Back to publications
Narrative 2026-03-06

জেলেদের ঋণ ফাঁদ: সমুদ্রে গেলেও মুক্তি নেই

দাদন ব্যবস্থা, ইলিশ নিষেধাজ্ঞা, আর প্রান্তিক জীবন

জেলেদের ঋণ ফাঁদ: সমুদ্রে গেলেও মুক্তি নেই

পর্ব ১: জালের ওপাশে

তার নাম করিম। বয়স ৪২। পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। বাবাও জেলে ছিলেন, দাদাও। তিন প্রজন্ম ধরে একই পেশা, একই দারিদ্র্য।

করিম সমুদ্রে যাওয়ার আগে মহাজনের কাছ থেকে ধার নেয়। এটাকে বলে "দাদন"। মহাজন ৫০ হাজার টাকা দেয়, শর্ত একটাই: মাছ ধরে ফিরলে সব মাছ তাকেই বিক্রি করতে হবে, তার ঠিক করা দামে। বাজারে যে মাছের কেজি ৮০০ টাকা, মহাজন দেয় ৩০০। করিম জানে এটা অন্যায়। কিন্তু দাদন না নিলে নৌকার জ্বালানি কেনার টাকা নেই, জাল মেরামতের টাকা নেই, পরিবারের খাওয়ার টাকা নেই।

কিন্তু দাদন না নিলে নৌকার জ্বালানি কেনার টাকা নেই, জাল মেরামতের টাকা নেই, পরিবারের খাওয়ার টাকা নেই।
৩.৫%
জালের ওপাশে
৭০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাক
দাদনের শিকল
২.৭৯ লাখ
ইলিশের রাজনীতি

করিম একা না। বাংলাদেশে প্রায় ২০ লাখ জেলে এই একই ফাঁদে আটকা। তাদের কেউ সমুদ্রে যায়, কেউ নদীতে, কেউ বিলে। কিন্তু ফাঁদ সবার একই: দাদন।

বাংলাদেশ "মাছে-ভাতে বাঙালি"। এই প্রবাদ হাজার বছরের। মৎস্য খাতে জিডিপির ৩.৫% আসে, কৃষিজ জিডিপির প্রায় ২৬%। বিশ্বে অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয়, চীন আর ভারতের পরে। কিন্তু যারা এই মাছ ধরে, তাদের জীবন কেমন?

উত্তরটা ভয়াবহ। বাংলাদেশের জেলে সম্প্রদায়ের ৮০% দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। জাতীয় দারিদ্র্যহার যখন ১৮.৭%, জেলেদের মধ্যে সেটা ৪৫% এর উপরে। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পেশাজীবী গোষ্ঠীগুলোর একটা হলো জেলেরা।

কেন? উত্তরটা শুরু হয় দাদন থেকে।


পর্ব ২: দাদনের শিকল

দাদন ব্যবস্থা কোনো নতুন জিনিস না। শত বছর ধরে বাংলাদেশের উপকূলীয় আর নদীতীরবর্তী অঞ্চলে এটা চলে আসছে। কিন্তু এটা ঠিক কীভাবে কাজ করে?

মহাজন (যাকে স্থানীয়ভাবে "দাদনদার" বা "আড়তদার" বলে) মাছ ধরার মৌসুমের শুরুতে জেলেকে অগ্রিম টাকা দেয়। এই টাকায় জেলে জাল কেনে, নৌকা মেরামত করে, পরিবারের জন্য চাল-ডাল কেনে। বিনিময়ে জেলে চুক্তিবদ্ধ হয় যে সমস্ত মাছ শুধু সেই মহাজনের কাছেই বিক্রি করবে, মহাজনের ধার্য করা দামে।

গড়ে একজন সামুদ্রিক জেলে ৭০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকা দাদন নেয়। সুদের হার? ব্যাংকে যেখানে ৯-১২%, দাদনে সেটা ৬০-১২০%। হ্যাঁ, ঠিক পড়েছেন। প্রকৃত সুদের হার (মাছের বাজারমূল্য আর মহাজনের দেওয়া মূল্যের পার্থক্য হিসাব করলে) ষাট থেকে একশো বিশ শতাংশ।

