Back to publications
Narrative 2026-03-06

প্রতিবন্ধী মানুষ: অদৃশ্য ১ কোটি

প্রতিবন্ধিতার পরিসংখ্যান, বৈষম্য, আর অবহেলা

প্রতিবন্ধী মানুষ: অদৃশ্য ১ কোটি

পর্ব ১: যাদের গোনা হয় না

রহিমার বয়স ১৪। সে চলতে পারে না। জন্মের সময় সেরেব্রাল পালসি হয়েছিল। হুইলচেয়ার নেই, ক্র্যাচ আছে একটা, সেটাও ভাঙা। বাড়ি থেকে স্কুল দেড় কিলোমিটার। রাস্তায় কোনো র‍্যাম্প নেই, ফুটপাত নেই, কাঁচা মাটির পথ। বর্ষাকালে কাদায় ডুবে যায়। রহিমা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। তারপর আর যেতে পারেনি।

রহিমার বাবা রিকশা চালায়। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে। দুজনের আয় মিলিয়ে মাসে ৮,০০০ টাকার মতো। সরকার থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পায় মাসে ৭৫০ টাকা। ৭৫০ টাকা। এই টাকা দিয়ে কী হয়? দুই দিনের চালের দাম, হয়তো তিন দিনের।

কিন্তু প্রকৃত প্রতিবন্ধী জনসংখ্যা যদি ১ কোটির বেশি হয়, তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ এখনো নিবন্ধনের বাইরে।
১.২ কোটি মানুষ
কী করা যেত, কী করা যায়
প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ
আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই
মাসে ৮,০০০ টাকা
যাদের গোনা হয় না

রহিমা কি একা? না। বাংলাদেশে রহিমার মতো কত মানুষ আছে?

উত্তরটা নির্ভর করে আপনি কাকে জিজ্ঞেস করছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) বলে দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১.৪%। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এটা প্রায় ২৪ লাখ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলে যেকোনো দেশে জনসংখ্যার অন্তত ১৫% মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার মুখোমুখি। বাংলাদেশের জনসংখ্যায় ১৫% মানে প্রায় ২.৭ কোটি। সবচেয়ে রক্ষণশীল আন্তর্জাতিক হিসাবেও (৬-৭%) সংখ্যাটা দাঁড়ায় ১ কোটির বেশি।

মানে সরকারি হিসাব আর আন্তর্জাতিক প্রাক্কলনের মধ্যে পার্থক্য দশ গুণেরও বেশি। এত বড় গ্যাপ কেন?

কারণগুলো স্পষ্ট। প্রথমত, আদমশুমারির প্রশ্নমালায় প্রতিবন্ধিতার সংজ্ঞা সংকীর্ণ। "আপনি কি প্রতিবন্ধী?" এই একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়। কিন্তু প্রতিবন্ধিতা কোনো হ্যাঁ/না বিষয় না। দৃষ্টি কম কিন্তু একেবারে অন্ধ না, এমন মানুষ কি প্রতিবন্ধী? শ্রবণ সমস্যা আছে কিন্তু শুনতে পায়, এমন মানুষ? মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যেমন বিষণ্নতা বা সিজোফ্রেনিয়া? বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা? অটিজম? দীর্ঘমেয়াদি রোগ যেমন ডায়াবেটিস বা আর্থ্রাইটিস যা দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা দেয়?

Washington Group on Disability Statistics এর পদ্ধতি অনুযায়ী প্রতিবন্ধিতা মাপতে হলে ছয়টি মাত্রায় প্রশ্ন করতে হয়: দেখা, শোনা, চলাফেরা, স্মৃতি/মনোযোগ, স্ব-যত্ন, যোগাযোগ। প্রতিটি মাত্রায় "কোনো সমস্যা নেই" থেকে "একেবারে পারি না" পর্যন্ত চার স্তরের উত্তর। এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা অন্তত ৬-৭% হওয়ার কথা।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক কলঙ্ক। বাংলাদেশে প্রতিবন্ধিতা অনেক পরিবারে "লজ্জা" বা "পাপের ফল" হিসেবে দেখা হয়। পরিবার নিজে থেকে প্রতিবন্ধী সদস্যের কথা বলতে চায় না। শুমারিকর্মী যখন জিজ্ঞেস করেন "পরিবারে কেউ প্রতিবন্ধী আছে?", অনেক পরিবার বলে "না"। বিশেষত মেয়েদের ক্ষেত্রে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ক্ষেত্রে, আর বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার ক্ষেত্রে এই লুকানোর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

