Back to publications
Narrative 2026-03-06

রানা প্লাজার পর কী বদলেছে?

গার্মেন্টস কারখানার নিরাপত্তা: অগ্রগতি ও অসম্পূর্ণতা

রানা প্লাজার পর কী বদলেছে?

পর্ব ১: ১,১৩৪ জন

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল। সকাল ন'টার কিছু আগে। সাভারের রানা প্লাজা ভবনে হাজার হাজার গার্মেন্টস শ্রমিক ঢুকছে কাজে। আগের দিন ভবনে ফাটল দেখা গিয়েছিল। ব্যাংক আর দোকানগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি? খোলা। মালিকরা বলেছিল, "কাজে আসো, না এলে বেতন কাটা যাবে।"

সকাল আটটা পঁয়তাল্লিশে ভবনটা ভেঙে পড়লো। আট তলা ভবন, পাঁচটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। ১,১৩৪ জন মারা গেলো। ২,৫০০ জনের বেশি আহত। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনাগুলোর একটা।

কমপ্লায়েন্স কাগজে আছে, বাস্তবে কতটা, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। ভবন কাঠামোগত নিরাপত্তার চিত্র দেখুন: Accord-এর প্রাথমিক পরিদর্শনে ২৯% কারখানায় গুরুতর কাঠামোগত সমস্যা পাওয়া গিয়েছিল।
মোট ১.৫ লাখ
Accord ও Alliance, একটা অভূতপূর্ব পরীক্ষা
প্রায় ৫৫-৬০%
RSC, নতুন অধ্যায় নাকি পুরোনো সমস্যা
৩-৫ ডলার
বিশ্বের চোখে বাংলাদেশ

কিন্তু রানা প্লাজা হঠাৎ ঘটেনি। এর আগেও ঘটেছে, বারবার। ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনস ফ্যাক্টরিতে আগুনে ১১৭ জন মারা গিয়েছিল। জরুরি বহির্গমন পথ তালাবদ্ধ ছিল। ২০১০ সালে হামিম গ্রুপের ফ্যাক্টরিতে আগুনে ২৯ জন। ২০০৬ সালে চিটাগাং-এ কেটিএস ফ্যাক্টরিতে ৬৪ জন। প্রতিটা দুর্ঘটনার পর শোক, প্রতিশ্রুতি, তদন্ত কমিটি। তারপর ভুলে যাওয়া।

রানা প্লাজা ভুলে যাওয়া গেলো না। কারণ সংখ্যাটা এত বড় ছিল যে পুরো বিশ্ব নড়ে বসলো।

এই চার্টটা দেখুন:

২০০৬ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানায় আগুন ও দুর্ঘটনায় মৃত্যুর চিত্র। ২০১৩ সালের স্পাইকটা রানা প্লাজা। কিন্তু লক্ষ করুন: ২০১৩-র আগেও প্রতি বছর দশ থেকে শ খানেক শ্রমিক মারা যাচ্ছিল। সেই মৃত্যুগুলো পশ্চিমা মিডিয়ায় আসেনি, তাই "ঘটেনি"।

রানা প্লাজার পর কিছু একটা বদলালো। বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ড, জারা, এইচঅ্যান্ডএম, প্রাইমার্ক, বেনেটন, তারা চাপে পড়লো। ভোক্তারা জিজ্ঞেস করতে লাগলো: "আমার জামাটা কি একটা ডেথ ট্র্যাপে বানানো হয়েছে?" এই চাপ থেকে জন্ম নিলো দুটো উদ্যোগ যেগুলো বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পকে বদলে দিলো।


পর্ব ২: Accord ও Alliance, একটা অভূতপূর্ব পরীক্ষা

রানা প্লাজার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দুটো আন্তর্জাতিক উদ্যোগ তৈরি হলো। Accord on Fire and Building Safety in Bangladesh (ইউরোপীয় ব্র্যান্ড ও ট্রেড ইউনিয়নদের) এবং Alliance for Bangladesh Worker Safety (উত্তর আমেরিকান ব্র্যান্ডদের)। এই দুটো সংগঠন মিলে ২,০০০-এরও বেশি কারখানা পরিদর্শন করলো। আগুন নিরাপত্তা, ভবন কাঠামো, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, সব পরীক্ষা করলো।

