Back to publications
Narrative 2026-03-06

রাজনৈতিক পরিবার: গণতন্ত্র না রাজবংশ?

পরিবারতন্ত্রের ক্ষমতার মানচিত্র

রাজনৈতিক পরিবার: গণতন্ত্র না রাজবংশ?

পর্ব ১: চেনা মুখ

ধরুন আপনি বাংলাদেশের যেকোনো একটা সংসদীয় আসনে দাঁড়িয়ে আছেন। গোপালগঞ্জ, রংপুর, ফেনী, টাঙ্গাইল, যেকোনো জায়গা। এবার সেই আসনের গত চারটা নির্বাচনের ফলাফল দেখুন। বিজয়ী প্রার্থীদের নাম দেখুন।

একটা প্যাটার্ন চোখে পড়বে।

কিন্তু দুটো দলের ভেতরেই পরিবারতন্ত্রের চিত্র একই রকম কিনা? আওয়ামী লীগে পারিবারিক সংযোগযুক্ত সংসদ সদস্যের হার ৪৫% এর কাছাকাছি।
প্রায় ৪৫-৪৮%
ক্রমবর্ধমান প্রবণতা
৯৯.৯%
রাজবংশ থেকে গণতন্ত্রে
প্রায় ৪০%
চেনা মুখ

২০০৮ সালে বাবা জিতেছেন। ২০১৪ সালে ছেলে। ২০১৮ সালে আবার ছেলে। মাঝে কখনো স্ত্রী, কখনো ভাই, কখনো শ্বশুর। পদবি বদলায় না। পরিবার বদলায় না। শুধু প্রজন্ম বদলায়।

এটা একটা আসনের গল্প না। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রায় ৪০% আসনে এই একই ছবি। একই পরিবার, দশকের পর দশক, একই এলাকায় "প্রতিনিধিত্ব" করছে। প্রতিনিধিত্ব শব্দটা উদ্ধৃতি চিহ্নে রাখছি ইচ্ছে করেই। কারণ প্রশ্ন হলো: এরা কাদের প্রতিনিধি? জনগণের, নাকি নিজেদের পরিবারের?

এই চার্টটা দেখুন। বাংলাদেশের একাদশ সংসদে (২০১৮) নির্বাচিত ৩০০ সদস্যের মধ্যে ১২০ জনেরও বেশি সদস্যের সরাসরি পারিবারিক রাজনৈতিক সংযোগ আছে। বাবা সংসদ সদস্য ছিলেন, অথবা মা মন্ত্রী ছিলেন, অথবা শ্বশুর দলের সভাপতি ছিলেন। সংখ্যাটা ৪০% এর কাছাকাছি।

এটা কি স্বাভাবিক? রাজনৈতিক পরিবারে বড় হলে রাজনীতিতে আসার আগ্রহ থাকবে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু ৪০%? সেটা আর ব্যক্তিগত পছন্দ না, সেটা কাঠামোগত সমস্যা।

একটু তুলনা করি। আমেরিকার কংগ্রেসে পারিবারিক সংযোগ আছে এমন সদস্যের হার ৬%। ব্রিটেনের পার্লামেন্টে ৮%। জাপানে (যেটা পরিবারতন্ত্রের জন্য বিখ্যাত) ২৫%। বাংলাদেশে ৪০%। আমরা জাপানকেও ছাড়িয়ে গেছি।

কিন্তু শুধু সংখ্যা দেখলে পুরো ছবি বোঝা যায় না। এই পরিবারতন্ত্র কোন দলে বেশি? কোন দল "গণতান্ত্রিক" আর কোন দল "পারিবারিক"? সেটা দেখা যাক।


পর্ব ২: দলের ভেতরের দরবার

বাংলাদেশের রাজনীতি দুটো দলকেন্দ্রিক, সেটা সবাই জানে। আওয়ামী লীগ আর বিএনপি। কিন্তু দুটো দলের ভেতরেই পরিবারতন্ত্রের চিত্র একই রকম কিনা? দেখুন:

