Back to publications
Narrative 2026-03-06

১৫ বছরে বিয়ে, ১৮ বছরে মা

বাল্যবিবাহের অর্থনীতি ও মানবিক মূল্য

১৫ বছরে বিয়ে, ১৮ বছরে মা

পর্ব ১: ফাতেমার গল্প

কুড়িগ্রামের একটা চরে থাকে ফাতেমা। বয়স ১৪। সবে অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছে। স্কুলে সে ক্লাসে প্রথম হতো না, কিন্তু গণিতে তার মাথা পরিষ্কার। শিক্ষক বলেছিলেন, "এই মেয়ে এসএসসি পাস করবেই।"

কিন্তু ফাতেমার বাবা আবদুল করিম দিনমজুর। মাসে আয় হয় ৫,০০০-৬,০০০ টাকা, যখন কাজ থাকে। চরে বন্যা এলে কাজ থাকে না। ফাতেমার পরে আরো দুই বোন আছে।

অর্থাৎ আইনত ১৮ বছরের আগে বিয়ে অবৈধ হলেও, বাস্তবে সবচেয়ে বেশি বিয়ে হচ্ছে ১৫-১৬ বছরে।
৫,০০০-৬,০০০ টাকা
ফাতেমার গল্প
৬০-৮০%
যৌতুকের অর্থনীতি
৫-১০%
ভাঙা যায়, ভেঙেছে অন্যরা

করিম সাহেব হিসাব কষলেন। এখন মেয়েকে বিয়ে দিলে যৌতুক লাগবে ৩০,০০০ টাকা। দুই বছর পরে? এসএসসি পাস করলে পাত্রপক্ষ বেশি চাইবে, ৮০,০০০-১,০০,০০০ টাকা। কারণ "বড় মেয়ে" মানে বেশি যৌতুক।

বিয়ে হলো। ফাতেমার স্বামীর বয়স ২৬। একটা চায়ের দোকান চালায়। ফাতেমা স্কুল ছেড়ে দিলো। ১৫ বছরে গর্ভবতী হলো। ১৬ বছরে প্রথম সন্তান, ঘরেই ডেলিভারি, কারণ হাসপাতাল ১৮ কিলোমিটার দূরে। রক্তক্ষরণ হলো, কোনোরকমে বাঁচলো।

ফাতেমা একটা পরিসংখ্যান না। সে একটা মানুষ। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিদিন এরকম হাজার হাজার ফাতেমার গল্প তৈরি হচ্ছে।

এবার জুম আউট করুন।

বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয় ৫৯% মেয়ের। ১৫ বছরের আগে বিয়ে হয় ২২% মেয়ের। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮,৮০০ মেয়ের বাল্যবিবাহ হচ্ছে সারা বিশ্বে, আর তার একটা বড় অংশ বাংলাদেশে।

এই চার্টে দেখুন: ১৯৯৩ সালে ৭৩% মেয়ের বিয়ে হতো ১৮ বছরের আগে। তিরিশ বছরে সেটা কমে ৫৯% হয়েছে। অগ্রগতি আছে, কিন্তু গতি অত্যন্ত ধীর। এই হারে বাল্যবিবাহ শূন্যে নামতে ২০৮০ সাল লেগে যাবে।

আর বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশ কোথায়? এই চার্টটা দেখুন:

বাল্যবিবাহের হারে বাংলাদেশ বিশ্বে অষ্টম। নিজের গোষ্ঠীর দেশগুলোর মধ্যে, মানে দক্ষিণ এশিয়ায়, বাংলাদেশ সবচেয়ে খারাপ। ভারত থেকে খারাপ, পাকিস্তান থেকে খারাপ, নেপাল থেকে খারাপ।


পর্ব ২: কে, কখন, কোথায়

বাল্যবিবাহ শুধু একটা সংখ্যা না, এর পেছনে একটা প্যাটার্ন আছে। কোন বয়সে বিয়ে হচ্ছে?

