বিদেশি সাহায্য কমছে কেন?
পর্ব ১: একটা ভুল ধারণা
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, অবকাঠামো নেই, অর্থনীতি নেই, খাদ্য নেই। হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, "a bottomless basket case." পৃথিবী বাংলাদেশকে দেখেছিল সমবেদনার চোখে। সাহায্য এসেছিল স্রোতের মতো। আমেরিকা, জাপান, ইউরোপ, বিশ্বব্যাংক, সবাই টাকা ঢেলেছে। সেই সময় বাংলাদেশের মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) প্রায় ৬-৭% আসতো বিদেশি সাহায্য থেকে। উন্নয়ন বাজেটের ৮০% ছিল বৈদেশিক অর্থায়ন।
আজ ২০২৫ সাল। বাংলাদেশ এখন ১৮ কোটি মানুষের দেশ। জিডিপি ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। গার্মেন্টস রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয়। রেমিট্যান্স ২৪ বিলিয়ন ডলার। দারিদ্র্য ৪৯% থেকে কমে ১৯%-এ নেমে এসেছে। এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েশনের দোরগোড়ায়।
আর বিদেশি সাহায্য? জিএনআই-র ১%-এরও কম। পরম সংখ্যায় কিছু বেড়েছে, কিন্তু অর্থনীতির তুলনায় সাহায্যের গুরুত্ব তীব্রভাবে কমে গেছে।
এবার এই চার্টটা দেখুন:
পরম সংখ্যায় সাহায্য বেড়েছে, ১৯৯০ সালের ২ বিলিয়ন থেকে ২০২৫ সালে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার। এটা দেখে মনে হয়, "সাহায্য তো কমেনি, বরং বেড়েছে!" কিন্তু এই সংখ্যা একটা মিথ্যা স্বস্তি দেয়। কারণ অর্থনীতিও বিশাল হয়ে গেছে। তাই আসল ছবিটা দেখতে হলে অনুপাতটা দেখতে হবে।
এবার এই চার্টটা দেখুন:
এটাই আসল গল্প। ১৯৯০ সালে বিদেশি সাহায্য ছিল জিএনআই-র ৬.৭%। ২০০৫ সালে ২%। ২০১৫ সালে ১.৪%। ২০২৫ সালে? ০.৭%। তিন দশকে সাহায্যের আপেক্ষিক গুরুত্ব দশ ভাগের একভাগে নেমে এসেছে।
এটা কি ভালো খবর না খারাপ খবর? উত্তরটা জটিল। একদিক থেকে ভালো, কারণ এর মানে বাংলাদেশ আর আগের মতো সাহায্যনির্ভর নয়। অর্থনীতি বড় হয়েছে, নিজের পায়ে কিছুটা দাঁড়িয়েছে। কিন্তু অন্যদিক থেকে বিপজ্জনক, কারণ যে খাতগুলোতে সাহায্য যায়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সেই খাতগুলোতে বাংলাদেশ সরকার এখনো পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করছে না। সাহায্য কমে গেলে এই ঘাটতি কে পূরণ করবে?
