সারের ভর্তুকিতে কে লাভবান?
পর্ব ১: করিম চাচার সারের লাইন
করিম চাচা ময়মনসিংহের ত্রিশালে তিন বিঘা জমি চাষ করে। বোরো মৌসুমে ইউরিয়া লাগে ১৫০ কেজি। সরকার নির্ধারিত দাম ১৬ টাকা কেজি। মানে ২,৪০০ টাকার সার। কিন্তু করিম চাচা কখনো ১৬ টাকায় সার পায় না। ডিলারের কাছে দাম ২২-২৫ টাকা। কখনো ৩০। কারণ? "স্টক নেই ভাই, একটু বেশি দিতে হবে।"
করিম চাচা জানে না যে সরকার প্রতি কেজি ইউরিয়ায় ৩০-৪০ টাকা ভর্তুকি দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম কেজিতে ৫০-৫৫ টাকা। সরকার সেটা ১৬ টাকায় বিক্রি করে কৃষকদের কাছে। এই পার্থক্যটা, প্রতি কেজিতে ৩৫-৪০ টাকা, সেটাই ভর্তুকি। কিন্তু করিম চাচা পায় কত? ডিলার ২২ টাকায় বেচলে করিম চাচা পাচ্ছে ভর্তুকির একটা অংশ, বাকিটা ডিলারের পকেটে।
আর করিম চাচার প্রতিবেশী রফিক সাহেব? তার ৩০ বিঘা জমি। তিনি ১,৫০০ কেজি ইউরিয়া পান। মানে ভর্তুকির টাকায় হিসাব করলে সরকার করিম চাচার পেছনে ব্যয় করছে ৫,২৫০ টাকা, আর রফিক সাহেবের পেছনে ৫২,৫০০ টাকা। দশগুণ। এটাই সারের ভর্তুকির মূল সমস্যা: যার জমি বেশি, সে বেশি সার পায়, বেশি ভর্তুকি পায়। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি, যারা বাংলাদেশের কৃষকদের ৮৪%, তারা ভর্তুকির সিংহভাগ পায় না।
এবার পুরো ছবিটা দেখা যাক। বাংলাদেশ সরকার সারে কত ভর্তুকি দেয়?
২০১০ সালে সার ভর্তুকি ছিল প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকা। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক সারের দাম আকাশ ছুঁলে ভর্তুকি লাফিয়ে উঠলো ৩০,০০০ কোটি টাকায়। ২০২৫ সালে কিছুটা কমে ২৫,০০০ কোটি। এই টাকা দিয়ে কয়েকটা পদ্মা সেতু বানানো যেত। কিন্তু সারের ভর্তুকি রাজনৈতিকভাবে এত সংবেদনশীল যে কোনো সরকারই এটা কমাতে সাহস পায় না।
পর্ব ২: ইউরিয়া আসক্তি
বাংলাদেশের কৃষক সার বলতে বোঝে ইউরিয়া। ধানের পাতা হলুদ হলে ইউরিয়া। ফলন কম হলে ইউরিয়া। জমি ক্লান্ত লাগলে আরো ইউরিয়া। এটা একটা আসক্তি, এবং এই আসক্তি বাংলাদেশের মাটিকে ধীরে ধীরে মেরে ফেলছে।
গত দুই দশকে বাংলাদেশে সারের ব্যবহার ক্রমাগত বেড়েছে। ২০০৫ সালে মোট সার ব্যবহার ছিল ৩৫ লাখ মেট্রিক টন। ২০২৫ সালে সেটা ৬০ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়েছে। কিন্তু সমস্যাটা শুধু পরিমাণে না, অনুপাতে। ইউরিয়া মোট সারের ৫৫-৬০%। ফসলের জন্য ইউরিয়া (নাইট্রোজেন), টিএসপি (ফসফরাস), আর এমওপি (পটাশিয়াম) লাগে প্রায় ৪:২:১ অনুপাতে। বাংলাদেশের কৃষক ব্যবহার করে ৮:২:১ বা তার চেয়েও বেশি ইউরিয়া-ভারী অনুপাতে।
কেন? কারণ ইউরিয়ার ফল চোখে দেখা যায়। ইউরিয়া দিলে গাছ দ্রুত সবুজ হয়, বড় হয়। কৃষকের মনে হয় "কাজ হচ্ছে।" কিন্তু এটা একটা ফাঁদ। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন মাটির জৈব পদার্থ পুড়িয়ে দেয়, উপকারী অণুজীব মেরে ফেলে, মাটির গঠন ভেঙে দেয়।
