মেধা পাচার: সেরারা কেন ফেরে না?
পর্ব ১: তানভীরের চিঠি
তানভীর আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিল। তারপর স্কলারশিপ নিয়ে গেলো আমেরিকায়, এমআইটিতে। পাঁচ বছর ন্যানোম্যাটেরিয়ালস নিয়ে গবেষণা করে পিএইচডি শেষ করলো। তার পেপার বেরোলো Nature Materials-এ। সুপারভাইজর বললেন, "তুমি চাইলে এখানে পোস্ট-ডক করো, তারপর ফ্যাকাল্টি পজিশন পাবে।"
তানভীর ভাবলো। দেশে ফিরবো। দেশের জন্য কাজ করবো।
সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলো। উত্তর পেতে চার মাস লাগলো। সাক্ষাৎকারে গেলো। কমিটির একজন সদস্য জিজ্ঞেস করলো, "আপনার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কী?" তানভীর বুঝলো, এখানে মেধা দিয়ে চাকরি হয় না। চাকরি হয় দলীয় পরিচয়ে।
সে ফিরে গেলো আমেরিকায়। এখন ক্যালিফোর্নিয়ার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক। মাসিক বেতন ৮,৫০০ ডলার। গবেষণা তহবিল ৩ লাখ ডলার। ল্যাব আছে, যন্ত্রপাতি আছে, ছাত্র আছে, স্বাধীনতা আছে।
তানভীর যদি ঢাকায় চাকরি পেতো, তার বেতন হতো কত? একজন প্রভাষকের শুরুর বেতন মাসে প্রায় ৩৫,০০০ টাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এমআইটি থেকে পিএইচডি করে এসে। ৩৫,০০০ টাকা।
তানভীর একটা কাল্পনিক চরিত্র। কিন্তু তানভীরের গল্প বাস্তব। হাজার হাজার তানভীর এই মুহূর্তে পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, গবেষণাগারে, প্রযুক্তি কোম্পানিতে কাজ করছে। তারা বাংলাদেশের সেরা মেধা। তারা ফেরেনি। ফিরবেও না।
এবার সংখ্যা দিয়ে শুরু করি।
২০০০ সাল থেকে প্রতি বছর গড়ে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ বাংলাদেশি ছাত্র পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হচ্ছে বিদেশে। কিন্তু প্রতি বছর দেশে ফিরছে মাত্র ১২০ থেকে ১৬০ জন। দুটো লাইনের মাঝে যে ফাঁকটা দেখছেন, সেটাই বাংলাদেশের মেধা পাচারের গল্প। লাল লাইন বাড়ছে, সবুজ লাইন প্রায় সমতলে পড়ে আছে। ২৫ বছরে এই ফাঁক কেবল বেড়েছে, কমেনি।
তারা কোথায় যাচ্ছে? এই চার্টটা দেখুন।
যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৮,২০০ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পিএইচডি ধারী। তারপর যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, জাপান। এরা পদার্থবিদ, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ, চিকিৎসক, কম্পিউটার বিজ্ঞানী। পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট। পৃথিবীর সেরা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। আর বাংলাদেশে? এদের মধ্যে কতজন ফিরেছে? ১০ জনে ১ জনও না।