আর সামনে আসছে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন। তার মানে সাহায্য আরো কমবে, শর্ত আরো কঠিন হবে, সুদের হার বাড়বে। এই সত্যটা বোঝার জন্য আগে জানতে হবে: সাহায্যটা আসলে কোথা থেকে আসে, কীভাবে আসে, আর কোথায় যায়।
পর্ব ২: কে দেয়, কত দেয়
বাংলাদেশের বিদেশি সাহায্যের ভূগোলটা বোঝা দরকার। সব দাতা সমান না। তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন, শর্ত ভিন্ন, আগ্রহের ক্ষেত্র ভিন্ন।
বিশ্বব্যাংকের আইডিএ (International Development Association) সবচেয়ে বড় দাতা, বছরে প্রায় ১.৪৫ বিলিয়ন ডলার। তারপর জাপান, প্রায় ৮২০ মিলিয়ন। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ৬৮০ মিলিয়ন। যুক্তরাজ্য ৪১০ মিলিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ৩৫০ মিলিয়ন।
কিন্তু শুধু পরিমাণ দেখলে চলবে না। সাহায্যের ধরনটাও গুরুত্বপূর্ণ। ৯০-এর দশকে বাংলাদেশে আসা সাহায্যের বেশিরভাগ ছিল অনুদান (গ্র্যান্ট)। ফেরত দিতে হতো না। এখন? ছবিটা একেবারে উলটে গেছে।
২০০০ সালে সাহায্যের ৭২% ছিল অনুদান, ২৮% ঋণ। ২০২৫ সালে অনুদান মাত্র ২২%, ঋণ ৭৮%। মানে যেটাকে আমরা "সাহায্য" বলি, সেটা আর আসলে সাহায্য নয়। এটা ঋণ। সস্তা ঋণ, হ্যাঁ। বাজার সুদের চেয়ে অনেক কম সুদে। কিন্তু ঋণ তো ফেরত দিতে হয়।
আইডিএ-র ঋণের সুদ ১.২৫%, পরিশোধকাল ৩৮ বছর, গ্রেস পিরিয়ড ৬ বছর। এটা অবশ্যই বাণিজ্যিক ঋণের চেয়ে ভালো। কিন্তু এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর? বাংলাদেশ আর আইডিএ-র (সবচেয়ে সস্তা) ঋণ পাবে না। পাবে আইবিআরডি-র ঋণ, যেখানে সুদ ৪-৬%, পরিশোধকাল ২০-২৫ বছর। খরচ প্রায় তিনগুণ বাড়বে।
আর এই সাহায্য কোন খাতে যায়? সবটা কি সমানভাবে বণ্টিত?
অবকাঠামো আর যোগাযোগ সবচেয়ে বেশি পায়, ২৮%। এটা বোধগম্য, বড় সেতু, মহাসড়ক, রেলপথ, এগুলো বড় প্রকল্প, বড় ঋণ। স্বাস্থ্য পায় ১৬%, শিক্ষা ১২%, জলবায়ু ১১%। কিন্তু মানবিক সহায়তা মাত্র ৭%, যেখানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় নিয়মিত ঘটনা।
একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনেকে জানে না: বিদেশি সাহায্যের একটা বড় অংশ "টাইড এইড"। মানে সাহায্যের সাথে শর্ত থাকে যে দাতা দেশের কোম্পানি বা পণ্য ব্যবহার করতে হবে। জাপানের ঋণে জাপানি কন্সালটেন্ট, জাপানি ঠিকাদার, জাপানি যন্ত্রপাতি। ফলে সাহায্যের ডলার আবার দাতা দেশেই ফিরে যায়। বাংলাদেশের প্রকৃত প্রাপ্তি হিসাবের চেয়ে কম।
এখন প্রশ্ন হলো: এই সাহায্য কি কাজে আসছে? নাকি শুধু ঢালা হচ্ছে আর বালিতে মিশে যাচ্ছে?
