Back to publications
Narrative 2026-03-06

বন্যা বীমা: কেন কেউ কেনে না?

ফসল বীমা ১% এর নিচে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবই হারায় কৃষক

বন্যা বীমা: কেন কেউ কেনে না?

পর্ব ১: করিমের গল্প

করিম মিয়ার বাড়ি সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে। যমুনার পূর্ব তীরে। প্রতি বছর বর্ষায় নদীর পানি বাড়ে, কখনো মাঠে ওঠে, কখনো উঠোন পর্যন্ত। করিম মিয়া এটা জানে। তার বাবাও জানতো। তার দাদাও।

২০২৪ সালের আগস্টে পানি শুধু উঠোনে আসেনি, ঘরে ঢুকেছে। তিন ফুট পানি। ধানের গোলা ভেসে গেছে। দুটো গরু মারা গেছে। পাট শুকাতে দিয়েছিল, সব নষ্ট। হিসাব করলে ক্ষতি প্রায় দুই লাখ টাকা। করিম মিয়ার সারা বছরের আয় সাড়ে তিন লাখ।

বাংলাদেশের বীমা শিল্পের পুরো ছবিটা দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যায়।
৫০,০০০ টাকা
করিমের গল্প
০.৫%
বীমার শূন্যতা
প্রায় ৩,০০০ থেকে ৫,০০০
ক্ষতির হিসাব, সুরক্ষার অভাব

বন্যার পর করিম মিয়া কী করলো? প্রথমে মহাজনের কাছে গেলো। ১০% মাসিক সুদে ৫০,০০০ টাকা ধার নিলো। তারপর একটা গরু বিক্রি করলো, যেটা বেঁচে ছিল। তারপর স্ত্রীর গহনা বিক্রি করলো, বিয়ের সময়ের সোনার কানের দুল।

কেউ করিম মিয়াকে জিজ্ঞেস করেনি, "আপনার বীমা আছে?" কারণ এই প্রশ্নটা বাংলাদেশের গ্রামে অর্থহীন। বীমা কী, বেশিরভাগ কৃষক সেটাই জানে না। যারা জানে, তারা জানে এটা শহুরে মানুষের জিনিস। গাড়ির বীমা হয়, কারখানার বীমা হয়। কিন্তু ফসলের? গরুর? বাড়ির? না।

বাংলাদেশে ১.৬ কোটি কৃষক পরিবার আছে। তাদের মধ্যে কতজনের ফসল বীমা আছে? ১% এরও কম। সংখ্যাটা এতই ছোট যে এটাকে সংখ্যা না বলে "অনুপস্থিতি" বলাই ভালো।

এই চার্টটা দেখুন। বাংলাদেশে আবাদযোগ্য জমির মাত্র ০.৩% ফসল বীমার আওতায়। ভারতে এই সংখ্যা ৩০%, কারণ সেখানে প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা (PMFBY) আছে। চীনে ৭০%। থাইল্যান্ডে ১৫%। বাংলাদেশ এই তালিকায় তলানিতে। কেন? কারণ কয়েকটা। প্রথমত, সরকারি উদ্যোগ নেই বললেই চলে। ভারতে PMFBY একটা রাষ্ট্রীয় প্রকল্প, যেখানে সরকার প্রিমিয়ামের বড় অংশ ভর্তুকি দেয়। বাংলাদেশে এমন কোনো প্রকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলো গ্রামে যেতে চায় না। কারণ গ্রামীণ ফসল বীমা ব্যয়বহুল, ক্ষতির হার বেশি, আর প্রিমিয়াম আদায় কঠিন।

এটা শুধু একটা পরিসংখ্যান না। এটা একটা নীতিগত ব্যর্থতা। কারণ বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বন্যাপ্রবণ দেশগুলোর একটা, আর এখানে কৃষকের কোনো আর্থিক সুরক্ষা নেই।


