বন্যা এলে কার লাভ, কার ক্ষতি?
পর্ব ১: হালিমের জমি
হালিম শেখ সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলায় থাকে। যমুনা নদীর পাড়ে, চরে, যেখানে মাটি আলগা আর নদী প্রতি বছর নতুন রূপ নেয়। হালিমের তিন বিঘা জমি। আষাঢ়ে যমুনা ফুলে ওঠে, হালিমের জমি ডোবে। কার্তিকে পানি নামে, ফিরে আসে পলিমাটি। সেই পলিতে হালিম বোরো ধান লাগায়, সরিষা লাগায়, আলু লাগায়। ফলনও ভালো হয়।
কিন্তু ২০২৪ সালে বন্যা অন্যরকম ছিল। আষাঢ়ের আগেই এসেছিল, জ্যৈষ্ঠ মাসে। পানি উঠেছিল এত দ্রুত যে হালিমের পাটক্ষেতে পানি ঢুকে গেল, পাট পচে গেল। গোয়ালের গরু সরাতে পারেনি, একটা বাছুর তলিয়ে গেছে। ঘরের টিনের চালা পর্যন্ত পানি উঠেছিল। হালিম পরিবার নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে গেছে, দশ দিন ছিল সেখানে। ফিরে এসে দেখেছে জমির ফসল নেই, ঘরের মেঝেতে কাদা, টিউবওয়েলে ময়লা পানি।
হালিম বলে, "বন্যা আমাদের দেয়ও, নেয়ও। কিন্তু এখন নেওয়াটা বেশি হচ্ছে।"
এই কথাটার মধ্যে বাংলাদেশের বন্যার পুরো অর্থনীতি লুকিয়ে আছে। বন্যা এই দেশের জন্য শুধু দুর্যোগ না। এটা একটা জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণ, যেখানে ক্ষতি আছে, লাভও আছে, কিন্তু ক্ষতি আর লাভ সমান ভাবে বণ্টিত হয় না। কে লাভবান হয়, কে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেটা নির্ভর করে আপনি কোথায় থাকেন, কতটুকু আপনার আছে, আর সরকার আপনাকে কতটুকু সুরক্ষা দেয়।
প্রথমে ক্ষতির চিত্রটা দেখুন।
গত দশ বছরে বাংলাদেশে বন্যায় বার্ষিক ক্ষতি গড়ে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। ২০১৭ সালে ছিল ২.৮ বিলিয়ন। ২০২৪ সালে ৩.১ বিলিয়ন। এই সংখ্যাগুলো শুধু সরাসরি ক্ষতি, ফসল নষ্ট, বাড়িঘর ভাঙা, রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত, গবাদি পশু হারানো। পরোক্ষ ক্ষতি, যেমন কাজ হারানো, স্কুল বন্ধ থাকা, স্বাস্থ্যসমস্যা, সেগুলো ধরলে সংখ্যা আরো বড়।
আর কতটুকু এলাকা প্লাবিত হচ্ছে?
স্বাভাবিক বছরে দেশের ২০-২৫% ভূমি বন্যায় প্লাবিত হয়। বড় বন্যায় এটা ৪০-৭০% পর্যন্ত যায়। ১৯৯৮ সালে ৬৮% দেশ ডুবেছিল। ২০০৪ সালে ৩৮%। ২০১৭ সালে ৩২%। ২০২৪ সালে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, ফেনী মিলিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল।
পর্ব ২: বন্যার দুই মুখ
কিন্তু বন্যার গল্প শুধু ক্ষতির গল্প না। এটা বোঝা দরকার। বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র আর মেঘনা, তিনটা বিশাল নদী এখানে এসে মিশেছে। এই নদীগুলো প্রতি বছর হিমালয় থেকে কোটি কোটি টন পলি বয়ে আনে। সেই পলি জমিতে পড়ে, জমিকে উর্বর করে। বাংলাদেশের কৃষির উৎপাদনশীলতা এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে বেশি, তার একটা বড় কারণ এই পলিমাটি।
এখন একটা অদ্ভুত তথ্য দেখুন।
লক্ষ্য করুন, বন্যার পরের বছর ফসলের ফলন প্রায় সবসময় আগের বছরের চেয়ে বেশি। ২০১৭ সালে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল, কিন্তু ২০১৮ সালে বোরো ধানের ফলন ছিল রেকর্ড। ২০২০ সালের বন্যার পর ২০২১ সালে একই চিত্র। কারণটা সহজ: বন্যার পানি সরে গেলে পলিমাটি থাকে। সেই পলিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সব আছে। কৃষককে সার কম দিতে হয়। ফলন ভালো হয়।
এটাই বন্যার দ্বৈত চরিত্র। একদিকে সে ধ্বংস করে, অন্যদিকে সে গড়ে। সমস্যা হলো, ধ্বংস আর গড়ার মধ্যে সময়ের ফারাক আছে। ধ্বংসটা হয় তাৎক্ষণিক: ফসল নষ্ট, ঘর ভাঙা, জীবন হারানো। গড়াটা হয় পরের মৌসুমে: ভালো ফলন, উর্বর মাটি। যে কৃষক বন্যায় সব হারিয়েছে, পরের মৌসুমে ভালো ফলনের সুযোগ নিতে তার হাতে পুঁজি থাকে না। বীজ কেনার টাকা নেই, সার কেনার টাকা নেই। সে ঋণ নেয়, মহাজনের কাছ থেকে, উচ্চ সুদে। ফলন ভালো হলেও লাভের বড় অংশ সুদ শোধে চলে যায়।
