একটা নির্বাচনে কত টাকা খরচ?
পর্ব ১: ২৫ লাখ টাকার গণতন্ত্র
বাংলাদেশে একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের আইনি সীমা কত জানেন? ২৫ লাখ টাকা। নির্বাচন কমিশন এটা ঠিক করে দিয়েছে। প্রার্থী মনোনয়নপত্রে লেখেন, "আমি ২৫ লাখের বেশি খরচ করবো না।" স্বাক্ষর করেন। জমা দেন।
এবার বাস্তবটা দেখুন।
একটা জাতীয় নির্বাচনে একজন প্রার্থী আসলে কত খরচ করেন? গবেষণা সংস্থা TIB (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) এবং সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বারবার জরিপ চালিয়ে দেখিয়েছে: গড় খরচ ৫ থেকে ২০ কোটি টাকা। কোনো কোনো আসনে ৫০ কোটি ছাড়িয়ে যায়। ঢাকার কিছু আসনে ১০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে শোনা যায়, যদিও প্রমাণ পাওয়া কঠিন, কারণ এই টাকার বেশিরভাগই নগদ, হিসাবের বাইরে।
চার্টটা দেখুন। নির্বাচন কমিশনের সীমা ২৫ লাখ। আর প্রকৃত ব্যয়ের গড় ৮ থেকে ১৫ কোটি। পার্থক্যটা ৩০ থেকে ৬০ গুণ। এটা শুধু গুজব বা সাংবাদিকতার অনুমান না। TIB-র গবেষণা, সুজনের পর্যবেক্ষণ, এমনকি প্রার্থীরা নিজেরাও অফ-রেকর্ডে স্বীকার করেন।
তাহলে প্রশ্ন: আইনি সীমা ২৫ লাখ হলে বাকি টাকাটা কোথা থেকে আসে? আর কোথায় যায়?
নীল বারটা দেখুন, এটা আনুষ্ঠানিক হিসাব। লাল বারটা প্রকৃত ব্যয়ের অনুমান। প্রতিটা নির্বাচনে এই গ্যাপ বাড়ছে। ২০০১ সালে প্রার্থীরা হয়তো ১-২ কোটি খরচ করতেন। ২০০৮ সালে ৫-৭ কোটি। ২০১৮ সালে ১০-২০ কোটি। ২০২৪ সালে? সেটা আরেক গল্প।
নির্বাচনী ব্যয় বাড়ার কারণ কী? প্রধানত তিনটা: ভোটার কেনা, পোস্টার-মাইকিং-র্যালির খরচ, আর দলীয় মনোনয়ন পেতে অভ্যন্তরীণ "বিনিয়োগ"। কিন্তু সবচেয়ে বড় খরচ ভোটার ম্যানেজমেন্ট। প্রতিটা ওয়ার্ডে, প্রতিটা ইউনিয়নে, প্রতিটা গ্রামে "লোক" রাখতে হয়। তাদের মোবাইল বিল, যাতায়াত, খাওয়া-দাওয়া, আর "প্রণোদনা" দিতে হয়। নির্বাচনের দিন প্রতিটা কেন্দ্রে এজেন্ট, প্রতিটা বুথে মানুষ লাগে। এই পুরো নেটওয়ার্ক চালাতে কোটি কোটি টাকা লাগে।
আর এই পুরো ব্যবস্থার পেছনে একটা সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে যার কাজ নির্বাচন সুষ্ঠু করা। সেই নির্বাচন কমিশন নিজে কত টাকা খরচ করে একটা নির্বাচন আয়োজন করতে?
