Back to publications
Narrative 2026-03-06

৩৫ লাখ শিশু কাজ করে, স্কুলে যায় না

শিশুশ্রমের অর্থনীতি ও হারানো ভবিষ্যৎ

৩৫ লাখ শিশু কাজ করে, স্কুলে যায় না

পর্ব ১: রিমনের সকাল

সকাল ছয়টায় ঘুম ভাঙে রিমনের। বয়স ১১। ঢাকার মিরপুরে একটা অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে কাজ করে। মাসে বেতন ৩,০০০ টাকা। কখনো ৩,৫০০ পায়, কখনো কম। বেতন নির্ভর করে মালিকের মেজাজের উপর।

রিমনের কাজ কী? গাড়ির নিচে ঢুকে তেল বদলানো, পার্টস পরিষ্কার করা, ভারী যন্ত্রাংশ টানা, গ্রিজমাখা হাত দিয়ে স্ক্রু খোলা। হাতে কাটা দাগ আছে কয়েকটা। একবার গাড়ির জ্যাক পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল, কোনোরকমে সরে গেছে। সেফটি গ্লাভস, গগলস, এসব শব্দ সে কখনো শোনেনি।

কিন্তু কিছু দেশ এই সমস্যা মোকাবেলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে, কিছু দেশ পিছিয়ে পড়েছে।
৩,০০০ টাকা
রিমনের সকাল
১১.৪%
কোথায়, কারা
৪৮.৭%
ঝুঁকির অন্ধকার

রিমনের বাবা রিকশা চালাতো। দুই বছর আগে স্ট্রোক হয়ে শয্যাশায়ী। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে, মাসে পায় ২,৫০০ টাকা। দুইজনের আয় মিলিয়ে ৫,৫০০-৬,০০০ টাকা। ভাড়া দিতে হয় ২,৫০০, বাবার ওষুধ লাগে ১,০০০, বাকিটায় খাওয়া। স্কুল? সেটা একটা বিলাসিতা যেটা রিমনের পরিবার কিনতে পারে না।

রিমনকে চিনলে আপনার মায়া লাগবে। চঞ্চল ছেলে, হাসতে ভালোবাসে, ক্রিকেট খেলতে চায়। কিন্তু ক্রিকেট খেলার সময় কোথায়? সকাল সাতটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত ওয়ার্কশপ। সপ্তাহে একদিনও ছুটি নেই। শুক্রবার আধা দিন, তাও মালিক খুশি থাকলে।

রিমন একটা ব্যক্তি, একটা পরিসংখ্যান না। কিন্তু বাংলাদেশে রিমনের মতো শিশুর সংখ্যা কত জানেন?

৩৫ লাখ।

BBS-এর ২০২২ সালের জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩৫.৩৬ লাখ শিশু কোনো না কোনো ধরনের শ্রমে নিয়োজিত। এদের মধ্যে ১৭ লাখের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে আছে, যেখানে শারীরিক ক্ষতি, রাসায়নিক পদার্থ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বা মানসিক নির্যাতনের ঝুঁকি রয়েছে।

এবার এই চার্টটা দেখুন:

২০০০ সালে শিশুশ্রমের হার ছিল ১৯.১%। ২০২২ সালে সেটা কমে এসেছে ৬.৮%। অগ্রগতি হয়েছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু পরম সংখ্যায়? ৩৫ লাখ শিশু এখনো কাজ করছে। এটা পুরো নরওয়ের জনসংখ্যার ৬৫%। প্রতিটা শিশু একটা হারানো সম্ভাবনা, একটা অপূর্ণ স্বপ্ন, একটা ভবিষ্যৎ যেটা কখনো আসবে না।

আর এই ৩৫ লাখ শিশু কোথায় কাজ করছে? কোন খাতে, কোন ধরনের কাজে?

