ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র: কতটা প্রস্তুত?
পর্ব ১: সেই রাতের গল্প
১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর। রাত সাড়ে দশটা। ভোলা জেলার তজুমদ্দিন উপজেলায় হালিমা বিবি তার চার সন্তানকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। বাইরে বাতাস বাড়ছে, কিন্তু নভেম্বরে উপকূলে বাতাস তো থাকেই। রেডিও নেই, বিদ্যুৎ নেই, সতর্কবার্তা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। মাটির ঘর, টিনের চাল, চারপাশে সমতল ভূমি। পালানোর কোথাও নেই।
রাত বারোটার দিকে সমুদ্রের পানি ১০ মিটার উঁচু হয়ে ভূমিতে আছড়ে পড়লো। ঘণ্টায় ২২৪ কিলোমিটার বেগে বাতাস ছুটলো। হালিমা বিবি ঘুম ভেঙে দেখলেন কোমর পানি। তিনি দুই সন্তানকে ধরতে পারলেন, বাকি দুইজনকে স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গেল। তিনি একটা খেজুর গাছ ধরে সারারাত ঝুলে থাকলেন। সকালে দেখলেন, তাঁর গ্রাম আর নেই।
সেই রাতে তিন লাখ মানুষ মারা গেল। কোনো কোনো হিসাবে পাঁচ লাখ। পৃথিবীর ইতিহাসে একটি মাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি। কেন এত মানুষ মারা গেল? কারণ পুরো উপকূলে মোট আশ্রয়কেন্দ্র ছিল ১২টা। বারোটা। ৩ কোটি উপকূলবাসীর জন্য ১২টা কংক্রিটের ভবন।
এখন ৫৫ বছর পর প্রশ্নটা হলো: আমরা কতদূর এগিয়েছি? এই চার্টটা দেখুন:
১৯৭০ সালে ১২। ১৯৯১ সালের পর লাফ দিয়ে বাড়লো, কারণ সেই ঘূর্ণিঝড়ে আরো দেড় লাখ মানুষ মারা গেল। ২০০৭ সালে সিডরের পর আরেকটা ধাক্কা। আজ সংখ্যাটা ৪,২৬৬। প্রতিটা বড় বিপর্যয়ের পর আমরা হুঁশে আসি, কিছু আশ্রয়কেন্দ্র বানাই, তারপর আবার ভুলে যাই। পরের বিপর্যয় না আসা পর্যন্ত।
৪,২৬৬ শুনতে অনেক মনে হয়। কিন্তু যখন ঝুঁকিপূর্ণ জনসংখ্যার সাথে মেলাবেন, ছবিটা একেবারে বদলে যাবে।
লাল বারগুলো দেখুন: ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় জনসংখ্যা ৩.৫ কোটি। সবুজ বারগুলো: আশ্রয়কেন্দ্রের মোট ধারণক্ষমতা ২১ লাখ। মানে প্রতি ১৭ জনের মধ্যে ১ জনের জায়গা আছে। বাকি ১৬ জন? তারা গাছে উঠবে, বাঁধের উপর দাঁড়াবে, মাটির ঘরে বসে প্রার্থনা করবে। ঠিক যেভাবে হালিমা বিবি করেছিলেন ১৯৭০ সালে।
প্রশ্ন করতে পারেন: ৩.৫ কোটি মানুষকে তো একসাথে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া লাগবে না, সবাই তো সমান ঝুঁকিতে থাকে না? ঠিক। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ জনসংখ্যার কমপক্ষে ২০-২৫% ধারণক্ষমতা থাকা উচিত। মানে ৭০-৮৫ লাখ। আমাদের আছে ২১ লাখ। গ্যাপটা বিশাল।
কিন্তু সংখ্যার আড়ালে আরেকটা সত্য আছে, সেটা আরো ভয়ংকর।
পর্ব ২: কংক্রিটের মিথ্যা
৪,২৬৬ আশ্রয়কেন্দ্র কাগজে আছে। কিন্তু বাস্তবে কটা দাঁড়িয়ে আছে?
