অ্যান্টিবায়োটিক: সুপারবাগ তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে
পর্ব ১: ওষুধের দোকানে একটি সাধারণ দৃশ্য
ঢাকার মিরপুরে একটা ফার্মেসি। সন্ধ্যা সাতটা। একজন রিকশাচালক ঢুকলেন, বললেন, "ভাই, জ্বর আর গলা ব্যথা। একটু অ্যান্টিবায়োটিক দেন।" দোকানদার কোনো প্রশ্ন করলো না। প্রেসক্রিপশন চাইলো না। একটা স্ট্রিপ অ্যাজিথ্রোমাইসিন বের করে দিলো। দাম ১২০ টাকা। রিকশাচালক তিনটা ট্যাবলেট খাবেন, জ্বর কমলেই বাকিগুলো রেখে দেবেন। পরের বার জ্বর হলে আবার খাবেন। কোর্স শেষ করার প্রশ্নই আসে না।
এই দৃশ্য বাংলাদেশে প্রতিদিন লাখ লাখ বার ঘটছে। প্রতিটা মোড়ে, প্রতিটা বাজারে, প্রতিটা গ্রামে। অ্যান্টিবায়োটিক এখানে প্যারাসিটামলের মতো সহজলভ্য। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন? সেটা আইনে আছে, বাস্তবে নেই।
কতটা ভয়াবহ এই পরিস্থিতি? এই চার্টটা দেখুন:
বাংলাদেশে বিক্রি হওয়া অ্যান্টিবায়োটিকের ৮০% এর বেশি প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি হয়। ভারতে এই হার ৬৪%, সেটাও উদ্বেগজনক। কিন্তু থাইল্যান্ড (২৮%) বা মালয়েশিয়া (১৫%) এর সাথে তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে এই হার ৫% এর কম, কারণ সেখানে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়াই যায় না।
সমস্যাটা শুধু প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি না। সমস্যাটা আরো গভীর। বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের মোট ব্যবহার বাড়ছে দ্রুত গতিতে। এই চার্টটা দেখুন:
২০১০ সালে বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের বাজার ছিল প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে সেটা ১,৫০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তিন গুণের বেশি বৃদ্ধি। জনসংখ্যা বেড়েছে ১৫%, কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বেড়েছে ২৩০%। এই অনুপাত স্বাভাবিক না। এটা অতিব্যবহারের স্পষ্ট চিহ্ন।
মাথাপিছু ব্যবহারের হিসাবটাও চমকে দেওয়ার মতো। এই চার্টটা দেখুন:
বাংলাদেশে মাথাপিছু অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার প্রতি ১,০০০ জনে দৈনিক ২১.৫ ডিফাইন্ড ডেইলি ডোজ (DDD)। WHO বলছে ১০ DDD এর নিচে রাখা উচিত। ভারতে এই হার ১৩.৬, থাইল্যান্ডে ১৫.২। কিন্তু নেদারল্যান্ডসে মাত্র ৮.৭, সুইডেনে ১০.৩। বাংলাদেশ ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছে।
কেন এত বেশি ব্যবহার? তিনটা কারণ। প্রথমত, ডাক্তাররা নিজেই অপ্রয়োজনে প্রেসক্রাইব করেন। সর্দি-কাশিতে, ভাইরাল জ্বরে, ডায়রিয়ায় (যেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো কাজ নেই)। দ্বিতীয়ত, রোগীরা নিজেরাই দোকান থেকে কিনে খায়। তৃতীয়ত, ওষুধ কোম্পানিগুলো আক্রমণাত্মক বিপণন করে, ডাক্তারদের অ্যান্টিবায়োটিক লেখার জন্য প্রণোদনা দেয়।
পর্ব ২: মুরগির খামারে নীরব বিপর্যয়
মানুষের অতিব্যবহার সমস্যার একটা দিক মাত্র। আরেকটা দিক আরো ভয়ংকর: পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক।
বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয় দুটো কারণে। প্রথমত, রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা, সেটা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু দ্বিতীয় কারণটা বিপজ্জনক: গ্রোথ প্রমোটার হিসেবে। মুরগির খাবারে অ্যান্টিবায়োটিক মেশালে মুরগি দ্রুত বড় হয়। কম খাবারে বেশি ওজন আসে। খামারির জন্য লাভজনক। কিন্তু এই অভ্যাস প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরি করছে, যেগুলো মুরগির মাংসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ঢুকছে।
বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পে বছরে প্রায় ৩৮০ টন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ৪৫% ব্যবহৃত হয় গ্রোথ প্রমোটার হিসেবে, ৩০% রোগ প্রতিরোধে (প্রোফাইল্যাক্সিস), আর মাত্র ২৫% প্রকৃত চিকিৎসায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০০৬ সালে গ্রোথ প্রমোটার হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক নিষিদ্ধ করেছে। ভারত ২০১৯ সালে কোলিস্টিন নিষিদ্ধ করেছে (কোলিস্টিন হলো "last resort" অ্যান্টিবায়োটিক, যেটা অন্য সব ওষুধ কাজ না করলে ব্যবহার করা হয়)। বাংলাদেশে কোনো কার্যকর নিষেধাজ্ঞা নেই।