কৃষিতে সবচেয়ে বেশি, ৪০.৩%। তারপর সেবা খাত ৩২.১%, যেখানে গৃহকর্ম, হোটেল, দোকান, পরিবহন ইত্যাদি পড়ে। শিল্প খাতে ১৯.৮%, মানে গার্মেন্টসের সাব-কন্ট্র্যাক্ট ইউনিট, ইটভাটা, ওয়ার্কশপ, ওয়েল্ডিং। বাকি ৭.৮% অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেমন বর্জ্য সংগ্রহ, রাস্তায় বিক্রি, ভিক্ষাবৃত্তি।

কৃষিতে শিশুশ্রম অনেকে "স্বাভাবিক" মনে করে। "বাচ্চারা তো মাঠে যায়, এটা শেখার অংশ।" কিন্তু ILO-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, যখন একটা শিশু এত ঘণ্টা কাজ করে যে স্কুলে যেতে পারে না, বা এমন কাজ করে যেটা তার শরীরের জন্য ক্ষতিকর (কীটনাশক স্প্রে, ভারী বোঝা, ধারালো যন্ত্র), তখন সেটা আর "শেখা" না। সেটা শোষণ।


পর্ব ২: কোথায়, কারা

শিশুশ্রম সারা দেশে সমান না। কিছু বিভাগে অনেক বেশি, কিছু বিভাগে কম। এই পার্থক্যের পেছনে দারিদ্র্য, শিক্ষার সুযোগ, আর অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিন্নতা কাজ করে।

রংপুর বিভাগে শিশুশ্রমের হার সবচেয়ে বেশি, ১১.৪%। রাজশাহীতে ৯.৮%। ময়মনসিংহে ৯.২%। অন্যদিকে, ঢাকায় ৪.৯%, সিলেটে ৫.৩%। রংপুরের কথা আলাদা করে বলতে হয়। এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র বিভাগ। মঙ্গা, মানে মৌসুমি খাদ্য সংকট, এখানকার বাস্তবতা। যখন পরিবারে খাবার নেই, শিশুকে কাজে পাঠানো ছাড়া আর উপায় থাকে না।

এবার লিঙ্গভেদে দেখা যাক। ছেলে আর মেয়ে শিশুদের শ্রমের ধরন আলাদা।

ছেলেদের মধ্যে শিশুশ্রমের হার বেশি, ৭৩.২%। কিন্তু মেয়েদের ২৬.৮% মানে কম, এটা ভাবলে ভুল হবে। মেয়েদের শ্রম অদৃশ্য। গৃহকর্ম, রান্না, ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনা, এগুলো অনেক সময় "কাজ" হিসেবে গণনাই হয় না। আর গৃহশ্রমে থাকা মেয়ে শিশুরা যৌন নির্যাতনের ঝুঁকিতেও থাকে, যেটা নিয়ে কেউ কথা বলে না।

ছেলেরা কোথায় কাজ করে? ওয়ার্কশপ, ইটভাটা, মাছ ধরার নৌকা, পরিবহন সেক্টর। মেয়েরা? গৃহকর্ম, গার্মেন্টস সাব-কন্ট্র্যাক্ট, শুকনো মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, চিংড়ি ডিপো। দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি আছে, কিন্তু ধরন আলাদা।

আর বয়স অনুযায়ী বিভাজন? কোন বয়সের শিশুরা বেশি কাজ করছে?

৫-৯ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৮.২% শ্রমে নিয়োজিত। ১০-১৪ বছরে সেটা লাফ দিয়ে বেড়ে যায় ৩৮.৬%। আর ১৫-১৭ বছরে? ৫৩.২%। মানে বয়স যত বাড়ে, শ্রমের চাপ তত বাড়ে। ১০ বছর পেরোলেই পরিবার হিসাব কষতে শুরু করে: এই বাচ্চা স্কুলে গেলে খরচ, আর কাজে গেলে আয়। অধিকাংশ পরিবারে হিসাবের ফল একটাই, কাজ।


পর্ব ৩: ঝুঁকির অন্ধকার

সব শিশুশ্রম সমান না। ILO-এর সংজ্ঞায় "hazardous child labor" বা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম হলো সেই কাজ যেটা শিশুর স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, বা নৈতিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশে এই শ্রেণিতে পড়ে কত শিশু?

