Back to publications
Narrative 2026-03-06

বাংলাদেশ কি ঋণ ফাঁদে?

ঋণ পরিষেবা, রিজার্ভ, আর ভবিষ্যতের হিসাব

বাংলাদেশ কি ঋণ ফাঁদে?

পর্ব ১: একটা পরিবারের হিসাব

ধরুন একটা পরিবার। চার সদস্য। মাসিক আয় ৫০,০০০ টাকা। কিন্তু খরচ ৫৫,০০০। প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা ধার করতে হয়। প্রথম কয়েক মাস কোনো সমস্যা নেই। আত্মীয়স্বজন দেয়, মহাজন দেয়, মাইক্রোক্রেডিট দেয়। কিন্তু ধারের উপর সুদ জমতে থাকে। ছয় মাস পর ৫,০০০ টাকা ধারের সাথে ১,৫০০ টাকা সুদও দিতে হচ্ছে। এক বছর পর ৩,০০০ টাকা সুদ। দুই বছর পর? সুদের টাকাটাই এত বড় হয়ে যায় যে পরিবার আর মূল ঋণ শোধ করতে পারে না। শুধু সুদ দিয়েই হিমশিম খাচ্ছে।

এই পরিবারের নাম বাংলাদেশ।

মানে ঋণ বাড়ছে, কিন্তু সেই ঋণ শোধ করার ক্ষমতা বাড়ছে না। এটাই আসল বিপদ।
৫০,০০০ টাকা
একটা পরিবারের হিসাব
৪.৭ বিলিয়ন ডলার
আইএমএফ যা বলছে
প্রায় ১৫%
ঋণের পাহাড়

মাসিক আয় ৫০,০০০ মানে সরকারের রাজস্ব আহরণ। খরচ ৫৫,০০০ মানে সরকারের ব্যয়। আর প্রতি মাসে যে ৫,০০০ ধার করতে হয়, সেটা হলো বাজেট ঘাটতি, যেটা মেটানো হচ্ছে ঋণ নিয়ে। দেশের ভেতর থেকে, বাইরে থেকে, ব্যাংক থেকে, আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে।

আর এই ঋণের সুদ? সেটা এখন এত বড় হয়ে গেছে যে বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা খাতে যত খরচ করে, তার চেয়ে বেশি খরচ করে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধে।

এটা কোনো রাজনৈতিক মতামত না। এটা গণিত। আর গণিত কারো পক্ষে না। চলুন, সংখ্যাগুলো দেখি।


পর্ব ২: ঋণের পাহাড়

২০১০ সালে বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ছিল জিডিপির প্রায় ১৫%। সেই সময় অর্থনীতিবিদরা বলতেন, বাংলাদেশ একটা "লো-ডেট" দেশ। ঋণ কম, ঝুঁকি কম। কিন্তু তারপর কী হলো?

পনেরো বছরে ঋণ ১৫% থেকে বেড়ে প্রায় ৪০% হয়েছে। বিশ্বের মানদণ্ডে ৪০% খুব একটা উদ্বেগজনক না। জাপানের ঋণ জিডিপির ২৫০% এর বেশি। আমেরিকার ১২০%। ভারতের ৮৩%। তাহলে বাংলাদেশের ৪০% নিয়ে চিন্তা কেন?

কারণ সমস্যাটা পরম সংখ্যায় না, বৃদ্ধির হারে। পনেরো বছরে ঋণ প্রায় তিন গুণ হয়েছে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল। জিডিপির মাত্র ৮% কর আদায় করতে পারে সরকার। মানে ঋণ বাড়ছে, কিন্তু সেই ঋণ শোধ করার ক্ষমতা বাড়ছে না। এটাই আসল বিপদ।

এখন এই ঋণের গঠনটা দেখা দরকার। সব ঋণ এক রকম না।

বাংলাদেশের সরকারি ঋণের প্রায় ৬০% অভ্যন্তরীণ, মানে দেশের ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র, ট্রেজারি বিল থেকে নেওয়া। বাকি ৪০% বৈদেশিক। বৈদেশিক ঋণের মধ্যে বহুপাক্ষিক (বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ) বেশি, দ্বিপাক্ষিক (চীন, জাপান, রাশিয়া) তুলনামূলক কম।

অভ্যন্তরীণ ঋণ টাকায়, তাই মুদ্রা ঝুঁকি নেই। কিন্তু এই ঋণ দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে টাকা টেনে নেয়। সরকার যখন ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, সেই টাকা ব্যক্তি খাতে যেতে পারতো। ব্যবসায়ী ঋণ পেতো, কারখানা বসাতো, কর্মসংস্থান হতো। এটাকে অর্থনীতিবিদরা বলেন "ক্রাউডিং আউট"। সরকারের ঋণ বেসরকারি বিনিয়োগকে ঠেলে বের করে দিচ্ছে।

আর বৈদেশিক ঋণ? সেটা ডলারে শোধ করতে হয়। টাকার দাম কমলে, মানে ডলারের বিপরীতে টাকা দুর্বল হলে, ঋণের বোঝা আরো বাড়ে। ২০২২ সালে ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১১০ টাকা হয়েছে। মানে বৈদেশিক ঋণের বোঝা রাতারাতি ৩০% বেড়ে গেছে, কোনো নতুন ঋণ না নিয়েই।

কিন্তু ঋণের মূল অংশটা বড় সমস্যা না। আসল সমস্যা হলো ঋণ পরিষেবা, মানে সুদ আর কিস্তি পরিশোধ।


পর্ব ৩: সুদের জাল

একটা সহজ প্রশ্ন করি। বাংলাদেশ সরকার কিসে বেশি খরচ করে: শিক্ষায়, নাকি ঋণের সুদে?