পর্ব ২: বীমার শূন্যতা

বাংলাদেশের বীমা শিল্পের পুরো ছবিটা দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যায়। শুধু ফসল বীমা না, সামগ্রিক বীমা প্রবেশের হারই অত্যন্ত কম। গত দশ বছরে এই হার কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে (বা হয়নি), সেটা দেখুন।

২০১৫ সালে বীমা প্রবেশের হার ছিল জিডিপির ০.৫%। ২০২৫ সালেও সেটা মাত্র ০.৪%। দশ বছরে কোনো উন্নতি হয়নি, বরং সামান্য কমেছে। তুলনায় ভারত এই সময়ে ৩.৫% থেকে ৪.২%-এ গেছে। শ্রীলঙ্কা ১.১% থেকে ১.৫%-এ। নেপাল পর্যন্ত ০.৮% থেকে ১.২%-এ উঠেছে। বাংলাদেশ? স্থির। প্রায় নিশ্চল।

এর মানে কী? মানে হলো, গত দশ বছরে দেশের অর্থনীতি বেড়েছে, মানুষের আয় বেড়েছে, কিন্তু বীমায় অংশগ্রহণ বাড়েনি। মানুষ এখনো বীমাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে। অথবা বীমা কোম্পানিগুলো এখনো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি।

মাথাপিছু বীমা ব্যয়ের তুলনা করলে ছবিটা আরো স্পষ্ট হয়।

বাংলাদেশে মাথাপিছু বীমা ব্যয় মাত্র ৯ ডলার। বিশ্ব গড় ৮৫০ ডলার। মানে একজন বাংলাদেশি বিশ্ব গড়ের একশো ভাগের এক ভাগেরও কম বীমায় খরচ করে। ভারতে ৭৮ ডলার, শ্রীলঙ্কায় ৬৫ ডলার। এমনকি মিয়ানমারেও ১২ ডলার। বাংলাদেশ তার প্রতিবেশীদের চেয়েও অনেক পিছিয়ে।

এর মানে হলো, যখন দুর্যোগ আসে, বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণ অরক্ষিত। কোনো আর্থিক কুশন নেই। ক্ষতি যতটুকু হয়, পুরোটাই বহন করতে হয় নিজের কাঁধে।


পর্ব ৩: ক্ষতির হিসাব, সুরক্ষার অভাব

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বার্ষিক ক্ষতি গড়ে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এই ক্ষতির কতটুকু বীমা দিয়ে আচ্ছাদিত? প্রায় কিছুই না।

গত দশ বছরে (২০১৫ থেকে ২০২৪) বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর নদীভাঙনে মোট ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বীমা দিয়ে কভার হয়েছে মাত্র ৩%। বাকি ৯৭% অবীমাকৃত। তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে দুর্যোগ ক্ষতির প্রায় ৫০% বীমা কভার করে। জাপানে ৩৫%। ভারতেও ৮%।

এই ৯৭% অবীমাকৃত ক্ষতি কে বহন করে? তিনটা উৎস। প্রথম, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার নিজে, সঞ্চয় ভেঙে, সম্পদ বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে। দ্বিতীয়, সরকার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে। তৃতীয়, আন্তর্জাতিক সাহায্য, যেটা আসে দেরিতে, আসে কম, আর সবসময় আসে না।

তাহলে সরকার কি ত্রাণ দিয়ে সমস্যা সামলাতে পারে? এই চার্টটা দেখুন।

বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারি বরাদ্দ বার্ষিক প্রায় ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ত্রাণ, পুনর্বাসন, অবকাঠামো মেরামত সবকিছু। কিন্তু বার্ষিক ক্ষতি? ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ কোটি টাকা। মানে সরকারি বরাদ্দ ক্ষতির মাত্র ১৫ থেকে ২০% কভার করে। বাকিটা? পরিবারকেই বহন করতে হয়।

তুলনায় ভারত যদি PMFBY-র মাধ্যমে কৃষকদের বীমা কভারেজ দেয়, সেটা প্রাক-অর্থায়ন। দুর্যোগের আগে থেকেই অর্থ সংরক্ষিত থাকে। সরকারের ত্রাণ মডেল হলো প্রতিক্রিয়াশীল, দুর্যোগের পরে টাকা জোগাড় করে পাঠানো হয়। বীমা মডেল হলো প্রতিরোধমূলক, আগে থেকে ঝুঁকি ভাগ করা হয়।

কিন্তু কৃষক কেন বীমা কেনে না? শুধু কি দামের জন্য? নাকি আরো গভীর কারণ আছে?