ফলে বন্যার "লাভ" কার হয়? যার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আছে, তার। বড় জমির মালিক, যে বন্যায় কিছু হারালেও পরের মৌসুমে নিজের পুঁজিতে চাষ করতে পারে। আর ক্ষতি কার হয়? হালিমের মতো প্রান্তিক চাষির, যে বন্যায় সব হারিয়ে ঋণের ফাঁদে পড়ে।
পর্ব ৩: বীমার শূন্যতা
এই পুরো সমীকরণে একটা জিনিস নেই যেটা থাকলে সব বদলে যেত: বীমা।
উন্নত দেশে কৃষক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল হারালে বীমা থেকে ক্ষতিপূরণ পায়। আমেরিকায় ফেডারেল ক্রপ ইন্স্যুরেন্স প্রোগ্রাম ৮৯% ফসলি জমি কভার করে। ভারতে প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা (PMFBY) চালু হয়েছে ২০১৬ সালে, যেটা এখন প্রায় ৩০% কৃষককে কভার করে। বাংলাদেশে?
বাংলাদেশে ফসল বীমার কভারেজ ১% এরও কম। প্রায় শূন্য। ১৬ কোটি মানুষের দেশে, যেখানে জিডিপির ১১% আসে কৃষি থেকে, যেখানে প্রতি বছর বন্যায় শত শত কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়, সেখানে কৃষি বীমা নেই বললেই চলে। সমলয় নামে একটা পাইলট প্রকল্প আছে, কিন্তু সেটা মাত্র কয়েকটা উপজেলায় সীমাবদ্ধ। গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের আবহাওয়া-ভিত্তিক ইনডেক্স বীমা আছে, কিন্তু সেটাও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। বিশ্বব্যাংক আর আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো বছরের পর বছর বলছে বাংলাদেশে কৃষি বীমা দরকার। হচ্ছে না।
কেন হচ্ছে না? কারণগুলো জটিল। প্রথমত, বীমা কোম্পানিগুলো কৃষি বীমাকে লাভজনক মনে করে না, কারণ ঝুঁকি অনেক বেশি। দ্বিতীয়ত, কৃষকদের বীমা সম্পর্কে ধারণা কম। তৃতীয়ত, প্রিমিয়াম দেওয়ার সামর্থ্য নেই অধিকাংশ কৃষকের। চতুর্থত, ক্ষতি যাচাইয়ের জন্য যে অবকাঠামো দরকার, যেমন উপগ্রহ চিত্র, আবহাওয়া স্টেশন, ফিল্ড এজেন্ট, সেটা নেই।
ফলে বন্যায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে কী করে? সরকারি ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করে। ত্রাণ আসে, কিন্তু দেরিতে, অল্প পরিমাণে, আর অনেক সময় সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছায় না। হালিম ২০২৪ সালের বন্যায় সরকারি ত্রাণ হিসেবে পেয়েছে ১০ কেজি চাল আর ৫০০ টাকা। তার ক্ষতি হয়েছে ৮০,০০০ টাকার বেশি। এই ফারাকটা কে পূরণ করবে?
পর্ব ৪: কত মানুষ, কোন খাত
২০২৪ সালের বন্যা পুরনো প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এনেছে। প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। এটা কোনো ব্যতিক্রম না। প্রতি বড় বন্যায় লাখ লাখ মানুষ ঘর ছাড়ে।
বন্যায় বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা গত দুই দশকে স্পষ্টতই বাড়ছে। কারণ দুটো: একদিকে বন্যার তীব্রতা বাড়ছে, অন্যদিকে বন্যাপ্রবণ এলাকায় জনসংখ্যা বাড়ছে। চরাঞ্চলে, হাওরে, নিচু জমিতে মানুষ থাকছে কারণ অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।
বন্যার ক্ষতি কোন খাতে কতটুকু হয়, সেটাও দেখা দরকার।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় কৃষি খাতে, মোট ক্ষতির প্রায় ৩৫-৪০%। তারপর অবকাঠামো, রাস্তা, সেতু, কালভার্ট, এগুলো, প্রায় ২৫%। বাড়িঘর ২০%। আর বাকিটা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প মিলিয়ে।
কিন্তু ক্ষতির পর পুনরুদ্ধারে কত খরচ হয়?