এই চার্টে দেখুন: বাংলাদেশে মেয়েদের বিয়ের বয়সের সবচেয়ে বড় ঘনত্ব ১৫-১৬ বছরে। অর্থাৎ আইনত ১৮ বছরের আগে বিয়ে অবৈধ হলেও, বাস্তবে সবচেয়ে বেশি বিয়ে হচ্ছে ১৫-১৬ বছরে। নবম-দশম শ্রেণির মেয়ে। এসএসসি পরীক্ষার আগেই জীবন বদলে যাচ্ছে।

কিন্তু সারাদেশে সমান না। কোথায় বেশি, কোথায় কম?

রংপুর বিভাগে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৭৩%। তারপর ময়মনসিংহ, রাজশাহী। আর সবচেয়ে কম? ঢাকা বিভাগে, ৪১%। পার্থক্যটা প্রায় দ্বিগুণ। একই দেশ, কিন্তু দুটো আলাদা বাস্তবতা।

প্যাটার্নটা পরিষ্কার: যেখানে দারিদ্র্য বেশি, সেখানে বাল্যবিবাহ বেশি। রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি। ঢাকায় সবচেয়ে কম। দারিদ্র্য আর বাল্যবিবাহ একই মুদ্রার দুই পিঠ।

কিন্তু শুধু দারিদ্র্য দিয়ে সব ব্যাখ্যা হয় না। একটা নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক যুক্তি আছে যেটা বাংলাদেশের বাল্যবিবাহকে টিকিয়ে রাখছে। সেটা হলো যৌতুক।


পর্ব ৩: যৌতুকের অর্থনীতি

বাংলাদেশে যৌতুক আইনত নিষিদ্ধ। ১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ আইন স্পষ্ট বলে: যৌতুক দেওয়া ও নেওয়া দুটোই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু আইন আর বাস্তবতা দুই জিনিস।

বাস্তবে, বাংলাদেশে বিবাহের ৬০-৮০% ক্ষেত্রে কোনো না কোনো ধরনের যৌতুক লেনদেন হয়। আর এই যৌতুকের পরিমাণ নির্ভর করে মেয়ের বয়সের উপর।

এই চার্টটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ১৩-১৪ বছর বয়সী মেয়ের বিয়েতে গড় যৌতুক ২৫,০০০-৩০,০০০ টাকা। ১৬-১৭ বছরে সেটা বেড়ে ৬০,০০০-৮০,০০০ টাকা। ১৮ বছরের পরে? ১,০০,০০০ টাকার বেশি।

ফাতেমার বাবার হিসাবটা এবার বুঝুন। তিনি গরিব, দিনমজুর। তিনটা মেয়ে আছে। যদি তিনজনকেই ১৮ বছরের পরে বিয়ে দেন, যৌতুক লাগবে কমপক্ষে ৩ লাখ টাকা। তার পাঁচ বছরের আয়ের সমান। কিন্তু যদি ১৪-১৫ বছরে বিয়ে দেন? মোট খরচ ১ লাখ টাকার কম। পার্থক্য ২ লাখ টাকা। একজন দিনমজুরের কাছে ২ লাখ টাকা মানে পুরো জীবন।

এটা কোনো নৈতিক ব্যর্থতা না। এটা দারিদ্র্যের অর্থনীতি। যখন একটা পরিবারের সামনে দুটো বিকল্প থাকে, মেয়ের শিক্ষা নাকি পরিবারের বেঁচে থাকা, তখন বেঁচে থাকাটা জেতে। প্রতিবার।

আর যৌতুকের সাথে আরেকটা ভয় আছে: যৌন হয়রানি। গ্রামে বা চরে একটা মেয়ে বড় হতে থাকলে "ইভটিজিং"-এর ঝুঁকি বাড়ে। পরিবার মনে করে, বিয়ে দিলে মেয়ে "নিরাপদ" হবে। একটা অন্যায়ের সমাধান হিসেবে আরেকটা অন্যায় চালু হয়।

এখন প্রশ্ন: এই তাড়াতাড়ি বিয়ের মূল্যটা কী? শুধু শিক্ষা হারানো না। শরীরেরও একটা দাম আছে।


পর্ব ৪: শরীরের দাম

একটা ১৫ বছরের মেয়ের শরীর সন্তান ধারণের জন্য প্রস্তুত না। এটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সরল সত্য। কিন্তু বাংলাদেশে ১৫-১৯ বছর বয়সী বিবাহিত মেয়েদের ৩১% প্রথম বছরেই গর্ভবতী হয়।