২০২৩ সালে একটি জরিপে দেখা গেছে, ৬৮% কৃষক "ফসল বীমা" শব্দটাই শোনেনি। আরো ১৮% শুনেছে কিন্তু কীভাবে কাজ করে জানে না। মাত্র ৮% বুঝতে পারে বীমা কী, আর কেনার আগ্রহ আছে মাত্র ৩% কৃষকের। বাকিরা? হয় জানে না, অথবা জানে কিন্তু বিশ্বাস করে না।

বিশ্বাসের সমস্যাটা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে বীমা কোম্পানিগুলোর দাবি নিষ্পত্তির হার ৫৫ থেকে ৬০%। মানে প্রতি ১০টা দাবির মধ্যে ৪টা প্রত্যাখ্যান হয় বা এত দেরি হয় যে মানুষ হাল ছেড়ে দেয়। এই অভিজ্ঞতা পুরো শিল্পের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করেছে। কৃষকের কাছে বীমা মানে "টাকা দিলাম, কিছু পেলাম না।"


পর্ব ৪: পাইলট, প্রিমিয়াম আর প্রতিবন্ধকতা

বাংলাদেশে কি কোনো ফসল বীমার চেষ্টা হয়নি? হয়েছে। কিন্তু সবই পাইলট পর্যায়ে আটকে আছে।

সদরুল্লাহ ইনস্যুরেন্সের প্রথম পাইলট ১৯৭৭ সালে শুরু হয়েছিল, ব্যর্থ হয়। GIZ ২০১৪ সালে সিরাজগঞ্জে আবহাওয়া-সূচক বীমার পাইলট চালায়, প্রায় ১০,০০০ কৃষককে কভার করে। BRAC ২০১৮ সালে আরেকটা শুরু করে, ২৫,০০০ কৃষক। Green Delta Insurance ২০২০ সালে ১৫,০০০ কৃষকের জন্য মাইক্রো-ইনস্যুরেন্স পাইলট চালায়। সরকারের কৃষি বীমা পাইলট ২০২২ সালে শুরু হয়, ৫০,০০০ কৃষককে লক্ষ্য করে।

সব মিলিয়ে? কভারেজ ১ লাখের কাছাকাছি। দেশের ১.৬ কোটি কৃষক পরিবারের তুলনায় এটা ০.৬%। পাইলটগুলো কেন স্কেল আপ হয়নি? কারণ মৌলিক সমস্যা তিনটা। এক, ক্ষতি যাচাই করা কঠিন ও ব্যয়বহুল। দুই, নৈতিক ঝুঁকি (moral hazard) এবং প্রতিকূল নির্বাচন (adverse selection) সমস্যা। তিন, প্রতিষ্ঠানগত টেকসইতার অভাব, তহবিল শেষ হলে প্রকল্প বন্ধ।

কিন্তু কৃষকের পক্ষে কি আদৌ প্রিমিয়াম দেওয়া সম্ভব?

একজন প্রান্তিক কৃষকের (১ একর জমি) জন্য বার্ষিক ফসল বীমার প্রিমিয়াম ৩,০০০ থেকে ৮,০০০ টাকা। তার বার্ষিক কৃষি আয় ৮০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকা। মানে আয়ের ৪ থেকে ৬% বীমায় যাবে। এটা অনেক বেশি। ভারতে PMFBY-তে কৃষক প্রিমিয়ামের মাত্র ১.৫ থেকে ২% দেয়, বাকিটা সরকার ভর্তুকি দেয়। বাংলাদেশে কোনো ভর্তুকি নেই।