পর্ব ৩: কার্যকারিতার প্রশ্ন
বাংলাদেশে বিদেশি সাহায্যের কার্যকারিতা নিয়ে একটা অস্বস্তিকর সত্য আছে। সবাই জানে, কেউ জোরে বলে না।
প্রকল্প সময়মতো শেষ হওয়ার হার মাত্র ৩৮%, বৈশ্বিক গড় ৬৫%। ঋণ ব্যবহারের হার (disbursement rate) ৫২%, যেখানে বিশ্ব গড় ৭২%। মানে অনুমোদিত ঋণের প্রায় অর্ধেক সময়মতো খরচ হচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক বা এডিবি ঋণ অনুমোদন করেছে, কিন্তু বাংলাদেশ সেই টাকা তুলতে পারছে না। কেন? জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, পরিকল্পনার দুর্বলতা, দুর্নীতি।
একটা উদাহরণ দিই। ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প। জাইকা-র (জাপান) অর্থায়ন। প্রথম ফেজ শেষ হয়েছে, সেটা ভালো। কিন্তু মূল পরিকল্পনার চেয়ে দুই বছর দেরি হয়েছে এবং খরচ ৪০% বেড়ে গেছে। পদ্মা সেতু? নিজেদের টাকায় বানিয়েছি, সেটা গর্বের। কিন্তু বিশ্বব্যাংক কেন সরে গিয়েছিল? দুর্নীতির অভিযোগ। সেই অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও, এটা বাংলাদেশের সাহায্য গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ফলাফল ভিত্তিক মূল্যায়ন মাত্র ২৮%, যেখানে বিশ্ব গড় ৫৫%। মানে সাহায্যপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলো আসলে কতটা উপকার করছে, সেটা পরিমাপ করার সংস্কৃতিই নেই। টাকা খরচ হচ্ছে, প্রকল্প হচ্ছে, কিন্তু সেই প্রকল্পে কতজনের জীবন বদলাচ্ছে, সেই হিসাব কেউ রাখছে না।
এই পরিস্থিতিতে দাতারা যখন দেখে তাদের টাকা দক্ষভাবে ব্যবহার হচ্ছে না, তখন তারা কী করে? হতাশ হয়। কম দেয়। শর্ত কঠিন করে। এটাকে বলে "দাতা ক্লান্তি" (donor fatigue)। আর এই ক্লান্তি শুধু বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কিত না। এটা একটা বৈশ্বিক প্রবণতা।
জাতিসংঘের লক্ষ্যমাত্রা হলো ধনী দেশগুলো তাদের জিএনআই-র ০.৭% উন্নয়ন সাহায্যে ব্যয় করবে। বাস্তবে? ডিএসি (DAC) দেশগুলোর গড় ০.৩১%। লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম। শুধু নরওয়ে, সুইডেন, লুক্সেমবার্গ, ডেনমার্ক ০.৭% লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে। যুক্তরাষ্ট্র, পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনীতি, দেয় মাত্র ০.২৪%। জাপানও কমিয়ে আনছে।
কেন কমছে? কারণ ধনী দেশগুলোর নিজেদের সমস্যা বাড়ছে। ইউরোপে ইউক্রেন যুদ্ধের খরচ, শরণার্থী সংকট, মুদ্রাস্ফীতি। আমেরিকায় রাজনৈতিক মেরুকরণ, "আমেরিকা ফার্স্ট" মানসিকতা। সাহায্য বাজেট কাটা রাজনৈতিকভাবে সহজ, কারণ এর বিরুদ্ধে ভোটাররা প্রতিবাদ করে না।
পর্ব ৪: গ্র্যাজুয়েশনের ধাক্কা
বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েট করবে। এটা একটা উন্নয়ন মাইলফলক। কিন্তু সাহায্যের ক্ষেত্রে এর মানে কী? মানে হলো সস্তায় টাকা পাওয়ার যুগ শেষ।
এই চার্টে তিনটা লাইন। নীল লাইন: এখন পর্যন্ত প্রকৃত সাহায্য। সবুজ ড্যাশ: যদি এলডিসি থাকতাম, তাহলে সাহায্য কেমন হতো। লাল ড্যাশ: গ্র্যাজুয়েশনের পর যা হবে বলে অনুমান।
পার্থক্যটা দেখুন। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকৃত সাহায্য প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসতে পারে, যেখানে এলডিসি থাকলে ৫.৩ বিলিয়ন পেতাম। ২০৩৫ সালে? ফারাক আরো বড়, প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার কম পাওয়ার আশঙ্কা।
শুধু পরিমাণ কমবে না। শর্ত বদলাবে। আইডিএ-র বদলে আইবিআরডি ঋণ, যেখানে সুদ তিনগুণ। ইইউ-এর EBA (Everything But Arms) সুবিধা শেষ হবে, গার্মেন্টসে ১২% শুল্ক বসবে। জিএসপি সুবিধা কমবে। দ্বিপক্ষীয় অনুদান কমে যাবে কারণ দাতারা বলবে, "তোমরা তো এখন মধ্যম আয়ের দেশ, তোমাদের আর সাহায্য লাগে কেন?"
