ইয়াবা থেকে ফেনসিডিল: মাদকের অর্থনীতি
পর্ব ১: ট্যাবলেটটা কোথা থেকে আসে
টেকনাফের একটা চায়ের দোকানে বসে আছেন ধরুন। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমার। এপারে বাংলাদেশ। দুই দেশের মাঝে পানির দূরত্ব কিছু জায়গায় মাত্র ২০০ মিটার। একটু ভালো সাঁতার জানলেই পার হওয়া যায়।
এই ২০০ মিটার পানির নিচে দিয়ে, ওপরে দিয়ে, নৌকায় করে, প্রতিদিন রাতে লাখ লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট বাংলাদেশে ঢুকছে। প্রতিটা ট্যাবলেটের ওজন ৯০ মিলিগ্রামের কম। রং কখনো গোলাপি, কখনো সবুজ, কখনো কমলা। ভেতরে মেথামফেটামিন আর ক্যাফেইন। মিয়ানমারের শান রাজ্যে তৈরি, সেখানকার সশস্ত্র গোষ্ঠীদের কারখানায়। উৎপাদন খরচ প্রতিটা ট্যাবলেটে ৫ থেকে ১০ টাকা। বাংলাদেশে খুচরা দাম? ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা। লাভ ১৫০০ থেকে ৩০০০ শতাংশ।
এই চার্টটা দেখুন:
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (DNC) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ইয়াবা জব্দ হয়েছিল প্রায় ৩.৫ কোটি পিস। ২০২৫ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি পিস। তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি। কিন্তু এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে: জব্দ হওয়া মানে কী?
মাদক বিশেষজ্ঞরা বলেন, জব্দ হয় মোট চালানের ১০ থেকে ২০ শতাংশ। বাকি ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ঢুকে যায়। মানে ২০২৫ সালে যদি ১২ কোটি পিস জব্দ হয়ে থাকে, তাহলে আসলে ঢুকেছে ৬০ থেকে ১২০ কোটি পিস। এই সংখ্যাটা ভাবুন। ১২০ কোটি ইয়াবা ট্যাবলেট। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটি। মানে প্রতি মানুষের জন্য গড়ে ৬ থেকে ৭টা ট্যাবলেট। শিশু, বৃদ্ধ, সবাই মিলিয়ে।
শুধু ইয়াবা না। বাংলাদেশে মাদকের ধরন অনেক। এই চার্টটা দেখুন:
ইয়াবা সবচেয়ে বড় সমস্যা, মোট মাদক জব্দের প্রায় ৪৫%। তারপর ফেনসিডিল (কোডিন সিরাপ), এটা আসে ভারত সীমান্ত দিয়ে। গাঁজা দেশেই উৎপাদিত হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম আর রাজশাহী অঞ্চলে। হেরোইন এখন কমে এসেছে, কিন্তু ইনজেকশনে মাদক সেবন (আইভি ড্রাগ ইউজ) এখনো ঢাকার বস্তিগুলোতে আছে। আর নতুন করে যোগ হয়েছে আইস (ক্রিস্টাল মেথ), যেটা ইয়াবার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং বেশি ক্ষতিকর।
কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যটা অন্য জায়গায়। কতজন মানুষ আসলে মাদক সেবন করছে?
সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে মাদক সেবনকারীর সংখ্যা ৭০ থেকে ৭৫ লাখ। কিছু বেসরকারি সমীক্ষায় এই সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যায়। ২০১০ সালে এই সংখ্যা ছিল ২০ থেকে ২৫ লাখ। ১৫ বছরে তিন গুণ বেড়েছে। আর সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো, ব্যবহারকারীদের গড় বয়স ক্রমশ কমছে। এখন ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
পর্ব ২: সীমান্তের ভূগোল
ইয়াবা আর ফেনসিডিল, দুটো ভিন্ন মাদক, দুটো ভিন্ন সীমান্ত দিয়ে আসে। এই চার্টটা দেখুন:
পূর্ব সীমান্ত, বিশেষত কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া, এটা ইয়াবার প্রধান রুট। মিয়ানমার থেকে নাফ নদী পার হয়ে কক্সবাজারে আসে, সেখান থেকে চট্টগ্রাম, তারপর সারা দেশে ছড়ায়। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলো দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটা ট্রানজিট পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাখ লাখ হতাশ, কর্মহীন মানুষ, তাদের কাউকে কাউকে চোরাকারবারীরা ব্যবহার করছে বাহক হিসেবে।
পশ্চিম ও উত্তর সীমান্ত, ভারতের সাথে। এখান দিয়ে আসে ফেনসিডিল। ভারতে ফেনসিডিল নিষিদ্ধ, কিন্তু সেখানে অবৈধ কারখানায় তৈরি হয়, শুধু বাংলাদেশে পাচারের জন্য। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বেনাপোল, হিলি, এই করিডোরগুলো দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার বোতল ঢোকে। একটা ফেনসিডিলের বোতলের দাম ভারতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা। বাংলাদেশে বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়।
দক্ষিণ সীমান্ত, সমুদ্রপথ। এটা তুলনামূলক নতুন রুট। মাছ ধরার ট্রলার ব্যবহার করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পটুয়াখালীর সমুদ্র উপকূলে ইয়াবা আনা হচ্ছে। এই রুটে জব্দের হার সবচেয়ে কম, কারণ সমুদ্রে নজরদারি প্রায় নেই।
মিয়ানমারের দিক থেকে বিষয়টা বুঝতে হলে সেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝতে হবে। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমার কার্যত একটা ব্যর্থ রাষ্ট্র। শান রাজ্যে United Wa State Army (UWSA) সহ একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী মেথামফেটামিন উৎপাদনকে তাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি বানিয়ে ফেলেছে। UNODC এর হিসাবে, মিয়ানমার এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মেথামফেটামিন উৎপাদক। এবং তাদের সবচেয়ে কাছের, সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে সহজ বাজার হলো বাংলাদেশ।
পর্ব ৩: টাকার হিসাব
মাদক শুধু একটা স্বাস্থ্য সমস্যা না। এটা একটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। একটা বিশাল, অবৈধ, কিন্তু অত্যন্ত সংগঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।
এই চার্টটা দেখুন:
বাংলাদেশের মাদক বাজারের আনুমানিক আকার ৫০,০০০ কোটি টাকার বেশি। কিছু অনুমানে এটা ৭০,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত। তুলনায়, বাংলাদেশের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শিক্ষা বাজেট ৯৫,০০০ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য বাজেট ৪২,০০০ কোটি টাকা। মানে মাদকের বাজার স্বাস্থ্য বাজেটের চেয়ে বড়।
এই টাকা কোথায় যাচ্ছে? স্থানীয় মাদক কারবারী, তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক, দুর্নীতিগ্রস্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সীমান্ত রক্ষীদের একাংশ, মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী, ভারতের অবৈধ ফেনসিডিল কারখানার মালিক। এই অর্থনীতি একটা সমান্তরাল ব্যবস্থা তৈরি করেছে। টেকনাফ, উখিয়া, কক্সবাজারে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত লোকদের বাড়ি, গাড়ি, জমি দেখলে বোঝা যায়, এই ব্যবসা কতটা লাভজনক।
কিন্তু এই লাভের বিপরীতে ক্ষতিটা কোথায় পড়ছে?
বাংলাদেশে মাদকসংক্রান্ত মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। সরকারি হিসাবে প্রতি বছর মাদকসংক্রান্ত প্রত্যক্ষ মৃত্যু ৫০০ থেকে ৮০০। কিন্তু এই সংখ্যায় অনেক কিছু অন্তর্ভুক্ত হয় না: "বন্দুকযুদ্ধে" নিহতদের কথা, মাদকের কারণে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় মৃত্যু, আইভি ড্রাগ ব্যবহারে এইচআইভি সংক্রমণ, পারিবারিক সহিংসতায় মৃত্যু যেখানে মাদক জড়িত ছিল। ২০১৮ সালে সরকারের "মাদকবিরোধী অভিযান"-এ তিন মাসে ২০০ এর বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছিল বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে। এদের বেশিরভাগ ক্ষুদ্র মাদক বিক্রেতা বা ব্যবহারকারী, বড় কারবারী না।
প্রকৃত মাদকসংক্রান্ত মৃত্যু (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ) বছরে ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ এর কাছাকাছি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন।
পর্ব ৪: চিকিৎসা যেখানে নেই
বাংলাদেশে ৭০ থেকে ৭৫ লাখ মাদক সেবনকারী। তাদের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটুকু আছে?
সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র আছে মাত্র ১০টি। তার মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বড়, কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, যার ক্ষমতা ২০০ শয্যা। বেসরকারি কেন্দ্র আছে প্রায় ৮০ থেকে ৯০টি, কিন্তু এদের মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন আছে। অনেক কেন্দ্রে রোগীদের শারীরিক নির্যাতন, জোরপূর্বক আটকে রাখা, অপর্যাপ্ত চিকিৎসা, এগুলো নিয়মিত অভিযোগ। মোট সব কেন্দ্র মিলিয়ে ক্ষমতা ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ জন। ৭৫ লাখ ব্যবহারকারীর বিপরীতে ১০,০০০ শয্যা। মানে প্রতি ৭৫০ জনের জন্য ১টি শয্যা।
WHO বলে, মাদকাসক্তি একটি রোগ, শাস্তিযোগ্য অপরাধ না। আধুনিক মাদকনীতিতে চিকিৎসা, ক্ষতি হ্রাস (harm reduction), পুনর্বাসন, এগুলো মূল কৌশল। বাংলাদেশে? মূল কৌশল হলো গ্রেফতার আর "বন্দুকযুদ্ধ"।
পুনর্বাসনের হার কেমন? এই চার্টটা দেখুন:
যারা চিকিৎসা পাচ্ছে, তাদের মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদে মাদকমুক্ত থাকতে পারছে। বাকিরা আবার ফিরে যাচ্ছে। কারণ? চিকিৎসার পরে ফলোআপ নেই। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেই। চাকরি নেই। সামাজিক কলঙ্ক আছে। একজন মাদকাসক্ত যদি সুস্থ হয়ে ফিরে আসে, তার পরিবার তাকে গ্রহণ করে না, সমাজ করে না, চাকরিদাতা করে না। সে আবার সেই পুরনো চক্রে ফিরে যায়। থাইল্যান্ডে এই দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার হার ৪০ শতাংশের বেশি, কারণ সেখানে চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন কর্মসূচি আছে।
পর্ব ৫: টাকার যুদ্ধ
সরকার এই সমস্যা মোকাবেলায় কত খরচ করছে? আর সেই খরচটা কতটা কার্যকর?
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বার্ষিক বাজেট প্রায় ২০০ কোটি টাকা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযান, সীমান্ত নজরদারি, গোয়েন্দা কার্যক্রম, সব মিলিয়ে বছরে মোট খরচ প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৫০০ কোটি টাকা। এই খরচ কি বাড়ছে? হ্যাঁ। ফল পাচ্ছি? জব্দের পরিমাণ বাড়ছে, কিন্তু সরবরাহও বাড়ছে। মানে আমরা দৌড়াচ্ছি, কিন্তু সমস্যা আমাদের চেয়ে দ্রুত দৌড়াচ্ছে।
তুলনায়, মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সরকারি বরাদ্দ বছরে ১০০ কোটি টাকারও কম। মানে আমরা নিয়ন্ত্রণে যা খরচ করি, চিকিৎসায় তার দশ ভাগের এক ভাগও করি না। এটা হলো সেই পদ্ধতি যেখানে বালতি দিয়ে পানি সেচা হচ্ছে, কিন্তু ছিদ্রটা বন্ধ করা হচ্ছে না।
পর্ব ৬: অন্যরা কী করলো, আমরা কী করতে পারি
পর্তুগালের কথা ধরুন। ২০০১ সালে পর্তুগাল ইউরোপের সবচেয়ে খারাপ মাদক সমস্যার দেশ ছিল। হেরোইন মহামারি, এইচআইভি সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, জেলখানা ভরে গেছে মাদক সেবনকারীতে। তারা একটা সাহসী সিদ্ধান্ত নিলো: মাদক সেবন অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দিলো (decriminalization)। পাচার আর ব্যবসা অপরাধ রইলো, কিন্তু ব্যক্তিগত ব্যবহার শাস্তিযোগ্য অপরাধ থেকে স্বাস্থ্য সমস্যায় রূপান্তরিত হলো। গ্রেফতারের বদলে চিকিৎসা। জেলের বদলে পুনর্বাসন কেন্দ্র।
ফলাফল? ২০ বছরে পর্তুগালে মাদকসংক্রান্ত মৃত্যু ৮০% কমেছে। এইচআইভি সংক্রমণ ৯৫% কমেছে। মাদক ব্যবহারের হার ইউরোপীয় গড়ের নিচে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশে বিশ্বের তুলনায় অবস্থান কেমন? এই চার্টটা দেখুন:
জনসংখ্যার অনুপাতে মাদক সেবনকারীর হারে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে। আর চিকিৎসা সুবিধার অনুপাতে একেবারে তলানিতে। এটা একটা বিপজ্জনক সমীকরণ।
বাংলাদেশের জন্য কী করা সম্ভব?