যদি সরকার ৫০% ভর্তুকি দেয়, তাহলে প্রিমিয়াম নামে ১,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকায়। এটা আয়ের ২ থেকে ৩%, যেটা সহনীয়। ৭৫% ভর্তুকি দিলে ৭৫০ থেকে ২,০০০ টাকা, যেটা বেশিরভাগ কৃষকের নাগালে। প্রশ্ন হলো, সরকারের কি এই ভর্তুকি দেওয়ার সামর্থ্য আছে? ১.৬ কোটি কৃষক পরিবারকে যদি গড়ে ৩,০০০ টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়, তাহলে বার্ষিক ব্যয় ৪,৮০০ কোটি টাকা। এটা জাতীয় বাজেটের ০.৬%। তুলনায়, প্রতি বছর দুর্যোগে ক্ষতি হচ্ছে ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ কোটি টাকা। ভর্তুকি দেওয়া সস্তা, না দেওয়া দামি।

আর বীমা কত দ্রুত ক্ষতিপূরণ দিতে পারে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে গড়ে ৯০ থেকে ১২০ দিন সময় নেয়। ভারতে PMFBY-তে গড় ৪৫ দিন। কেনিয়ায় ACRE Africa-র ইনডেক্স বীমায় ৫ থেকে ১০ দিন। একজন কৃষকের কাছে এই সময়ের পার্থক্য জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য। বন্যার পর যদি ৩ মাস অপেক্ষা করতে হয় ক্ষতিপূরণের জন্য, ততদিনে মহাজনের ঋণ নিতে হয়, গরু বিক্রি করতে হয়, সন্তানদের স্কুল ছাড়াতে হয়। বীমা যদি ৭ দিনে টাকা দিতে পারে, তাহলে এই ধ্বংসের চক্র শুরুই হয় না।


পর্ব ৫: সমাধান কোথায়?

বাংলাদেশ একা না এই সমস্যায়। কিন্তু অন্য দেশগুলো সমাধান খুঁজছে, বাংলাদেশ খুঁজছে না।

সবচেয়ে আশাজনক সমাধান হলো প্যারামেট্রিক বা ইনডেক্স-ভিত্তিক বীমা। এখানে ক্ষতি যাচাই করার দরকার নেই। এর বদলে একটা আবহাওয়া সূচক ব্যবহার করা হয়। যেমন: যদি কোনো এলাকায় সাত দিনে ৩০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়, তাহলে সেই এলাকার সব বীমাগ্রাহক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিপূরণ পায়। মাঠে গিয়ে দেখার দরকার নেই, দাবি করার দরকার নেই।

এই চার্টে দেখুন কীভাবে প্যারামেট্রিক বীমা বাংলাদেশে কাজ করতে পারে। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৫টি জেলা বন্যাপ্রবণ। এই ৩৫ জেলায় প্রায় ৮০ লাখ কৃষক পরিবার আছে। যদি প্যারামেট্রিক বীমা শুধু এই ৩৫ জেলায় চালু করা হয়, তাহলেও দেশের অর্ধেক কৃষকের কাছে পৌঁছানো যায়। প্রিমিয়াম কম (৭৫% ভর্তুকিতে মাত্র ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা), ক্ষতিপূরণ দ্রুত (৫ থেকে ৭ দিন), আর পুরো প্রক্রিয়া মোবাইলে।

বাংলাদেশে বিকাশ আর নগদ মিলিয়ে ২০ কোটির বেশি অ্যাকাউন্ট আছে। প্রতিটা গ্রামে এজেন্ট আছে। কৃষক বর্ষার আগে বিকাশে ১,০০০ টাকা পাঠাবে। স্যাটেলাইট আর আবহাওয়া স্টেশন থেকে বৃষ্টিপাত ও পানির স্তরের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগ্রহ হবে। যখন সূচক নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করবে, বিকাশে ক্ষতিপূরণ চলে আসবে। কোনো কাগজপত্র নেই, কোনো মাঠ পরিদর্শন নেই, কোনো দালাল নেই।

