ডেঙ্গু: শহরের মহামারী
পর্ব ১: একটি মশার সাম্রাজ্য
২০২৩ সালের জুলাই মাস। ঢাকার মিরপুরে চার বছর বয়সী তানহা জ্বরে কাঁপছে। তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি। মা ওষুধের দোকান থেকে প্যারাসিটামল কিনে এনেছেন। দুই দিন পর জ্বর কমেনি, বরং শরীরে র্যাশ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় ক্লিনিকে গেলেন, ডাক্তার বললেন, "ডেঙ্গু টেস্ট করান।" পজিটিভ। ডাক্তার বললেন, "প্লাটিলেট কাউন্ট কমে যাচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তি করান।"
ঢাকা মেডিকেলে গেলেন। বেড নেই। শিশু বিভাগে মেঝেতে শোয়ানো হলো। পাশে আরো তিনটি শিশু, সবার একই রোগ। নার্স একজন, রোগী ত্রিশ জন। স্যালাইন লাগানোর জন্য দুই ঘণ্টা অপেক্ষা।
এটা ২০২৩ সালের ঢাকার বাস্তবতা। সেই বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গু রেকর্ড ভেঙে দিলো। আগের সব হিসাব মুছে গেলো।
কতটা ভয়াবহ ছিল ২০২৩? এই চার্টটা দেখুন:
২০১৯ সালে ১ লাখ ১ হাজার কেস ছিল, সেটাই তখন রেকর্ড। ২০২৩ সালে সংখ্যাটা হয়ে গেলো ৩ লাখ ২১ হাজার। তিন গুণেরও বেশি। শুধু কেস না, মৃত্যুর সংখ্যাও আগের সব রেকর্ড ভাঙলো:
২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে মারা গেছে ১,৭০৫ জন। সরকারি হিসাব এটা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি, কারণ গ্রামাঞ্চলে অনেক মৃত্যু রিপোর্ট হয় না। তুলনা করুন: ২০২২ সালে মৃত্যু ছিল ২৮১। এক বছরে ছয় গুণ বৃদ্ধি।
ডেঙ্গু কোনো নতুন রোগ না। বাংলাদেশে প্রথম বড় প্রাদুর্ভাব ছিল ২০০০ সালে। কিন্তু দুই দশক ধরে সরকার এটাকে "ঢাকার সমস্যা" মনে করে এসেছে। ২০২৩ সাল সেই ভুল ধারণা চূড়ান্তভাবে ভেঙে দিলো।
পর্ব ২: বর্ষা, মশা, আর শহর
ডেঙ্গু এডিস ইজিপ্টাই মশা বহন করে। এই মশা পরিষ্কার জমা পানিতে জন্মায়। ফুলের টব, ফেলে দেওয়া টায়ার, নির্মাণাধীন ভবনের জমা পানি, এয়ার কন্ডিশনারের ট্রে। এই মশা গ্রামের চেয়ে শহরে বেশি থাকে, কারণ শহরে এইসব প্রজনন ক্ষেত্র বেশি।
ডেঙ্গুর একটা স্পষ্ট মৌসুমী প্যাটার্ন আছে। এই চার্টটা দেখুন:
জুন থেকে নভেম্বর, এই ছয় মাসে মোট কেসের ৯০% এর বেশি হয়। পিক আসে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে। কারণ সহজ: বর্ষাকাল। বৃষ্টি হলে পানি জমে, পানি জমলে মশা জন্মায়, মশা জন্মালে ডেঙ্গু ছড়ায়।
কিন্তু শুধু বৃষ্টি দিয়ে ২০২৩ এর বিস্ফোরণ ব্যাখ্যা করা যায় না। বৃষ্টি তো প্রতি বছরই হয়। তাহলে ২০২৩ এ কেন এত বেশি? এই চার্টটা দেখুন:
২০২৩ সালে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি ছিল, কিন্তু রেকর্ড মাত্রায় না। আসল কারণ হলো তাপমাত্রা। ২০২৩ সালে জুন-জুলাইয়ে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১.৫ থেকে ২ ডিগ্রি বেশি ছিল। উষ্ণ আবহাওয়ায় এডিস মশার জীবনচক্র দ্রুত হয়। ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা হতে স্বাভাবিকে ১০-১২ দিন লাগে, উচ্চ তাপমাত্রায় ৭-৮ দিনেই হয়ে যায়। তাপমাত্রা বাড়লে মশার কামড়ানোর হারও বাড়ে। আর ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ডও কমে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তন ডেঙ্গুকে আরো ভয়ংকর করছে। এটা কোনো তত্ত্ব না, এটা ডেটায় দেখা যাচ্ছে।
এখন ডেঙ্গু শুধু ঢাকার রোগ নেই। ২০২৩ সালে দেশের প্রতিটি বিভাগে ডেঙ্গু ছড়িয়েছে:
ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি কেস, সেটা প্রত্যাশিত। কিন্তু চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশালেও হাজার হাজার কেস হয়েছে। এমনকি রংপুর আর সিলেটেও। এডিস মশা এখন সারা দেশে আছে। শুধু ঢাকায় মশা মারলে ডেঙ্গু দমন হবে না।
পর্ব ৩: কারা মরছে?