কিন্তু মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া মানে কি সব সমস্যা শেষ? ১৮ কোটি মানুষের দেশে এখনো ৩.৫ কোটি দরিদ্র। মাথাপিছু সাহায্যের পরিমাণ দেখলে বাংলাদেশের অবস্থান আরো স্পষ্ট হয়।
বাংলাদেশে মাথাপিছু সাহায্য মাত্র ২৮ ডলার। রুয়ান্ডায় ৯২ ডলার, কম্বোডিয়ায় ৬৭, নেপালে ৪৮। জনসংখ্যা বিশাল হওয়ায় মোট সাহায্য বেশি মনে হলেও, ব্যক্তি পর্যায়ে পৌঁছায় খুবই কম। আর এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর এই ২৮ ডলারও ১৫-১৮ ডলারে নেমে আসতে পারে।
তাহলে প্রশ্ন: অন্য দেশেরা কীভাবে সাহায্য নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসেছে? তাদের থেকে আমরা কী শিখতে পারি?
পর্ব ৫: বেরিয়ে আসার পথ
পৃথিবীতে কিছু দেশ আছে যারা সাহায্যনির্ভর ছিল, কিন্তু সফলভাবে বেরিয়ে এসেছে। তাদের গল্প পড়লে বাংলাদেশের জন্য পথ খুঁজে পাওয়া যায়।
ভিয়েতনাম। ১৯৯০ সালে ওডিএ ছিল জিএনআই-র ৫.৮%। আজ ০.৫%। কীভাবে? তারা এফডিআই (প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ) আকৃষ্ট করেছে। স্যামসাং, ইন্টেল, এলজি, সবাই ভিয়েতনামে কারখানা বসিয়েছে। এফডিআই এখন জিডিপি-র ৬%। রপ্তানি বৈচিত্র্যময়, শুধু গার্মেন্টস না, ইলেকট্রনিক্স, যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার। সরকার ব্যবসা সহজ করেছে, দুর্নীতি কমিয়েছে, প্রশিক্ষিত শ্রমশক্তি তৈরি করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া। ১৯৭৫ সালে সাহায্য ছিল জিএনআই-র ৪.২%। আজ? কোরিয়া নিজে দাতা দেশ। ২০১০ সালে OECD DAC-এ যোগ দিয়েছে। সাহায্য গ্রহীতা থেকে সাহায্য দাতায় পরিণত হওয়ার ইতিহাসে এটা সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ। কীভাবে? শিক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ, শিল্পনীতি, রপ্তানিমুখী কৌশল, আর প্রযুক্তি খাতে একাগ্রতা।
কম্বোডিয়া। ১৯৯৫ সালে সাহায্য ছিল ১২.৪%। এখন ৩.২%। এখনো অনেক নির্ভরশীল, কিন্তু ক্রমশ কমছে। পর্যটন, গার্মেন্টস, আর এফডিআই দিয়ে ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপন করছে।
বাংলাদেশ কোথায়? ১৯৯০ সালে ৬.৭%, ২০২৫ সালে ০.৭%। সংখ্যাগত দিক থেকে প্রায় বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু প্রস্তুতি? সেখানেই সমস্যা।
ভিয়েতনাম সাহায্য কমার আগেই এফডিআই আনার ব্যবস্থা করেছিল। কোরিয়া সাহায্য কমার আগেই শিল্পায়ন করেছিল। বাংলাদেশ? এফডিআই জিডিপি-র ০.৬%। রপ্তানি ৮৫% গার্মেন্টস-নির্ভর। কর-জিডিপি অনুপাত ৮%, দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। মানে সাহায্য কমে গেলে সেই ঘাটতি পূরণ করার মতো অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের সক্ষমতাও নেই।
পর্ব ৬: কী করতে হবে
একটু ভাবুন। বিদেশি সাহায্য কমে যাওয়া অনিবার্য। দাতা ক্লান্তি বাড়ছে, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হচ্ছে, বৈশ্বিক রাজনীতি বদলাচ্ছে। এটা নিয়ে কান্নাকাটি করে লাভ নেই। প্রশ্ন হলো: আমরা কি প্রস্তুত? আর যদি প্রস্তুত না হই, তাহলে কী করতে হবে?
