Back to publications
Narrative 2026-03-06

চরের মানুষ: মানচিত্রে নেই, জীবনে নেই

৬০ লাখ চরবাসীর অদৃশ্য সংগ্রাম

চরের মানুষ: মানচিত্রে নেই, জীবনে নেই

পর্ব ১: করিমের চর

করিম মিয়ার বয়স ষাট। গত চল্লিশ বছরে সে সাতবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। প্রতিবার নদী তার ঘর খেয়ে ফেলেছে। প্রতিবার সে নতুন করে শুরু করেছে। কখনো পদ্মার পাড়ে, কখনো যমুনার চরে, কখনো মেঘনার বুকে জেগে ওঠা নতুন একটুকরো মাটিতে।

করিম বলে, "নদী দেয়, নদী নেয়। আমরা শুধু দেখি।"

কিন্তু দারিদ্র্যের চেয়েও বড় সমস্যা আছে। সেটা হলো অনিশ্চয়তা।
৫০ থেকে ৬৫ লাখ মানুষ
কতজন, কোথায়
৬০ লাখ মানুষ
কী করা হচ্ছে, কী করা দরকার
৬০ থেকে ৮০ শতাংশ
নদী দেয়, নদী নেয়

করিমের মতো মানুষ বাংলাদেশে কত? সরকারি হিসেবে প্রায় ৬০ লাখ। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত আরো বেশি। কারণ চরের মানুষদের অনেকে জনশুমারিতে ঠিকভাবে গণনা হয় না। তারা এমন জায়গায় থাকে যেখানে আদমশুমারির কর্মীরা পৌঁছাতে পারে না, বা পৌঁছাতে চায় না। তারা এমন জমিতে থাকে যেটা দশ বছর পরে নদীর তলায় চলে যেতে পারে।

বাংলাদেশের মানচিত্রে চরগুলো ধূসর ছোপের মতো দেখায়। নদীর বুকে ভেসে থাকা পলিমাটির টুকরো। কিন্তু এই ধূসর ছোপগুলোতে লাখ লাখ মানুষ বাস করে। স্কুল নেই, হাসপাতাল নেই, রাস্তা নেই, বিদ্যুৎ নেই। বছরের অর্ধেক সময় বন্যায় ডুবে থাকে। বাকি অর্ধেক সময় তারা পরবর্তী বন্যার জন্য অপেক্ষা করে।

এই ন্যারেটিভটা তাদের গল্প। সংখ্যা দিয়ে বলা।


পর্ব ২: কতজন, কোথায়

বাংলাদেশে চরের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। কারণ চর জেগে ওঠে, আবার ডুবে যায়। তবে CDSP (Char Development and Settlement Project) এবং CEGIS-এর হিসাব অনুযায়ী, যেকোনো সময়ে প্রায় ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ চর সক্রিয় থাকে। এগুলোতে ৫০ থেকে ৬৫ লাখ মানুষ বাস করে।

সংখ্যাটা সময়ের সাথে বেড়েছে। ১৯৯০ সালে চরবাসীর সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৩৫ লাখ। ২০২৫ সালে ৬৩ লাখ। কেন বাড়ছে? দুটো কারণ। প্রথমত, জনসংখ্যা বৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত, মূল ভূখণ্ড থেকে উচ্ছেদ। ভূমিহীন মানুষ, যাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, তারা চরে গিয়ে বসতি গড়ে। নদীর বুকে জেগে ওঠা মাটি সরকারি খাসজমি, কিন্তু বাস্তবে দখল করে যে আগে যায়, জমি তার।

চরের মানুষরা বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষদের মধ্যে পড়ে। জাতীয় দারিদ্র্যের হার যেখানে প্রায় ১৯%, চরে সেটা ৮০% ছাড়িয়ে যায়।

এই পার্থক্যটা বিস্ময়কর। জাতীয় গড়ের চেয়ে চারগুণ বেশি দারিদ্র্য। গ্রামীণ গড়ের চেয়েও তিনগুণ। চরের মানুষের জন্য দারিদ্র্য শুধু আয়ের অভাব না, এটা সবকিছুর অভাব: খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, মর্যাদা।