সমস্যাটা শুধু পোল্ট্রিতে সীমাবদ্ধ না। মৎস্য চাষে, গরু মোটাতাজাকরণে, এমনকি শাকসবজির জৈব সারেও অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যাচ্ছে। এটাকে বিজ্ঞানীরা বলেন "One Health" সংকট: মানুষ, পশু, আর পরিবেশ, তিনটা একসাথে জড়িত। একটা জায়গায় অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হলে তার প্রভাব বাকি দুটোতে পড়ে।
ঢাকার নদী ও নালায় গবেষকরা উচ্চমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জিন খুঁজে পেয়েছেন। বুড়িগঙ্গার পানিতে, হাজারীবাগের বর্জ্যে, এমনকি রাজধানীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায়ও। মানে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া শুধু হাসপাতালে না, তারা চারপাশে আছে।
পর্ব ৩: সুপারবাগ এখানে
এত অতিব্যবহারের ফল কী? ফল হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR), যেটাকে সাধারণ ভাষায় বলা হয় "সুপারবাগ।" ব্যাকটেরিয়া শিখে গেছে কীভাবে অ্যান্টিবায়োটিক থেকে বেঁচে থাকতে হয়। আর একবার শেখার পর সেই ক্ষমতা অন্য ব্যাকটেরিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে সাধারণ রোগজীবাণুগুলোর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের হার দেখলে আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। এই চার্টটা দেখুন:
E. coli ব্যাকটেরিয়ার ৭৫% এখন সিপ্রোফ্লক্সাসিন-প্রতিরোধী। এর মানে হলো, মূত্রনালীর সংক্রমণে (UTI) সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকটা এখন চারটার মধ্যে তিনটা ক্ষেত্রে কাজ করে না। Klebsiella pneumoniae-র ৬৮% তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিন-প্রতিরোধী। Salmonella-র ৬১% মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট। Staphylococcus aureus-এর (MRSA) ৪৭% মেথিসিলিন-প্রতিরোধী। Acinetobacter-এর ৮০% কার্বাপেনেম-প্রতিরোধী (কার্বাপেনেম হলো সবচেয়ে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর একটা)।
এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান না। এগুলো মানে হলো বাংলাদেশে একটা সাধারণ সংক্রমণও এখন প্রাণঘাতী হতে পারে। একটা কাটা আঙুলের ইনফেকশন, একটা সিজারিয়ানের পর সংক্রমণ, একটা নিউমোনিয়া, এগুলোতে আগে যে অ্যান্টিবায়োটিক দিলে সেরে যেতো, এখন সেটা কাজ করে না। ডাক্তারকে আরো শক্তিশালী, আরো দামি, আরো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত ওষুধ দিতে হচ্ছে। আর সেগুলোও কতদিন কাজ করবে, কেউ জানে না।
আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? এই চার্টটা দেখুন:
E. coli-র ফ্লুরোকুইনোলোন প্রতিরোধের হার বাংলাদেশে ৭৫%, ভারতে ৭০%, চীনে ৫৫%, থাইল্যান্ডে ৪৫%, যুক্তরাষ্ট্রে ২৫%, নেদারল্যান্ডসে ১২%। বাংলাদেশ ও ভারত বিশ্বের সর্বোচ্চ AMR হারের দেশগুলোর মধ্যে। এটা কাকতালীয় না। দুটো দেশেই প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সহজে পাওয়া যায়, পশুপালনে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার হয়, আর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল।
হাসপাতালের ভেতরের চিত্র আরো ভয়াবহ। এই চার্টটা দেখুন:
বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে নোসোকোমিয়াল ইনফেকশনের (হাসপাতাল-অর্জিত সংক্রমণ) হার প্রায় ৩০%। মানে প্রতি ১০ জন ভর্তি রোগীর মধ্যে ৩ জন হাসপাতালে থাকার সময় নতুন সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছে। উন্নত দেশে এই হার ৫-৭%। ভারতে ১৫-২০%। বাংলাদেশে ৩০% হওয়ার কারণ পরিষ্কার: অপর্যাপ্ত হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, জীবাণুনাশক ঘাটতি, অতিরিক্ত ভিড়, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইনফেকশন কন্ট্রোল কমিটি অধিকাংশ হাসপাতালে কাগজে কলমে আছে, বাস্তবে নেই।
পর্ব ৪: ওষুধের মান নিয়ে প্রশ্ন
অতিব্যবহার একটা সমস্যা। কিন্তু আরেকটা সমস্যা আছে যেটা কম আলোচিত: ওষুধের মান। বাংলাদেশে বিক্রি হওয়া সব অ্যান্টিবায়োটিক কি আসলেই মানসম্পন্ন?