প্রথমত, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের আধুনিকায়ন। টেকনাফ-উখিয়া করিডোরে থার্মাল ক্যামেরা, ড্রোন নজরদারি, রাডার সিস্টেম বসানো দরকার। ২৭১ কিলোমিটার মিয়ানমার সীমান্তের পুরোটা পাহারা দেওয়া অসম্ভব, কিন্তু প্রযুক্তি দিয়ে মূল চোরাকারবারি রুটগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব। ভারতের সাথে সমন্বিত অভিযান দরকার ফেনসিডিল কারখানা বন্ধ করতে।
দ্বিতীয়ত, চিকিৎসা সক্ষমতা দশ গুণ বাড়ানো। প্রতিটা জেলায় অন্তত একটা সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর, মেথাডোন প্রোগ্রাম (ওপিওয়েড নির্ভরশীলদের জন্য), needle exchange program (এইচআইভি প্রতিরোধে)। খরচ? প্রতি জেলায় বছরে ৫ কোটি টাকা, ৬৪ জেলায় ৩২০ কোটি টাকা। বর্তমান মাদক নিয়ন্ত্রণ বাজেটের এক-চতুর্থাংশ।
তৃতীয়ত, "মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ" থেকে "মাদকের ক্ষতি হ্রাস"-এ দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো। পর্তুগাল মডেল হুবহু কপি করার দরকার নেই। কিন্তু এটুকু বোঝা দরকার: গ্রেফতার করে করে মাদক সমস্যার সমাধান কোনো দেশেই হয়নি। আমেরিকা ৫০ বছর ধরে "War on Drugs" চালাচ্ছে, ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে, সমস্যা বেড়েছে। ফিলিপাইনে দুতের্তে হাজার হাজার মানুষ মেরেছেন, মাদক কমেনি। শাস্তি দিয়ে চাহিদা কমে না। চাহিদা কমাতে হলে দরকার শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, আর সামাজিক সুরক্ষা।
চতুর্থত, অর্থ পাচারের সন্ধান। ৫০,০০০ কোটি টাকার বাজারের টাকা কোথায় যাচ্ছে? জমি কেনায়, ফ্ল্যাট কেনায়, গাড়ি কেনায়, ব্যবসায় বিনিয়োগে, বিদেশে পাচারে। এই অর্থপ্রবাহ ট্র্যাক করা গেলে বড় কারবারীদের ধরা সম্ভব। কিন্তু সেজন্য Bangladesh Financial Intelligence Unit (BFIU) কে আরো শক্তিশালী করতে হবে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত করতে হবে।
আসুন শেষ করি যেখান থেকে শুরু করেছিলাম।
টেকনাফের সেই চায়ের দোকান। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। নাফ নদীর ওপার থেকে অন্ধকার নেমে আসছে। আজ রাতেও নৌকা আসবে। আজ রাতেও লাখ লাখ ট্যাবলেট এপারে চলে আসবে। আজ রাতেও কোথাও একটা ১৬ বছরের ছেলে প্রথমবার ইয়াবা খাবে, "শুধু একবার চেষ্টা করে দেখি।" আজ রাতেও কোনো মা ঘুম থেকে উঠে দেখবে তার ছেলে নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে আছে।
আমরা এই সমস্যাটাকে নৈতিকতার চোখে দেখি: "মাদকসেবী খারাপ মানুষ।" কিন্তু একজন ১৬ বছরের ছেলে কেন ইয়াবা খায়? কারণ তার জীবনে কোনো আশা নেই। পড়াশোনা করে চাকরি পাবে না। খেলার মাঠ নেই। বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। বন্ধুরা খাচ্ছে, সেও খাচ্ছে। আর একবার শুরু হলে মেথামফেটামিনের রসায়ন তাকে ছাড়ে না।
৫০,০০০ কোটি টাকার মাদক বাজার চলছে এই দেশে। সেই টাকায় ৬৪ জেলায় ৬৪টা আধুনিক হাসপাতাল তৈরি করা যেত। ১০ লাখ তরুণকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া যেত। হাজার হাজার খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, কমিউনিটি সেন্টার বানানো যেত।
পরিবর্তে সেই টাকা যাচ্ছে চোরাকারবারীর পকেটে, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে, মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র কেনায়। আর মূল্য দিচ্ছে লাখ লাখ তরুণ, তাদের পরিবার, তাদের ভবিষ্যৎ।
মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শব্দটা শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু যুদ্ধ করতে হবে মাদকের বিরুদ্ধে না, মাদকের কারণগুলোর বিরুদ্ধে: দারিদ্র্য, বেকারত্ব, হতাশা, চিকিৎসার অভাব, আর সীমাহীন দুর্নীতি। নাফ নদীর ২০০ মিটার পানি পাহারা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। সমাধান করতে হবে ওই ১৬ বছরের ছেলেটার জীবনে, যে আজ রাতে "শুধু একবার" চেষ্টা করার কথা ভাবছে।