উত্তরটা ভয়ংকর। ঋণ পরিষেবায় (সুদ + মূল কিস্তি) বাজেটের যত শতাংশ যায়, সেটা শিক্ষা আর স্বাস্থ্য মিলিয়ে যত যায় তার চেয়ে বেশি। মানে বাংলাদেশ সরকার তার নাগরিকদের শিক্ষিত ও সুস্থ রাখার চেয়ে বেশি খরচ করছে ঋণদাতাদের সুদ দিতে।

এটা একটু ভেবে দেখুন। প্রতিটা টাকা যেটা সুদে যাচ্ছে, সেটা একটা স্কুলে যেতে পারতো। একটা হাসপাতালে যেতে পারতো। একটা সড়ক বানাতে পারতো। সুদ কোনো কিছু তৈরি করে না। সুদ শুধু অতীতের ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য পরিশোধ করে।

আর এই বোঝা দ্রুত বাড়ছে।

২০১৫ সালে সুদ পরিশোধ ছিল সরকারি রাজস্বের প্রায় ২০%। ২০২৫ সালে সেটা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩২%। মানে সরকার যত টাকা আয় করে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চলে যাচ্ছে শুধু সুদে। মূল ঋণ শোধ করার কথা আলাদা।

এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কী হবে? ২০৩০ সালের মধ্যে সুদ পরিশোধ রাজস্বের ৪০% ছাড়িয়ে যেতে পারে। তখন সরকারের হাতে উন্নয়নের জন্য কিছুই থাকবে না। বেতন দেবে, সুদ দেবে, ভর্তুকি দেবে, ব্যস। নতুন রাস্তা, ব্রিজ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, কিছুই হবে না। শুধু অতীতের ঋণের সুদ দিয়ে যাবে।

এটাই ঋণ ফাঁদের সংজ্ঞা। যখন আপনি নতুন ঋণ নেন পুরনো ঋণের সুদ দিতে। যখন ঋণ শোধ করার জন্য আরো ঋণ নিতে হয়। চক্রটা ভাঙা যায় না, কারণ রাজস্ব বাড়াতে পারছেন না।


পর্ব ৪: রিজার্ভের পতন

ঋণের সমস্যাটা আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠে যখন আপনি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দিকে তাকান।

২০২১ সালে বাংলাদেশের ফরেন রিজার্ভ ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার। রেকর্ড। সবাই আত্মতৃপ্তিতে ভুগছিল। কিন্তু মাত্র চার বছরে সেটা নেমে এসেছে প্রায় ২০ বিলিয়নে। অর্ধেকেরও কম। একটা দেশের রিজার্ভ চার বছরে অর্ধেক হয়ে যাওয়া একটা বিপর্যয়।

কিন্তু শুধু পরম সংখ্যা দেখলে পুরো ছবি বোঝা যায় না। রিজার্ভের আসল মাপকাঠি হলো: এই টাকা দিয়ে কত মাসের আমদানি চালানো যাবে?

২০২১ সালে রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ৮ মাসের আমদানি চালানো যেত। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ন্যূনতম ৩ মাস থাকা দরকার। ২০২৫ সালে সেটা নেমে এসেছে প্রায় ৩.৫ মাসে। ন্যূনতমের কাছাকাছি। আরেকটু পড়লেই শ্রীলঙ্কা ২০২২ এর মতো পরিস্থিতি।

তাহলে রিজার্ভ কোথায় গেলো? ২৮ বিলিয়ন ডলার চার বছরে কীভাবে গায়েব হলো?

কয়েকটা কারণ একসাথে কাজ করেছে। প্রথমত, জ্বালানি আমদানি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর তেল ও গ্যাসের দাম আকাশে উঠেছিল। বাংলাদেশ তেল আমদানিকারক দেশ, তাই বিল বিশাল বেড়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য ঘাটতি। আমদানি রপ্তানির চেয়ে অনেক বেশি। তৃতীয়ত, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ। মেগা প্রকল্পগুলোর (পদ্মা রেল, রূপপুর, মেট্রোরেল, পায়রা বন্দর) কিস্তি পড়তে শুরু করেছে। চতুর্থত, মূলধন পাচার। অবৈধ পথে ডলার বাইরে চলে যাচ্ছে।

এই চারটা ধারা একসাথে চলতে থাকলে রিজার্ভ আরো কমবে। আর রিজার্ভ কমলে ডলারের দাম বাড়বে, ডলারের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়বে, আমদানি ব্যয় বাড়লে রিজার্ভ আরো কমবে। আরেকটা চক্র।


পর্ব ৫: আইএমএফ যা বলছে

২০২৩ সালে বাংলাদেশ আইএমএফের কাছ থেকে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজ নিয়েছে। এটা প্রথমবার বাংলাদেশ আইএমএফের দ্বারস্থ হয়েছে দীর্ঘদিনে। আইএমএফের Article IV পর্যালোচনা বাংলাদেশের অর্থনীতির একটা নির্মম এক্স-রে। তারা কী বলছে?