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বিক্রি হওয়া অ্যান্টিবায়োটিকের ১০-১৫% মানসম্পন্ন না। কিছু ক্ষেত্রে সক্রিয় উপাদানের পরিমাণ ঘোষিত মাত্রার ৬০% এরও কম। কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ দ্রবীভূতই হয় না ঠিকমতো, ফলে শরীরে শোষিত হয় না। এই নিম্নমানের ওষুধ দুটো ক্ষতি করে: একদিকে রোগ সারে না, অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়া কম মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিকের সংস্পর্শে এসে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে। মানে নিম্নমানের ওষুধ সরাসরি সুপারবাগ তৈরি করছে।
DGDA (Directorate General of Drug Administration) এর তত্ত্বাবধানে ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ হওয়ার কথা। কিন্তু সারাদেশে ২ লাখের বেশি ওষুধের দোকান আর মাত্র কয়েকশ পরিদর্শক দিয়ে কতটুকু নজরদারি সম্ভব? ফলে নিম্নমানের, মেয়াদোত্তীর্ণ, এমনকি ভেজাল ওষুধ বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
পর্ব ৫: মৃত্যুর হিসাব আর অর্থনৈতিক মূল্য
AMR কতটা মারাত্মক? সংখ্যায় দেখলে ভয়ংকর। ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী AMR-সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৯ লাখ (যার মধ্যে ১২.৭ লাখ সরাসরি AMR-এর কারণে)। Lancet-এর গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বছরে ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশের জন্য প্রাক্কলন করলে সংখ্যাটা আতঙ্কজনক।
বাংলাদেশে বর্তমানে AMR-সম্পর্কিত মৃত্যু বছরে আনুমানিক ৫৮,০০০। ২০৩০ সালে এটা ৮৫,০০০, ২০৪০ সালে ১,৩০,০০০, আর ২০৫০ সালে ১,৭০,০০০ ছাড়াতে পারে। তুলনার জন্য বলি: বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে প্রায় ৮,০০০ মানুষ মারা যায়। AMR ইতিমধ্যে তার সাত গুণ বেশি মানুষ মারছে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়, AMR নিয়ে হয় না।
আর শুধু মৃত্যু না, আর্থিক ক্ষতিও বিশাল। এই চার্টটা দেখুন:
AMR-এর কারণে বাংলাদেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতি আনুমানিক ২.৫ বিলিয়ন ডলার। এই ক্ষতি আসে কয়েকটা পথে: দীর্ঘতর হাসপাতাল ভর্তি (AMR সংক্রমণে গড়ে ১২ দিন বেশি থাকতে হয়), দ্বিতীয়/তৃতীয় সারির দামি ওষুধের খরচ, উৎপাদনশীলতা হ্রাস (অসুস্থ মানুষ কাজ করতে পারে না), আর মৃত্যুজনিত আয় ক্ষতি। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী AMR-এর বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে ১০০ ট্রিলিয়ন ডলার, এটা বিশ্ব ব্যাংকের অনুমান।
বাংলাদেশের জন্য ২.৫ বিলিয়ন ডলার মানে কী? এটা দেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের চেয়ে বেশি। মানে AMR-এর ক্ষতি মেটাতে যে টাকা দরকার, সেটা সরকার পুরো স্বাস্থ্য খাতে যা খরচ করে তার চেয়ে বেশি।
পর্ব ৬: কী করা যেতে পারে?