কিশোরী গর্ভাবস্থার ঝুঁকি কতটা? এই চার্টটা দেখুন:

১৫ বছরের কম বয়সী মায়েদের মৃত্যুর ঝুঁকি ২০-২৪ বছর বয়সীদের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি। ১৫-১৯ বছরে সেটা দুই গুণ। প্রসবকালীন জটিলতা, রক্তক্ষরণ, একলাম্পসিয়া, অপুষ্টি, সবকিছু কিশোরী মায়েদের জন্য বেশি। কারণ তাদের শরীর এখনো বাড়ছে। একটা শরীর যেটা নিজেই তৈরি হচ্ছে, সেটাকে আরেকটা শরীর তৈরি করতে বলা হচ্ছে।

কিশোরী গর্ভধারণের হার কীভাবে বদলেছে?

বাংলাদেশে কিশোরী প্রজনন হার (প্রতি ১,০০০ মেয়ে, ১৫-১৯ বছর) ১৯৯০ সালে ছিল ১৪৮। ২০২৩ সালে নেমে এসেছে ৭৪। কমেছে, কিন্তু এখনো বিশ্বের গড়ের (৪৩) প্রায় দ্বিগুণ। আর দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি।

শুধু মায়ের ঝুঁকি না। শিশুরও দাম দিতে হয়।

যখন মা নিজে কিশোরী, তখন সন্তানের খর্বাকৃতি (স্টান্টিং) হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ১৫ বছরের কম বয়সী মায়েদের সন্তানের ৪৬% খর্বাকৃতি। ২০-২৪ বছর বয়সী মায়েদের সন্তানে সেটা ৩০%। পার্থক্য ১৬ শতাংশ পয়েন্ট।

খর্বাকৃতি মানে শুধু ছোট থাকা না। খর্বাকৃতি মানে মস্তিষ্কের বিকাশ কম। শেখার ক্ষমতা কম। আয় করার ক্ষমতা কম। একটা কিশোরী মায়ের সন্তান সারাজীবন সেই বোঝা বহন করে। দারিদ্র্য থেকে দারিদ্র্য, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।

ফাতেমার মেয়েও সম্ভবত ১৫ বছরে বিয়ে হবে। তার মেয়েরও। এটাই দারিদ্র্যের চক্র। বাল্যবিবাহ এই চক্রের সবচেয়ে শক্তিশালী চাকা।


পর্ব ৫: ভাঙা যায়, ভেঙেছে অন্যরা

এতক্ষণ শুধু সমস্যার কথা বললাম। কিন্তু সমাধান কি আছে? হ্যাঁ, আছে। আর সবচেয়ে শক্তিশালী সমাধানটা সবচেয়ে সরল: শিক্ষা।

এই চার্টটা দেখুন। মাধ্যমিক শিক্ষার প্রতিটা অতিরিক্ত বছর বাল্যবিবাহের সম্ভাবনা ৫-১০% কমায়। যে মেয়ে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে, তার বাল্যবিবাহের সম্ভাবনা পঞ্চম শ্রেণিতে থামা মেয়ের তুলনায় ৬০% কম।

কেন? তিনটা কারণ। প্রথমত, শিক্ষিত মেয়ে আয় করতে পারে। সে পরিবারের বোঝা না, সম্পদ। দ্বিতীয়ত, শিক্ষিত মেয়ের বিয়ের বাজারে মূল্য বাড়ে, অনেক ক্ষেত্রে যৌতুক কমে বা লাগে না। তৃতীয়ত, শিক্ষিত মেয়ে নিজের অধিকার জানে, প্রতিবাদ করতে পারে।

বাংলাদেশ সরকার মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় উপবৃত্তি দেয়, ১৯৯৪ সাল থেকে। এটা একটা সফল কর্মসূচি। মেয়েদের মাধ্যমিক ভর্তি ১৯৯০ সালের ১৩% থেকে বেড়ে আজ ৭২% হয়েছে। কিন্তু ভর্তি হওয়া আর পাস করা এক কথা না। ড্রপআউট রেট এখনো বিশাল, বিশেষ করে অষ্টম শ্রেণির পরে। কারণ? বিয়ে।

অন্য দেশগুলো কী করেছে? কে কতটা সফল হয়েছে?