আওয়ামী লীগে পারিবারিক সংযোগযুক্ত সংসদ সদস্যের হার ৪৫% এর কাছাকাছি। বিএনপিতে প্রায় ৩৮%। জাতীয় পার্টিতে ৫০% এর উপরে। ছোট দলগুলোতেও (জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি) একই রকম।

কিন্তু সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটা দলের শীর্ষে। আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। বিএনপির চেয়ারপারসন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তাদের ছেলে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছেলে। মানে বাংলাদেশের তিনটা প্রধান দলই পারিবারিক উত্তরাধিকারে চলছে।

দলের ভেতরে গণতন্ত্র নেই। কাউন্সিল হয়, কিন্তু ফলাফল আগে থেকেই ঠিক। মনোনয়ন বোর্ড আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত দলপ্রধানের। একজন সাধারণ কর্মী, যত যোগ্যই হোক, যত জনপ্রিয়ই হোক, মনোনয়ন পাবে না যদি তার "পরিচয়" না থাকে। আর "পরিচয়" মানে? হয় পরিবার, নয় টাকা।

এবার আরেকটা দিক দেখি। এই পরিবারগুলো শুধু একটা নির্বাচনে জেতে ক্ষান্ত হয় না। তারা একটা আসনকে "দখল" করে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

বাংলাদেশের ৩০০ আসনের মধ্যে প্রায় ৮৫টা আসনে একই পরিবার তিনটা বা তার বেশি নির্বাচনে জিতেছে। ৩৫টা আসনে চারটার বেশি। এবং ১২টা আসনে স্বাধীনতার পর থেকে মূলত একই পরিবারের কেউ না কেউ জিতে আসছে। এগুলো আর সংসদীয় আসন না, এগুলো পারিবারিক জমিদারি।

গোপালগঞ্জের একটা আসন ধরুন। ১৯৭৩ সাল থেকে এই আসনে শেখ পরিবারের কেউ না কেউ জিতেছে। রংপুরের একটা আসনে জিয়া পরিবারের প্রভাব একইভাবে বিস্তৃত। টাঙ্গাইলের একটা আসনে একই পরিবারের তিন প্রজন্ম সংসদ সদস্য হয়েছে।

এটা কি জনগণের পছন্দ? নাকি জনগণের সামনে আর কোনো বিকল্প থাকে না?


পর্ব ৩: নারী, রাজবংশ, আর শূন্য পরিসর

বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে একটা গর্বের ন্যারেটিভ আছে। তিন দশক ধরে প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী, স্পিকার নারী। সংসদে সংরক্ষিত আসনসহ নারী সদস্য প্রায় ২১%। দক্ষিণ এশিয়ায় এটা উল্লেখযোগ্য।

কিন্তু এই সংখ্যাগুলোর পেছনে আরেকটা সত্য লুকিয়ে আছে।

সংসদে সরাসরি নির্বাচিত নারী সদস্যদের (সংরক্ষিত আসন বাদে) মধ্যে ৭০% এরও বেশি রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসা। তাদের স্বামী সংসদ সদস্য ছিলেন (মৃত বা অযোগ্য ঘোষিত), অথবা বাবা মন্ত্রী ছিলেন, অথবা শ্বশুর দলের নেতা। নিজের যোগ্যতায়, নিজের কর্মী জীবন দিয়ে, একেবারে শূন্য থেকে উঠে এসেছেন, এমন নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা হাতে গোনা যায়।

এটা নারীদের দোষ না। এটা ব্যবস্থার দোষ। রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের মনোনয়ন দেয় মূলত দুটো কারণে: হয় "ফ্যামিলি সিট" ধরে রাখতে (স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকে দাঁড় করাও), অথবা সংরক্ষিত আসনে বসিয়ে দিতে (যেখানে জনগণের ভোট লাগে না, দলের সিদ্ধান্তেই হয়)। দুটো ক্ষেত্রেই নারীর নিজের এজেন্সি সীমিত।

শীর্ষ নেতৃত্বের কথাই ধরুন। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে দলের নেতৃত্বে এসেছিলেন। খালেদা জিয়া জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে। দুজনেই পরে নিজেদের যোগ্যতায় দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিলেন, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রবেশের পথটা ছিল পারিবারিক।