কিন্তু দারিদ্র্যের চেয়েও বড় সমস্যা আছে। সেটা হলো অনিশ্চয়তা। চরের মানুষ জানে না তার ঘর কতদিন টিকবে। জানে না পরের বর্ষায় চরটা থাকবে কি না। জানে না সে পরের বছর কোথায় থাকবে।


পর্ব ৩: নদী দেয়, নদী নেয়

বাংলাদেশের নদীগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে গতিশীল নদীব্যবস্থার অংশ। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, এই তিনটা নদী প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পলি বহন করে আনে হিমালয় থেকে। এই পলি জমে চর তৈরি হয়। আবার নদীর গতিপথ বদলায়, চর ভেঙে যায়। এটা একটা চক্র। কিন্তু এই চক্রে আটকে পড়া মানুষদের জীবন চক্রাকার না, সেটা সর্পিল, প্রতিবার একটু নিচে নেমে যায়।

একটা চরের গড় আয়ু ১০ থেকে ১৫ বছর। কিছু চর মাত্র ৫ বছরে ভেঙে যায়। কিছু ২০ বছর টেকে। কিন্তু কোনো চরই স্থায়ী না। নদীভাঙন বাংলাদেশের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বন্যায় ঘর ডুবে যায়, কিন্তু পানি নামলে মানুষ ফিরে আসতে পারে। নদীভাঙনে জমিটাই চলে যায়। ফিরে আসার কিছু থাকে না।

CEGIS-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত নদীভাঙনে প্রায় ১,৭০০ বর্গ কিলোমিটার জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। এটা ঢাকা শহরের আয়তনের প্রায় ছয় গুণ। একই সময়ে নতুন চর জেগেছে প্রায় ১,০০০ বর্গ কিলোমিটার। নেট ক্ষতি ৭০০ বর্গ কিলোমিটার। কিন্তু নতুন চর আর পুরনো উর্বর জমি এক জিনিস না। নতুন চরের মাটি বালুকাময়, অনুর্বর। ফসল ফলাতে কয়েক বছর লাগে।

আর প্রতিবার ভাঙনে একটা পরিবার কী হারায়? ঘর, জমি, গাছপালা, পুকুর, সবকিছু। একটা গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে একটা চরবাসী পরিবার প্রতিটা ভাঙনে তাদের সম্পদের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ হারায়। আর জীবনে গড়ে ৫ থেকে ৭ বার ভাঙনের শিকার হয়।

প্রতি ৫ থেকে ৭ বছরে একবার বাস্তুচ্যুতি। পুরো একটা জীবনে ৫ থেকে ১০ বার। প্রতিবার শূন্য থেকে শুরু। প্রতিবার আরেকটু দরিদ্র। প্রতিবার আরেকটু ভঙ্গুর। এটা দারিদ্র্যের ফাঁদ। এই ফাঁদ থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব।


পর্ব ৪: অদৃশ্য নাগরিক

চরের মানুষরা বাংলাদেশের নাগরিক। তাদের ভোটাধিকার আছে, জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। কিন্তু নাগরিক হিসেবে তারা যেসব সেবা পাওয়ার কথা, সেগুলো তারা পায় না। কারণ সেবা পৌঁছায় না চরে।

মূল ভূখণ্ডে যেখানে ৯৫% মানুষের বিদ্যুৎ আছে, চরে সেটা ২০% এর কম। পাকা রাস্তা? চরে প্রায় নেই বললেই চলে। পানীয় জল? অধিকাংশ চরবাসী নদীর পানি বা অগভীর নলকূপের পানি পান করে, যেটায় আর্সেনিক থাকার ঝুঁকি বেশি। স্যানিটেশন? ৬০% এর বেশি চরবাসী উন্মুক্ত পায়খানা ব্যবহার করে।

শিক্ষার অবস্থা আরো করুণ।

চরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৫৫%, জাতীয় গড় ৯৮%। মাধ্যমিকে এটা আরো খারাপ, মাত্র ২২%। জাতীয় গড় ৭২%। কেন? কারণ স্কুল নেই। যেটুকু আছে, সেটা বর্ষায় ডুবে যায়। শিক্ষক আসতে চান না চরে। যোগাযোগ কঠিন, জীবনযাত্রা কষ্টকর। আর যেসব পরিবার প্রতি কয়েক বছরে একবার উচ্ছেদ হয়, তাদের সন্তানদের পড়ালেখার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কঠিন।