কিন্তু সমস্যা শুধু সুদে না। সমস্যা হলো এই চক্র থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। জেলে এক মৌসুমে দাদন শোধ করতে পারে না, পরের মৌসুমে আরো বেশি ধার করতে হয়। বাবার ঋণ ছেলের ঘাড়ে চাপে। করিমের বাবা যে দাদন নিয়েছিলেন, তার একটা অংশ এখনো করিমের ঘাড়ে।

ফলাফল? জেলে কার্যত মহাজনের বন্ধুয়া শ্রমিক হয়ে যায়। সে স্বাধীনভাবে মাছ বিক্রি করতে পারে না, নৌকা বদলাতে পারে না, পেশা ছাড়তে পারে না। দাদন শোধ না হওয়া পর্যন্ত সে আটকা।

এখানেই আসল প্রশ্ন: ব্যাংক ঋণ পেলে তো জেলেরা দাদন থেকে মুক্তি পেতে পারতো? তত্ত্বগতভাবে হ্যাঁ। বাস্তবে? মাত্র ৮-১২% জেলে আনুষ্ঠানিক ব্যাংক ঋণ পায়। বাকি ৮৮% পুরোপুরি দাদন বা অনানুষ্ঠানিক ঋণের উপর নির্ভরশীল। কেন? কারণ জেলেদের জামানত নেই। তাদের জমি নেই, স্থায়ী সম্পদ নেই। ব্যাংক তাদের "ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগ্রহীতা" মনে করে। আর মহাজন? সে কোনো কাগজপত্র চায় না, জামানত চায় না। শুধু চায় আপনার শ্রম, আপনার মাছ, আপনার স্বাধীনতা।


পর্ব ৩: ইলিশের রাজনীতি

ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। বাঙালি সংস্কৃতিতে ইলিশের স্থান অনন্য। কিন্তু ইলিশ ধরা জেলেদের জন্য এটা শুধু সংস্কৃতি না, এটা জীবিকা। আর সেই জীবিকায় সরকার প্রতি বছর ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেয়।

মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ২২ দিন (জাটকা সংরক্ষণ) এবং অক্টোবরে মা ইলিশ রক্ষায় আরো ২২ দিন। এছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে অঞ্চলভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা মিলিয়ে মোট ৬৫ দিন জেলেরা সমুদ্রে বা নদীতে ইলিশ ধরতে পারে না।

নিষেধাজ্ঞার পেছনের যুক্তি সঠিক। ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখলে ভবিষ্যতে ইলিশের মজুদ বাড়বে। আর এটা কাজও করেছে। ২০০৫ সালে ইলিশ উৎপাদন ছিল ২.৭৯ লাখ মেট্রিক টন, ২০২৪ সালে সেটা বেড়ে হয়েছে ৫.৭৫ লাখ মেট্রিক টন। প্রায় দ্বিগুণ। মৎস্যবিজ্ঞানের দিক থেকে এটা একটা বিশাল সাফল্য।

কিন্তু জেলেদের দিক থেকে? ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ মানে ৬৫ দিন আয় শূন্য।

সরকার নিষেধাজ্ঞার সময় জেলে পরিবারপ্রতি ৪০ কেজি চাল আর ভিজিএফ কার্ড দেয়। কিন্তু একটা পরিবারের মাসিক খরচ যেখানে ৮,০০০-১২,০০০ টাকা, সেখানে ৪০ কেজি চালের (বাজারমূল্য ২,০০০ টাকা) সাহায্য কতটুকু? বাকি টাকা কোথা থেকে আসবে? মহাজনের কাছ থেকে। আবার দাদন। আবার ঋণের চক্র।

ইলিশ নিষেধাজ্ঞা পরিবেশগতভাবে সফল, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে এটা জেলেদের আরো গভীর ঋণ ফাঁদে ঠেলে দিচ্ছে। এই দুটো লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখার কোনো কার্যকর পরিকল্পনা নেই।


পর্ব ৪: মাছের দাম কে পায়?

করিম সমুদ্র থেকে ইলিশ ধরে আনে। সেই ইলিশ ঢাকার কারওয়ান বাজারে কেজি ১,২০০-১,৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। করিম পায় কত? কেজি ৩০০-৪০০ টাকা। মানে খুচরা মূল্যের ২৫-৩০%।

বাকি ৭০-৭৫% কোথায় যায়?