চার্টটা দেখুন। বাংলাদেশে হেক্টর প্রতি সার ব্যবহার বিশ্ব গড়ের প্রায় আড়াই গুণ। ভারতের দ্বিগুণ। আমরা বিশ্বের অন্যতম ঘন সার ব্যবহারকারী দেশ। এবং এই অতিরিক্ত ব্যবহারের বেশিরভাগটাই ইউরিয়া।
এর পরিণতি? মাটি তার জীবনীশক্তি হারাচ্ছে। জৈব পদার্থের পরিমাণ কমছে, মাটির pH বদলে যাচ্ছে, অণুজীব বৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। ফলে একই ফলন পেতে প্রতি বছর আরো বেশি সার লাগছে। এটা একটা ক্লাসিক "ডিমিনিশিং রিটার্নস" পরিস্থিতি: যত বেশি দেবেন, তত কম কাজ হবে, তত আরো বেশি দিতে হবে।
এই চার্টে দেখুন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির জৈব পদার্থ কীভাবে কমেছে। সুস্থ মাটিতে জৈব পদার্থ ৩% এর উপরে থাকা উচিত। বাংলাদেশের জাতীয় গড় এখন ১.৫%। রাজশাহী আর রংপুর বিভাগে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ, সেখানে ১.৩-১.৪%। এই মাটিতে আগামী ২০ বছর চাষ করতে হলে ক্রমাগত আরো বেশি রাসায়নিক সার দিতে হবে। নাহলে ফলন ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
পর্ব ৩: ভর্তুকি কার পকেটে যায়?
সরকার বলে ভর্তুকি কৃষকের জন্য। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
বাংলাদেশে সার বিতরণ করে বিএডিসি (Bangladesh Agricultural Development Corporation)। বিএডিসি থেকে সার যায় জেলা পর্যায়ের ডিলারদের কাছে, সেখান থেকে উপজেলা ডিলার, তারপর ইউনিয়ন পর্যায়ের খুচরা বিক্রেতা, এবং অবশেষে কৃষকের হাতে। প্রতিটা ধাপে কিছু টাকা "হারিয়ে" যায়।
সবচেয়ে ধনী ২০% কৃষক, যাদের জমি ৫ একরের বেশি, তারা মোট ভর্তুকির ৩৮% পায়। কারণ তারা বেশি সার কেনে। আর সবচেয়ে গরিব ২০% কৃষক, প্রান্তিক চাষি, তারা পায় মাত্র ৮%। মাঝখানে ডিলার নেটওয়ার্ক নিজেদের জন্য রেখে দেয় আরো ১০-১৫%। মানে সরকার যে ২৫,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে, তার একটা বড় অংশ যাচ্ছে বড় কৃষক আর মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। প্রান্তিক চাষি করিম চাচা পাচ্ছে টুকরো।
এবার আরেকটা দিক দেখুন। বাংলাদেশ ইউরিয়ার কিছু অংশ দেশে তৈরি করে (যমুনা, চিটাগাং, আশুগঞ্জ সার কারখানা), কিন্তু ডিএপি, টিএসপি, এমওপি প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়। এই আমদানি খরচটাই ভর্তুকির বিশাল অংশ।
বাংলাদেশ প্রতি বছর ৪,০০০-৮,০০০ কোটি টাকার সার আমদানি করে। ২০২২ সালে এই খরচ ১২,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমদানি নির্ভরতার মানে হলো বৈশ্বিক বাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশের ভর্তুকি বিলও লাফিয়ে বাড়ে। সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এটা একটা চোরাবালি: যখন বিশ্ব বাজারে দাম বাড়ে, সরকারের সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি দিতে হয়, ঠিক যখন সরকারের রাজস্ব আয়ও চাপে থাকে।