গত কয়েকটা সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের বাজেট দেখুন। ২০০৮ সালে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা, ২০১৪ সালে ১,১০০ কোটি, ২০১৮ সালে ১,৫০০ কোটি, ২০২৪ সালে ২,০০০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। ভোটার তালিকা প্রণয়ন, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যালট ছাপা, নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন, প্রশিক্ষণ, সব মিলিয়ে একটা বিশাল অপারেশন। ১৫ কোটি ভোটার, ৩ লাখের বেশি ভোটকেন্দ্র, ৩০০ আসন।
এখন একটু গুণে দেখুন। ৩০০ আসনে গড়ে ১০ জন প্রার্থী (বড় দুই দলের বাইরেও অনেকে দাঁড়ান)। মানে ৩,০০০ প্রার্থী। প্রতি প্রার্থী গড়ে ১০ কোটি খরচ করলে মোট প্রার্থী ব্যয় ৩০,০০০ কোটি টাকা। নির্বাচন কমিশনের বাজেট ২,০০০ কোটি। মানে প্রার্থীরা মিলে নির্বাচন কমিশনের চেয়ে ১৫ গুণ বেশি টাকা খরচ করছেন। গণতন্ত্রটা চালাচ্ছে কে? কমিশন, নাকি টাকা?
পর্ব ২: প্রতিটা ভোটের দাম
একটু অন্যভাবে হিসাবটা করি। একটা নির্বাচনে মোট কত টাকা খরচ হয়, সেটাকে মোট ভোটার সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায় "প্রতি ভোটের দাম"। এটা একটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মেট্রিক যেটা দিয়ে গণতন্ত্রের ব্যয়বহুলতা মাপা হয়।
বাংলাদেশে প্রতি ভোটের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। ২০০১ সালে প্রতি ভোটে খরচ ছিল প্রায় ৫০ টাকা (শুধু কমিশন বাজেট ধরলে)। ২০২৪ সালে সেটা ১৩৫ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু প্রার্থীদের অনানুষ্ঠানিক খরচ ধরলে? প্রতি ভোটে দাম পড়ছে ২,০০০ টাকার বেশি। একটা ভোট। একটা আঙুলে কালি লাগানো। এর দাম ২,০০০ টাকা।
এটা কি অনেক বেশি? আন্তর্জাতিক তুলনা দেখলে বুঝবেন।
আমেরিকায় ২০২৪ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতি ভোটে খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ ডলার (মোট ব্যয় / মোট ভোটার)। ভারতে ২০২৪ সালে প্রতি ভোটে খরচ ছিল প্রায় ১০ ডলার। বাংলাদেশে? প্রার্থীদের অনানুষ্ঠানিক ব্যয় ধরলে প্রতি ভোটে প্রায় ১৮ ডলার।
চমকে গেলেন? আমেরিকা পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু আমেরিকার মাথাপিছু আয় ৮০,০০০ ডলার, আর বাংলাদেশের ২,৮০০ ডলার। অনুপাতে ধরলে, বাংলাদেশের নির্বাচন আমেরিকার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল। একটা দরিদ্র দেশে নির্বাচন একটা ধনী দেশের চেয়ে বেশি দামি, এটা কীভাবে সম্ভব?
সম্ভব, কারণ বাংলাদেশে নির্বাচন শুধু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া না। এটা একটা বিনিয়োগ। এবং প্রতিটা বিনিয়োগের রিটার্ন আছে।
পর্ব ৩: বিনিয়োগের রিটার্ন
একজন মানুষ কেন ১০-২০ কোটি টাকা খরচ করে সংসদ সদস্য হতে চান? সংসদ সদস্যের মাসিক বেতন প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। পাঁচ বছর মেয়াদে মোট বেতন প্রায় ৭৮ লাখ টাকা। ভাতা, গাড়ি, বাসস্থান, চিকিৎসা সব মিলিয়ে ধরুন ২ কোটি টাকা। মানে ১৫ কোটি খরচ করে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত পাচ্ছেন ২ কোটি। ১৩ কোটি লস।
কোনো ব্যবসায়ী এত বড় লসে বিনিয়োগ করেন না। তাহলে রিটার্নটা আসে কোথা থেকে?