মোট শিশু শ্রমিকের ৪৮.৭% ঝুঁকিপূর্ণ কাজে আছে। সংখ্যায় ১৭.২ লাখ। এরা কোথায় কাজ করে? ইটভাটায় ভারী ইট বহন করে, ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করে, ধুলোয় শ্বাস নেয়। ওয়েল্ডিং শপে চোখের সুরক্ষা ছাড়া আগুনের স্ফুলিঙ্গের সামনে দাঁড়ায়। জাহাজ ভাঙা শিল্পে অ্যাসবেস্টস, সিসা, আর ভারী ধাতুর সংস্পর্শে আসে। ট্যানারিতে ক্রোমিয়াম আর অন্যান্য রাসায়নিকে হাত ডোবায়। কোনো প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম নেই, কোনো প্রশিক্ষণ নেই, কোনো তত্ত্বাবধান নেই।

বাংলাদেশ সরকার ২০২১ সালে ৪৩টি ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকা প্রকাশ করেছে যেখানে শিশুদের নিয়োগ নিষিদ্ধ। তালিকায় আছে: ইটভাটা, জাহাজ ভাঙা, ট্যানারি, ওয়েল্ডিং, রাসায়নিক কারখানা, পরিবহনে হেলপারি, মাছ ধরার ট্রলার। কিন্তু তালিকা প্রকাশ করা আর প্রয়োগ করা দুটো ভিন্ন জিনিস। পরিদর্শক কতজন? তদারকি কতটুকু? জরিমানা কত? উত্তরগুলো হতাশাজনক।

ILO-এর "Worst Forms of Child Labour" কনভেনশন (নং ১৮২) বাংলাদেশ অনুমোদন করেছে ২০০১ সালে। কিন্তু অনুমোদন আর বাস্তবায়ন দুই জিনিস। কাগজে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, বাস্তবে ১৭ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে।


পর্ব ৪: স্কুল না কাজ

শিশুশ্রমের সবচেয়ে বড় মূল্য হলো শিক্ষা। একটা শিশু যখন দিনে ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করে, স্কুলে যাওয়ার সময় বা শক্তি কোনোটাই থাকে না। আর স্কুলে না গেলে? সেই শিশু বড় হয়ে অদক্ষ শ্রমিক হয়, কম আয় করে, তার সন্তানকেও কাজে পাঠায়। দারিদ্র্যের একটা চক্র তৈরি হয় যেটা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতে থাকে।

চার্টটা দেখুন। যেখানে শিশুশ্রমের হার বেশি, সেখানে স্কুলে ভর্তির হার কম। সম্পর্কটা প্রায় সরলরৈখিক। রংপুরে শিশুশ্রম ১১.৪%, প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে উত্তরণের হার ৭২%। ঢাকায় শিশুশ্রম ৪.৯%, উত্তরণের হার ৯১%। শিশুশ্রম আর স্কুল ছাড়া, এরা একই সমীকরণের দুই পাশ।

BBS-এর তথ্য বলছে, শিশু শ্রমিকদের মধ্যে ৩৮% কখনো স্কুলে যায়নি। আরো ২৯% কোনো এক সময় স্কুলে গিয়েছিল কিন্তু ছেড়ে দিয়েছে। মাত্র ৩৩% একই সাথে কাজ আর পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে, এবং তাদের বেশিরভাগই অনিয়মিত। মানে, ৩৫ লাখ শিশু শ্রমিকের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বাইরে।

একটা শিশু যদি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে, তার জীবনকালীন আয় গড়ে ৩০-৪০% বেশি হয় একজন নিরক্ষর শ্রমিকের তুলনায়। এসএসসি পাস করলে? ৭০-৮০% বেশি। কিন্তু সেই হিসাব দরিদ্র পরিবারের কাছে তাৎক্ষণিক না। তাদের কাছে হিসাবটা হলো: আজ রাতে খাবার আছে কি না।

এবার প্রশ্ন, এই শিশুরা পরিবারের আয়ে কতটুকু অবদান রাখে? শিশুশ্রমের অর্থনৈতিক যুক্তিটা কী?