ডেঙ্গুতে সবাই আক্রান্ত হতে পারে, কিন্তু সবাই সমানভাবে ঝুঁকিতে না। বয়স একটা বড় ফ্যাক্টর:
শিশু (০-১৪ বছর) আর বয়স্ক (৬০+ বছর) মানুষের মধ্যে মৃত্যুর হার বেশি। ১৫-৪৪ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়, কারণ তারা বাইরে বেশি যায়। কিন্তু শিশু আর বৃদ্ধদের মধ্যে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার (DHF) আর ডেঙ্গু শক সিনড্রোম (DSS) বেশি হয়।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে ঝুঁকি অনেক বেশি। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ আছে (DENV-1, 2, 3, 4)। প্রথমবার একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে সেটার বিরুদ্ধে আজীবন প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে, শরীরের পুরনো অ্যান্টিবডি উল্টো ক্ষতি করে। এটাকে বলে Antibody-Dependent Enhancement (ADE)। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে DENV-2 প্রধান সেরোটাইপ ছিল, যেখানে আগের বছরগুলোতে DENV-1 আর DENV-3 প্রধান ছিল। ফলে যারা আগে ডেঙ্গু হয়ে "সুরক্ষিত" মনে করছিল, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়লো।
মৃত্যুর হার (Case Fatality Rate) কেমন ছিল? এই চার্টটা দেখুন:
২০২৩ সালে মৃত্যুর হার ছিল ০.৫৩%। সংখ্যাটা ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু ৩ লাখ কেসের ০.৫৩% মানে ১,৭০৫ জন মানুষ। আর এই হার আগের বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০১৯ সালে মৃত্যুর হার ছিল ০.১৩%। চার গুণ বৃদ্ধি। এর একটা কারণ হাসপাতালের সামর্থ্য। এত রোগী একসাথে ভর্তি হলে চিকিৎসার মান কমে যায়।
পর্ব ৪: বিশ্বের সাথে তুলনা
ডেঙ্গু শুধু বাংলাদেশের সমস্যা না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকায় ডেঙ্গু বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি কতটা খারাপ? এই চার্টটা দেখুন:
থাইল্যান্ড আর ফিলিপাইনে ডেঙ্গু দশকের পর দশক ধরে আছে। কিন্তু তারা মৃত্যুর হার কমিয়ে এনেছে। থাইল্যান্ডে ডেঙ্গু মৃত্যুর হার ০.১% এর নিচে। কারণ? তিনটা জিনিস।
প্রথমত, আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম। থাইল্যান্ড প্রতি সপ্তাহে মশার ঘনত্ব মাপে। যখন কোনো এলাকায় ব্রুটো ইনডেক্স (BI) বা হাউস ইনডেক্স (HI) নির্দিষ্ট সীমার উপরে যায়, তখনই সেই এলাকায় জরুরি মশা নিধন অভিযান চালানো হয়। বাংলাদেশে এই ধরনের পদ্ধতিগত মনিটরিং নেই।
দ্বিতীয়ত, হাসপাতালের সামর্থ্য। থাইল্যান্ডে প্রতি ১০,০০০ জনে ২১ টি হাসপাতাল শয্যা আছে। বাংলাদেশে মাত্র ৮ টি। ডেঙ্গু মৌসুমে হাসপাতালগুলো কতটা চাপে পড়ে, এই চার্টটা দেখুন:
২০২৩ এর পিক মাসগুলোতে (আগস্ট-অক্টোবর) ঢাকার হাসপাতালগুলোতে শয্যার তুলনায় রোগী ছিল দুই থেকে তিন গুণ। মেঝেতে, করিডোরে, এমনকি বারান্দায় রোগী রাখা হয়েছে। এই অবস্থায় মানসম্পন্ন চিকিৎসা দেওয়া অসম্ভব।
তৃতীয়ত, জনসচেতনতা। থাইল্যান্ড আর সিঙ্গাপুরে প্রতিটি বাড়ির মালিক জানে যে জমা পানি পরিষ্কার করতে হবে। সিঙ্গাপুরে বাড়িতে মশার প্রজনন ক্ষেত্র পাওয়া গেলে জরিমানা হয় ৫,০০০ সিঙ্গাপুর ডলার (প্রায় ৪ লাখ টাকা)। বাংলাদেশে এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেই।
পর্ব ৫: কত খরচ হচ্ছে, কত খরচ করা উচিত
ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাংলাদেশ কত খরচ করে? এই চার্টটা দেখুন:
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন (উত্তর ও দক্ষিণ) মিলে মশা নিধনে বছরে প্রায় ৫০-৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখে। ২০২৩ সালের মহামারীর পর বরাদ্দ কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু এই অর্থ কোথায় যায়? বেশিরভাগ যায় ফগিং মেশিন চালাতে, যেটা ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কম কার্যকর পদ্ধতি। ফগিং শুধু উড়ন্ত মশা মারে, লার্ভা মারে না। আর এডিস মশা দিনের বেলা কামড়ায়, ফগিং হয় সন্ধ্যায় বা ভোরে।
যা দরকার সেটা হলো লার্ভা নিধন, সোর্স রিডাকশন, আর কমিউনিটি এনগেজমেন্ট। প্রতিটা বাড়ি, প্রতিটা নির্মাণ সাইট, প্রতিটা টায়ারের দোকান, প্রতিটা ফুলের নার্সারি পরিদর্শন করতে হবে। জমা পানি পরিষ্কার করতে হবে। এটা শ্রমঘন কাজ, খরচও বেশি। কিন্তু ফগিংয়ের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।
একটা হিসাব করা যাক। ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে ৩ লাখ ২১ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। গড়ে প্রতিটি ডেঙ্গু কেসে সরাসরি চিকিৎসা খরচ (হাসপাতাল, ওষুধ, পরীক্ষা) প্রায় ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা। এর সাথে যোগ করুন পরোক্ষ খরচ: কাজ হারানো, উৎপাদনশীলতা কমা, পরিবারের সদস্যদের কাজ ছেড়ে সেবা দেওয়া। সব মিলিয়ে ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর অর্থনৈতিক ক্ষতি আনুমানিক ৮,০০০ থেকে ১২,০০০ কোটি টাকা। সেখানে প্রতিরোধে বরাদ্দ ৬০ কোটি টাকা। অনুপাতটা ভয়ংকর: প্রতি ১ টাকা প্রতিরোধ বরাদ্দের বিপরীতে ১৫০ থেকে ২০০ টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
পর্ব ৬: কী করতে হবে?
ডেঙ্গু নির্মূল করা সম্ভব না। এডিস মশা পৃথিবী থেকে সরিয়ে ফেলা যাবে না। কিন্তু ডেঙ্গুকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কিউবা করেছে। বাংলাদেশও পারে, যদি চারটা কাজ করে।
প্রথমত, মশা মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা। প্রতিটা ওয়ার্ডে, প্রতিটা ইউনিয়নে সাপ্তাহিক মশার ঘনত্ব জরিপ। ব্রুটো ইনডেক্স ২০ এর উপরে গেলে জরুরি অভিযান। এই ডেটা পাবলিক ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ করা, যাতে মানুষ জানতে পারে তাদের এলাকায় ঝুঁকি কতটা।
দ্বিতীয়ত, নির্মাণ সাইট নিয়ন্ত্রণ। ঢাকায় হাজার হাজার নির্মাণাধীন ভবন আছে। প্রতিটাতে লিফটের গর্ত, বেসমেন্ট, ছাদ, এসব জায়গায় পানি জমে। বিল্ডিং কোডে বাধ্যতামূলক করতে হবে যে নির্মাণ সাইটে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। না মানলে জরিমানা।
তৃতীয়ত, হাসপাতালের সামর্থ্য বাড়ানো। ডেঙ্গু মৌসুমের আগে (মে-জুন মাসে) অতিরিক্ত শয্যা, স্যালাইন, প্লাটিলেট ব্যাংকের ব্যবস্থা করতে হবে। জরুরি ডেঙ্গু ওয়ার্ড খোলার প্রস্তুতি আগে থেকে থাকতে হবে, আগস্টে ভিড় শুরু হলে তখন তাড়াহুড়ো করে না।
চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদে নগর পরিকল্পনা বদলাতে হবে। ঢাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। রাস্তায় পানি জমে, নালায় পানি জমে, ছাদে পানি জমে। যতদিন এই মৌলিক সমস্যা সমাধান না হবে, ততদিন মশা জন্মাতে থাকবে, ডেঙ্গু ছড়াতে থাকবে।
২০২৩ সালের ১,৭০৫ মৃত্যু একটা সতর্কবার্তা ছিল। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এই সতর্কবার্তায় কান দেবে, নাকি পরের মৌসুমে আবার একই গল্পের পুনরাবৃত্তি হবে?
তানহার মা জানতে চান উত্তরটা। ঢাকার মিরপুরে তার ঘরের পেছনে এখনো একটা পরিত্যক্ত টায়ার পড়ে আছে। ভেতরে পানি জমে আছে। সেই পানিতে এডিস মশার লার্ভা বড় হচ্ছে। পরের বর্ষায় সেই মশা কাউকে কামড়াবে। হয়তো তানহাকেই, দ্বিতীয়বার।