এখানে একটা ভয়ংকর প্যাটার্ন আছে। বন্যার সরাসরি ক্ষতি যত, পুনরুদ্ধারের খরচ তার প্রায় দ্বিগুণ। কারণ ক্ষতিটা শুধু "ভাঙা" না। ক্ষতির পরে আবার গড়তে হয়, সেটার খরচ আলাদা। রাস্তা ভাঙলে শুধু রাস্তা মেরামত না, নতুন করে তৈরি করতে হয়। ফসল নষ্ট হলে শুধু ফসলের দাম না, পরের মৌসুমের বীজ, সার, সেচ, সব নতুন করে বিনিয়োগ। টিউবওয়েল দূষিত হলে নতুন টিউবওয়েল বসাতে হয়। স্কুল ডুবলে মেরামত করতে হয়, আসবাবপত্র কিনতে হয়, বই কিনতে হয়।
পর্ব ৫: আগাম সতর্কতা আর আন্তর্জাতিক তুলনা
একটা জায়গায় বাংলাদেশ আসলে বেশ ভালো করেছে: বন্যার আগাম সতর্কতা। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কতা কেন্দ্র (FFWC) গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে।
১৯৯৮ সালে বন্যার পূর্বাভাস সময় ছিল মাত্র ২৪ ঘণ্টা। এখন সেটা ৫ দিন পর্যন্ত। স্যাটেলাইট ডেটা, নদী মনিটরিং স্টেশন, আর কম্পিউটার মডেলিং মিলিয়ে FFWC এখন আঞ্চলিক পর্যায়ে বেশ নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে পারে। মোবাইল ফোনে SMS সতর্কতা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। কমিউনিটি ভলান্টিয়াররা তথ্য ছড়িয়ে দেয়। এই ব্যবস্থার কারণে বন্যায় মৃত্যুর সংখ্যা গত ত্রিশ বছরে নাটকীয়ভাবে কমেছে। ১৯৯৮ সালের বন্যায় ১,১০০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। ২০২৪ সালের বন্যায়, যেটা তীব্রতায় কম ছিল না, মৃত্যু ছিল তুলনামূলক অনেক কম।
কিন্তু আগাম সতর্কতা জীবন বাঁচায়, সম্পদ বাঁচায় না। মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারে, কিন্তু জমি, ঘর, গবাদিপশু সরানো সম্ভব না।
এখন বন্যার ধরন কীভাবে বদলাচ্ছে সেটা দেখুন।
বন্যার ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ছে, বিশেষ করে "অস্বাভাবিক সময়ে" বন্যা। আগে বন্যা ছিল আষাঢ়-শ্রাবণের ব্যাপার। এখন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠেও আকস্মিক বন্যা হচ্ছে। হাওর অঞ্চলে এপ্রিলে বন্যা একটা নতুন বাস্তবতা, যেটা বোরো ধান কাটার ঠিক আগে আসে আর পুরো ফসল ধ্বংস করে। ২০১৭ সালের হাওরের বন্যায় প্রায় ২ লাখ হেক্টর বোরো ধান নষ্ট হয়েছিল। ২০২২ সালে সিলেটে জুনে অভূতপূর্ব বন্যা হয়েছিল, যেটা "বছরে দুইবার বন্যা" ধারণাটাকে বাস্তবে পরিণত করেছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন আছে। হিমালয়ের বরফ গলার ধরন বদলাচ্ছে। মৌসুমি বৃষ্টির প্যাটার্ন অনিয়মিত হচ্ছে। উজানে ভারতের বাঁধ থেকে পানি ছাড়ার সময়সূচি পাল্টাচ্ছে।
এবার আন্তর্জাতিক তুলনা দেখুন।
নেদারল্যান্ডস, জাপান আর বাংলাদেশ, তিনটাই বন্যাপ্রবণ দেশ। কিন্তু ফলাফল কত আলাদা। নেদারল্যান্ডসের এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে। তারা ডেল্টা ওয়ার্কস প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে ১৩ বিলিয়ন ডলার। ফলাফল? বন্যায় ক্ষতি জিডিপির ০.০১% এরও কম। জাপান প্রতি বছর বন্যা নিয়ন্ত্রণে জিডিপির ০.৮% ব্যয় করে। বাংলাদেশ? ০.১%-এরও কম। নেদারল্যান্ডসের মাথাপিছু বন্যা প্রতিরক্ষা ব্যয় ১,২০০ ডলার। বাংলাদেশের? ৪ ডলারের কম।
সমস্যাটা শুধু টাকার না। কিন্তু টাকা ছাড়া সমাধান সম্ভব না।
পর্ব ৬: কী করা যায়?