গড়ে, একটা শিশু শ্রমিক পরিবারের মোট আয়ের ২০-২৫% অর্জন করে। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোতে এই অনুপাত ৩০-৩৫% পর্যন্ত যায়। মানে, শিশুকে কাজ থেকে সরিয়ে আনলে পরিবারের আয় এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ কমে যাবে। দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারের জন্য এটা জীবন-মরণ সমস্যা।

এটাই শিশুশ্রমের মূল সমস্যা। এটা শুধু আইনি বিষয় না, অর্থনৈতিক বিষয়। যতদিন পরিবারের বেঁচে থাকা শিশুর আয়ের উপর নির্ভর করে, ততদিন আইন দিয়ে শিশুশ্রম বন্ধ করা যাবে না। শিশুকে স্কুলে ফেরাতে হলে, পরিবারকে একটা বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা দিতে হবে।


পর্ব ৫: বিশ্ব কী করছে

বাংলাদেশ একা না এই সমস্যায়। বিশ্বজুড়ে ১৬ কোটি শিশু শ্রমে নিয়োজিত। কিন্তু কিছু দেশ এই সমস্যা মোকাবেলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে, কিছু দেশ পিছিয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

দক্ষিণ এশিয়ায় শিশুশ্রমের গড় হার ৫.৫%। সাব-সাহারান আফ্রিকায় ২৩.৯%। বাংলাদেশে ৬.৮%। ভারতে ৫.৭%, পাকিস্তানে ৫.৪%। ইথিওপিয়ায় ৪০.৫%। বৈশ্বিক গড় ৯.৬%।

সংখ্যায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে সামান্য বেশি। কিন্তু ভারত আর পাকিস্তানের চেয়ে বেশি, এটা লক্ষণীয়। ভারত গত দুই দশকে শিশুশ্রম কমাতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে, বিশেষ করে মিড-ডে মিল প্রোগ্রাম, যেখানে স্কুলে বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়া হয়। এই একটা কর্মসূচি লক্ষ লক্ষ শিশুকে স্কুলে ফিরিয়ে এনেছে। কারণ দরিদ্র পরিবারের কাছে "ছেলেকে স্কুলে পাঠালে দুপুরের খাবার নিশ্চিত" এটা একটা শক্তিশালী প্রণোদনা।

ব্রাজিলের Bolsa Familia প্রোগ্রাম আরেকটা সফল উদাহরণ। সরকার দরিদ্র পরিবারকে নগদ অর্থ দেয়, শর্ত হলো সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে হবে। ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ব্রাজিলে শিশুশ্রম ৫০% কমেছে।

তাহলে বাংলাদেশ সরকার কী করছে? কত টাকা খরচ করছে?

বাংলাদেশের National Child Labour Elimination Policy (NCLEP) ২০১০ সালে গৃহীত হয়েছে। এর অধীনে বার্ষিক বরাদ্দ? ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ৯০ কোটি টাকা, যেটা মোট বাজেটের ০.০১৩%। এই টাকা দিয়ে ৩৫ লাখ শিশুকে কাজ থেকে সরিয়ে আনতে হবে? প্রতি শিশুর পেছনে পড়ছে বছরে মাত্র ২৫৭ টাকা। ভারত শিশুশ্রম নির্মূলে যে পরিমাণ খরচ করে, বাংলাদেশ তার দশ ভাগের এক ভাগও করে না।


পর্ব ৬: কী করা যেত

আসুন কল্পনা করি। ২০৩০ সাল। বাংলাদেশ তিনটা পদক্ষেপ নিয়েছে। তিনটাই পরীক্ষিত, অন্য দেশে কাজ করেছে। শুধু দরকার ছিল রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর সঠিক বরাদ্দ।