তৃতীয়ত, প্রান্তিক এলাকায় শুমারি পৌঁছায় না ঠিকমতো। চরের মানুষ, পাহাড়ি আদিবাসী, বস্তিবাসী, এদের মধ্যে প্রতিবন্ধিতার হার বেশি কিন্তু শুমারিতে এদের গণনাই হয় না অনেক সময়।

ফলে বাংলাদেশে ১ কোটির বেশি মানুষ পরিসংখ্যানগতভাবে অদৃশ্য। রাষ্ট্র তাদের গোনে না। নীতি তাদের জন্য তৈরি হয় না। বাজেট বরাদ্দ তাদের কথা ভেবে হয় না। তারা আছে, কিন্তু নেই।


পর্ব ২: বেকার, দরিদ্র, বঞ্চিত

প্রতিবন্ধিতা আর দারিদ্র্য একটা চক্রের মতো। দারিদ্র্য প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকি বাড়ায় (অপুষ্টি, চিকিৎসার অভাব, বিপজ্জনক কাজের পরিবেশ)। আবার প্রতিবন্ধিতা দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয় (কাজ পাওয়া যায় না, শিক্ষা অসম্পূর্ণ, অতিরিক্ত চিকিৎসা খরচ)।

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী মানুষদের কর্মসংস্থানের হার ভয়াবহ রকম কম। সরকারি হিসাবে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যই নেই। যেটুকু গবেষণা হয়েছে, তাতে দেখা যায় কর্মক্ষম প্রতিবন্ধী মানুষদের মধ্যে মাত্র ২০-৩০% কোনো না কোনো আয়মূলক কাজে নিয়োজিত। তুলনায় সাধারণ জনগোষ্ঠীতে কর্মসংস্থানের হার ৫৬%। মানে প্রতিবন্ধী মানুষদের বেকারত্বের হার সাধারণ মানুষের তিন গুণ।

আর যারা কাজ করে, তারা কী ধরনের কাজ করে? অনানুষ্ঠানিক খাতে, দিনমজুরি, ভিক্ষা। আনুষ্ঠানিক খাতে প্রতিবন্ধী মানুষের উপস্থিতি প্রায় শূন্য। সরকারি চাকরিতে ১% কোটা আছে, কিন্তু বাস্তবে পূরণ হয় তার অর্ধেকেরও কম। বেসরকারি খাতে? কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, কোনো প্রণোদনা নেই, ফলে কেউ নিয়োগ দেয় না।

এই বৈষম্যের শিকড় আরো গভীরে, শিক্ষায়।

প্রতিবন্ধী শিশুদের স্কুলে ভর্তির হার সাধারণ শিশুদের তুলনায় অনেক কম। প্রাথমিক স্তরে প্রতিবন্ধী শিশুদের নেট ভর্তির হার আনুমানিক ৩৫-৪০%, যেখানে সাধারণ শিশুদের ৯৭%। মাধ্যমিকে পার্থক্য আরো বাড়ে: প্রতিবন্ধী শিশু ১৫-২০%, সাধারণ শিশু ৭২%। উচ্চশিক্ষায়? প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণ ৫%-এরও কম।

কেন এত কম? স্কুলে র‍্যাম্প নেই। ব্রেইল বই নেই। সাংকেতিক ভাষায় পড়াতে পারা শিক্ষক নেই। বিশেষ শিক্ষা সহায়ক নেই। সহপাঠীদের উত্যক্ত করা, শিক্ষকদের অসহযোগিতা, পরিবারের হতাশা, সব মিলিয়ে প্রতিবন্ধী শিশু ঝরে পড়ে। রহিমার গল্প ব্যতিক্রম না, নিয়ম।