প্রশ্ন হলো: এই ব্যবস্থায় একজন সাধারণ নারী, যার রাজনৈতিক পরিবার নেই, তার পক্ষে কি সংসদে আসা সম্ভব? উত্তর প্রায় সবসময় "না"।

এটা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা না। পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় একই চিত্র।

ভারতে নেহরু-গান্ধী পরিবার কংগ্রেস দলকে প্রায় সত্তর বছর নিয়ন্ত্রণ করেছে। জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী। পাকিস্তানে ভুট্টো পরিবার (জুলফিকার, বেনজির, বিলাওয়াল) আর শরিফ পরিবার (নওয়াজ, শাহবাজ)। ফিলিপাইনে মার্কোস পরিবার (ফার্দিনান্দ সিনিয়র, বংবং মার্কোস)। শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসা পরিবার (মহিন্দা, গোতাবায়া, বাসিল, চামাল)।

দক্ষিণ এশিয়ার সংসদগুলোতে পারিবারিক সংযোগযুক্ত সদস্যের হার গড়ে ৩০% এর উপরে। পশ্চিম ইউরোপে ৫% এর নিচে। পার্থক্যটা ছয় গুণ।

কেন? কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল। দলের ভেতরে গণতন্ত্র নেই, স্বচ্ছ মনোনয়ন প্রক্রিয়া নেই, তৃণমূল পর্যায়ে কর্মীদের উপরে ওঠার সিঁড়ি নেই। ফলে "নাম" আর "পরিচিতি"ই সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হয়ে দাঁড়ায়।


পর্ব ৪: কার যোগ্যতা, কার সুযোগ

পরিবারতন্ত্রের সমর্থকেরা একটা যুক্তি দেন: "রাজনৈতিক পরিবারে বড় হলে অভিজ্ঞতা থাকে, নেটওয়ার্ক থাকে, দক্ষতা তৈরি হয়।" এই যুক্তিটা কতটা সত্য?

পারিবারিক সংযোগযুক্ত সংসদ সদস্যদের পুনর্নির্বাচনের হার ৬২%। পারিবারিক সংযোগবিহীন সদস্যদের ৪১%। মানে পরিবারতন্ত্র থেকে আসা সদস্যরা বারবার জিতছে। কিন্তু এটা কি তাদের যোগ্যতার প্রমাণ? নাকি তাদের কাঠামোগত সুবিধার প্রমাণ?

একজন রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান জন্ম থেকেই কিছু সুবিধা পায়। দলের নেটওয়ার্ক, অর্থ, মিডিয়া পরিচিতি, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মনোনয়ন। একজন সাধারণ কর্মী এই সুবিধাগুলোর কোনোটাই পায় না। ফলে প্রতিযোগিতা সমান হয় না। পরিবারতন্ত্রের প্রার্থী জেতে, কারণ তার সুযোগ বেশি, যোগ্যতা বেশি বলে না।

শিক্ষাগত যোগ্যতার তুলনা করলে আরেকটা মজার ছবি পাওয়া যায়:

পারিবারিক সংযোগবিহীন সংসদ সদস্যদের মধ্যে স্নাতকোত্তর বা তার উপরে শিক্ষিতদের হার ৫৮%। পারিবারিক সংযোগযুক্তদের মধ্যে ৪৫%। মানে পারিবারিক সংযোগ ছাড়া যারা সংসদে এসেছেন, তারা গড়ে বেশি শিক্ষিত। যোগ্যতার মই ভেঙে উপরে উঠতে হয়েছে, তাই শিক্ষার ভিত্তি বেশি দরকার হয়েছে। আর পরিবারতন্ত্র থেকে আসা সদস্যদের শিক্ষাগত ভিত্তি কিছুটা দুর্বল, কারণ তাদের জন্য শিক্ষা প্রবেশের শর্ত না, পরিবারই যথেষ্ট।

এবার আরেকটা সংবেদনশীল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ: সম্পদ।