বৈশ্বিক সারের দাম গত দশ বছরে একটা রোলারকোস্টারের মতো চলেছে। ২০২০ সালে ইউরিয়া ছিল টনে ২২০ ডলার। ২০২২ সালে লাফিয়ে ৯০০ ডলারে পৌঁছেছে। এই ধরনের দামের ওঠানামা থেকে বাংলাদেশের বাজেটকে রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। প্রতিবার বৈশ্বিক দাম বাড়লে সরকারকে হয় ভর্তুকি বাড়াতে হয়, নয়তো কৃষকের উপর বোঝা চাপাতে হয়। দুটোই রাজনৈতিকভাবে কঠিন।
পর্ব ৪: বাজেটের ভারী বোঝা
সারের ভর্তুকি বাংলাদেশের বাজেটের একটা বড় অংশ খেয়ে ফেলে। এই টাকা দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করা যেত। কিন্তু সেটা হচ্ছে না।
সার ভর্তুকি মোট বাজেটের ৩-৫% গ্রাস করে। ২০২২ সালে এটা ৫.৫% ছুঁয়েছিল। তুলনা করুন: বাংলাদেশ স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করে বাজেটের ৫.৪%। মানে সারে ভর্তুকি দিতে গিয়ে যে টাকা ব্যয় হয়, সেটা পুরো স্বাস্থ্য বাজেটের সমান। এটা একটা সুযোগ ব্যয় (opportunity cost) যেটা কেউ হিসাব করে না।
প্রশ্ন হলো, এই ভর্তুকি কি টেকসই? উত্তর: না। বৈশ্বিক সারের দাম বাড়লে ভর্তুকি বাড়ে, বাজেট ঘাটতি বাড়ে, ঋণ বাড়ে। এটা একটা দুষ্টচক্র। কিন্তু ভর্তুকি কমানোর কথা বললে কৃষক বিক্ষোভ করে, রাজনৈতিক দল সুযোগ নেয়, সরকার পিছু হটে। ফলে একটা অকার্যকর ব্যবস্থা চলতেই থাকে।
অন্য দেশগুলো কী করছে?
ভারত ২০১৮ সালে Neem-coated urea বাধ্যতামূলক করেছে, যা ইউরিয়ার অপচয় ১০-১৫% কমিয়েছে। ইন্দোনেশিয়া Smart Subsidy Card চালু করেছে, যেখানে শুধু নিবন্ধিত কৃষকই ভর্তুকি পায়। মালয়েশিয়া ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠায় (Direct Benefit Transfer)। আর বাংলাদেশ? বাংলাদেশ এখনো ডিলার-ভিত্তিক বিতরণ ব্যবস্থায় আটকে আছে, যেখানে ভর্তুকির একটা বড় অংশ মধ্যস্বত্বভোগীরা চুরি করে।
পর্ব ৫: জৈব সারের স্বপ্ন আর বাস্তবতা
সবাই বলে জৈব সার ব্যবহার বাড়ান। কম্পোস্ট করুন। ভার্মিকম্পোস্ট করুন। কিন্তু বাস্তবতা কী?
বাংলাদেশে জৈব কৃষির অংশ মোট কৃষিজমির ১% এরও কম। ভারতে ৩%, থাইল্যান্ডে ৫%, ডেনমার্কে ১২%। বাংলাদেশে জৈব সার ব্যবহার নগণ্য কেন? কারণ একটাই: রাসায়নিক সার সস্তা (ভর্তুকি দেওয়া), আর জৈব সার তুলনামূলক দামি এবং পরিশ্রমসাধ্য।
সরকার যখন ইউরিয়ায় ভারী ভর্তুকি দেয়, তখন কৃষকের কোনো প্রণোদনা থাকে না জৈব সার ব্যবহার করার। কেন সে কষ্ট করে কম্পোস্ট বানাবে যদি সরকার প্রায় বিনামূল্যে ইউরিয়া দেয়? ভর্তুকি নীতি নিজেই জৈব কৃষির সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এটা একটা নীতিগত বৈপরীত্য। এক হাতে সরকার বলছে "জৈব কৃষি বাড়ান", অন্য হাতে রাসায়নিক সারে বিশাল ভর্তুকি দিচ্ছে। বাজারকে এভাবে বিকৃত করলে কৃষক স্বাভাবিকভাবেই সস্তা বিকল্প বেছে নেবে।
পর্ব ৬: সমাধানের রূপরেখা