পর্ব ২: ফেরার হিসাব
কেন ফেরে না? উত্তরটা জটিল না। উত্তরটা খুবই সরল। অর্থনীতি।
এই চার্টটা দেখুন। বাংলাদেশে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মাসিক বেতন ৮০,০০০ থেকে ৯৫,০০০ টাকা। ডলারে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০। একই যোগ্যতা নিয়ে আমেরিকায় গেলে? মাসে ৮,০০০ থেকে ১২,০০০ ডলার। যুক্তরাজ্যে ৫,০০০ থেকে ৮,০০০ পাউন্ড। কানাডায় ৭,০০০ থেকে ১০,০০০ কানাডিয়ান ডলার। পার্থক্যটা ১০ থেকে ১৫ গুণ। আমেরিকায় একজন সহকারী অধ্যাপক যা এক মাসে আয় করে, বাংলাদেশে একজন পূর্ণ অধ্যাপক সেটা আয় করতে এক বছর লাগে।
কিন্তু শুধু বেতন না। গবেষণার জন্য অর্থায়নের প্রশ্নটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ জিডিপির মাত্র ০.৩% ব্যয় করে গবেষণা ও উন্নয়নে। দক্ষিণ কোরিয়া ৪.৮%। ইসরায়েল ৫.৪%। চীন ২.৪%। ভারতও ব্যয় করে ০.৭%। বাস্তবে এটার মানে কী? বাংলাদেশের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক যদি ন্যানোটেকনোলজি নিয়ে কাজ করতে চান, তার গবেষণা তহবিল পাওয়ার সুযোগ প্রায় শূন্য। ইউজিসি থেকে যে অনুদান পাওয়া যায়, সেটা সাধারণত ১ থেকে ৩ লাখ টাকা। এই টাকায় একটা ভালো মাইক্রোস্কোপের লেন্সও কেনা যায় না।
আমেরিকায়? NSF থেকে একটা স্ট্যান্ডার্ড গবেষণা অনুদান ৩ থেকে ৫ লাখ ডলার। তিন বছরের জন্য। ল্যাব আছে, যন্ত্রপাতি আছে, ডক্টরাল ছাত্রদের স্টাইপেন্ড আছে, কনফারেন্সে যাওয়ার টাকা আছে। একজন গবেষক সেখানে গবেষণা করতে পারেন। বাংলাদেশে করতে পারেন না। শুধু ইচ্ছা দিয়ে বিজ্ঞান হয় না, বিনিয়োগ লাগে।
এখন একজন তানভীরকে বলুন, "দেশে ফেরো।" সে জিজ্ঞেস করবে, "ফিরে কী করবো? ক্লাসরুমে ছাত্র পড়াবো, গবেষণা করার সুযোগ নেই, বেতন দিয়ে ঢাকায় একটা ফ্ল্যাটের ভাড়াও দেওয়া যায় না, আর বিভাগীয় রাজনীতিতে ডুবে যেতে হবে?"
ফলাফল?
দেশে ফেরার হার ক্রমাগত কমছে। ২০০০ সালে যেটা ১৫% ছিল, ২০২৫-এ সেটা ৮%-এ নেমে এসেছে। ভারতের রেফারেন্স লাইনটা দেখুন, ৩০%। দক্ষিণ কোরিয়ার ৭০%। বাংলাদেশের ৮%। এই সংখ্যাটা নিয়ে ভাবুন। প্রতি ১০০ জন বাংলাদেশি পিএইচডি ধারীর মধ্যে ৯২ জন আর ফেরে না। আমরা আমাদের সেরাদের তৈরি করি, খরচ করি, তারপর তাদের বিদেশে পাঠিয়ে দিই। চিরতরে।
পর্ব ৩: ফাঁকা চেয়ার, ডুবে যাওয়া র্যাঙ্কিং
তানভীর ফেরেনি। তানভীরের মতো আরো হাজার হাজার ফেরেনি। ফলে কী হচ্ছে দেশের ভেতরে?
বাংলাদেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশ্ব র্যাঙ্কিং প্রতি বছর খারাপ হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৫ সালে QS র্যাঙ্কিংয়ে ৫০০ থেকে ৫৫০-এর মধ্যে ছিল। ২০২৫ সালে সেটা ৮৫০-এর বেশি। একই সময়ে ভারতের IIT Bombay ১৫০-এর কাছে উঠেছে, মালয়েশিয়ার University of Malaya ৬০-এর কাছে। কেন এত পার্থক্য? গবেষণা। র্যাঙ্কিংয়ের সবচেয়ে বড় উপাদান হলো গবেষণা আউটপুট। যোগ্য গবেষক নেই, গবেষণা তহবিল নেই, তাই গবেষণা নেই। গবেষণা নেই, তাই র্যাঙ্কিং ডুবছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুমোদিত শিক্ষক পদের ২৫ থেকে ৩৫% খালি। কোনো কোনো বিভাগে অবস্থা আরো ভয়াবহ। বুয়েটে ৩৫% পদ শূন্য। কুয়েটে ৩৮%। প্রকৌশল, কম্পিউটার সায়েন্স, পদার্থবিদ্যা, এইসব বিষয়ে যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায় না। কারণ যারা যোগ্য, তারা বিদেশে।
আর কোন কোন ক্ষেত্রে মেধা পাচার সবচেয়ে বেশি?
কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে সবচেয়ে বেশি, ৯৫% পিএইচডি ধারী বিদেশেই থেকে যায়। তারপর চিকিৎসাবিদ্যা ৯২%, পদার্থবিদ্যা ও গণিত ৯০%, অর্থনীতি ৮৮%। এই ক্ষেত্রগুলোতে বিদেশে চাহিদা সবচেয়ে বেশি, বেতন সবচেয়ে বেশি, সুযোগ সবচেয়ে বেশি। ফলে সবচেয়ে বেশি মানুষ যায় আর সবচেয়ে কম ফেরে।
একটু ভেবে দেখুন। বাংলাদেশ ডিজিটাল অর্থনীতি গড়তে চায়। কিন্তু কম্পিউটার সায়েন্সের সেরা মাথাগুলো গুগল, মাইক্রোসফট, মেটাতে কাজ করছে। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাত উন্নত করতে চায়। কিন্তু সেরা চিকিৎসকরা আমেরিকা, যুক্তরাজ্যের হাসপাতালে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করতে চায়। কিন্তু পরিবেশ বিজ্ঞানীরা ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ে। যে সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে, সেগুলো দেশে। যারা সমাধান করতে পারে, তারা বিদেশে।
পর্ব ৪: মেধার মূল্য ডলারে
মেধা পাচারের অর্থনৈতিক ক্ষতি শুধু "যোগ্য শিক্ষক নেই" পর্যন্ত সীমিত না। এর আরো গভীর একটা স্তর আছে।
একজন ছাত্র প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যে শিক্ষা পায়, তাতে রাষ্ট্রের খরচ হয় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। ২০,০০০-এর বেশি পিএইচডি ধারী বিদেশে মানে রাষ্ট্রের বিনিয়োগ অন্তত ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ কোটি টাকা বিদেশে হস্তান্তর হয়ে গেছে। বিনা ক্ষতিপূরণে। আমরা তৈরি করেছি, অন্য দেশ ব্যবহার করছে।
তবে একটা কথাও সত্য: প্রবাসী পেশাজীবীরা দেশে অর্থ পাঠান। প্রশ্ন হলো, কত?
বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের মাত্র ১২ থেকে ১৫% আসে দক্ষ ও উচ্চশিক্ষিত প্রবাসীদের কাছ থেকে। বাকি ৮৫% আসে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অদক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিকদের কাছ থেকে। ভারতের ক্ষেত্রে চিত্র একেবারে উল্টো। ভারতের মোট রেমিট্যান্সের ৬০% আসে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দক্ষ পেশাজীবীদের থেকে। একজন সিলিকন ভ্যালির ইঞ্জিনিয়ার বছরে যে পরিমাণ টাকা দেশে পাঠায়, সেটা ৫০ জন নির্মাণ শ্রমিকের সমান।
মানে বাংলাদেশ থেকে যে মেধা বের হয়ে যাচ্ছে, তাদের অর্থনৈতিক প্রভাব দেশের উপর ন্যূনতম। তারা বিদেশে কর দেয়, বিদেশে খরচ করে, বিদেশে সঞ্চয় করে। বাংলাদেশ শুধু তাদের তৈরি করার খরচটা বহন করলো। লাভের গুড় খেলো অন্য দেশ।
পর্ব ৫: অন্যরা কী করলো
বাংলাদেশ একা এই সমস্যায় ভুগছে না। চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সবাই একসময় ব্রেইন ড্রেইনে ভুগেছে। কিন্তু তারা এটাকে উল্টে দিয়েছে। কীভাবে?