প্রথম পদক্ষেপ: শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা, ব্রাজিল মডেল। দরিদ্র পরিবারকে মাসে ১,৫০০-২,০০০ টাকা দেওয়া হচ্ছে, শর্ত হলো ৫-১৪ বছরের সব সন্তান স্কুলে যাবে। ৩৫ লাখ শিশুর পরিবারকে মাসে ১,৫০০ টাকা দিলে বার্ষিক খরচ ৬,৩০০ কোটি টাকা। মোট বাজেটের ১% এরও কম। এই বিনিয়োগের রিটার্ন? প্রতিটা শিশু যদি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে, তার জীবনকালীন আয় গড়ে ৩-৫ লাখ টাকা বেশি হবে। ৩৫ লাখ শিশু গুণ ৩ লাখ টাকা সমান ১,০৫,০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত জীবনকালীন আয়। বিনিয়োগের রিটার্ন প্রায় ১৭ গুণ।

দ্বিতীয় পদক্ষেপ: স্কুলে খাবার, ভারত মডেল। প্রতিটা সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে দুপুরের খাবার। ভারতে এই প্রোগ্রাম প্রতিদিন ১২ কোটি শিশুকে খাওয়ায়। বাংলাদেশে কিছু উপজেলায় "স্কুল ফিডিং" চলছে, কিন্তু সারাদেশে না। সারাদেশে চালু করলে যে পরিবার ভাবছে "ছেলেকে কাজে পাঠালে একবেলা খাবার বাঁচে", তারা ভাববে "ছেলেকে স্কুলে পাঠালে একবেলা খাবার নিশ্চিত।" প্রণোদনার দিক বদলে যায়।

তৃতীয় পদক্ষেপ: শ্রম পরিদর্শন শক্তিশালীকরণ। বাংলাদেশে শ্রম পরিদর্শক আছে প্রায় ৩৫০ জন। কারখানা, ওয়ার্কশপ, ইটভাটা মিলিয়ে তদারকি করতে হয় লক্ষ লক্ষ প্রতিষ্ঠান। ৩৫০ জন দিয়ে কী হবে? ILO-এর সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশে কমপক্ষে ২,৫০০ পরিদর্শক দরকার। শিশুশ্রম আইন ভঙ্গের জরিমানা বাড়াতে হবে, কার্যকর করতে হবে। একটাও ইটভাটায় শিশু পাওয়া গেলে ভাটার লাইসেন্স বাতিল, এমন কঠোরতা দরকার।

রিমনের কথা মনে আছে? মিরপুরের ওয়ার্কশপে যে ছেলেটা কাজ করে? রিমনকে স্কুলে ফেরানো সম্ভব। তার পরিবারকে মাসে ১,৫০০ টাকা দিলে, স্কুলে একবেলা খাবার দিলে, আর ওয়ার্কশপের মালিককে জরিমানা করলে, রিমন স্কুলে ফিরবে। গণিত শিখবে, বাংলা পড়বে, ক্রিকেট খেলবে। বড় হয়ে হয়তো মেকানিক হবে, কিন্তু প্রশিক্ষিত মেকানিক, মাসে ৩,০০০ টাকায় না, ২০,০০০-৩০,০০০ টাকায়।

কিন্তু এসবের কিছুই হচ্ছে না। বরাদ্দ ০.০১৩%। পরিদর্শক ৩৫০ জন। আইন আছে, প্রয়োগ নেই। কমিটি আছে, কাজ নেই। প্রতিদিন ৩৫ লাখ শিশু সকালে উঠে কাজে যায়। তাদের হাত গ্রিজে মাখে, ধুলোয় শ্বাস নেয়, ভারী বোঝা বহন করে। আর আমরা GDP প্রবৃদ্ধির হিসাব করি, মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখি।

একটা দেশ যেখানে ৩৫ লাখ শিশু স্কুলে না গিয়ে কাজ করে, সেই দেশ মধ্যম আয়ের হতে পারে, কিন্তু মধ্যম মর্যাদার হতে পারে না। উন্নয়ন শুধু সংখ্যা না। উন্নয়ন হলো প্রতিটা শিশু যখন সকালে উঠে স্কুলে যায়, কাজে না।

রিমন সেটা ডিজার্ভ করে। ৩৫ লাখ রিমন সেটা ডিজার্ভ করে।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50