এই চার্টটা দেখুন:

২০১৩ সালে যখন পরিদর্শন শুরু হলো, প্রায় প্রতিটা কারখানায় গুরুতর সমস্যা পাওয়া গেলো। কোথাও আগুন নির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। কোথাও জরুরি বহির্গমন পথ ব্লক করা। কোথাও ভবনের কাঠামোই দুর্বল। মোট ১.৫ লাখের বেশি সমস্যা চিহ্নিত হলো।

Accord ও Alliance যেটা করলো সেটা আগে কখনো হয়নি। তারা শুধু সমস্যা চিহ্নিত করলো না, মেরামতও বাধ্যতামূলক করলো। কারখানা মালিককে বললো: "এই সমস্যাগুলো ঠিক করো, না হলে বায়ার অর্ডার দেবে না।" এটা ছিল বাজারভিত্তিক চাপ। সরকারি আইন না, ক্রেতাদের শর্ত। আর সেই শর্ত কাজ করলো।

প্রাথমিক পরিদর্শনে যে সমস্যাগুলো ধরা পড়েছিল, তার ৯০% এর বেশি ২০২৩ সালের মধ্যে মেরামত করা হয়েছে। এটা একটা উল্লেখযোগ্য অর্জন। হাজার হাজার কারখানায় ফায়ার ডোর লাগানো হয়েছে, স্প্রিংকলার সিস্টেম বসানো হয়েছে, বৈদ্যুতিক তার বদলানো হয়েছে, কাঠামোগত দুর্বলতা মেরামত করা হয়েছে।

কিন্তু মেরামতের গল্পটা এত সরল না। কারণ কে এই খরচ বহন করলো? মূলত কারখানা মালিকরা। কিছু ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডরা আর্থিক সহায়তা দিয়েছে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মালিককেই নিজের পকেট থেকে দিতে হয়েছে। ছোট কারখানার জন্য এটা ছিল বিশাল বোঝা। কিছু কারখানা বন্ধই হয়ে গেছে, মেরামতের খরচ বহন করতে না পেরে।

আর রানা প্লাজায় যারা মারা গেলো, আহত হলো, তাদের কী হলো?

রানা প্লাজা ট্রাস্ট ফান্ড তৈরি হয়েছিল আন্তর্জাতিক চাপে। লক্ষ্য ছিল ৩০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা। বাস্তবে সংগ্রহ হয়েছে প্রায় ৩০ মিলিয়ন, আইএলও-র তত্ত্বাবধানে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। কিন্তু ক্ষতিপূরণের পরিমাণ? গড়ে একটা পরিবার পেয়েছে ৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ ডলার। একজন মৃত শ্রমিকের পরিবার কত পেলে তার জীবনের "দাম" হয়? এই প্রশ্নের উত্তর কারো কাছে নেই।

তাজরীন ফ্যাশনসের ক্ষতিগ্রস্তরা আরো কম পেয়েছে। আরো আগের দুর্ঘটনাগুলো? প্রায় কিছুই না। ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক চাপ থাকলে কাজ করে, না থাকলে করে না। এটা একটা সিস্টেমিক ব্যর্থতা।


পর্ব ৩: কমপ্লায়েন্সের আলো ও ছায়া

রানা প্লাজার পর দশ বছরে বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানার নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা বদলেছে? সংখ্যা দিয়ে দেখা যাক।