চীনের গল্পটা সবচেয়ে নাটকীয়। ১৯৯০-এর দশকে চীন থেকে যারা পিএইচডি করতে আমেরিকায় যেতো, তাদের ৯২% ফিরতো না। ৯২%। বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ। কিন্তু চীন সরকার "Thousand Talents Plan" চালু করলো ২০০৮ সালে। কী ছিল এতে? বিদেশে থাকা চীনা বিজ্ঞানীদের জন্য বিশাল প্যাকেজ: মাসিক বেতন ৭,০০০ থেকে ১৪,০০০ ডলার, স্টার্ট-আপ রিসার্চ গ্র্যান্ট ২ থেকে ৫ মিলিয়ন ইউয়ান, বাড়ি কেনার ভর্তুকি, সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তির নিশ্চয়তা। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: অত্যাধুনিক ল্যাব ও যন্ত্রপাতি। ফলাফল? ২০২০ সালে চীনে ফেরত আসা পিএইচডি ধারীর সংখ্যা বিদেশে যাওয়াদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেলো। নেট ব্রেইন ড্রেইন উল্টে গেলো নেট ব্রেইন গেইনে।
দক্ষিণ কোরিয়াও একই পথে এগিয়েছে। ১৯৬০ থেকে ৭০-এর দশকে তাদের ব্রেইন ড্রেইন ছিল ভয়াবহ। সরকার KIST প্রতিষ্ঠা করলো, বিদেশফেরত বিজ্ঞানীদের জন্য বিশ্বমানের গবেষণাগার তৈরি করলো, আন্তর্জাতিক বেতন দিলো। আজ কোরিয়ায় ফেরার হার ৭০%-এর বেশি। ভারতেও Ramalingaswami Fellowship, SERB অনুদানের মাধ্যমে ফেরার হার ১২% থেকে ৩০%-এ উঠেছে।
আর বাংলাদেশ? বাংলাদেশের কোনো কার্যকর Reverse Brain Drain প্রোগ্রাম নেই বললেই চলে।
কিন্তু যারা ফেরেনি, তারাও কি দিতে পারে? হ্যাঁ, পারে। আর সেটাই পরের প্রশ্ন।
ভারত আর চীন দেখিয়ে দিয়েছে যে, প্রবাসী পেশাজীবীদের ফিরিয়ে না এনেও তাদের জ্ঞান, নেটওয়ার্ক, মূলধন দেশের কাজে লাগানো সম্ভব। সিলিকন ভ্যালির ভারতীয় প্রকৌশলীরা ব্যাঙ্গালোরে আইটি শিল্প গড়ে তুলেছে। শেনঝেনের টেক ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে প্রবাসী চীনাদের সংযোগে। এটাকে বলে "Diaspora Knowledge Networks"। যৌথ গবেষণা প্রকল্প, অনলাইন মেন্টরিং, টেক স্টার্ট-আপে বিনিয়োগ, পেটেন্ট ও প্রযুক্তি হস্তান্তর। চীন ও ভারত এই সব ক্ষেত্রে ৭০ থেকে ৯৫ পয়েন্ট স্কোর করছে। বাংলাদেশ? ৩ থেকে ১৫।
বাংলাদেশের ২০,০০০-এর বেশি প্রবাসী পিএইচডি ধারীর সম্মিলিত জ্ঞান, নেটওয়ার্ক, অভিজ্ঞতা যদি কোনোভাবে দেশের সাথে সংযুক্ত করা যায়, সেটা বিশাল সম্পদ হতে পারে। কিন্তু সেটার জন্য একটা কাঠামো দরকার, একটা প্ল্যাটফর্ম দরকার, সরকারি উদ্যোগ দরকার। এখন পর্যন্ত সেটা নেই।
পর্ব ৬: কল্পনা করুন
ধরুন এটা ২০৩০ সাল। বাংলাদেশ সরকার তিনটা পদক্ষেপ নিয়েছে।
পদক্ষেপ ১: "মেধা ফেরত" ফেলোশিপ