২০২৩ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর (DDM) একটা জরিপ করলো। প্রতিটা আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা করা হলো। ফলাফলটা দেখুন:
৪,২৬৬ আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ১,৭৫০টা ভালো অবস্থায়। ১,৬০০টায় ফাটল ধরেছে, ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে, টয়লেট ভাঙা, মেরামত ছাড়া ব্যবহারের ঝুঁকি আছে। আর ৯১৬টা? সম্পূর্ণ ব্যবহার অযোগ্য। দেয়ালে এমন ফাটল যে ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কায় ভেঙে পড়তে পারে। এগুলোতে আশ্রয় নেওয়া মানে খোলা মাঠে থাকার চেয়ে বেশি বিপজ্জনক।
মানে কাগজে ৪,২৬৬ লেখা থাকলেও কাজের আশ্রয়কেন্দ্র ১,৭৫০। ধারণক্ষমতা ২১ লাখ না, বাস্তবে ৯ লাখের কাছাকাছি। ৩.৫ কোটি মানুষের জন্য ৯ লাখের জায়গা।
কেন এই অবস্থা? উত্তরটা সোজা: আমরা তৈরি করতে ভালোবাসি, রক্ষণাবেক্ষণ করতে রাজি না। একটা আশ্রয়কেন্দ্র বানাতে ১-২ কোটি টাকা খরচ হয়। ফিতা কাটা হয়, ছবি তোলা হয়, সংবাদপত্রে আসে। তারপর? ২০-৩০ বছর কেউ তাকায় না। লবণাক্ত সামুদ্রিক বাতাসে রড মরচে ধরে, কংক্রিট খসে পড়ে, ছাদ ফুটো হয়ে যায়। মাত্র ১০-১৫ লাখ টাকার মেরামতে একটা আশ্রয়কেন্দ্র আরো ২০ বছর সেবা দিতে পারতো। কিন্তু সেই ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ হয় না। কারণ মেরামতে ফিতা কাটার সুযোগ নেই।
তাহলে যে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোতে কি মানুষ যায়? ঘূর্ণিঝড় এলে কতটুকু ব্যবহার হয়?
ঘূর্ণিঝড়ভেদে ব্যবহারের হার ৪৫% থেকে ৮৫%। ২০১৩ সালে মহাসেনে মাত্র ৪৫%। ২০২০ সালে আম্ফানে ৮৫%। এই পার্থক্যের কারণ কী?
অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চায় না। ঘর ছেড়ে যেতে ভয় পায়, লুটপাটের আশঙ্কায়। গরু-ছাগল নিয়ে যাওয়ার জায়গা নেই, ফেলে গেলে মারা যাবে। মহিলারা পর্দার কারণে এত মানুষের ভিড়ে যেতে অস্বস্তি বোধ করে। প্রতিবন্ধী বা বৃদ্ধদের জন্য কোনো আলাদা ব্যবস্থা নেই। কিছু আশ্রয়কেন্দ্র এত দূরে যে ঝড়ের মধ্যে হেঁটে পৌঁছানো সম্ভব না।
কিন্তু একটা কথা অস্বীকার করার উপায় নেই: যারা আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছাতে পেরেছে, তারা বেঁচে গেছে। আর এই বেঁচে যাওয়ার পেছনে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে অসাধারণ একটা গল্প।
পর্ব ৩: যারা ঝড়ের রাতে দৌড়ায়
১৯৭০: তিন লাখ মৃত্যু। ১৯৯১: দেড় লাখ। ২০০৭ সিডর: ৩,৪০৬। ২০২০ আম্ফান: ২৬। ২০২৪ রিমাল: ১৬।
এই চার্টটা দেখুন:
তিন লাখ থেকে ১৬। পঞ্চাশ বছরে মৃত্যু কমেছে ৯৯.৯৯%। ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি কমেনি, বরং জলবায়ু পরিবর্তনে বেড়েছে। তাহলে মানুষ বাঁচলো কীভাবে?