এই চার্টটা দেখুন। গত কয়েক সংসদে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পেশাগত পরিচয়। ৬০% এর বেশি ব্যবসায়ী। আইনজীবী ১২-১৫%। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ৫-৭%। কৃষক? ১% এরও কম। শ্রমিক? প্রায় শূন্য। শিক্ষক? হাতে গোনা।
জাতীয় সংসদ মানে "জনগণের প্রতিনিধি সভা"। কিন্তু ১৭ কোটি মানুষের দেশে ৬০% সংসদ সদস্য ব্যবসায়ী। সংসদটা আসলে একটা ব্যবসায়ী সমিতি।
এবার রিটার্নের প্রশ্নে আসি। একজন ব্যবসায়ী-সংসদ সদস্য কী পান? সরকারি ঠিকাদারি পান, ব্যাংক ঋণ সহজে পান, জমি বরাদ্দ পান, আমদানি-রপ্তানিতে সুবিধা পান, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোতে প্রভাব খাটাতে পারেন। একটা সরকারি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদারি পেলে সেখান থেকেই ১০-২০ কোটি টাকা লাভ করা সম্ভব। পাঁচ বছরে এরকম কয়েকটা প্রকল্প পেলে নির্বাচনী "বিনিয়োগ" অনেক আগেই উঠে যায়।
আর সবচেয়ে বড় রিটার্ন? সুরক্ষা। একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা কঠিন, গ্রেফতার করা আরো কঠিন। রাজনৈতিক ক্ষমতা মানে আইনি সুরক্ষা কবচ। অনেক প্রার্থী যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে, মামলা আছে, তারা নির্বাচনে দাঁড়ান এই সুরক্ষা পেতে।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া সম্পদ ঘোষণাপত্র দেখুন। গত চারটা নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের গড় ঘোষিত সম্পদ কীভাবে বেড়েছে। ২০০১ সালে গড় ঘোষিত সম্পদ ছিল প্রায় ১.৫ কোটি টাকা। ২০০৮ সালে ৪ কোটি। ২০১৮ সালে ১০ কোটি। ২০২৪ সালে ১৫ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। আর এগুলো ঘোষিত সম্পদ, মানে যেটুকু তারা নিজেরা জানিয়েছেন। প্রকৃত সম্পদ কত, সেটা কেউ জানে না।
একটা গবেষণায় দেখা গেছে, সংসদ সদস্যদের সম্পদ পাঁচ বছরে গড়ে ৩-৫ গুণ বাড়ে। যদি একজনের প্রথম মেয়াদে সম্পদ ৫ কোটি থাকে, দ্বিতীয় মেয়াদে সেটা ২০-২৫ কোটি হয়ে যায়। এটা শুধু বৈধ ব্যবসা দিয়ে সম্ভব না। সংসদ সদস্য হওয়াটাই একটা সম্পদ-বৃদ্ধি যন্ত্র।
পর্ব ৪: কালো টাকা আর সহিংসতার অর্থনীতি
১০-২০ কোটি টাকা কোথা থেকে আসে? তিনটা প্রধান উৎস।
প্রথমত, নিজস্ব ব্যবসা থেকে। ব্যবসায়ী প্রার্থীরা তাদের কোম্পানির টাকা ব্যবহার করেন। এটা তুলনামূলকভাবে কম সমস্যাজনক, যদিও হিসাব রাখা হয় না।
দ্বিতীয়ত, দলীয় ফান্ড থেকে। কেন্দ্রীয় দল মনোনীত প্রার্থীকে কিছু টাকা দেয়। কিন্তু এই পরিমাণ সীমিত, বেশিরভাগ খরচ প্রার্থীকে নিজেকেই বহন করতে হয়।
তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনক, কালো টাকা। অবৈধ উৎস থেকে আসা অঘোষিত আয়। জমি দখল, চাঁদাবাজি, সরকারি প্রকল্পের কমিশন, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, এই সব থেকে আসা টাকা নির্বাচনে ঢুকছে। TIB-র একটা গবেষণায় প্রাক্কলন করা হয়েছে যে একটা সাধারণ নির্বাচনে মোট অনানুষ্ঠানিক ব্যয়ের ৩০-৪০% আসে অবৈধ উৎস থেকে।