সমস্যাটা বিশাল, কিন্তু সমাধান অসম্ভব না। অন্যান্য দেশ দেখিয়েছে যে AMR নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
সুইডেন ১৯৮৬ সালে পশুখাদ্যে গ্রোথ প্রমোটার হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক নিষিদ্ধ করেছে, বিশ্বে প্রথম। ফলাফল? পশুপালন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং স্বাস্থ্যকর পশুপালন পদ্ধতি গড়ে উঠেছে। থাইল্যান্ড ২০১৭ সালে একটা জাতীয় AMR কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। পাঁচ বছরে তাদের হাসপাতালে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ২০% কমেছে। ভারত "Red Line Campaign" চালু করেছে: প্রেসক্রিপশন ওষুধের প্যাকেটে লাল দাগ থাকে, দোকানদার জানে এটা বিনা প্রেসক্রিপশনে দেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশের জন্য কী দরকার?
প্রথমত, প্রেসক্রিপশন বাধ্যতামূলক করা এবং সত্যিকার অর্থে তা বাস্তবায়ন করা। এখন আইন আছে, প্রয়োগ নেই। ফার্মেসি লাইসেন্সিং কঠোর করতে হবে। ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে: ডাক্তার ই-প্রেসক্রিপশন দেবেন, ফার্মেসি সেই কোড ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারবে না। বাংলাদেশে ইন্টারনেট আছে, স্মার্টফোন আছে, প্রযুক্তিগত বাধা নেই।
দ্বিতীয়ত, পোল্ট্রি ও মৎস্য চাষে গ্রোথ প্রমোটার হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা। এটা করতে খামারিদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, বিকল্প পদ্ধতি (প্রোবায়োটিক, ভ্যাকসিন, উন্নত খামার ব্যবস্থাপনা) শেখাতে হবে।
তৃতীয়ত, হাসপাতালে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা। প্রতিটা হাসপাতালে কার্যকর ইনফেকশন কন্ট্রোল কমিটি থাকা উচিত। অ্যান্টিবায়োটিক স্টুয়ার্ডশিপ প্রোগ্রাম চালু করা দরকার: কোন রোগে কোন অ্যান্টিবায়োটিক কত দিন দেওয়া হবে, সেটা নির্ধারিত গাইডলাইন মেনে হবে, ডাক্তারের ইচ্ছামতো না।
চতুর্থত, জনসচেতনতা। মানুষকে জানাতে হবে যে অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসে কাজ করে না, কোর্স শেষ না করলে বিপদ, আর প্রতিটা অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ভবিষ্যতের একটা ওষুধকে অকেজো করে দিচ্ছে।
পঞ্চমত, AMR নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বাংলাদেশে এখনো কোনো জাতীয় AMR সার্ভেইল্যান্স নেটওয়ার্ক নেই। কোন ব্যাকটেরিয়া কোন অ্যান্টিবায়োটিকে প্রতিরোধী হয়ে উঠছে, সেটার পদ্ধতিগত তথ্য সংগ্রহ হয় না। তথ্য ছাড়া পরিকল্পনা অসম্ভব।
একটা সত্যি কথা বলে শেষ করি।
অ্যান্টিবায়োটিক ছিল বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চিকিৎসা আবিষ্কার। আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ১৯২৮ সালে পেনিসিলিন আবিষ্কার করেছিলেন। সেই একটা আবিষ্কার কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। নিউমোনিয়া, সেপসিস, যক্ষ্মা, কলেরা, এসব রোগ থেকে মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমেছে শুধু অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে। আধুনিক সার্জারি, ক্যান্সার চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, এগুলোর কোনোটাই অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া সম্ভব না।
আর আমরা সেই অমূল্য সম্পদটাকে ধ্বংস করছি। প্রতিটা অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, প্রতিটা অসম্পূর্ণ কোর্স, প্রতিটা মুরগির খাবারে মেশানো অ্যান্টিবায়োটিক একটু একটু করে আমাদের শেষ অস্ত্রটাকে ভোঁতা করে দিচ্ছে।
ফ্লেমিং নিজেই ১৯৪৫ সালে নোবেল বক্তৃতায় সতর্ক করেছিলেন: "এমন একটা সময় আসতে পারে যখন পেনিসিলিন যেকেউ দোকান থেকে কিনতে পারবে। তখন একজন অজ্ঞ মানুষ সহজেই নিজেকে কম মাত্রায় পেনিসিলিন দিয়ে অণুজীবগুলোকে প্রতিরোধী করে তুলবে।"
মিরপুরের সেই ফার্মেসিতে যা ঘটছে, ফ্লেমিং ঠিক সেটাই আশি বছর আগে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুনবো, নাকি সুপারবাগের যুগে প্রবেশ করবো অপ্রস্তুত অবস্থায়?