তিনটা কাজ।
প্রথমত, কর আদায় বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৮%। ভারতে ১১%, ভিয়েতনামে ১৪%, থাইল্যান্ডে ১৭%। যদি বাংলাদেশ কর-জিডিপি অনুপাত ১২%-এ নিয়ে যেতে পারে (যেটা খুব বেশি না), তাহলে বছরে অতিরিক্ত ১৮ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আসবে। পুরো বিদেশি সাহায্যের তিনগুণের বেশি। সমস্যা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। ধনীদের ওপর কর বসানো কঠিন, কারণ তারাই রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক।
দ্বিতীয়ত, সাহায্যের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। যে সাহায্য আসছে, সেটা ঠিকমতো ব্যবহার করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের হার ৩৮% থেকে অন্তত ৬০%-এ নিয়ে যেতে হবে। ঋণ ব্যবহারের হার বাড়াতে হবে। জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সংস্কার করতে হবে। প্রকল্প পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। দুর্নীতি কমাতে হবে। এগুলো শুধু সাহায্যের জন্য না, নিজেদের উন্নয়নের জন্যও দরকার।
তৃতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়নকে আলাদা করে দেখতে হবে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী না, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত সবচেয়ে বেশি। এটা ঐতিহ্যবাহী সাহায্য না, এটা ক্ষতিপূরণ। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড, এগুলোতে বাংলাদেশের ন্যায্য দাবি আছে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হলেও জলবায়ু অর্থায়ন আলাদা ক্যাটাগরিতে রাখার জন্য আন্তর্জাতিক লবি করতে হবে।
আসুন শেষ করি একটা বাস্তবতা দিয়ে।
বাংলাদেশ আর ১৯৭১ সালের "bottomless basket case" নেই। দেশ অনেক এগিয়েছে। গরিব মানুষ গার্মেন্টসে কাজ করে, প্রবাসী ভাই টাকা পাঠায়, কৃষক তিনবার ধান ফলায়। এই মানুষগুলোর শক্তিতে দেশ দাঁড়িয়ে আছে, বিদেশি সাহায্যের জোরে না।
কিন্তু সেই মানুষগুলোর জন্য স্বাস্থ্যসেবা দরকার, শিক্ষা দরকার, জলবায়ু অভিযোজন দরকার। এগুলোর টাকা এতদিন আংশিকভাবে বিদেশ থেকে আসতো। সেই টাকা কমে যাচ্ছে। কমতে থাকবে। বিদেশিরা আমাদের সমস্যা সমাধান করবে, এই ধারণা ত্যাগ করতে হবে।
প্রশ্ন হলো: নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করার সক্ষমতা কি আমাদের আছে? উত্তরটা হতে পারে "হ্যাঁ", যদি আমরা কর আদায় করি, সম্পদ দক্ষভাবে ব্যবহার করি, আর প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছাই। কিন্তু "হ্যাঁ" বলাটা সহজ। করাটা কঠিন।
সাহায্যের যুগ শেষ হচ্ছে। স্বনির্ভরতার যুগ শুরু হওয়া উচিত ছিল অনেক আগে। আমরা দেরি করে ফেলেছি। কিন্তু দেরি মানে অসম্ভব নয়। দক্ষিণ কোরিয়া পেরেছে, ভিয়েতনাম পারছে। বাংলাদেশও পারবে। যদি চায়।