প্রবাসীরা ভোট দিতে পারে না কেন?
পর্ব ১: একটা ফোন কল
রাত দুইটা, নিউ ইয়র্ক সময়। তানভীর ভাই ঘুমাতে পারছেন না। বাংলাদেশে সকাল হয়ে গেছে। আজ নির্বাচনের দিন। ফেসবুকে লাইভ দেখছেন, কোথাও ভোটার লাইনে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ, কোথাও কেন্দ্র ফাঁকা।
তানভীর ভাই জ্যাকসন হাইটসে একটা রেস্টুরেন্ট চালান। ১৮ বছর আমেরিকায়। গ্রিন কার্ড আছে, সিটিজেনশিপের জন্য আবেদন করেছেন। প্রতি মাসে বাবা-মাকে ৫০,০০০ টাকা পাঠান। গ্রামের বাড়িতে দোতলা বানিয়ে দিয়েছেন। ছোট বোনের বিয়ের খরচ দিয়েছেন। পাড়ার মসজিদে দান করেন।
কিন্তু আজ, বাংলাদেশের নির্বাচনে, তানভীর ভাইয়ের ভোট নেই।
উনি একজন "প্রবাসী"। বাংলাদেশের পাসপোর্ট আছে, জাতীয় পরিচয়পত্র আছে, ভোটার তালিকায় নাম আছে। কিন্তু ভোট দিতে হলে নির্বাচনের দিন নিজের এলাকার কেন্দ্রে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকতে হবে। নিউ ইয়র্ক থেকে সিলেটে যেতে টিকিটের দাম ১,৫০০ ডলার। ছুটি নিতে হবে দুই সপ্তাহ। রেস্টুরেন্ট বন্ধ রাখলে লোকসান। শুধু ভোট দিতে এত খরচ, এত ঝামেলা, কে করবে?
তানভীর ভাইয়ের মতো কত মানুষ বিদেশে? সংখ্যাটা বড়।
বাংলাদেশের প্রায় ১.৩ কোটি নাগরিক বিদেশে বাস করেন। সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ২৬ লাখ। তারপর আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েত, কাতার, ওমান, ইতালি, সিঙ্গাপুর। এই ১.৩ কোটি মানুষ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮%। প্রতি ১২ জন বাংলাদেশির একজন দেশের বাইরে।
এই ১.৩ কোটি মানুষ কেউ ভোট দিতে পারে না। একটা ভোটও না। কোনো নির্বাচনে না, কোনো পদ্ধতিতে না, কোনো উপায়ে না।
প্রশ্ন হলো: পৃথিবীর অন্য দেশে কী হয়? অন্য দেশের প্রবাসীরা কি ভোট দিতে পারে?
১১৫টারও বেশি দেশ তাদের প্রবাসীদের ভোটাধিকার দিয়েছে। ভারত ২০১১ সালে প্রবাসীদের ভোটার তালিকাভুক্তির আইন করেছে (বাস্তবায়নে সমস্যা আছে, কিন্তু আইনটা আছে)। ফিলিপাইন ২০০৩ সালেই Overseas Absentee Voting Act পাস করেছে। ৬০ টির বেশি দেশে দূতাবাসে ভোট দেওয়া যায়। অনেক দেশে পোস্টাল ব্যালট আছে। কিছু দেশে অনলাইন ভোটিং পাইলট চলছে। বাংলাদেশ? শূন্য। কোনো আইন নেই, কোনো পরিকল্পনা নেই, কোনো আলোচনাও নেই।
এটা বোঝার জন্য আরেকটু গভীরে যেতে হবে।
পর্ব ২: ১ কোটি মানুষের নীরবতা
এত মানুষ, এত টাকা পাঠাচ্ছে, তবু তাদের কোনো রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর নেই। কেন?