শিক্ষা নেই, তাই দক্ষতা নেই। দক্ষতা নেই, তাই কাজ নেই। কাজ নেই, তাই আয় নেই। আয় নেই, তাই দারিদ্র্য। দারিদ্র্য, তাই চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা নেই, তাই প্রতিবন্ধিতা আরো গভীর হয়। এটাই সেই চক্র।


পর্ব ৩: আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই

২০১৩ সালে বাংলাদেশ "প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন" পাশ করে। কাগজে কলমে এটা একটা ভালো আইন। ১১ ধরনের প্রতিবন্ধিতা চিহ্নিত করেছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষায় সমান অধিকারের কথা বলেছে। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন গঠনের কথা বলেছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সনাক্তকরণ কার্ড ইস্যুর কথা বলেছে।

কিন্তু আইন পাশ হওয়ার ১৩ বছর পরেও বাস্তবায়নের চিত্র হতাশাজনক।

প্রতিবন্ধী সনাক্তকরণ কার্ড: ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ নিবন্ধিত হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত প্রতিবন্ধী জনসংখ্যা যদি ১ কোটির বেশি হয়, তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ এখনো নিবন্ধনের বাইরে। নিবন্ধন প্রক্রিয়া জটিল, উপজেলা পর্যায়ে যেতে হয়, কাগজপত্র লাগে, মেডিকেল সার্টিফিকেট লাগে। একজন প্রতিবন্ধী মানুষ যার চলাফেরাই কঠিন, তাকে উপজেলা কার্যালয়ে যেতে বলা একটা নিষ্ঠুর রসিকতা।

প্রতিবন্ধী ভাতা: বর্তমানে মাসে ৭৫০ টাকা। প্রায় ২৩ লাখ মানুষ পায়। মোট বার্ষিক ব্যয় প্রায় ২,০৭০ কোটি টাকা। এটা পুরো জাতীয় বাজেটের ০.৩% এরও কম।

৭৫০ টাকা। এই সংখ্যাটা একটু ভেবে দেখুন। ঢাকায় এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৭৫০ টাকার কাছাকাছি। মানে একজন প্রতিবন্ধী মানুষের সারা মাসের ভাতা দিয়ে এক কেজি মাংস কেনা যায়। বা পাঁচ কেজি চাল। বা তিন দিনের তিন বেলার খাবার, যদি খুব সাদামাটা খায়।

তুলনা করুন: ভারতে প্রতিবন্ধী পেনশন মাসে ৩০০-১,০০০ রুপি (রাজ্যভেদে ভিন্ন, কিন্তু ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি)। থাইল্যান্ডে ৮০০-১,০০০ বাট। ভিয়েতনামে ৩৬০,০০০-৭২০,০০০ ডং। উন্নত দেশের কথা বাদই দিলাম।

আর অবকাঠামো? প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

ঢাকার ফুটপাত দিয়ে হুইলচেয়ার চালানো অসম্ভব। ফুটপাত থাকলে সেখানে দোকান বসে আছে, হকার আছে, গাড়ি পার্ক করা আছে। যেখানে ফুটপাত আছে, সেখানে কার্ব কাট নেই। সরকারি ভবনে র‍্যাম্প আছে হাতে গোনা কয়েকটায়। লিফটে ব্রেইল নেই। বাসে হুইলচেয়ার তোলার ব্যবস্থা নেই। রেলে নেই। লঞ্চে নেই। হাসপাতালে নেই। ব্যাংকে নেই। স্কুলে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। মসজিদে নেই। শপিং মলে আছে কিছু, সেটাও শুধু লিফট, বাকি কিছু না।

ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি? সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর কতটা স্ক্রিন রিডার দিয়ে পড়া যায়? মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ কি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ব্যবহারযোগ্য? জাতীয় পরিচয়পত্রের অনলাইন সেবা? এনআইডি কার্ড তোলার সময় শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সাংকেতিক ভাষার দোভাষী থাকে?