মাছ জেলের নৌকা থেকে ভোক্তার থালায় পৌঁছাতে চার-পাঁচটা হাত ঘোরে। প্রথমে আড়তদার (মহাজন), তারপর পাইকার, তারপর পরিবহনকারী, তারপর শহরের আড়তদার, সবশেষে খুচরা বিক্রেতা। প্রতিটা ধাপে মুনাফা যোগ হয়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নেয় জেলে (সমুদ্রে ঝড়, দুর্ঘটনা, শূন্য হাতে ফেরা), কিন্তু সবচেয়ে কম লাভ পায় সে-ই।

এটা শুধু ইলিশের গল্প না। চিংড়ি, রূপচাঁদা, পমফ্রেট, সব মাছের ক্ষেত্রে একই চিত্র। জেলে খুচরা মূল্যের ২০-৩০% পায়, বাকিটা মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যায়।

আর ইলিশ যখন রপ্তানি হয়? সেই হিসাব আরো ভয়ংকর।

বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৪,০০০-৫,০০০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানি করে, মূলত ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকায়। রপ্তানি আয় প্রায় ৩০০-৪০০ কোটি টাকা। কিন্তু এই আয়ের কতটুকু জেলে পায়? ১০-১৫%। রপ্তানিকারক, প্রক্রিয়াজাতকারী, আর মধ্যস্বত্বভোগীরা সিংহভাগ নিয়ে যায়।


পর্ব ৫: সমুদ্র আর দারিদ্র্য

বাংলাদেশের জেলেদের দুটো জগৎ আছে: সামুদ্রিক আর অভ্যন্তরীণ। দুই জগতের চিত্র আলাদা, কিন্তু দারিদ্র্য সবখানে।

সামুদ্রিক জেলেরা বেশি ঝুঁকি নেয়। তারা সপ্তাহের পর সপ্তাহ সমুদ্রে থাকে। ঝড়ে নৌকা ডোবে, মানুষ মারা যায়। ২০২৩ সালে ঘূর্ণিঝড় মোখায় কক্সবাজার আর সেন্টমার্টিনের শত শত জেলে নৌকা ধ্বংস হয়েছিল। কিন্তু আয়? সামুদ্রিক জেলের মাসিক আয় ৮,০০০-১২,০০০ টাকা। অভ্যন্তরীণ জেলে? ৫,০০০-৮,০০০ টাকা। দুটোই জাতীয় গড় আয়ের অনেক নিচে।

জেলে সম্প্রদায়ে দারিদ্র্যহার ৪৫%, যেখানে জাতীয় গড় ১৮.৭%। চরম দারিদ্র্যহার (দিনে ১.৯ ডলারের কম আয়) জেলেদের মধ্যে ২৫%, জাতীয় গড়ের (৫.৬%) প্রায় সাড়ে চার গুণ। তাদের সন্তানদের স্কুলে যাওয়ার হার জাতীয় গড়ের চেয়ে ২০-২৫ শতাংশ পয়েন্ট কম। স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশ প্রায় শূন্য। উপকূলীয় অঞ্চলে হাসপাতাল দূরে, আর যেতে হলে নৌকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ।

আর জলবায়ু পরিবর্তন এই দারিদ্র্যকে আরো গভীর করছে।

গত দুই দশকে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বেড়েছে। সাইক্লোন সিডর (২০০৭), আইলা (২০০৯), আম্ফান (২০২০), মোখা (২০২৩)। প্রতিটা ঘূর্ণিঝড় জেলেদের নৌকা ভাঙে, জাল নষ্ট করে, ঘরবাড়ি ধ্বংস করে। ঝড়ের পর আবার শুরু থেকে শুরু। আবার মহাজনের কাছে, আবার দাদন, আবার ঋণের চক্র।

ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বছরে গড়ে ৩০-৪৫ দিন সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ থাকে। ইলিশ নিষেধাজ্ঞার ৬৫ দিনের সাথে যোগ করলে বছরে প্রায় ১০০ দিন জেলেরা কাজ করতে পারে না। বছরের প্রায় একতৃতীয়াংশ আয় শূন্য।