উত্তরের নাম CPP: সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার আর রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি মিলে CPP শুরু করে। ধারণাটা খুব সাধারণ: উপকূলের প্রতিটা গ্রামে কিছু স্বেচ্ছাসেবক থাকবে। ঘূর্ণিঝড়ের খবর পেলে তারা মেগাফোন হাতে বাড়ি বাড়ি যাবে। মানুষকে জানাবে, বুঝাবে, প্রয়োজনে টেনে নিয়ে যাবে আশ্রয়কেন্দ্রে। অসুস্থদের কাঁধে করে বহন করবে। বৃদ্ধদের হাত ধরে নিয়ে যাবে।
আজ CPP-তে ৭৬,০০০ স্বেচ্ছাসেবক। ৫৯৬টা ইউনিয়নে তাদের নেটওয়ার্ক। এদের বেতন নেই। কোনো চাকরি না, কোনো পদোন্নতি না, কোনো পুরস্কার না। তারা এটা করে কারণ তাদের প্রতিবেশী মানুষগুলো তাদের চেনে, বিশ্বাস করে। সিডরের রাতে সাতক্ষীরার একজন CPP স্বেচ্ছাসেবক একাই ১২০ জনকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরদিন সকালে দেখলেন তাঁর নিজের বাড়ি স্রোতে ভেসে গেছে। তিনি বললেন, "বাড়ি আবার বানাবো, মানুষ তো আবার বানানো যায় না।"
এই ৭৬,০০০ মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে কম খরচে সবচেয়ে বেশি জীবন বাঁচানো ব্যবস্থা চালাচ্ছে। নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য এর চেয়ে যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাওয়া কঠিন।
কিন্তু মানুষ বেঁচে গেলেই কি সব ঠিক? জীবন বাঁচে, জীবিকা তো যায়।
মৃত্যু কমেছে, কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়ছে। ২০২০ সালে আম্ফানে মাত্র ২৬ জন মারা গেলেও ক্ষতির পরিমাণ ১৩ বিলিয়ন ডলার। কারণ উপকূলে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সম্পদ। চিংড়ি ঘের, মাছের খামার, সোলার প্যানেল, পোশাক কারখানা। ঘূর্ণিঝড় এলে সব শেষ। মানুষ বেঁচে থাকে, কিন্তু সব হারিয়ে আবার শূন্য থেকে শুরু করে। একজন চিংড়ি চাষি যে পাঁচ বছর খেটে ঘের দাঁড় করিয়েছেন, এক রাতে সব ভেসে যায়। বিমা নেই, সরকারি সাহায্য ক্ষীণ, ঋণ মাথায়।
পর্ব ৪: স্কুল যখন শেষ ভরসা
বাংলাদেশের আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবস্থার একটা অনন্য বৈশিষ্ট্য আছে। বেশিরভাগ আশ্রয়কেন্দ্র সারা বছর অন্য কাজে চলে।
৪,২৬৬ আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ২,১০০টা সারা বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৩৮০টা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ৫২০টা কমিউনিটি সেন্টার। শুধু আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ফাঁকা পড়ে আছে মাত্র ১,২৬৬টা।
এটা চমৎকার ব্যবস্থা, তাই না? একটা ভবন দুটো কাজ করছে। সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে হাজার হাজার ভবন শুধু "ঘূর্ণিঝড়ের জন্য" ফেলে রাখা সম্ভব না। বহুমুখী ব্যবহারই যুক্তিসঙ্গত।
কিন্তু সমস্যাও এখানেই। স্কুল হিসেবে প্রতিদিন শত শত বাচ্চা ব্যবহার করছে। দেয়ালে লেখালেখি, টয়লেট ভাঙছে, পানির লাইন নষ্ট হচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার? শিক্ষা বোর্ড বলে আমাদের না, DDM বলে আমাদের না, ইউনিয়ন পরিষদ বলে আমাদের না। কেউ দায়িত্ব নেয় না। ভবনটা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়।
আরেকটা সমস্যা: স্কুলে পাঠদান চলছে, হঠাৎ ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা এলো। বাচ্চাদের বের করে সাধারণ মানুষকে ঢোকাতে হবে। বাচ্চারা কোথায় যাবে? বাড়িতে। সেই বাড়ি থেকে আবার পরিবারসহ ফিরে আসবে আশ্রয়কেন্দ্রে। এই বিশৃঙ্খলা ঘূর্ণিঝড়ের আগে প্রতিবার ঘটে।
এখন বড় প্রশ্ন: সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কত টাকা দেয়?