হালিমের জমি পরের বছরও ডুববে। এটা বাংলাদেশের ভূগোল, বদলানো যাবে না। কিন্তু ডুবলে কী হবে, সেটা বদলানো যায়।
- ফসল বীমা জাতীয় পর্যায়ে চালু করতে হবে। ভারতের PMFBY মডেল থেকে শেখা যায়। সরকার প্রিমিয়ামের ৫০-৬০% ভর্তুকি দিলে কৃষকের পক্ষে বীমা কেনা সম্ভব। ইনডেক্স-ভিত্তিক বীমা ব্যবহার করলে ক্ষতি যাচাইয়ের জটিলতা কমে। উপগ্রহ ছবি থেকে বন্যার পরিধি মাপা যায়, প্রতিটা খেত আলাদা করে দেখতে হয় না। বিকাশ আর নগদ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ক্ষতিপূরণ সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে পাঠানো যায়।
- বন্যাপ্রবণ কৃষিকে পুনর্গঠন করতে হবে। ভাসমান সবজি চাষ বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্ভাবন। এটাকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া দরকার। বন্যা-সহিষ্ণু ধানের জাত (BRRI dhan52, BRRI dhan79) আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। হাওর অঞ্চলে বোরো ধানের আগাম জাত ব্যবহার করলে মার্চেই ধান কাটা সম্ভব, এপ্রিলের বন্যার আগে।
- বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নেদারল্যান্ডসের মতো ১৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। কিন্তু বাঁধ মেরামত, নদী ড্রেজিং, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নতি, এগুলোতে বর্তমান ব্যয়ের তিন-চার গুণ বিনিয়োগ দরকার। চীন আর জাপানের সাথে বন্যা ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সহযোগিতা বাড়ানো যায়।
- ত্রাণ ব্যবস্থাকে ডিজিটাল আর স্বচ্ছ করতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র আর মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়া সম্ভব। মাঝখানের দুর্নীতি কমবে, গতি বাড়বে।
আসুন ফিরে যাই সিরাজগঞ্জে। হালিম শেখের কাছে।
হালিম জানে না ইনডেক্স ইন্স্যুরেন্স কী। জানে না ডেল্টা ওয়ার্কস কী। জানে না FFWC কীভাবে পূর্বাভাস দেয়। সে জানে আষাঢ়ে পানি আসবে, কার্তিকে নামবে। জানে পানি নামলে মাটি ভালো থাকে, ফসল ভালো হয়। জানে এবারের বন্যা আগের চেয়ে বেশি ছিল। জানে পরের বারেরটা আরো বেশি হতে পারে।
হালিমের বাবাও চাষ করতো, দাদাও। তারা বন্যার সাথে বাঁচতে শিখেছিল। কিন্তু তাদের সময়ের বন্যা আর এই সময়ের বন্যা এক না। পানি বেশি আসছে, আগে আসছে, বেশিক্ষণ থাকছে। আর হালিমের হাতে সেই একই পুরনো হাতিয়ার: ধৈর্য, পরিশ্রম, আর ঈশ্বরের ওপর ভরসা। এগুলো যথেষ্ট ছিল একসময়। এখন আর যথেষ্ট না।
হালিমের দরকার একটা বীমা কার্ড, যেটায় লেখা থাকবে: বন্যায় ফসল নষ্ট হলে ক্ষতিপূরণ পাবেন। দরকার একটা আগাম সতর্কতা মেসেজ, যেটা ৫ দিন আগে আসবে। দরকার একটা বন্যা-সহিষ্ণু ধানের বীজ, যেটা ২ সপ্তাহ পানির নিচে থেকেও বাঁচবে। দরকার একটা শক্ত বাঁধ, যেটা যমুনার ভাঙন ঠেকাবে।
এগুলো অসম্ভব কিছু না। নেদারল্যান্ডস পেরেছে, জাপান পেরেছে, এমনকি ভিয়েতনাম পারছে। বাংলাদেশও পারবে। প্রশ্ন হলো, হালিম কি সেদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবে?
বন্যা এলে কার লাভ, কার ক্ষতি? এই প্রশ্নের উত্তর বদলানো আমাদের হাতে। বন্যা প্রকৃতির। কিন্তু বন্যার ক্ষতি থেকে মানুষকে বাঁচানো, সেটা নীতির কাজ, প্রযুক্তির কাজ, বিনিয়োগের কাজ। আর সেই কাজটা এখনই শুরু না করলে হালিমদের অপেক্ষা আর শেষ হবে না।