Back to publications
Narrative 2026-03-06

তালাকের হিসাব: কে ছাড়ছে কাকে?

ক্রমবর্ধমান বিবাহবিচ্ছেদ, কারণ, আর সামাজিক পরিবর্তন

তালাকের হিসাব: কে ছাড়ছে কাকে?

পর্ব ১: একটা ফোন কল

রাত সাড়ে এগারোটা। ঢাকার মিরপুরে তিন রুমের একটা ফ্ল্যাটে রিমা বসে আছে। বয়স ২৮। একটা গার্মেন্টস কোম্পানিতে কোয়ালিটি কন্ট্রোলে কাজ করে। মাসে বেতন ২২,০০০ টাকা। হাতে একটা ফোন, স্ক্রিনে একজন আইনজীবীর নম্বর।

রিমার বিয়ে হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। স্বামী ফারুক একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। বিয়ের প্রথম দুই বছর ঠিকই ছিল। তারপর ফারুক দ্বিতীয় বিয়ের কথা তুললো। রিমা রাজি হলো না। শুরু হলো মানসিক নির্যাতন। টাকা দেওয়া বন্ধ। খাওয়ার সময় অপমান। "তোর বাপের বাড়ি যা।"

এর মানে, সমস্যাগুলো শুরু থেকেই আছে, কিন্তু নারীরা কিছুদিন সহ্য করার পরে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
২২,০০০ টাকা
একটা ফোন কল
৬০-৮০%
কারণের মানচিত্র
প্রায় ৩৫%
খুলার উত্থান

রিমা যায়নি। সে চাকরি করে, নিজের পায়ে দাঁড়ানো। তিন মাস আগে সে খোলা তালাক (খুলা) এর আবেদন করেছে পারিবারিক আদালতে। আজ সন্ধ্যায় আইনজীবী জানিয়েছেন, ফারুক আপত্তি করেছে। মামলা আরো ছয় মাস লাগবে।

রিমা একটা পরিসংখ্যান না। কিন্তু রিমার মতো হাজার হাজার নারী এখন বাংলাদেশে একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যেটা দশ বছর আগেও প্রায় অসম্ভব ছিল: নিজে থেকে বিবাহবিচ্ছেদ চাওয়া।

এবার সংখ্যাগুলো দেখুন।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নিবন্ধিত তালাকের সংখ্যা ৩০% এর বেশি বেড়েছে। ২০১৫ সালে ঢাকায় নিবন্ধিত তালাক ছিল প্রায় ১৪,০০০। ২০২৪ সালে সেটা ১৯,৫০০ ছাড়িয়ে গেছে। আর এটা শুধু ঢাকার হিসাব। সারাদেশে ছবিটা আরো বড়।

কিন্তু শুধু ঢাকা না। অন্য শহরগুলোতেও একই প্রবণতা।

চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, সব বড় শহরে তালাকের সংখ্যা বাড়ছে। তবে ঢাকার গতি সবচেয়ে বেশি। কারণ? ঢাকায় নারীর কর্মসংস্থান সবচেয়ে বেশি, শিক্ষার হার সবচেয়ে বেশি, আর সামাজিক চাপ তুলনামূলকভাবে কম।

প্রশ্ন হলো: কে ছাড়ছে কাকে?


পর্ব ২: খুলার উত্থান

বাংলাদেশে তালাকের তিনটা পথ আছে। প্রথমত, স্বামী কর্তৃক তালাক, যেটা ঐতিহ্যগতভাবে সবচেয়ে সাধারণ ছিল। দ্বিতীয়ত, পারস্পরিক সম্মতিতে তালাক। তৃতীয়ত, খুলা, যেখানে স্ত্রী নিজে থেকে বিবাহবিচ্ছেদ চান।

খুলার পরিসংখ্যান গত দশ বছরে নাটকীয়ভাবে বদলেছে।

২০১৫ সালে মোট তালাকের মধ্যে নারী-উদ্যোগী তালাক (খুলা) ছিল প্রায় ৩৫%। ২০২৪ সালে সেটা বেড়ে ৬২% হয়েছে। অর্থাৎ এখন বেশিরভাগ তালাকই নারীরা চাইছেন।

এটা একটা বিশাল পরিবর্তন। দশ বছর আগে বাংলাদেশে একজন নারী তালাক চাইলে পরিবার বলতো, "মেনে নে, সংসার টিকিয়ে রাখ।" সমাজ বলতো, "তালাকপ্রাপ্তা মেয়ে মানে শেষ।" এখন সেই হিসাব বদলাচ্ছে।

কেন বদলাচ্ছে? তিনটা কারণ। প্রথমত, নারী শিক্ষার বিস্তার। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করা নারীর সংখ্যা গত বিশ বছরে তিন গুণ বেড়েছে। শিক্ষিত নারী তার অধিকার জানে। দ্বিতীয়ত, নারীর কর্মসংস্থান। গার্মেন্টস খাতে ৪০ লাখ নারী কাজ করে। যখন একজন নারীর নিজের আয় আছে, সে অসুখী বিয়েতে আটকে থাকতে বাধ্য না। তৃতীয়ত, মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেট। আইনি সহায়তার তথ্য এখন হাতের মুঠোয়।