চীনের Thousand Talents-এর আদলে একটা প্রোগ্রাম চালু হয়েছে। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি গবেষকদের জন্য: মাসিক বেতন ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ ডলার (দেশের মানে অনেক বেশি, বিদেশের চেয়ে কম, কিন্তু ক্রয়ক্ষমতায় কাছাকাছি)। গবেষণা অনুদান ৫০ থেকে ১০০ লাখ টাকা। আধুনিক ল্যাব সুবিধা। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত নিয়োগ। খরচ? ৫০০ জন গবেষককে ফেরত আনতে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেটের ০.০৪%।
পদক্ষেপ ২: ডায়াস্পোরা নলেজ নেটওয়ার্ক
যারা ফিরতে পারবে না বা চায় না, তাদের জন্য একটা আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম। অনলাইন মেন্টরশিপ, যৌথ গবেষণা, ভার্চুয়াল ল্যাব, গ্রীষ্মকালীন ভিজিটিং ফেলোশিপ। প্রবাসী বিজ্ঞানীরা বছরে ২ থেকে ৪ সপ্তাহ দেশে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ লেকচার দেবেন, ল্যাব সেটআপে সাহায্য করবেন, গবেষণা প্রকল্পে পরামর্শ দেবেন।
পদক্ষেপ ৩: গবেষণা খাতে বিনিয়োগ দ্বিগুণ
জিডিপির ০.৩% থেকে ০.৬% করুন। শুধু দ্বিগুণ। এটা বছরে অতিরিক্ত ১,৫০০ কোটি টাকা। এই টাকা দিয়ে ১০টা বিশেষায়িত গবেষণা কেন্দ্র তৈরি করুন: জলবায়ু, কৃষি প্রযুক্তি, ওষুধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ন্যানোটেক, পানি বিশুদ্ধকরণ। এগুলো বাংলাদেশের নিজের সমস্যা সমাধানে কাজ করবে।
তিন পদক্ষেপ হলে কী বদলাবে? বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য শিক্ষক আসবে। গবেষণার মান বাড়বে। র্যাঙ্কিং উঠবে। ছাত্ররা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা পাবে। কিছু ছাত্র বিদেশে গিয়েও ফিরে আসবে, কারণ দেশে সুযোগ আছে।
আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।
তানভীর আহমেদ আজ ক্যালিফোর্নিয়ায় বসে ন্যানোম্যাটেরিয়ালস নিয়ে গবেষণা করছে। তার গবেষণা হয়তো একদিন সৌরবিদ্যুতের দক্ষতা ৫০% বাড়িয়ে দেবে। সেই প্রযুক্তি বাংলাদেশেও আসবে, কিন্তু আমদানি হিসেবে, উদ্ভাবন হিসেবে না।
বাংলাদেশ প্রতি বছর তার সেরা মেধাকে তৈরি করে, খরচ করে, তারপর বিদেশে পাঠিয়ে দেয়। এটা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি না। এটা ভবিষ্যৎ হারানো। একটা দেশ যখন তার সেরাদের ধরে রাখতে পারে না, সেই দেশ কখনো মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বের হতে পারবে না। প্রযুক্তি আমদানি করা যায়, মেধা আমদানি করা যায় না। মেধা নিজের তৈরি করতে হয়, আর তৈরি করে ধরে রাখতে হয়।
তানভীর ফিরতে চেয়েছিল। দেশ তাকে ফেরায়নি। প্রশ্ন হলো: আমরা কি পরের তানভীরকে ফেরাতে পারবো?