২০১৩ সালে যখন Accord পরিদর্শন শুরু করলো, মাত্র ১০%-এর কম কারখানা আন্তর্জাতিক আগুন ও ভবন নিরাপত্তা মান পূরণ করতো। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৫% (Accord/RSC-এর আওতাভুক্ত কারখানাগুলোতে)। এটা নাটকীয় উন্নতি। কিন্তু এই সংখ্যার পেছনে একটা বড় সতর্কতা আছে।

এই ৮৫% হলো সেই কারখানাগুলো যেগুলো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সরাসরি সরবরাহ চেইনে আছে। বাংলাদেশে মোট গার্মেন্টস কারখানার সংখ্যা প্রায় ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ (বিভিন্ন হিসাবে ভিন্ন)। Accord/RSC পরিদর্শন করেছে প্রায় ২,০০০টি। বাকি ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কারখানা? সেগুলো সাবকন্ট্রাক্ট ফ্যাক্টরি, ছোট কারখানা, যেগুলো সরাসরি রপ্তানি করে না কিন্তু বড় কারখানার অর্ডার শেয়ার করে। সেগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন? কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। কারণ কেউ পরীক্ষা করেনি।

আগুন নিরাপত্তা সরঞ্জামের দিকে তাকানো যাক:

Accord/RSC আওতাভুক্ত কারখানাগুলোতে ফায়ার অ্যালার্ম, স্প্রিংকলার, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, জরুরি বহির্গমন পথ, এসবের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০১৩ সালে ৩০% এরও কম কারখানায় কার্যকর স্প্রিংকলার সিস্টেম ছিল। ২০২৫ সালে সেটা ৯২%। ফায়ার অ্যালার্ম ২৫% থেকে ৯৫%। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ৪০% থেকে ৯৮%। সংখ্যাগুলো চমৎকার।

কিন্তু সরঞ্জাম থাকা আর সরঞ্জাম কাজ করা এক জিনিস না। ২০২৩ সালে একটা জরিপে দেখা গেছে, অনেক কারখানায় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মেয়াদ শেষ, স্প্রিংকলারের রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি, ফায়ার ড্রিল কাগজে আছে কিন্তু বাস্তবে হয় না। কমপ্লায়েন্স কাগজে আছে, বাস্তবে কতটা, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ।

ভবন কাঠামোগত নিরাপত্তার চিত্র দেখুন:

Accord-এর প্রাথমিক পরিদর্শনে ২৯% কারখানায় গুরুতর কাঠামোগত সমস্যা পাওয়া গিয়েছিল। অতিরিক্ত তলা নির্মাণ, দুর্বল ভিত্তি, কলামে ফাটল। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৫%-এ। অনেক কারখানা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে, কিছু স্থানান্তরিত হয়েছে নতুন ভবনে। কিন্তু পুরোনো শিল্পাঞ্চলগুলোতে, বিশেষ করে ঢাকার ভেতরে, এখনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কারখানা চলছে। সেগুলো অধিকাংশই Accord/RSC-এর আওতার বাইরে।


পর্ব ৪: RSC, নতুন অধ্যায় নাকি পুরোনো সমস্যা?

Accord-এর মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর (২০১৩ থেকে ২০১৮)। পরে বাড়িয়ে ২০২০ পর্যন্ত করা হয়। তারপর? একটা বড় প্রশ্ন উঠলো: এই পরিদর্শন ব্যবস্থা কে চালাবে? বিদেশি সংগঠন চিরকাল থাকবে না। বাংলাদেশকে নিজের দায়িত্ব নিতে হবে।

২০২০ সালে তৈরি হলো RMG Sustainability Council (RSC)। এটা বাংলাদেশভিত্তিক সংগঠন, যেখানে কারখানা মালিক, ব্র্যান্ড, এবং শ্রমিক প্রতিনিধি তিনপক্ষই আছে। RSC এখন Accord-এর কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো: RSC কি Accord-এর মতো কঠোর?

