঁ, দেয়। কিন্তু সেই গ্যারান্টি রাখতে সরকার প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা রিক্যাপিটালাইজেশনে ঢালে। সেটা আসে কোথা থেকে? আপনার ট্যাক্সের টাকা থেকে। মানে আপনি দুইবার হারাচ্ছেন: একবার ব্যাংকের মাধ্যমে, আরেকবার ট্যাক্সের মাধ্যমে।
পুরো সংকটটা এক ফ্রেমে দেখুন:
এখন এই ঝুঁকিটা আমানত ব্যবস্থার ভেতরে কতটা বড়, সেটা দেখুন:
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ৪.৫ লাখ কোটি টাকা আমানত। এনপিএল এক্সপোজার? ১ লাখ কোটি টাকার বেশি। এই টাকা দিয়ে কী করা যেত? ৫০০টা বড় হাসপাতাল বানানো যেত। অথবা ২,০০০ কিলোমিটার মেট্রোরেল। অথবা প্রতিটা জেলায় একটা করে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়।
কিন্তু সেই টাকা গেছে। কিছু মানুষের পকেটে।
এখন প্রশ্ন: এটা কি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা? আমাদের প্রতিবেশীরা কি একই সমস্যায় ভুগছে?
না। এবং সেটাই আসল ভয়ের জায়গা।
পর্ব ২: বাংলাদেশ কি শ্রীলঙ্কা হবে?
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা ভেঙে পড়লো। মানুষ রাস্তায়। ডলার নেই, তেল নেই, খাবার নেই। রাষ্ট্রপতি দেশ ছেড়ে পালালেন।
এই সংকট একদিনে হয়নি। বছরের পর বছর ব্যাংকিং সেক্টরে খারাপ ঋণ জমতে জমতে পুরো অর্থনীতির ভিত্তি পচে গিয়েছিল। সংকটের ঠিক আগে শ্রীলঙ্কার এনপিএল ছিল ৯%।
বাংলাদেশের এখন ১২.৫%।
এবার এই চার্টটা দেখুন। এটা আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চার্ট:
পাঁচটা দেশ, দশ বছরের ডাটা। কয়েকটা জিনিস খেয়াল করুন:
- ভারতের লাইনটা দেখুন। ২০১৮ সালে ১০%-এ পৌঁছেছিল। তারপর? ফ্রি ফল। এখন ২.৫%। কীভাবে সম্ভব? সেটা একটু পরে বলছি।
- ভিয়েতনামের লাইন। সবসময় নিচে, ২-৪% রেঞ্জে। এরাও আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশ।
- আর বাংলাদেশ? পাঁচটা দেশের মধ্যে একমাত্র দেশ যেখানে ট্রেন্ড ক্রমাগত উপরে যাচ্ছে। সবাই কমাচ্ছে বা ধরে রাখছে, আমরা বাড়াচ্ছি।
এটা শুধু সংখ্যা না। এটা একটা দিকনির্দেশনা। এবং দিকটা ভুল।
এবার আরেকটা তুলনা দেখি যেটা রাতে ঘুম আসবে না:
এখানে আমি শ্রীলঙ্কার সংকটের আগের পাঁচ বছর আর বাংলাদেশের গত পাঁচ বছর পাশাপাশি রেখেছি। প্রতিটা পয়েন্টে বাংলাদেশের সংখ্যা শ্রীলঙ্কার চেয়ে বেশি। শ্রীলঙ্কা ছিল ৫-৯% রেঞ্জে। আমরা আছি ৮-১২.৫% রেঞ্জে।
আমি বলছি না যে বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কার মতো সংকট হবেই। দুই দেশ একরকম না। বাংলাদেশের রেমিট্যান্স শক্তিশালী, গার্মেন্টস রপ্তানি আছে, ঋণ-জিডিপি অনুপাত কম। কিন্তু শ্রীলঙ্কাও ভেবেছিল তারা আলাদা। প্রতিটা সংকটে আক্রান্ত দেশই ভাবে, "আমাদের ক্ষেত্রে এটা হবে না।"
সমস্যাটা কোথায় সবচেয়ে গভীর? এই চার্ট দেখুন:
দুটো লাইন। লাল লাইন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, নীল লাইন বেসরকারি। দুটো লাইনের মধ্যে ফাঁক কত? প্রায় ১৫-২০ পার্সেন্টেজ পয়েন্ট। এই ফাঁকটা হলো রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল শাসন, আর জবাবদিহিতার অভাবের পরিমাপ।