উত্তর প্রায় সবক্ষেত্রে: না।


পর্ব ৪: বাজেট বলে সত্য কথা

একটা সরকার কোন বিষয়কে কতটা গুরুত্ব দেয়, সেটা বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো বাজেট দেখা। কথা আর প্রতিশ্রুতি সস্তা। বাজেট বরাদ্দ সত্য কথা বলে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিবন্ধী সংক্রান্ত কর্মসূচির বাজেট জাতীয় বাজেটের ০.৫% এরও কম। এর মধ্যে সিংহভাগ যায় ভাতা কর্মসূচিতে। প্রশিক্ষণ, পুনর্বাসন, সহায়ক যন্ত্রপাতি, অ্যাক্সেসিবিলিটি অবকাঠামো, এসবে বরাদ্দ নগণ্য।

তুলনা করুন: ভারত প্রতিবন্ধী খাতে জিডিপির প্রায় ০.০৪% ব্যয় করে (কম, কিন্তু বাংলাদেশের চেয়ে বেশি)। মালয়েশিয়া ০.১%। থাইল্যান্ড ০.০৮%। উন্নত দেশগুলোতে ১-৩%।

কিন্তু শুধু ভাতা দিলেই তো হবে না। প্রশ্ন হলো: এই মানুষগুলোকে অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ কোথায়?

আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে?

ডিসেবিলিটি ইনক্লুশন ইনডেক্সে বাংলাদেশের স্কোর দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়েও কম। ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, সবাই এগিয়ে। শুধু আফগানিস্তান আর কিছু সংঘাতপীড়িত দেশের সাথে তুলনায় বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে। এটা কোনো গৌরবের বিষয় না।

UNCRPD (UN Convention on the Rights of Persons with Disabilities) বাংলাদেশ ২০০৭ সালে অনুস্বাক্ষর করেছে। প্রায় দুই দশক হলো। বাস্তবায়ন কতদূর? জাতিসংঘের পর্যালোচনা কমিটি ২০২০ সালে বাংলাদেশকে বেশ কয়েকটি সুপারিশ দিয়েছিল: প্রতিবন্ধিতার সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানে আনা, অ্যাক্সেসিবিলিটি মানদণ্ড বাধ্যতামূলক করা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো, শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। কতটা হয়েছে? প্রায় কিছুই না।


পর্ব ৫: কী করা যেত, কী করা যায়

কল্পনা করুন ২০৩০ সাল। বাংলাদেশ তিনটা পদক্ষেপ নিয়েছে। তিনটাই বাস্তবসম্মত, অন্য উন্নয়নশীল দেশে পরীক্ষিত।

পদক্ষেপ ১: সঠিক গণনা, Washington Group পদ্ধতি

আদমশুমারি আর জরিপে Washington Group প্রশ্নমালা ব্যবহার শুরু হয়েছে। এখন সরকার জানে দেশে ১.২ কোটি মানুষ প্রতিবন্ধিতার মুখোমুখি। ২৪ লাখ না, ১.২ কোটি। এই সংখ্যা জানার পর নীতি বদলেছে, বাজেট বদলেছে, লক্ষ্যমাত্রা বদলেছে।

রুয়ান্ডা এটা করেছে। ২০১৫ সালে তাদের আদমশুমারিতে প্রতিবন্ধী মানুষের হার ছিল ৫%। ২০১৮ সালে Washington Group পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখলো ১৫%। এই তথ্য তাদের পুরো নীতি কাঠামো বদলে দিয়েছে।

পদক্ষেপ ২: প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো বাধ্যতামূলক

নতুন সরকারি ভবন, স্কুল, হাসপাতাল, সড়ক, সবকিছুতে অ্যাক্সেসিবিলিটি কোড বাধ্যতামূলক হয়েছে। নির্মাণ অনুমতি পেতে হলে র‍্যাম্প, লিফট, ব্রেইল সাইনেজ, অডিও সিগন্যাল থাকতে হবে। পুরনো ভবনে পর্যায়ক্রমে সংস্কার হচ্ছে।