প্রথম কারণ: বাংলাদেশের সংবিধানে প্রবাসী ভোটের কোনো বিধান নেই। নির্বাচন কমিশনের আইনে ভোট দিতে হলে নিজের এলাকায় উপস্থিত থাকতে হবে। এটা ১৯৭২ সালের সংবিধান থেকে চলে আসছে, যখন বিদেশে বাংলাদেশি বলতে কয়েক হাজার ছিল। আজ ১.৩ কোটি।
দ্বিতীয় কারণ: রাজনৈতিক দলগুলো চায় না। কেন চায় না? কারণ প্রবাসীদের ভোট নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। দেশের ভেতরে দলীয় ক্যাডার দিয়ে কেন্দ্র "ম্যানেজ" করা যায়। দূতাবাসে বা পোস্টাল ব্যালটে সেটা সম্ভব না। যে দল ক্ষমতায় থাকে, সে চায় না নতুন অনিশ্চিত ভোটার যোগ হোক। যে দল বিরোধী দলে, তারও এই ইস্যু নিয়ে চাপ দেওয়ার প্রণোদনা কম, কারণ তারাও ক্ষমতায় গেলে একই অবস্থান নেবে।
তৃতীয় কারণ: প্রবাসীদের নিজেদের সংগঠিত চাপ নেই। প্রবাসে বাংলাদেশি সংগঠন আছে শত শত। কিন্তু এগুলো মূলত সামাজিক বা সাংস্কৃতিক। জেলা সমিতি, থানা সমিতি, পূজা কমিটি, ঈদ জামাত। ভোটাধিকার আন্দোলন? খুব কম।
অথচ প্রবাসীদের অর্থনৈতিক অবদান কতটা বিশাল, সেটা দেখুন:
২০২৫ সালে প্রবাসীরা পাঠিয়েছে ২৪.৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) এসেছে ১.৫ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক সাহায্য এসেছে ৬ বিলিয়ন ডলার। মানে রেমিট্যান্স FDI-এর ১৬ গুণেরও বেশি। বৈদেশিক সাহায্যের চার গুণ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রার উৎস হলো প্রবাসীদের পাঠানো টাকা।
কিন্তু যারা সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে, তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব শূন্য। তারা কর দিতে পারে না সরাসরি (কারণ কোনো প্রবাসী করের ব্যবস্থা নেই), ভোট দিতে পারে না, সংসদে তাদের কোনো প্রতিনিধি নেই, তাদের নিয়ে কোনো মন্ত্রণালয়ের নীতি তৈরি হয় না (প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় আছে, কিন্তু তার কাজ মূলত শ্রমিক পাঠানো, রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা না)।
এটা একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের স্লোগান ছিল "No taxation without representation." বাংলাদেশের প্রবাসীদের ক্ষেত্রে বলা যায়: "No representation despite massive contribution."
পর্ব ৩: মেধার স্রোত
তানভীর ভাইয়ের গল্প একটা দিক। উনি রেস্টুরেন্ট চালান। কিন্তু প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আরেকটা বড় অংশ আছে যাদের কথা কম বলা হয়: পেশাদার ও উচ্চশিক্ষিত প্রবাসীরা।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের পেশাগত প্রোফাইল দেখলে একটা স্পষ্ট দ্বিভাজন দেখা যায়। উপসাগরীয় দেশগুলোতে বেশিরভাগ শ্রমিক পর্যায়ের কাজে আছেন: নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, গৃহকর্ম, ড্রাইভিং। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোতে? ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইটি পেশাদার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, ব্যাংকার, আইনজীবী।
যুক্তরাজ্যের NHS-এ হাজার হাজার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডাক্তার কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ার আছেন। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানিতে গবেষক আছেন। এই মেধাবীরা দেশ থেকে চলে গেছেন কেন?