নীল বারগুলো দুর্যোগ বাজেট: ২০১৫ সালে ৫,২০০ কোটি টাকা, ২০২৫ সালে ১৩,৮০০ কোটি। সংখ্যায় বাড়ছে। কিন্তু লাল লাইনটা খেয়াল করুন: মোট বাজেটের অংশ হিসেবে কমছে। ২০১৫ সালে ০.৫২% ছিল, এখন ০.৪৪%। বাজেট বাড়লেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অগ্রাধিকার কমছে।
এই ১৩,৮০০ কোটির মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র মেরামতে বরাদ্দ কত? ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২২০ কোটি টাকা। ৯১৬টা ব্যবহার অযোগ্য আশ্রয়কেন্দ্র মেরামত করতে প্রতিটায় গড়ে ১৫ লাখ টাকা ধরলে দরকার ১,৩৭৪ কোটি। ২২০ কোটিতে কতটুকু হবে? হিসাবটা নিজেই করুন।
পর্ব ৫: জাপান পারলে আমরা কেন পারি না?
বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে, সেটা বুঝতে হলে অন্যদের দিকে তাকাতে হবে।
দুর্যোগ প্রস্তুতি সূচকে জাপান ৮.৯ (১০ এর মধ্যে)। ফিলিপাইন ৫.৮। ভারত ৫.২। বাংলাদেশ ৪.১। মাঝারি প্রস্তুতি স্তরের (৫.০) নিচে আমরা।
জাপানের কথা ধরুন। প্রতি বছর টাইফুন আসে, ভূমিকম্প হয়, সুনামির ঝুঁকি থাকে। কিন্তু জাপানের প্রতিটা শিশু স্কুলে ভূমিকম্প ড্রিল করে। প্রতিটা ভবন ভূমিকম্প সহনীয়। প্রতিটা উপকূলীয় শহরে সুনামি প্রতিরোধক দেয়াল আছে। দুর্যোগ প্রস্তুতি তাদের সংস্কৃতির অংশ, শুধু সরকারি নীতি না।
ফিলিপাইন আর বাংলাদেশের মিল অনেক। দুটোই ঘূর্ণিঝড়প্রবণ, দুটোই উন্নয়নশীল, দুটোরই দীর্ঘ উপকূল। কিন্তু ২০১৩ সালে সুপার টাইফুন হাইয়ানে ৬,৩০০ মানুষ মারা যাওয়ার পর ফিলিপাইন একটা আইন করলো: DRRM Act। এই আইনে প্রতিটা স্থানীয় সরকারকে বাজেটের ৫% দুর্যোগ প্রস্তুতিতে ব্যয় করতে বাধ্য করা হলো। ৫%। এটা আইন, ইচ্ছানির্ভর না। বাংলাদেশে এরকম কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
ভারতের ওড়িশা রাজ্যের গল্পটা আরো চমকপ্রদ। ১৯৯৯ সালে সুপার সাইক্লোনে ১০,০০০ মানুষ মারা গেল। ২০১৯ সালে প্রায় একই তীব্রতার ঘূর্ণিঝড় ফণী আঘাত হানলো। মৃত্যু? ৬৪। বিশ বছরে ১০,০০০ থেকে ৬৪। কীভাবে? ৮৭৯টা আশ্রয়কেন্দ্র বানালো (প্রতিটায় পানি, টয়লেট, জেনারেটর), ৪৮ ঘণ্টায় ১২ লাখ মানুষকে সরিয়ে নিলো, আর প্রতিটা আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট রাখলো।
বাংলাদেশের CPP ব্যবস্থা পৃথিবী প্রশংসা করে। সেটা ঠিক। কিন্তু প্রশংসায় তৃপ্ত থাকলে বিপদ।
পর্ব ৬: পরের ঝড় আসার আগে
আসুন হিসাবটা একবার পরিষ্কার করি।
বাংলাদেশের উপকূলে ৩.৫ কোটি মানুষ ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে। তাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র আছে ৪,২৬৬টা, কিন্তু কার্যকর মাত্র ১,৭৫০টা। ধারণক্ষমতা কাগজে ২১ লাখ, বাস্তবে ৯ লাখ। দুর্যোগ বাজেটের অগ্রাধিকার কমছে। ৯১৬টা আশ্রয়কেন্দ্র ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়। আর জলবায়ু পরিবর্তনে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হচ্ছে।