ভারতে PMFBY ৫ কোটি কৃষককে কভার করে, সরকার প্রিমিয়ামের ৬০ থেকে ৭০% ভর্তুকি দেয়। কেনিয়ায় ACRE Africa মোবাইল ফোনে মাইক্রো-ইনস্যুরেন্স বিক্রি করে, M-Pesa দিয়ে প্রিমিয়াম নেয়, ক্ষতিপূরণও M-Pesa দিয়ে দেয়। ইথিওপিয়ায় R4 Rural Resilience Initiative কাজের বিনিময়ে বীমা দেয়, কৃষকের নগদ অর্থ লাগে না। এই মডেলগুলো বাংলাদেশে প্রয়োগযোগ্য। প্রযুক্তি আছে (বিকাশ, নগদ)। উপগ্রহ তথ্য আছে। যা নেই সেটা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।


পর্ব ৬: করিমের কাছে ফিরে যাই

করিম মিয়া জানে না প্যারামেট্রিক বীমা কী। জানে না PMFBY কী। জানে না premium subsidy কী। কিন্তু সে জানে প্রতি বর্ষায় তার বুক কাঁপে। জানে বন্যা এলে সব শেষ। জানে মহাজনের কাছে ধার নিলে সুদে সুদে ডুবে যায়।

করিম মিয়ার জন্য দরকার একটা সহজ জিনিস। বর্ষার আগে ফোনে ১,৫০০ টাকা পাঠাবে বিকাশে। বন্যা হলে, স্যাটেলাইট দেখবে পানি কতটুকু উঠেছে, আর ৭ দিনের মধ্যে তার বিকাশে ২০,০০০ টাকা চলে আসবে। দাবি করতে হবে না, মাঠে কেউ আসবে না, কাগজপত্র লাগবে না।

প্রতি বছর বাংলাদেশে বন্যায় হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এই ক্ষতি বহন করে সবচেয়ে গরিব মানুষগুলো। তারা গরু বেচে, গহনা বেচে, ছেলেমেয়েদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে, কম খেয়ে কোনোরকমে বেঁচে থাকে। পরের বছর আবার একই গল্প। প্রতিটা কৌশল আসলে ভবিষ্যতের ক্ষতি। মহাজনের ঋণ মানে উচ্চ সুদের ফাঁদ। সম্পদ বিক্রি মানে পরবর্তী মৌসুমে উৎপাদন ক্ষমতা কমা। কম খাওয়া মানে পুষ্টিহীনতা। স্কুল ছাড়ানো মানে পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষা নষ্ট।

এই চক্র ভাঙতে হবে। আর সেটা ভাঙার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হলো বীমা। সর্বজনীন, ভর্তুকিযুক্ত, ডিজিটাল, ইনডেক্স-ভিত্তিক ফসল বীমা।

সমাধান তিনটা ধাপে সম্ভব। প্রথম ধাপ: ৩৫টি বন্যাপ্রবণ জেলায় সরকারি ভর্তুকিযুক্ত প্যারামেট্রিক বীমা চালু করা। দ্বিতীয় ধাপ: বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে প্রিমিয়াম সংগ্রহ ও ক্ষতিপূরণ প্রদান সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা। তৃতীয় ধাপ: আবহাওয়া স্টেশন নেটওয়ার্ক ঘন করা আর স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার বাড়ানো, যাতে ইনডেক্স সঠিক হয়।

খরচ? ১.৬ কোটি কৃষককে গড়ে ৩,০০০ টাকা ভর্তুকি দিতে বছরে ৪,৮০০ কোটি টাকা লাগবে। এটা জাতীয় বাজেটের ০.৬%। প্রতি বছর দুর্যোগে ক্ষতি হচ্ছে ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ কোটি টাকা। ভর্তুকি দেওয়া সস্তা, না দেওয়া দামি।

করিম মিয়া অপেক্ষা করছে। কিন্তু যমুনা অপেক্ষা করে না।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50