RSC-এর আওতায় এখন প্রায় ২,০০০ কারখানা। এটা মোট রপ্তানিমুখী কারখানার প্রায় ৫৫-৬০%। বাকি ৪০% এর কাছাকাছি কারখানা কোনো আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থার আওতায় নেই। তারা নির্ভর করে সরকারি পরিদর্শন সংস্থা DIFE (Department of Inspection for Factories and Establishments) এর উপর। DIFE-র পরিদর্শক আছে ৪০০-এর কম, পুরো দেশের সব কারখানার জন্য (শুধু গার্মেন্টস না, সব শিল্প)। একজন পরিদর্শকের পক্ষে বছরে কয়টা কারখানা পরিদর্শন করা সম্ভব? গাণিতিকভাবেই অসম্ভব।

RSC নিয়ে আরেকটা উদ্বেগ আছে। Accord ছিল আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। ব্র্যান্ডরা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, চুক্তি ভাঙলে আদালতে যাওয়ার সুযোগ ছিল। RSC? এটা অনেকটা স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে চলে। চাপ কম, নমনীয়তা বেশি। কেউ কেউ বলছেন এটা বাস্তববাদী, কারণ বাংলাদেশকে নিজে করতে হবে। অন্যরা বলছেন এটা পিছিয়ে যাওয়া।

শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের দিকে তাকানো যাক:

২০১৩ সালে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ পাওয়ার হার ছিল ৫%-এর কম। ২০২৫ সালে সেটা বেড়ে প্রায় ৬৫% হয়েছে (Accord/RSC আওতাভুক্ত কারখানায়)। কিন্তু প্রশিক্ষণের মান কেমন? অনেক ক্ষেত্রে "প্রশিক্ষণ" মানে একটা ভিডিও দেখানো, একটা কাগজে সই নেওয়া। ফায়ার ড্রিল কতটা বাস্তবসম্মত, শ্রমিকরা আসলেই জানে কি জরুরি অবস্থায় কী করতে হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর সংখ্যায় পাওয়া যায় না।

একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: শ্রমিকের অধিকার বলতে শুধু ভবন না ভাঙা বোঝায় না। Safety committee-তে শ্রমিকের কণ্ঠস্বর আছে কি? কারখানায় অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা আছে কি? কোনো শ্রমিক যদি বলে "এই ভবনটা নিরাপদ না, আমি কাজ করবো না," সেটা বলার অধিকার তার আছে কি? রানা প্লাজায় যারা মারা গিয়েছিল, তাদের অনেকেই জানতো ভবনে ফাটল আছে। কিন্তু তাদের "না" বলার সুযোগ ছিল না। চাকরি যাওয়ার ভয়ে ঢুকেছিল। সেই ভয় কি কমেছে?


পর্ব ৫: বিশ্বের চোখে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের কারখানা নিরাপত্তার অগ্রগতি কি বিশ্বমানে দাঁড়ায়? একটা তুলনামূলক চিত্র দেখা যাক:

প্রতি লাখ গার্মেন্টস শ্রমিকে কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার। বাংলাদেশে ২০১৩ সালে এই হার ছিল ভয়াবহ, ২৮.৫ (রানা প্লাজাসহ)। ২০২৫ সালে সেটা নেমে এসেছে ০.৯-এ। ভিয়েতনামে ০.৫, চীনে ০.৪, তুরস্কে ১.২, কম্বোডিয়ায় ০.৮। বাংলাদেশ এখন আঞ্চলিক গড়ের কাছাকাছি। রানা প্লাজার আগের বাংলাদেশের সাথে তুলনা করলে এটা বিশাল অগ্রগতি।