ইথিওপিয়া ২০০৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ ৪৯% থেকে ৪০% এ নামিয়েছে। ভারত একই সময়ে ৪৭% থেকে ২৩% এ নামিয়েছে। ভারতের সাফল্যের পেছনে তিনটা জিনিস কাজ করেছে: মেয়েদের শিক্ষায় বিনিয়োগ, শর্তযুক্ত নগদ স্থানান্তর কর্মসূচি (যেমন কন্যাশ্রী, লাড়লি), আর কঠোর আইন প্রয়োগ। বাংলাদেশে আইন আছে, প্রয়োগ নেই। উপবৃত্তি আছে, পরিমাণ যথেষ্ট না।

বাংলাদেশের জন্য কী করা দরকার?

প্রথমত, উপবৃত্তির পরিমাণ বাড়ানো। এখন মাসে ৮০০-১,০০০ টাকা। এটা যদি ২,০০০-৩,০০০ টাকা হয়, তাহলে পরিবারের কাছে মেয়েকে স্কুলে রাখার অর্থনৈতিক যুক্তি তৈরি হয়। মেয়ে পড়লে টাকা আসছে, বিয়ে দিলে টাকা যাচ্ছে। হিসাবটা বদলে যায়।

দ্বিতীয়ত, জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও কঠোর করা। বাল্যবিবাহের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো বয়স বাড়িয়ে দেওয়া। জন্মনিবন্ধন সঠিক হলে এটা কঠিন হয়ে যায়। এখন জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে জন্মনিবন্ধন যুক্ত হচ্ছে, এটা ভালো পদক্ষেপ।

তৃতীয়ত, যৌতুকবিরোধী আইনের প্রকৃত প্রয়োগ। ৪৫ বছর ধরে আইন আছে, কিন্তু ক'টা মামলা হয়েছে? ক'জনের শাস্তি হয়েছে? আইন থাকলেই হয় না, মানুষকে জানাতে হয়, প্রয়োগ করতে হয়।


আসুন শেষ করি যেখান থেকে শুরু করেছিলাম।

কুড়িগ্রামের চরে ফাতেমার এখন বয়স ১৬। কোলে একটা বাচ্চা। স্কুলের বইগুলো বাক্সে তোলা। গণিতে তার মাথা পরিষ্কার ছিল, কিন্তু সেই মাথা এখন হিসাব করে চালের দাম আর দুধের দাম।

ফাতেমার ছোট বোন রুবির বয়স ১২। দুই বছর পরে তারও একই পরিণতি হওয়ার সম্ভাবনা ৫৯%।

কিন্তু যদি রুবি দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে? সেই সম্ভাবনা নেমে আসে ২০% এর নিচে। যদি এসএসসি পাস করে? ১০% এর নিচে।

একটা মেয়ের শিক্ষার মূল্য কত? বাংলাদেশে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রতি বছর সরকারের খরচ হয় জনপ্রতি প্রায় ১২,০০০ টাকা। চার বছরে ৪৮,০০০ টাকা। এটাই একটা জীবন বদলে দেওয়ার দাম। ৪৮,০০০ টাকা। একটা স্মার্টফোনের দাম।

আমরা প্রতি বছর ৩৫,০০০ কোটি টাকা রক্ষা বাজেটে খরচ করি। দেশকে বাইরের শত্রু থেকে রক্ষা করতে। কিন্তু দেশের ভেতরে প্রতিদিন হাজার হাজার মেয়ের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হচ্ছে, সেখানে কত খরচ করি?

ফাতেমা আর ফিরে আসবে না। তার গল্প শেষ। কিন্তু রুবির গল্প এখনো লেখা হয়নি। প্রশ্ন হলো: আমরা কি সেই গল্প বদলাতে প্রস্তুত? নাকি আমরা আরো ত্রিশ বছর অপেক্ষা করবো, পরিসংখ্যান দেখবো, "অগ্রগতি হচ্ছে" বলে আত্মতৃপ্তিতে ভুগবো, আর ফাতেমার পর ফাতেমা তৈরি হতে থাকবে?

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50