তিনটা কাজ এখনই করতে হবে।
প্রথমত, ৯১৬টা ব্যবহার অযোগ্য আশ্রয়কেন্দ্র মেরামত। খরচ প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা। পদ্মা সেতুর খরচের ৫%। একটা বড় ফ্লাইওভারের সমান। এই টাকা খরচ করলে আরো ৪-৫ লাখ মানুষের জায়গা হবে। নতুন বানানোর চেয়ে অনেক সস্তা, অনেক দ্রুত।
দ্বিতীয়ত, ফিলিপাইনের মতো আইন করে স্থানীয় সরকারকে বাধ্য করা যে বাজেটের একটা অংশ দুর্যোগ প্রস্তুতিতে যাবে। প্রতিটা আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য বছরে ৩-৫ লাখ টাকা রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট। ইউনিয়ন পরিষদ এটা করতে পারে, যদি আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে।
তৃতীয়ত, ধারণক্ষমতা বাড়ানো। সব আশ্রয়কেন্দ্র সরকারকে বানাতে হবে না। উপকূলীয় এলাকায় নতুন যেকোনো পাকা ভবন, মাদ্রাসা, কমিউনিটি সেন্টার, বাণিজ্যিক ভবন, এগুলোকে ভবন কোড আপডেট করে "আশ্রয় সক্ষম" করা যায়। ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় একটা নির্দিষ্ট আকারের উপরে সকল নতুন নির্মাণে আশ্রয়কেন্দ্রের মান বাধ্যতামূলক করলে দশ বছরে ধারণক্ষমতা দ্বিগুণ হতে পারে, সরকারের পকেট থেকে একটা টাকাও না খরচ করে।
আর CPP-র ৭৬,০০০ স্বেচ্ছাসেবক? তাদের সম্মান দিতে হবে। বিমা দিতে হবে, কারণ তারা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে। আধুনিক সরঞ্জাম দিতে হবে, কারণ মেগাফোন আর হারিকেন লণ্ঠন দিয়ে আর কতদিন? নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, জাতীয় স্বীকৃতি দিতে হবে। এই মানুষগুলো কোনো বেতন ছাড়া লাখ লাখ জীবন বাঁচিয়েছে।
আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।
১৯৭০ সালের সেই রাতে হালিমা বিবি একটা খেজুর গাছ ধরে বেঁচেছিলেন। কোনো সতর্কবার্তা ছিল না, কোনো আশ্রয়কেন্দ্র ছিল না, কোনো স্বেচ্ছাসেবক ছিল না। শুধু অন্ধকার আর পানি।
আজ ২০২৫ সালে সতর্কবার্তা আছে। ৪,২৬৬ আশ্রয়কেন্দ্র আছে (কাগজে)। ৭৬,০০০ স্বেচ্ছাসেবক আছে। মৃত্যু কমেছে ৯৯.৯৯%। এটা বাংলাদেশের গর্ব, সন্দেহ নেই।
কিন্তু সেই ৪,২৬৬ আশ্রয়কেন্দ্রের ৯১৬টা ভেঙে পড়ছে। ধারণক্ষমতা দরকারের ছয় ভাগের এক ভাগ। বাজেটে অগ্রাধিকার কমছে। জলবায়ু পরিবর্তন থামছে না।
পরের বড় ঘূর্ণিঝড় আসবে। সেটা প্রশ্ন না, সময়ের ব্যাপার মাত্র। প্রশ্ন হলো: সেই রাতে কতজন হালিমা বিবি আশ্রয়কেন্দ্রে জায়গা পাবে? আর কতজন খেজুর গাছ ধরে ঝুলে থাকবে?
উত্তরটা আমাদের হাতে। এখনো।