বেসরকারি ব্যাংক একই দেশে, একই অর্থনীতিতে, একই মানুষদের ঋণ দিচ্ছে। তাহলে তাদের এনপিএল কেন ৫-৬%? আর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কেন ২০-২৫%? উত্তর সোজা: কে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
বাংলাদেশের চারটা ঝুঁকি আছে যেগুলো পরিস্থিতি আরো কঠিন করছে:
- রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আধিপত্য। মোট ব্যাংকিং সম্পদের ২৫% এমন ব্যাংকের হাতে যেগুলোতে এনপিএল সবচেয়ে বেশি।
- গার্মেন্টস নির্ভরতা। রপ্তানি আয়ের ৮৫% একটা সেক্টর থেকে। সেখানে ধাক্কা লাগলে ডমিনো ইফেক্ট হবে।
- হুন্ডি সমস্যা। রেমিট্যান্স অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে গেলে ফরেন রিজার্ভে চাপ পড়ে, ব্যাংকিং স্থিতিশীলতা কমে।
- আইন আছে, প্রয়োগ নেই। অর্থঋণ আদালতে একটা মামলা চলে ৫-১০ বছর। ততদিনে খেলাপি সম্পদ বিদেশে পাচার করে ফেলে।
এবার একটা ভয়ের গল্প বলি। ধরুন এটা ২০৩০ সাল।
কোনো সংস্কার হয়নি। এনপিএল ২০%-এ পৌঁছেছে। সরকার প্রতি বছর ৩০,০০০ কোটি টাকা ব্যাংকে ঢালছে শুধু জীবিত রাখতে। সেই টাকা কোথা থেকে আসছে? শিক্ষা বাজেট থেকে। স্বাস্থ্য বাজেট থেকে। আপনার মেয়ের স্কুলের শিক্ষক বেতন পাচ্ছে না। আপনার বাবার হাসপাতালে ওষুধ নেই। কিন্তু ঋণখেলাপিরা? তারা গুলশানে নতুন বাড়ি কিনছে।
এটা কল্পনা না। এটা গণিত। বর্তমান ট্রেন্ড চলতে থাকলে এটাই হবে।
কিন্তু কীভাবে এই অবস্থা হলো? কারা টাকাগুলো নিলো? আর কেন সিস্টেম তাদের রক্ষা করছে?
পর্ব ৩: কারা খেলো ব্যাংকের টাকা?
বাংলাদেশে ঋণখেলাপি একটা দুর্ঘটনা না। এটা একটা সিস্টেম। একটা চক্র যেটা ডিজাইন করা হয়েছে কিছু মানুষের লাভের জন্য।
চক্রটা এরকম কাজ করে:
- রাজনৈতিক সংযোগ ব্যবহার করে বড় ঋণ নেওয়া হয়। জামানত কম, বা নকল।
- ঋণের টাকা ব্যবসায় লাগানো হয় না। সম্পদ কেনা, বিদেশে পাচার, বা অন্য কাজে চলে যায়।
- তিন মাস কিস্তি না দিলে এনপিএল হিসেবে চিহ্নিত হয়।
- তখন শুরু হয় "রিশিডিউলিং"। ঋণ পুনর্গঠন। নতুন শর্ত, নতুন সময়সীমা।
- রিশিডিউল হলে এনপিএল তালিকা থেকে বেরিয়ে যায়। হিসাবে দেখায় "সুস্থ ঋণ"।
- আবার কিস্তি বন্ধ। আবার এনপিএল। আবার রিশিডিউল।
এই চক্র চলে বছরের পর বছর। এটাকে অর্থনীতিতে বলে "মোরাল হ্যাজার্ড"। যখন কেউ জানে যে তার কিছু হবে না, সে আরো বেশি ঝুঁকি নেয়। বাংলাদেশে ঋণখেলাপিরা জানে: ফেরত না দিলেও কিছু হবে না। বরং আরো ঋণ পাওয়া যাবে।
কোন সেক্টর থেকে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ? এই চার্টটা দেখুন:
গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শীর্ষে, ২৮,৫০০ কোটি টাকা। তারপর রিয়েল এস্টেট, ২২,০০০ কোটি। ট্রেডিং, ১৮,০০০ কোটি। এর মানে এই না যে গার্মেন্টস সেক্টর খারাপ। এই সেক্টরে ঋণের পরিমাণ বেশি বলে খেলাপিও বেশি। কিন্তু কনসেনট্রেশনটা একটা ঝুঁকি। একটা সেক্টরে সমস্যা হলে পুরো ব্যাংকিং সিস্টেম কাঁপবে।
আর রিশিডিউলিং? সেটা কত বড় সমস্যা?