রাজনৈতিক পরিবারের সংসদ সদস্যদের গড় ঘোষিত সম্পদ প্রায় ২৮ কোটি টাকা। অ-পারিবারিক সদস্যদের গড় ১২ কোটি টাকা। পার্থক্য দ্বিগুণেরও বেশি। এটা ঘোষিত সম্পদ, প্রকৃত সম্পদ আরো বেশি হতে পারে।

প্রশ্ন হলো: এই সম্পদ কোথা থেকে আসে? রাজনীতিতে আসার আগে থেকেই ধনী ছিলেন, নাকি রাজনীতি করে ধনী হয়েছেন? উত্তর সম্ভবত দুটোরই মিশ্রণ। রাজনৈতিক পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ক্ষমতায় থাকায় সম্পদ জমা হয়, আর সেই সম্পদ আবার পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষমতায় আসার পথ সুগম করে। ক্ষমতা সম্পদ আনে, সম্পদ ক্ষমতা আনে। দুষ্টচক্র।


পর্ব ৫: ক্রমবর্ধমান প্রবণতা

পরিবারতন্ত্র কি বাড়ছে নাকি কমছে? অনেকে ধরে নেন, সময়ের সাথে সাথে গণতন্ত্র পরিপক্ব হলে পরিবারতন্ত্র কমবে। বাংলাদেশে কি সেটা হচ্ছে?

প্রথম সংসদে (১৯৭৩) পারিবারিক সংযোগযুক্ত সদস্যের হার ছিল প্রায় ১৫%। পঞ্চম সংসদে (১৯৯১) ২৫%। সপ্তম সংসদে (১৯৯৬) ৩০%। নবম সংসদে (২০০৮) ৩৫%। একাদশ সংসদে (২০১৮) ৪০%। মানে পরিবারতন্ত্র কমছে না, বাড়ছে। প্রতিটা নতুন সংসদে আরো বেশি "পরিবারের লোক" ঢুকছে।

কেন বাড়ছে? কারণ রাজনীতিতে প্রবেশের বাধা বাড়ছে। নির্বাচনী খরচ বাড়ছে, একটা সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এখন কোটি কোটি টাকা লাগে। দলের মনোনয়ন পেতে "পরিচয়" লাগে। আর পরিচয় মানে হয় টাকা, নয় পরিবার, নয় দুটোই। একজন সৎ, যোগ্য, কিন্তু সাধারণ পরিবারের মানুষ এই বাধা পেরোতে পারে না।

আর এই পরিবারতন্ত্র সারা দেশে সমানভাবে ছড়িয়ে আছে কি? না।

বিভাগ অনুযায়ী পরিবারতন্ত্রের মানচিত্র দেখলে দেখা যায়, ঢাকা আর চট্টগ্রাম বিভাগে হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪৫-৪৮%। রংপুর আর রাজশাহী বিভাগে কিছুটা কম, ৩০-৩৫%। ময়মনসিংহ আর সিলেট বিভাগে মাঝামাঝি। বরিশাল বিভাগে আবার বেশি, ৪২% এর কাছাকাছি।

ঢাকা আর চট্টগ্রামে বেশি কেন? কারণ এই এলাকাগুলোতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেশি, ব্যবসা বেশি, জমির দাম বেশি। রাজনৈতিক ক্ষমতার অর্থনৈতিক মূল্য এখানে সবচেয়ে বেশি। ফলে পরিবারগুলো এই আসন ছাড়তে রাজি না।


পর্ব ৬: রাজবংশ থেকে গণতন্ত্রে

এতক্ষণ যে ছবি দেখলেন, সেটা হতাশাজনক। কিন্তু এটা কি অপরিবর্তনীয়? অন্য দেশেরা কি পরিবারতন্ত্র ভাঙতে পেরেছে?