প্রথম সমস্যা: কর আদায়। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত পৃথিবীর সবচেয়ে কম দেশগুলোর একটি।

ভারত ১৭%। ভিয়েতনাম ১৮%। ইন্দোনেশিয়া ১০%। পাকিস্তান ১০%। আর বাংলাদেশ? ৮%। পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে কম। এটার মানে কী? মানে হলো সরকার পর্যাপ্ত কর আদায় করতে পারছে না। বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাত, দুর্বল কর প্রশাসন, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কর ছাড়, এসব মিলিয়ে সরকারের হাতে টাকা নেই।

দ্বিতীয় সমস্যা: ব্যয় শৃঙ্খলা। ভর্তুকি (বিশেষত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ভর্তুকি) বাজেটের বিশাল অংশ খাচ্ছে। মেগা প্রকল্পগুলোর খরচ মূল প্রাক্কলনের দুই-তিন গুণ হয়ে গেছে। পদ্মা সেতুর খরচ ১০,০০০ কোটি থেকে বেড়ে ৩০,০০০ কোটি হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচ ক্রমাগত বাড়ছে।

তৃতীয় সমস্যা: রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা। আইএমএফ স্পষ্ট বলেছে, কৃত্রিমভাবে টাকার দাম ধরে রাখতে গিয়ে রিজার্ভ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার দরকার।

আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, সংস্কার না হলে বাংলাদেশের ঋণ কোথায় যাবে?

দুটো লাইন। সবুজ: সংস্কার হলে। ঋণ ৪০-৪৫% এর মধ্যে থাকবে, ধীরে ধীরে কমবে। লাল: বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে। ঋণ ৬০% ছাড়িয়ে যাবে ২০৩০ এর মধ্যে। পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার পথে।

আর সবচেয়ে স্পষ্ট ছবিটা দেখুন এখানে:

সরকারের রাজস্ব আর ব্যয়ের গ্যাপ প্রতি বছর বাড়ছে। এই গ্যাপ পূরণ হচ্ছে ঋণ দিয়ে। ঋণের সুদ বাড়ছে। সুদ বাড়লে গ্যাপ আরো বাড়ছে। আরো ঋণ নিতে হচ্ছে।

এটা একটা সর্পিল। নিচের দিকে যাওয়া সর্পিল।


তাহলে বাংলাদেশ কি সত্যিই ঋণ ফাঁদে?

সৎ উত্তর: এখনো না। কিন্তু ফাঁদের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

৪০% ঋণ-জিডিপি অনুপাত নিজে বিপজ্জনক না। বিপজ্জনক হলো: ঋণ বাড়ার গতি, রাজস্ব বাড়ার গতির তুলনায় অনেক বেশি। সুদ পরিশোধ সামাজিক খাতকে গিলে খাচ্ছে। রিজার্ভ ন্যূনতমের কাছাকাছি। কর আদায় পৃথিবীর সবচেয়ে কম।

এই চারটা সমস্যা একসাথে সমাধান না হলে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পাকিস্তানের পথে হাঁটবে। আইএমএফের কাছে বারবার যেতে হবে। প্রতিবারই শর্ত কঠিন হবে। ভর্তুকি কাটতে হবে, জ্বালানির দাম বাড়াতে হবে, ভ্যাট বাড়াতে হবে। সাধারণ মানুষ ভুগবে।

বিকল্প আছে। কর ব্যবস্থা সংস্কার করুন, জিডিপির ৮% থেকে ১২% এ নিয়ে যান। মেগা প্রকল্পের খরচ নিয়ন্ত্রণ করুন। জ্বালানি ভর্তুকি ধাপে ধাপে কমান। রপ্তানি বহুমুখী করুন, শুধু গার্মেন্টস না।

কিন্তু এসবের জন্য দরকার কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস। আর সেই সাহস কি আমাদের আছে?

পর্ব ১ এর পরিবারটার কথা মনে করুন। মাসে ৫০,০০০ আয়, ৫৫,০০০ খরচ। সমাধান দুটো: হয় আয় বাড়ান, নয় খরচ কমান। দুটোই কষ্টকর। কিন্তু না করলে? একদিন ধার দেওয়ার মানুষও থাকবে না। সেদিন কী হবে, সেটা শ্রীলঙ্কাকে জিজ্ঞেস করুন।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50