প্রবাসী বাংলাদেশিদের শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য দেখুন। পশ্চিমা দেশগুলোতে (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া) প্রবাসীদের মধ্যে ৪০-৬০% স্নাতকোত্তর বা তার বেশি শিক্ষিত। মানে এরা দেশের সবচেয়ে মেধাবী সন্তান। বাংলাদেশ তাদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করেছে (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তুকি দিয়ে পড়িয়েছে), কিন্তু ফসল কাটছে অন্য দেশ।
এটাকে বলে "brain drain" বা মেধা পাচার। কিন্তু "brain drain" বলে ক্ষান্ত হলে পুরো ছবি দেখা হয় না। কিছু দেশ "brain drain"-কে "brain gain"-এ রূপান্তর করেছে। কীভাবে?
চীন তার প্রবাসী বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের ফিরিয়ে আনার জন্য Thousand Talents Program চালু করেছে। গবেষণা ল্যাব, ভালো বেতন, সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আকৃষ্ট করেছে। ভারত তার আইটি ডায়াস্পোরাকে কাজে লাগিয়ে ব্যাঙ্গালোরকে গ্লোবাল আইটি হাব বানিয়েছে। ইসরায়েল তার প্রবাসীদের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি ফিরিয়ে এনে "Startup Nation" হয়েছে। তাইওয়ান তার সিলিকন ভ্যালির ইঞ্জিনিয়ারদের ফিরিয়ে এনে TSMC তৈরি করেছে, যেটা আজ বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি।
বাংলাদেশ কী করেছে? প্রায় কিছুই না।
প্রবাসী ফেরত আসার হার (return migration rate) দেখুন। বাংলাদেশ থেকে যারা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যান, তাদের মাত্র ৮-১২% ফিরে আসেন। ভারতে এই হার ৩০-৩৫%, চীনে ৪০-৪৫%। কেন ফিরে আসেন না? কারণ দেশে সুযোগ নেই, গবেষণার পরিবেশ নেই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনীতি, মেধার মূল্যায়ন নেই। আর যারা ফিরতে চান, তাদের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই।
পর্ব ৪: হারানো বিলিয়ন
প্রবাসীদের শুধু রেমিট্যান্সের কথা ভাবলে ছবিটা অসম্পূর্ণ। রেমিট্যান্স হলো ভোগ্য আয়, পরিবারের খরচ মেটায়। কিন্তু প্রবাসীরা যদি দেশে বিনিয়োগ করতে পারতেন? যদি একটা সহজ, স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা থাকত?
বর্তমানে প্রবাসীদের দেশে সরাসরি বিনিয়োগ খুবই কম, আনুমানিক ০.৫-১ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু সম্ভাবনা কত? আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভালো নীতি পরিবেশে প্রবাসীরা তাদের রেমিট্যান্সের ১৫-২০% বিনিয়োগে রূপান্তর করতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা ৪-৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারত। এটা বর্তমান FDI-এর তিন গুণেরও বেশি।
কিন্তু প্রবাসীরা বিনিয়োগ করতে চান না কেন? কারণগুলো পরিচিত। জমি দখলের ভয়, আদালতে বিচার পেতে বছরের পর বছর, ব্যবসায় পার্টনারের প্রতারণা, সরকারি দপ্তরে হয়রানি, ব্যাংকে টাকা রাখলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। সোজা কথায়, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা নেই।