কলম্বিয়া এটা করেছে। বোগোটার TransMilenio বাস ব্যবস্থা প্রতিবন্ধীবান্ধব ডিজাইন করা হয়েছে শুরু থেকে। ভারতের দিল্লি মেট্রো প্রতিটি স্টেশনে লিফট, ট্যাক্টাইল পেভিং, অডিও ঘোষণা রেখেছে।

পদক্ষেপ ৩: ভাতা বাড়ানো আর কর্মসংস্থান কোটা কার্যকর করা

প্রতিবন্ধী ভাতা ৭৫০ থেকে বেড়ে ৩,০০০ টাকা হয়েছে। এখনো যথেষ্ট না, কিন্তু আগের চার গুণ। সরকারি চাকরিতে ৫% কোটা চালু হয়েছে আর সত্যি সত্যি পূরণ হচ্ছে। ১০০ জনের বেশি কর্মী আছে এমন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ২% প্রতিবন্ধী নিয়োগ বাধ্যতামূলক, না হলে জরিমানা।

কেনিয়া এটা করেছে। ২০০৩ সালের Persons with Disabilities Act এ ৫% কোটা রেখেছে। পূরণ না হলে সরকারি ঠিকাদারি পাওয়া যায় না। ফলে বেসরকারি খাতেও প্রতিবন্ধী নিয়োগ বেড়েছে।

এই তিনটা পদক্ষেপে কত খরচ? ভাতা ৩,০০০ টাকায় বাড়ালে আর আরো ৫০ লাখ মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করলে বার্ষিক অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১৫,০০০-১৮,০০০ কোটি টাকা। এটা কি সম্ভব? পদ্মা সেতুর খরচ ছিল ৩০,০০০ কোটি। মেট্রোরেলে খরচ হয়েছে ৩৩,০০০ কোটি। একটা মেগা প্রকল্পের অর্ধেক খরচে ১ কোটি মানুষের জীবন বদলানো যায়।

কিন্তু এই ১ কোটি মানুষের কোনো ভোটব্যাংক নেই, কোনো লবি গ্রুপ নেই, কোনো টিভি চ্যানেল তাদের নিয়ে প্রাইমটাইম আলোচনা করে না। তারা অদৃশ্য। আর অদৃশ্য মানুষদের জন্য সরকার টাকা খরচ করে না।


শেষ কথা

রহিমা আজও ঘরে বসে আছে। ক্লাস থ্রির পর আর স্কুলে যায়নি। হুইলচেয়ার পায়নি। সরকারি ভাতা মাসে ৭৫০ টাকা। তার বাবা রিকশা চালায়, কিন্তু পিঠে ব্যথা, কতদিন আর পারবে? মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে, কিন্তু বয়স বাড়ছে।

রহিমা কম্পিউটার চালাতে পারতো। ডাটা এন্ট্রি করতে পারতো। সেলাই শিখতে পারতো। অনলাইনে পড়ালেখা করতে পারতো। তার হাত ভালো আছে, মাথা ভালো আছে, শুধু পা চলে না। কিন্তু এই "শুধু পা চলে না" তাকে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করেছে।

বাংলাদেশে ১ কোটি রহিমা আছে। কেউ দেখা যায়, কেউ দেখা যায় না। কেউ রাস্তায় ভিক্ষা করে, কেউ ঘরে বন্দি। কেউ চিকিৎসা পায়নি বলে প্রতিবন্ধিতা বেড়েছে, কেউ দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি।

তাদের প্রত্যেকে একজন মানুষ। তাদের প্রত্যেকের স্বপ্ন আছে, সম্ভাবনা আছে, কিছু করার ইচ্ছা আছে। একটা র‍্যাম্প, একটা হুইলচেয়ার, একটা শ্রবণযন্ত্র, একটা ব্রেইল বই, এতটুকুই যথেষ্ট অনেকের জন্য।

কিন্তু রাষ্ট্র ততটুকুও দিচ্ছে না। কারণ তারা অদৃশ্য। আর অদৃশ্য মানুষদের কান্না কেউ শোনে না।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50