কিন্তু এই সংখ্যায় একটা সমস্যা আছে। বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনার রিপোর্টিং ব্যবস্থা দুর্বল। অনেক ছোট দুর্ঘটনা, আঘাত, পেশাগত রোগ, এগুলো রিপোর্ট হয় না। শ্রমিকরা ভয়ে রিপোর্ট করে না, কারখানা মালিকরা চাপা দেয়। তাই প্রকৃত সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। তারা Accord-এ স্বাক্ষর করেছে, RSC-তে আছে। কিন্তু তারা কি ন্যায্য দাম দিচ্ছে? কারখানা মালিক যখন ক্রেতার কাছ থেকে পায় প্রতি টি-শার্টে ৩-৫ ডলার, সেখান থেকে নিরাপত্তা সরঞ্জাম কিনতে হয়, শ্রমিকের বেতন দিতে হয়, ভবন রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। দাম চেপে ধরলে নিরাপত্তায় কাটছাঁট হবে, এটা অর্থনীতির সহজ হিসাব। Accord ভবন ঠিক করতে বাধ্য করেছে, কিন্তু ক্রেতাদের ন্যায্য দাম দিতে বাধ্য করেনি। এই ফাঁকটা এখনো আছে।


পর্ব ৬: এরপর কী?

রানা প্লাজার তেরো বছর পর বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে?

অগ্রগতি হয়েছে, সেটা অস্বীকার করা যাবে না। ২,০০০-এর বেশি কারখানা পরিদর্শন ও মেরামত হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু নাটকীয়ভাবে কমেছে। আগুন নিরাপত্তা সরঞ্জাম বেড়েছে। শ্রমিকদের একটা অংশ প্রশিক্ষণ পেয়েছে। RSC একটা স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে।

কিন্তু কাজ শেষ হয়নি। তিনটা বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।

প্রথমত, আওতার সমস্যা। মোট কারখানার প্রায় ৪০% কোনো আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থার বাইরে। সাবকন্ট্রাক্ট ফ্যাক্টরি, ছোট কারখানা, অনানুষ্ঠানিক ইউনিট, এদের নিরাপত্তা কে দেখবে? DIFE-র সক্ষমতা যথেষ্ট না। সরকারকে পরিদর্শন সংস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। শুধু পরিদর্শক নিয়োগ না, প্রযুক্তি ব্যবহার, ডিজিটাল মনিটরিং, রিয়েল-টাইম কমপ্লায়েন্স ট্র্যাকিং, এগুলো দরকার।

দ্বিতীয়ত, কাঠামোগত পরিবর্তনের অভাব। নিরাপত্তা সরঞ্জাম লাগানো হয়েছে, কিন্তু শ্রমিকের ক্ষমতায়ন হয়নি। ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার এখনো সীমিত। কারখানায় সেফটি কমিটিতে শ্রমিকের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নেই। "না" বলার অধিকার, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ প্রত্যাখ্যান করার অধিকার, এগুলো কাগজে আছে, বাস্তবে প্রয়োগ হয় না।

তৃতীয়ত, দাম ও নিরাপত্তার দ্বন্দ্ব। যতদিন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডরা সর্বনিম্ন দামে কিনতে চাইবে, ততদিন কারখানা মালিকের উপর নিরাপত্তায় কাটছাঁট করার চাপ থাকবে। ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ, সরবরাহ চেইনে স্বচ্ছতা, এগুলো ছাড়া কমপ্লায়েন্স টেকসই হবে না।

রানা প্লাজায় ১,১৩৪ জন মানুষ মারা গিয়েছিল। তাদের প্রত্যেকের নাম ছিল, পরিবার ছিল, স্বপ্ন ছিল। তাদের মৃত্যু একটা শিল্পকে বদলাতে বাধ্য করেছে। সেই বদলের অনেকটাই ঘটেছে। কিন্তু যতক্ষণ একজন শ্রমিকও ভয়ে কারখানায় ঢোকে, যতক্ষণ একটা কারখানাও পরিদর্শনের বাইরে থাকে, যতক্ষণ "সস্তায় বানাও" এই মন্ত্র চলতে থাকে, ততক্ষণ রানা প্লাজার শিক্ষা অসম্পূর্ণ থাকবে।

১,১৩৪ জনের জীবনের বিনিময়ে আমরা যেটুকু শিখেছি, সেটুকু যেন না ভুলি।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50