ফিলিপাইন কী করেছে? তারা Overseas Filipino Workers (OFW) দের জন্য আলাদা বিনিয়োগ প্রোগ্রাম তৈরি করেছে। সরকারি বন্ড ইস্যু করেছে যেটা প্রবাসীরা কিনতে পারে। ব্যাংকিং সহজ করেছে। সম্পত্তি কেনার আইন সরল করেছে। এমনকি দূতাবাসে আইনি সেবা দেয়। ভারত NRI (Non-Resident Indian) বিনিয়োগের জন্য আলাদা ব্যাংকিং চ্যানেল খুলেছে। NRI বিনিয়োগ ভারতের আইটি ও স্টার্টআপ বুমের অন্যতম চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশে? প্রবাসী বন্ড আছে, কিন্তু সুদের হার আকর্ষণীয় না। প্রক্রিয়া জটিল। বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট। ফলে প্রবাসীরা টাকা পাঠান পরিবারকে, পরিবার সেটা খরচ করে। বিনিয়োগ চক্রটা শুরুই হয় না।
পর্ব ৫: পরবর্তী প্রজন্ম
তানভীর ভাইয়ের মেয়ে রায়হানা। জন্ম নিউ ইয়র্কে। বয়স ১৬। বাংলা বুঝতে পারে, কিন্তু পড়তে পারে না। বাংলাদেশে গেছে তিনবার, নানাবাড়ি দেখতে। সে আমেরিকান, কিন্তু বাবা-মা বলে "তুই বাংলাদেশি।"
রায়হানার মতো লাখ লাখ দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রবাসী বাংলাদেশি আছে। তাদের পরিচয় জটিল। তারা যে দেশে জন্মেছে সেখানকার নাগরিক, কিন্তু বাবা-মায়ের দেশের সাথে আবেগের বন্ধন আছে। এই প্রজন্মকে ধরে রাখার কোনো কৌশল বাংলাদেশের নেই।
দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রবাসীদের আনুমানিক সংখ্যা দেখুন। যুক্তরাজ্যে ৬-৭ লাখ ব্রিটিশ-বাংলাদেশি আছেন যাদের বাবা-মা বা দাদা-দাদি বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে ২-৩ লাখ। ইতালি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায়ও সংখ্যা বাড়ছে। মোট ১৫-২০ লাখ দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষ পৃথিবীজুড়ে আছেন।
এদের মধ্যে অনেকে উচ্চশিক্ষিত, সফল, প্রভাবশালী। যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাউন্সিলর, মেয়র, এমনকি সংসদ সদস্য আছেন। টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ছিলেন। রুশনারা আলী ব্রিটিশ সংসদে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রথম MP। কিন্তু বাংলাদেশের সাথে এদের সম্পর্ক ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। প্রথম প্রজন্ম টাকা পাঠায়, দেশে বাড়ি করে, ফিরে যেতে চায়। দ্বিতীয় প্রজন্ম? তাদের "দেশ" হলো যেখানে তারা জন্মেছে। বাংলাদেশ তাদের কাছে বাবা-মায়ের স্মৃতি, ছুটিতে যাওয়ার জায়গা, এর বেশি কিছু না। তৃতীয় প্রজন্ম? বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক প্রায় শূন্য।
ভারত এটা বুঝেছে। তারা Overseas Citizen of India (OCI) কার্ড দিয়েছে। এটা ডুয়াল সিটিজেনশিপ না, কিন্তু কাছাকাছি। OCI কার্ডধারী ভারতে থাকতে পারে, কাজ করতে পারে, সম্পত্তি কিনতে পারে, ব্যবসা করতে পারে। ভোট দিতে পারে না, কিন্তু বাকি সব পারে। ফলে দ্বিতীয়, তৃতীয় প্রজন্মের প্রবাসী ভারতীয়রা ভারতের সাথে যুক্ত থাকছে। বিনিয়োগ করছে, ব্যবসা করছে, প্রযুক্তি আনছে।
বাংলাদেশের এমন কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে প্রতিটা নতুন প্রজন্মের সাথে বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, এবং একসময় ছিন্ন হবে।
পর্ব ৬: কী করা যেত?
এবার হিসাবটা করি। প্রবাসীদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করলে বাংলাদেশ কী পেতে পারত?