হ্যাঁ, পেরেছে।

ভারতে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী নেহরু-গান্ধী পরিবারের ৬০ বছরের আধিপত্য ভেঙেছিলেন। মোদী গুজরাটের একটা সাধারণ পরিবার থেকে এসেছেন, চা বিক্রেতার ছেলে। দলীয় সংগঠনে কাজ করে, তৃণমূল থেকে উপরে উঠেছেন। মোদীকে পছন্দ করুন বা না করুন, এটা স্বীকার করতে হবে: ভারতের রাজনীতিতে তিনি প্রমাণ করেছেন যে পরিবারতন্ত্রের বাইরেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্ভব।

ইন্দোনেশিয়ায় জোকো উইদোদো (জোকোই) আরেকটা উদাহরণ। কাঠমিস্ত্রির ছেলে, ছোট শহরের মেয়র থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। কোনো রাজনৈতিক পরিবার নেই, কোনো সামরিক পটভূমি নেই।

তাহলে পরিবারতন্ত্র ভাঙতে কী লাগে?

প্রথম, দলের ভেতরে গণতন্ত্র। মনোনয়ন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে। প্রাইমারি নির্বাচন চালু করা যায়, যেখানে দলের সদস্যরা ভোট দিয়ে প্রার্থী নির্বাচন করবে। দলপ্রধানের একক সিদ্ধান্তে মনোনয়ন দেওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে।

দ্বিতীয়, নির্বাচনী ব্যয় সীমিত করা। বাংলাদেশে আইনে নির্বাচনী ব্যয়সীমা আছে (২৫ লাখ টাকা), কিন্তু কেউ মানে না। প্রকৃত খরচ হয় কোটি কোটি টাকা। এই ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সাধারণ মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ বাড়বে।

তৃতীয়, রাজনৈতিক দলে পারিবারিক উত্তরাধিকার নিরুৎসাহিত করা। কিছু দেশে আইন আছে যে দলের প্রধানের নিকটাত্মীয় পরবর্তী প্রধান হতে পারবে না। বাংলাদেশে এটা আইন করা কঠিন হতে পারে, কিন্তু দলীয় সংবিধানে এই ধরনের বিধান রাখা সম্ভব।

চতুর্থ, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করলে স্থানীয় নেতৃত্ব তৈরি হবে। মানুষ স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করে দক্ষতা অর্জন করে জাতীয় পর্যায়ে আসতে পারবে। এখন স্থানীয় সরকার এত দুর্বল যে সরাসরি "জাতীয় পর্যায়ে" আসতে হয়, আর সেটার জন্য পরিবার বা টাকা ছাড়া উপায় নেই।


আসুন শেষ করি একটা সংখ্যা দিয়ে।

বাংলাদেশে ১৮ বছরের উপরে ভোটার প্রায় ১২ কোটি। তাদের মধ্যে ৯৯.৯% এরও বেশি মানুষ কখনো সংসদ সদস্য হওয়ার কথা ভাবতেও পারে না। কারণ তাদের পরিবারে রাজনীতিবিদ নেই, কোটি কোটি টাকা নেই, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে "যোগাযোগ" নেই। গণতন্ত্রের মানে হলো জনগণের শাসন, কিন্তু যেখানে ৪০% সংসদ সদস্য আসে মাত্র কয়েক শত পরিবার থেকে, সেটা জনগণের শাসন না। সেটা কয়েকটা পরিবারের শাসন, গণতন্ত্রের মোড়কে।

রাজতন্ত্র শেষ হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। জমিদারি শেষ হয়েছিল পাকিস্তান আমলে। কিন্তু একটা নতুন "রাজবংশ" তৈরি হয়েছে, গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে। এই রাজবংশ কোনো সিংহাসনে বসে না, বসে সংসদের আসনে। মুকুট পরে না, পরে নমিনেশন ফর্ম।

বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে একটা দেশ চেয়েছিল যেখানে সবার সমান অধিকার থাকবে। পঞ্চাশ বছর পরে, সেই দেশে ক্ষমতা কয়েকটা পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত। এটা বদলানো দরকার। প্রশ্ন হলো: কে বদলাবে? উত্তর একটাই: যারা এই ব্যবস্থায় বঞ্চিত, তারা। ১২ কোটি ভোটার। তাদের ভোট, তাদের কণ্ঠস্বর, তাদের দাবি। পরিবারতন্ত্র ভাঙতে হলে জনগণকেই ভাঙতে হবে।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50