কিন্তু তালাকের কারণগুলো কী? শুধু "অসুখী বিয়ে" বললে পুরো ছবি দেখা যায় না।


পর্ব ৩: কারণের মানচিত্র

পারিবারিক আদালতের মামলার তথ্য ও বিভিন্ন জরিপ থেকে তালাকের প্রধান কারণগুলো বের করা যায়।

যৌতুকসংক্রান্ত নির্যাতন এখনো সবচেয়ে বড় কারণ, মোট তালাকের প্রায় ২৭%। এরপর পারিবারিক সহিংসতা (২২%), বহুবিবাহ বা পরকীয়া (১৮%), অর্থনৈতিক অবহেলা (১৫%), মানসিক নিপীড়ন (১১%), আর অন্যান্য কারণ (৭%)।

যৌতুকের সংযোগটা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ১৯৮০ সালে যৌতুক নিরোধ আইন হয়েছে। ৪৫ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে ৬০-৮০% বিবাহে কোনো না কোনো যৌতুক লেনদেন হয়। আর যৌতুক-সম্পর্কিত নির্যাতন তালাকের এক নম্বর কারণ।

প্যাটার্নটা এরকম: বিয়ের সময় যৌতুক দেওয়া হয়। তারপর স্বামী বা শ্বশুরবাড়ি আরো চায়। স্ত্রীর বাবা দিতে পারে না। শুরু হয় নির্যাতন। শেষ পর্যন্ত তালাক।

এখন আরেকটা প্রশ্ন: বিয়ের কত বছর পরে তালাক হচ্ছে?

বেশিরভাগ তালাক হচ্ছে বিয়ের প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে। মোট তালাকের প্রায় ৪৫% ঘটে বিয়ের ১-৫ বছরের মধ্যে। এর মানে, সমস্যাগুলো শুরু থেকেই আছে, কিন্তু নারীরা কিছুদিন সহ্য করার পরে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আবার ১৫ বছরের পরেও তালাকের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আছে (১২%), যেখানে সন্তানেরা বড় হওয়ার পরে নারীরা পদক্ষেপ নিচ্ছেন।

শহর আর গ্রামের পার্থক্যটাও স্পষ্ট।

শহরে তালাকের হার গ্রামের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। ঢাকায় প্রতি ১,০০০ বিবাহে তালাকের সংখ্যা প্রায় ২৮। গ্রামে সেটা ৯ এর কাছাকাছি। কিন্তু এর মানে এই না যে গ্রামে বিয়ে বেশি সুখের। গ্রামে সামাজিক চাপ অনেক বেশি। একজন গ্রামের নারীর পক্ষে তালাক নিয়ে পরিবারের বিরুদ্ধে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। আইনজীবী নেই, আদালত দূরে, পরিবারের সমর্থন নেই। শহরে এই বাধাগুলো কম, তাই পরিসংখ্যানে তালাক বেশি দেখায়।


পর্ব ৪: সন্তান, ভরণপোষণ, আর আইনের ফাঁক

তালাকের পরে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন: সন্তান কার কাছে থাকবে?

বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, ছেলে সন্তানের হেফাজত ৭ বছর পর্যন্ত মায়ের কাছে, তারপর বাবার কাছে যায়। মেয়ে সন্তানের হেফাজত বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মায়ের কাছে। বাস্তবে, প্রায় ৬৮% ক্ষেত্রে তালাকের পরে সন্তান মায়ের কাছে থাকে। কিন্তু বাবার পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা পায় মাত্র ৩৫% সন্তান। বাকি ৬৫% ক্ষেত্রে বাবা ভরণপোষণ দেন না, এবং আদালতের আদেশ থাকলেও তা কার্যকর হয় না।

এবার ভরণপোষণ প্রয়োগের চিত্রটা দেখুন:

এই চার্টটা ভয়ংকর। আদালত ভরণপোষণের আদেশ দিলেও মাত্র ২৮% ক্ষেত্রে সেটা নিয়মিত কার্যকর হয়। ৩৫% ক্ষেত্রে কিছুদিন দিয়ে বন্ধ করে দেন। আর ৩৭% ক্ষেত্রে একবারও দেন না। আদালতের আদেশ কাগজে থাকে, বাস্তবে প্রয়োগ হয় না।

কেন? তিনটা কারণ। প্রথমত, পারিবারিক আদালতে মামলার সংখ্যা বিশাল, বিচারক কম। ঢাকার একটা পারিবারিক আদালতে একজন বিচারকের কাছে ৫,০০০ এর বেশি মামলা ঝুলে আছে। দ্বিতীয়ত, প্রয়োগ ব্যবস্থা দুর্বল। স্বামী ভরণপোষণ না দিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আরেকটা মামলা করতে হয়। তৃতীয়ত, অনেক পুরুষ সম্পদ লুকিয়ে রাখেন বা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, ফলে আয় প্রমাণ করা কঠিন।

রিমার মতো নারীরা তালাক পান, কিন্তু অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার পান না।


পর্ব ৫: বয়সের হিসাব, সমাজের বদল

কোন বয়সে তালাক হচ্ছে সবচেয়ে বেশি?