বিশ্বের যেসব দেশ প্রবাসী ভোটিং চালু করেছে, সেখানে একটা আকর্ষণীয় প্যাটার্ন দেখা যায়। প্রবাসী ভোটার অংশগ্রহণ প্রথমে ২০-৩০% থাকে, তারপর ধীরে ধীরে বাড়ে। কিন্তু ভোটাধিকার শুধু ভোটের সংখ্যা না। এটা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রতীক। যখন প্রবাসীরা জানে তাদের কণ্ঠস্বর আছে, তারা দেশের নীতি নিয়ে ভাবে, আলোচনা করে, চাপ দেয়, বিনিয়োগ করে। রাজনৈতিক অধিকার অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ায়।
এবার পুরো ছবিটা দেখি। প্রবাসীরা বাংলাদেশের জিডিপিতে কতটুকু অবদান রাখছে, আর কতটুকু রাখতে পারতো?
বর্তমানে প্রবাসী অবদান (রেমিট্যান্স) জিডিপির প্রায় ৬%। কিন্তু বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক, আর মেধা ফেরত আনা হিসাব করলে সম্ভাব্য অবদান ১০-১২% হতে পারত। এই ফারাকটা, এই ৪-৬ শতাংশ পয়েন্ট, এটাই হলো হারানো সুযোগ। ডলারে? বছরে ১৫-২০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে।
কী করতে হবে? তালিকা দীর্ঘ না, কিন্তু ইচ্ছাশক্তি দরকার।
এক: প্রবাসী ভোটাধিকার আইন পাস করা। দূতাবাসে ভোটকেন্দ্র স্থাপন, অথবা পোস্টাল ব্যালট, অথবা ই-ভোটিং পাইলট। ফিলিপাইন পেরেছে, মেক্সিকো পেরেছে, তুরস্ক পেরেছে। বাংলাদেশ কেন পারবে না?
দুই: Overseas Bangladeshi Card (OBC) চালু করা, ভারতের OCI-এর মতো। দ্বিতীয়, তৃতীয় প্রজন্মকে আইনি সুযোগ দিয়ে যুক্ত রাখা।
তিন: প্রবাসী বিনিয়োগের জন্য পৃথক ওয়ান-স্টপ সার্ভিস। জমি কেনা, ব্যবসা শুরু, ব্যাংকিং, সব একটা জায়গা থেকে। দূতাবাসে আইনি সেবা।
চার: মেধা ফেরত আনার প্রোগ্রাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা পদ, স্টার্টআপ ভিসা, ট্যাক্স ছাড়।
পাঁচ: সংসদে প্রবাসী আসন। ইতালি, ফ্রান্স, পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়া, অনেক দেশে প্রবাসীদের জন্য আলাদা সংসদীয় আসন আছে।
তানভীর ভাইয়ের কথায় ফিরে আসি।
নির্বাচনের দিন শেষ হলো। ফলাফল আসতে শুরু করলো। তানভীর ভাই ফেসবুকে দেখলেন, তার এলাকায় একজন প্রার্থী জিতেছেন যাকে তিনি চেনেন না, যার সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই, যিনি তানভীর ভাইয়ের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য না। কারণ তানভীর ভাই ভোটার না। তিনি শুধু টাকা পাঠানোর মেশিন।
প্রতি মাসে ৫০,০০০ টাকা পাঠান। বছরে ৬ লাখ। ১৮ বছরে প্রায় ১ কোটি টাকা পাঠিয়েছেন দেশে। কিন্তু দেশের ভাগ্য নির্ধারণে তার কোনো ভূমিকা নেই। উনি যুক্তরাষ্ট্রে সিটিজেনশিপ পেলে সেখানে ভোট দিতে পারবেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে, কংগ্রেস নির্বাচনে, এমনকি স্থানীয় স্কুল বোর্ড নির্বাচনে। কিন্তু নিজের দেশে? যে দেশে তার বাবা-মা থাকে, ভাইবোন থাকে, জমি আছে, বাড়ি আছে? সেখানে তার একটাও ভোট নেই।
১.৩ কোটি তানভীর ভাই। ২৪.৮ বিলিয়ন ডলার। শূন্য ভোট।
সংখ্যাগুলো নিজেই কথা বলে।