এই চার্টটা দেখে ভয় লাগার কথা। রিশিডিউলড ঋণ ২০১৫ সালে ছিল ১৫,০০০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে? ৬৮,০০০ কোটি। দশ বছরে সাড়ে চার গুণ।
একটা কথা বলে রাখি। এই ডাটা পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য না। অনেক রিশিডিউলড ঋণ রিপোর্টই করা হয় না। প্রকৃত সংখ্যা আরো বড়। তবে ট্রেন্ডটা পরিষ্কার: সমস্যা বাড়ছে, কমছে না।
এখন আশার কথা। কারণ এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। আমরা জানি, কারণ ভারত করে দেখিয়েছে।
২০১৬ সালে ভারতের এনপিএল ছিল ১০%। আমাদের মতোই খারাপ। তারপর তারা Insolvency and Bankruptcy Code (IBC) চালু করলো। কী করলো এটা?
- ১৮০ দিনের সময়সীমা। ঋণ ফেরত না দিলে ছয় মাসের মধ্যে সমাধান হতে হবে। পুনর্গঠন অথবা লিকুইডেশন। টালবাহানার সুযোগ নেই।
- ডুবিয়ে দেওয়া মালিকদের নিষিদ্ধ করলো। যে কোম্পানি ডুবিয়েছে, সে আর সেটা কিনতে পারবে না।
- বিশেষায়িত আদালত বানালো। NCLT, যেখানে শুধু ইনসলভেন্সি কেস শোনা হয়। দ্রুত, দক্ষ।
- সব তথ্য পাবলিক করলো। কে কত ঋণ নিয়েছে, কত ফেরত দিয়েছে, সবাই দেখতে পায়।
ফলাফল? সাত বছরে এনপিএল ১০% থেকে কমে ২.৫%। ঋণখেলাপিরা বুঝলো, আর পার পাওয়া যাবে না। অনেকে IBC নোটিশ পাওয়ার আগেই টাকা ফেরত দিয়ে দিলো।
বাংলাদেশে কি এটা সম্ভব? হ্যাঁ। আমার চারটা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব:
- ব্যাংকিং ট্রাইবুনাল তৈরি করুন। অর্থঋণ আদালত কাজ করছে না। ভারতের NCLT-র মতো বিশেষায়িত ট্রাইবুনাল দরকার। টার্গেট: ১৮০ দিনে সমাধান।
- ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শাস্তি দিন। পাসপোর্ট বাতিল। সম্পদ ক্রোক। নির্বাচনে দাঁড়ানো নিষিদ্ধ। ভারত এটা করেছে, কাজ হয়েছে।
- রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বোর্ডে রাজনীতি বন্ধ করুন। পেশাদার ব্যাংকার দিয়ে বোর্ড গঠন করুন। রাজনৈতিক নিয়োগ সম্পূর্ণ বন্ধ।
- ঋণ তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত করুন। কে কত ঋণ নিয়েছে, কত ফেরত দিয়েছে। স্বচ্ছতাই সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক।
এই সংস্কারগুলো হলে কী হবে? আর না হলে?
দুটো পথ। লাল ড্যাশ লাইন: কিছু না করলে ২০৩০ সালে এনপিএল ২০%। কমলা ড্যাশ লাইন: সংস্কার করলে ৫.৫%।
পার্থক্যটা কত? প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। এই টাকায় বাংলাদেশের প্রতিটা শিশুকে বিনামূল্যে ১২ বছর মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া যেত।
একটা সংখ্যা মনে রাখুন: ৪০,০০০ টাকা। এটা আপনার পরিবারের ভাগে পড়া ক্ষতি। প্রতিটা পরিবারের। এই সংখ্যাটা বাড়বে, না কমবে, সেটা নির্ভর করছে আমরা পরবর্তী দুই বছরে কী করি।
ভারত পেরেছে। আমরাও পারবো। কিন্তু শুধু তখনই, যখন আপনি প্রশ্ন করবেন: আমার টাকা কোথায় গেলো? আর কে নিলো?