চার্টটা দেখুন। নির্বাচনী ব্যয়ের উৎস ভেঙে দেখলে, নিজস্ব ব্যবসা ৩৫%, ঋণ ১৫%, দলীয় ফান্ড ১০%, অন্যদের কাছ থেকে চাঁদা ১০%, আর বাকি ৩০% "অন্যান্য", যেটা মূলত অনুসন্ধানযোগ্য না এমন নগদ, অর্থাৎ কালো টাকা।
এই কালো টাকা শুধু নির্বাচনে ঢোকে না, নির্বাচনের পর বেরও হয়। কারণ যে প্রার্থী কালো টাকা দিয়ে নির্বাচন জিতেছেন, তাকে সেই টাকার "রিটার্ন" দিতে হবে তার অর্থদাতাদের। এটা একটা দুষ্টচক্র: কালো টাকায় নির্বাচন, নির্বাচনে জিতে আরো কালো টাকা তৈরি, সেই টাকায় আবার নির্বাচন।
আর এই টাকার খেলার সাথে আসে সহিংসতা।
বাংলাদেশে প্রতিটা নির্বাচনে সহিংসতা ঘটে। নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন, নির্বাচনের পরে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, প্রতিপক্ষের ভোটারদের ভয় দেখানো। গত কয়েকটা নির্বাচনে প্রতিবারই ডজনখানেক মৃত্যু এবং শতাধিক আহত হওয়ার রেকর্ড আছে। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে একতরফা নির্বাচনের পরেও সহিংসতা কমেনি, বরং প্রতিবাদ ও দমনপীড়নের নতুন রূপ নিয়েছে।
সহিংসতা এবং টাকা একসাথে চলে। যে আসনে বেশি টাকা ঢালা হয়, সেখানে "বিনিয়োগ" রক্ষা করতে পেশিশক্তিও বেশি ব্যবহৃত হয়। ক্যাডার পোষার খরচ, অস্ত্র, পরিবহন, সব নির্বাচনী ব্যয়ের অংশ, যদিও কোনো হিসাবে আসে না।
পর্ব ৫: ভোটারের কী হলো?
এই পুরো ব্যবস্থায় সাধারণ ভোটার কোথায়?
ভোটার উপস্থিতির ট্রেন্ড দেখুন। ২০০১ সালে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৫%। ২০০৮ সালে ৮৭%, সেটা ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, মানুষের মধ্যে আশা ছিল। ২০১৪ সালে? ৪০% এরও কম, কারণ প্রধান বিরোধী দল বয়কট করেছিল, অনেক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় হয়েছে। ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ৮০% বলা হলেও পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন তুলেছেন। ২০২৪ সালে আবার নেমে এসেছে।
ভোটার উপস্থিতি কমা মানে মানুষ গণতন্ত্রে আস্থা হারাচ্ছে। তারা দেখছে, কে জিতলেও তাদের জীবনে পরিবর্তন আসে না। রাস্তা হয় না, হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া যায় না, স্কুলে শিক্ষক নেই। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকায় আর দেখা যায় না। পাঁচ বছর পর আবার আসেন, আবার টাকা বিলাতে শুরু করেন।
আর একটা নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে: ভোট কেনা। সরাসরি নগদ টাকা দেওয়া হয় ভোটারদের। ২০০-৫০০ টাকা প্রতি ভোট, কোথাও ১,০০০ টাকা পর্যন্ত। শাড়ি, লুঙ্গি বিতরণ নির্বাচনের আগে নিয়মিত ঘটনা। গরিব মানুষ এই টাকা নেয়, কারণ তাদের কাছে ২০০ টাকাও অনেক। কিন্তু এই টাকা নেওয়ার মাধ্যমে তারা অজান্তে নিজেদের ভোটের দাম কমিয়ে দিচ্ছে। একটা ভোট, পাঁচ বছরের জন্য, ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পর্ব ৬: অন্যরা কী করেছে?
বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যয়ের এই চিত্র কি অনিবার্য? অন্য দেশগুলো কি একইরকম? না, অনেক দেশ ভিন্নভাবে করছে।
ভারতে ২০১৩ সালে ইলেক্টোরাল বন্ড ব্যবস্থা চালু হয়েছিল (যদিও সুপ্রিম কোর্ট ২০২৪ সালে এটা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে)। জার্মানিতে রাজনৈতিক দলগুলো সরকারি তহবিল পায়, যেটা দলের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে নির্ধারিত হয়। এতে ধনী ব্যক্তি বা কর্পোরেশনের উপর নির্ভরতা কমে। দক্ষিণ কোরিয়ায় নির্বাচনী ব্যয়ের প্রতিটা টাকার হিসাব দিতে হয়, না দিলে আসন বাতিল। ব্রাজিলে ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থা প্রতারণা কমিয়ে এনেছে (যদিও বিতর্ক আছে)।
বাংলাদেশের জন্য তিনটা বাস্তবসম্মত সংস্কার সম্ভব:
প্রথমত, নির্বাচনী ব্যয়ের ডিজিটাল হিসাব বাধ্যতামূলক করা। প্রতিটা প্রার্থীর একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকবে, সব খরচ সেখান থেকে হবে, রিয়েল-টাইমে নির্বাচন কমিশন দেখতে পারবে। নগদ লেনদেন সীমিত করা হবে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সরকারি অর্থায়ন। জার্মানি মডেলে, প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সরকার দলগুলোকে অর্থ দেবে। এতে দলগুলো ব্যবসায়ী ও অবৈধ উৎসের উপর কম নির্ভর করবে।
তৃতীয়ত, সম্পদ ঘোষণার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। নির্বাচনের আগে ও পরে সম্পদ ঘোষণা বাধ্যতামূলক, এবং সেই তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। যে সংসদ সদস্যের সম্পদ পাঁচ বছরে ব্যাখ্যাতীতভাবে বাড়বে, তার বিরুদ্ধে তদন্ত হবে।
এই সংস্কারগুলো কি অসম্ভব? না। কিন্তু এগুলো করার ক্ষমতা যাদের হাতে, তারাই বর্তমান ব্যবস্থার সুবিধাভোগী। এটাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স: ব্যবস্থা বদলাতে যাদের সম্মতি দরকার, তারাই ব্যবস্থাটা টিকিয়ে রেখে লাভবান হচ্ছেন।
আসুন শেষ করি একটা সংখ্যা দিয়ে।
একটা সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশে মোট কত টাকা খরচ হয়? নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক বাজেট ২,০০০ কোটি। প্রার্থীদের অনানুষ্ঠানিক ব্যয় ধরলে মোট ৩০,০০০-৫০,০০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের ২০২৪-২৫ শিক্ষা বাজেট ছিল ৮৮,০০০ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য বাজেট ৩৮,০০০ কোটি। মানে একটা নির্বাচনে যে টাকা খরচ হয়, সেটা দিয়ে দেশের পুরো স্বাস্থ্য বাজেটের প্রায় সমান একটা তহবিল তৈরি করা যেত।
আমরা নির্বাচনকে গণতন্ত্রের উৎসব বলি। কিন্তু এই উৎসবের টিকিটের দাম এত বেশি যে সাধারণ মানুষ প্রার্থী হতে পারে না। শুধু ধনী ব্যবসায়ীরা পারেন। আর তারা যখন জেতেন, তখন তারা জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, তাদের বিনিয়োগের রিটার্ন তুলতে বসেন।
গণতন্ত্রের দাম থাকবে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দাম যখন এত বেশি হয়ে যায় যে গণতন্ত্র নিজেই বিক্রি হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন করতে হয়: আমরা কি গণতন্ত্র চালাচ্ছি, নাকি গণতন্ত্র আমাদের চালাচ্ছে?