স্বাস্থ্যসেবার চিত্রটাও একই রকম বিষণ্ণ।

চরবাসীদের নিকটতম স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে গড়ে ১২ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হয়। মূল ভূখণ্ডে এটা ৩ কিলোমিটার। কিন্তু শুধু দূরত্বটা দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যায় না। চর থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে নৌকা লাগে। বর্ষায় নদী উত্তাল থাকে, নৌকা চলা ঝুঁকিপূর্ণ। শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে যায়, তখন হেঁটে যেতে হয় কাদামাটির মধ্য দিয়ে। একজন অসুস্থ মানুষের পক্ষে এই যাত্রা করা প্রায় অসম্ভব।

ফলাফল? চরে মাতৃমৃত্যুর হার জাতীয় গড়ের দ্বিগুণ। শিশুমৃত্যুর হার তিনগুণ। পাঁচ বছরের নিচে অপুষ্টির হার ৫০% এর বেশি।

চরের মানুষরা নাগরিক, কিন্তু নাগরিকত্বের সুফল তাদের কাছে পৌঁছায় না।


পর্ব ৫: খাদ্য ও জীবিকা

চরের অর্থনীতি সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর। কিন্তু চরের কৃষি মূল ভূখণ্ডের কৃষি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। নতুন জেগে ওঠা চরের মাটি বালুময়, প্রথম কয়েক বছর শুধু কাশবন আর ঘাস জন্মায়। ধীরে ধীরে পলি জমে মাটি উর্বর হয়। তারপর হয়তো ১০ বছর ভালো ফসল হয়। তারপর নদী চরটাকে গ্রাস করে।

চরবাসীদের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার হার ভয়াবহ। প্রায় ৬৫% পরিবার বছরের কোনো না কোনো সময়ে খাদ্য সংকটে পড়ে। মঙ্গা, উত্তরবঙ্গের সেই মৌসুমি দুর্ভিক্ষ, চরাঞ্চলে সবচেয়ে তীব্র। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর, আমন ধান কাটার আগে, চরের মানুষের কাছে খাবার থাকে না, কাজ থাকে না, টাকা থাকে না। তারা দিনে দুবেলার জায়গায় একবেলা খায়। কখনো একদিন পুরো না খেয়ে থাকে।

চরবাসীদের প্রধান জীবিকা কৃষি (ধান, মরিচ, পেঁয়াজ), পশুপালন, আর মাছ ধরা। কিন্তু এই তিনটাই ঝুঁকিপূর্ণ। বন্যায় ফসল ডুবে যায়। গরু-ছাগল ভাসিয়ে নিয়ে যায়। মাছ ধরার নৌকা ভেঙে যায়।

মূল ভূখণ্ডের সাথে তুলনা করলে চরের পিছিয়ে থাকার মাত্রা স্পষ্ট হয়।

প্রতিটা সূচকে চর পিছিয়ে। সাক্ষরতা, মাথাপিছু আয়, বিদ্যুৎ সংযোগ, স্যানিটেশন, প্রতিষেধক টিকা, সবকিছুতে। এটা যেন একই দেশের ভেতরে দুটো আলাদা দেশ। মূল ভূখণ্ড ২১ শতকে আছে, চর আটকে আছে ২০ শতকের মাঝামাঝিতে।


পর্ব ৬: কী করা হচ্ছে, কী করা দরকার

চরবাসীদের জন্য কিছু কাজ হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো CDSP (Char Development and Settlement Project), যেটা নেদারল্যান্ডস সরকার ও বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে চালায়। ১৯৯৪ সাল থেকে এই প্রকল্প চরে ভূমি বরাদ্দ, অবকাঠামো নির্মাণ, আর জীবিকা সহায়তা দিচ্ছে। BRAC-এর CFPR (Challenging the Frontiers of Poverty Reduction) প্রোগ্রাম চরবাসীদের জন্য কাজ করেছে। এই প্রোগ্রামগুলো সীমিত পরিসরে কিছু ফল দিয়েছে।