২৫-৩৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে তালাকের হার সবচেয়ে বেশি, মোট তালাকের প্রায় ৪২%। এরপর ১৮-২৪ বছর (২৮%)। ৩৫-৪৪ বছরে ১৯%। ৪৫ এর উপরে ১১%।

এই বয়স বণ্টনটা গুরুত্বপূর্ণ। ২৫-৩৪ বছর মানে একজন নারী যখন কিছুটা স্থিতিশীল, চাকরি আছে বা চাকরি করার সক্ষমতা আছে, সন্তান হয়তো একটু বড় হয়েছে। এই বয়সেই নারীরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন যে অসুখী সংসারে আর থাকবেন না।

আর ১৮-২৪ বছরে ২৮% তালাক মানে অনেক বিয়ে একেবারে শুরুতেই ভেঙে যাচ্ছে। এর সাথে বাল্যবিবাহের সরাসরি সম্পর্ক আছে। যেসব মেয়ের ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়, তাদের তালাকের সম্ভাবনা পরে বিয়ে হওয়া নারীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাচ্ছে। ২০১০ সালের একটা জরিপে ৭৫% মানুষ বলেছিলেন তালাক "সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য।" ২০২৩ সালে সেটা কমে ৪৮% হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে তালাক আর "লজ্জার বিষয়" না, বরং "প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।"

ঢাকার বনানীতে একজন তালাকপ্রাপ্তা নারী নিজের ফ্ল্যাটে একা থাকেন, অফিসে যান, কেউ কিছু বলে না। কিন্তু সাতক্ষীরার একটা গ্রামে? তালাকপ্রাপ্তা নারী মানে "দোষী।" সমাজ ধরে নেয় ভুল তার। দুই বাংলাদেশের গল্প।


পর্ব ৬: প্রতিবেশীদের আয়না

বাংলাদেশে তালাকের হার কি সত্যিই বেশি? প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তুলনা করলে কী দেখা যায়?

বাংলাদেশে অপরিশোধিত তালাকের হার (crude divorce rate) প্রতি ১,০০০ জনসংখ্যায় প্রায় ১.৪। ভারতে এটা মাত্র ০.৩, পাকিস্তানে ০.৫। মালয়েশিয়ায় ১.৭, ইন্দোনেশিয়ায় ১.৮। বিশ্বের গড় প্রায় ১.৮।

এটা দেখে দুটো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। প্রথমত, বাংলাদেশের তালাকের হার ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু বিশ্বের গড়ের তুলনায় এখনো কম। দ্বিতীয়ত, ভারত ও পাকিস্তানে তালাকের হার কম মানে সেখানে বিয়ে বেশি সুখের, এমন না। সেখানে নারীর বেরিয়ে আসার পথ আরো সংকীর্ণ।

ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণটা তাৎপর্যপূর্ণ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, কিন্তু তালাকের হার বিশ্ব গড়ের কাছাকাছি। কারণ সেখানে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বেশি, পারিবারিক আদালত তুলনামূলকভাবে সক্রিয়, আর সামাজিক কলঙ্ক কম।


তাহলে বাংলাদেশে কী হচ্ছে? তালাক বাড়ছে মানে কি সমাজ ভেঙে পড়ছে?

না। তালাক বাড়ছে মানে নারীরা একটা অসুখী, অন্যায্য সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সাহস পাচ্ছেন। এটা সামাজিক পরিবর্তনের চিহ্ন, পতনের না।

কিন্তু তালাকের পরে কী হচ্ছে, সেটাই আসল সমস্যা। সন্তানের ভরণপোষণ পাওয়া যাচ্ছে না। পারিবারিক আদালতে মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে। তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা নেই বললেই চলে।

রিমা তার ফোনটা রেখে দিলো। আইনজীবীকে কাল আবার ফোন করবে। সে জানে মামলা লম্বা হবে। সে জানে ফারুক ভরণপোষণ দেবে কিনা সন্দেহ। কিন্তু সে এটাও জানে: সে আর ফিরে যাবে না।

বাংলাদেশের লাখ লাখ রিমা এখন এই সিদ্ধান্তটা নিচ্ছে। প্রশ্ন হলো: রাষ্ট্র কি তাদের পাশে দাঁড়াবে? পারিবারিক আদালতে বিচারক বাড়বে? ভরণপোষণ আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা হবে? তালাকপ্রাপ্তা নারী ও তাদের সন্তানদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা জাল তৈরি হবে?

নাকি আমরা শুধু পরিসংখ্যান গুনবো, "তালাক বাড়ছে" বলে দুশ্চিন্তা করবো, আর রিমাদের একা ছেড়ে দেবো?

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50