সমস্যাটা জটিল, কিন্তু অমীমাংসেয় না। কয়েকটা পথ দেখা যায়।
- সরাসরি নগদ স্থানান্তর (DBT)। ডিলার ব্যবস্থা বাদ দিন। ভর্তুকির টাকা সরাসরি কৃষকের বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্টে পাঠান। ভারত এটা করেছে তাদের PM-KISAN প্রকল্পে। বাংলাদেশের ডিজিটাল আইডি আর মোবাইল ব্যাংকিং পরিকাঠামো যথেষ্ট পরিপক্ব এটা করার জন্য। এতে ডিলার পর্যায়ের দুর্নীতি বন্ধ হবে, আর কৃষক নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কোন সার কিনবে।
- Neem-coated urea বাধ্যতামূলক করা। নিম প্রলেপযুক্ত ইউরিয়া ধীরে ধীরে নাইট্রোজেন ছাড়ে, ফলে কম সারে বেশি কাজ হয়। ভারতে এটা বাধ্যতামূলক করার পর ইউরিয়ার অপচয় ১০-১৫% কমেছে, অবৈধ ব্যবহার (শিল্পে, মাছ চাষে) কমেছে। বাংলাদেশে এই সহজ পদক্ষেপটা এখনো নেওয়া হয়নি।
- মৃত্তিকা পরীক্ষা ভিত্তিক সুপারিশ। SRDI (Soil Resource Development Institute) প্রতিটা ইউনিয়নে মাটি পরীক্ষা করে সার সুপারিশ দিতে পারে। কিন্তু SRDI-র জনবল অপ্রতুল, বাজেট সীমিত। ডিজিটাল মৃত্তিকা মানচিত্র (Digital Soil Map) তৈরি করে কৃষকের ফোনে সার সুপারিশ পাঠানো সম্ভব। প্রযুক্তি আছে, ইচ্ছা নেই।
- জৈব সারে ভর্তুকি দেওয়া। রাসায়নিক সারের ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে সেই টাকা জৈব সারে ভর্তুকি দিন। কম্পোস্ট উৎপাদকদের প্রণোদনা দিন। ভার্মিকম্পোস্ট কারখানায় বিনিয়োগ করুন। দশ বছরের মধ্যে রাসায়নিক সারের ভর্তুকি অর্ধেকে নামিয়ে সেই টাকা জৈব কৃষি প্রসারে ব্যবহার করা সম্ভব।
- আমদানি নির্ভরতা কমানো। দেশীয় সার কারখানাগুলো আধুনিকায়ন করুন। যমুনা, চিটাগাং, আশুগঞ্জ কারখানা পুরনো আর অদক্ষ। নতুন কারখানা স্থাপন বা পুরনো কারখানা আপগ্রেড করলে আমদানি নির্ভরতা কমবে, বৈশ্বিক দাম ওঠানামার ধাক্কা কমবে।
ফিরে যাই করিম চাচার কাছে। করিম চাচা জানে না ভর্তুকি কী, DBT কী, Neem-coated urea কী। সে জানে একটাই জিনিস: বোরো মৌসুমে সার দরকার, আর সার পেতে লাইনে দাঁড়াতে হয়, ডিলারকে তোষামোদ করতে হয়, বেশি দাম দিতে হয়।
করিম চাচা আরো একটা জিনিস জানে, যেটা সে তার বাবার কাছ থেকে শুনেছে। বাবা বলতো, "আগে সার ছাড়াই ফলন ভালো হতো। মাটিতে জোর ছিল।" সেই জোর এখন নেই। মাটি ক্লান্ত। প্রতি বছর বেশি সার দিতে হচ্ছে, ফলন সেই একই। খরচ বাড়ছে, লাভ কমছে।
বাংলাদেশের কৃষি একটা সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাসায়নিক সারের উপর অন্ধ নির্ভরতা আর অকার্যকর ভর্তুকি ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু তাতে মাটি মরবে, বাজেট ভারী হবে, আর করিম চাচার মতো প্রান্তিক চাষি ক্রমশ প্রান্তিক থেকে যাবে।
অথবা আমরা ব্যবস্থাটা ঠিক করতে পারি। ভর্তুকি যাদের দরকার তাদের কাছে পৌঁছাতে পারি। মাটিকে বাঁচাতে পারি। কৃষককে সত্যিকারের সাহায্য করতে পারি।
পছন্দটা আমাদের।