কিন্তু সামগ্রিকভাবে চরাঞ্চলে উন্নয়ন ব্যয় অত্যন্ত কম।

সরকারের উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ চরাঞ্চলে যায়। অথচ চরবাসীরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪%। মাথাপিছু উন্নয়ন ব্যয়ে তুলনা করলে চরে মূল ভূখণ্ডের অর্ধেকের কম খরচ হয়। সেবা পৌঁছানো কঠিন, অবকাঠামো স্থায়ী হয় না, এই যুক্তি সবসময় দেওয়া হয়। যুক্তিটা পুরোপুরি মিথ্যা না। চরে রাস্তা বানালে পাঁচ বছরে নদী সেটা খেয়ে ফেলতে পারে। স্কুল বানালে দশ বছরে সেটা পানির নিচে চলে যেতে পারে।

কিন্তু এই যুক্তি মেনে নিলে চরের মানুষদের সেবা না দেওয়াটা বৈধ হয়ে যায়। আর সেটা গ্রহণযোগ্য না।

ভাসমান স্কুল, সৌরবিদ্যুৎচালিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মোবাইল ব্যাংকিং, এগুলো চরের জন্য উপযুক্ত সমাধান। BRAC আর কিছু এনজিও ছোট পরিসরে এগুলো করছে। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে এগুলোর স্কেলিং হচ্ছে না।

চরের মানুষদের জন্য তিনটা জিনিস দরকার।

প্রথমত, ভূমি অধিকার। চরের বেশিরভাগ মানুষ যে জমিতে থাকে, সেটার আইনি অধিকার তাদের নেই। খাসজমি বরাদ্দের প্রক্রিয়া জটিল, দীর্ঘসূত্রী, আর দুর্নীতিগ্রস্ত। জমির মালিকানা না থাকলে মানুষ বিনিয়োগ করে না। ঘর পাকা করে না, গাছ লাগায় না, পুকুর কাটে না। কারণ জানে যেকোনো সময় উচ্ছেদ হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, চর-উপযোগী সেবা মডেল। স্থায়ী অবকাঠামো চরে কাজ করে না। দরকার ভাসমান ও পোর্টেবল সেবা ব্যবস্থা। ভাসমান ক্লিনিক, সৌরশক্তিচালিত চার্জিং স্টেশন, মোবাইল স্কুল, ড্রোনে ওষুধ সরবরাহ। প্রযুক্তি আছে, ইচ্ছাশক্তি নেই।

তৃতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষা। চরের মানুষদের জন্য বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দরকার। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা, মঙ্গার সময় খাদ্য সহায়তা, আর পুনর্বাসনের জন্য অনুদান।


ফিরে আসি করিম মিয়ার কাছে।

করিম বলেছিল, "আমরা নদীর মানুষ। নদী আমাদের সব দিয়েছে, সব নিয়েছে।" তারপর একটু থেমে বলেছিল, "কিন্তু সরকার আমাদের কিছু দেয়নি। কিছু নেয়ওনি। কারণ সরকার জানেই না আমরা আছি।"

বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জিডিপি বাড়ছে, রপ্তানি বাড়ছে, অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। পদ্মা সেতু হয়েছে, মেট্রোরেল চলছে। কিন্তু পদ্মা সেতুর নিচে দিয়ে যে নদী বয়ে যাচ্ছে, তার বুকে যে মানুষগুলো ভাসছে, তাদের কথা কেউ ভাবছে না।

৬০ লাখ মানুষ। একটা ছোট দেশের সমান জনসংখ্যা। তারা আছে, কিন্তু মানচিত্রে নেই। তারা বেঁচে আছে, কিন্তু জীবন নেই।

চরের মানুষদের দৃশ্যমান করতে হবে। তাদের গণনা করতে হবে, তাদের কথা শুনতে হবে, তাদের অধিকার দিতে হবে। নদীকে থামানো যাবে না। কিন্তু নদীর বুকে বেঁচে থাকা মানুষগুলোকে সাহায্য করা যাবে।

করিম মিয়া আটবার ভিটেমাটি হারাবে না, সেই ব্যবস্থা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50