পর্ব ৬: জাল ছেঁড়া, কিন্তু জোড়া লাগানো সম্ভব

করিমের গল্পে ফিরে আসি। তার বয়স ৪২, আর সে জানে তার ছেলেও জেলে হবে। কারণ অন্য কিছু করার সুযোগ নেই। শিক্ষা নেই, দক্ষতা নেই, পুঁজি নেই। দাদনের ঋণ আছে।

কিন্তু এটা অবধারিত নিয়তি না। কিছু জিনিস বদলানো সম্ভব।

প্রথমত, দাদন ভাঙতে হলে বিকল্প ঋণ ব্যবস্থা দরকার। বাংলাদেশে মাইক্রোক্রেডিটের বিশাল অবকাঠামো আছে (গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা)। কিন্তু জেলেদের জন্য বিশেষায়িত ঋণ কর্মসূচি নেই বললেই চলে। মৎস্য ঋণের জন্য জামানত ছাড়া গ্রুপ-ভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। ভারতের কেরালায় "মৎস্যফেড" মডেলে এটা সফল হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, মধ্যস্বত্বভোগী কমাতে হবে। জেলেদের সরাসরি বাজারে প্রবেশাধিকার দিতে হবে। মোবাইল অ্যাপ ভিত্তিক মাছের বাজার (যেমন ভারতের "ফিশমাও"), হিমাগার ও কোল্ড চেইন অবকাঠামো, জেলে সমবায়ের মাধ্যমে সরাসরি বিক্রয়। এগুলো প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন না, দরকার শুধু নীতি সহায়তা আর বিনিয়োগ।

তৃতীয়ত, ইলিশ নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প জীবিকা দরকার। ৪০ কেজি চাল দিয়ে হবে না। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের জন্য "ক্যাশ ফর ওয়ার্ক" প্রোগ্রাম, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ (শুঁটকি, ফিশ ফিড) প্রশিক্ষণ, উপকূলীয় পর্যটনে সম্পৃক্তকরণ। এগুলো করা সম্ভব।

চতুর্থত, জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে হবে। ঝড় সহনশীল নৌকা, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, মৎস্য বীমা (ক্রপ ইন্স্যুরেন্সের মতো)। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় মৎস্য বীমা চালু আছে, বাংলাদেশে নেই।

পঞ্চমত, জেলেদের সন্তানদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দারিদ্র্যের আন্তঃপ্রজন্ম চক্র ভাঙার একমাত্র পথ শিক্ষা। উপকূলীয় অঞ্চলে বিশেষ শিক্ষা বৃত্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, এগুলো বিনিয়োগ, ব্যয় না।


করিম আজ রাতে আবার সমুদ্রে যাবে। অন্ধকার পানিতে জাল ফেলবে। হয়তো ভালো মাছ পাবে, হয়তো পাবে না। কিন্তু মাছ পেলেও সেটা মহাজনকে দিতে হবে, মহাজনের দামে। ঋণ কমবে না, বরং সুদে বাড়বে।

বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মৎস্য উৎপাদনকারী। মৎস্য খাতে বছরে রপ্তানি আয় ৪,০০০ কোটি টাকার বেশি। ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম, বিশ্বের ৮৬% ইলিশ বাংলাদেশের। এই বিশাল শিল্পের ভিত্তি হলো করিম আর তার মতো ২০ লাখ জেলে। তাদের শ্রমে মাছ ধরা হয়, তাদের ঝুঁকিতে ইলিশ আসে আমাদের থালায়।

তারা প্রাপ্য পায় না। ন্যায্যমূল্য পায় না। ঋণমুক্তি পায় না। ঝড়ের আগে সতর্কতা পায়, কিন্তু ঝড়ের পরে পুনর্বাসন পায় না।

"মাছে-ভাতে বাঙালি" বলতে আমরা গর্ব করি। কিন্তু যারা সেই মাছ ধরে, তাদের ভাতের নিশ্চয়তাটুকু আমরা দিতে পারি না। এটা শুধু জেলেদের ব্যর্থতা না, এটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। নীতির ব্যর্থতা। আমাদের সবার ব্যর্থতা।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50