Back to publications
Narrative 2026-03-06

আপনার বোনের ফ্যাক্টরি কি টিকবে?

বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প: সাফল্যের আড়ালে যে সংকট

আপনার বোনের ফ্যাক্টরি কি টিকবে?

পর্ব ১: সেলাই মেশিনের গল্প

তার নাম রহিমা। বয়স ২৬। গাজীপুরের একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। সকাল আটটায় ফ্যাক্টরিতে ঢোকে, রাত আটটায় বেরোয়। কখনো দশটা, কখনো এগারোটা। ওভারটাইম। মাসে বেতন পায় ১২,৫০০ টাকা। ডিসেম্বরে বাড়লো, এখন ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০।

রহিমা একটা টি-শার্ট সেলাই করে। সেই টি-শার্ট জারা বা এইচঅ্যান্ডএম-এর দোকানে বিক্রি হয় ২০-৩০ ডলারে। রহিমা সেই টি-শার্ট বানাতে পায় কত? পুরো প্রক্রিয়ার হিসাবে, শ্রমিকের ভাগে যায় মোট খুচরা মূল্যের ২-৩%। মানে ৩০ ডলারের টি-শার্টে রহিমার অংশ ৬০-৯০ সেন্ট। এক ডলারেরও কম।

কিন্তু শুধু একমুখী নির্ভরতা সমস্যা না। আসল সমস্যা হলো, বাংলাদেশ এই শিল্পের সবচেয়ে নিচের ধাপে আটকে আছে।
প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক
সেলাই মেশিনের গল্প
মাসে ১২,৫০০ টাকা
ফাঁদ
৬০-৭০%
ঝড় আসছে

রহিমার সাথে একই ফ্যাক্টরিতে কাজ করে আরো ৩,০০০ নারী। পুরো বাংলাদেশে এরকম প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। তাদের ৮০% নারী। গ্রাম থেকে আসা, অধিকাংশের পড়াশোনা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। এরা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি শিল্পের মেরুদণ্ড।

এবার একটু জুম আউট করুন।

এই চার্টটা দেখুন:

১৯৯৫ সালে বাংলাদেশের গার্মেন্টস রপ্তানি ছিল ২.২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে সেটা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলারে। তিন দশকে বিশ গুণ বৃদ্ধি। পৃথিবীতে খুব কম দেশ আছে যারা একটা শিল্পে এরকম ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। বাংলাদেশ এখন চীনের পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক।

এটা একটা অসাধারণ সাফল্যের গল্প। গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছে। লাখ লাখ নারী প্রথমবার ঘরের বাইরে বেরিয়ে কাজ করছে। গ্রামীণ দারিদ্র্য কমেছে। বৈদেশিক মুদ্রা আসছে। অবকাঠামো তৈরি হয়েছে।

কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে একটা ভয়ংকর ফাঁদ তৈরি হয়েছে। আর সেই ফাঁদের নাম: একমুখী নির্ভরতা।


পর্ব ২: ফাঁদ

এই চার্টটা দেখুন:

বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮৪% আসে শুধু গার্মেন্টস থেকে। এটা একটু ভেবে দেখুন। একটা দেশের রপ্তানি আয়ের ৮৪% একটা মাত্র শিল্প থেকে আসে। পৃথিবীতে এরকম নির্ভরতা আর কোথাও নেই। তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতেও রপ্তানি এত একমুখী না।

২০০০ সালে এই অনুপাত ছিল ৭৬%। ২৫ বছরে কমেনি, বরং বেড়েছে। মানে বাংলাদেশ রপ্তানি বৈচিত্র্যের দিক থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে, এগোচ্ছে না।

এটা কেন বিপজ্জনক? কারণ যেকোনো ধাক্কায় পুরো অর্থনীতি টলে যায়। কোভিড-১৯ এর সময় যখন পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো অর্ডার বাতিল করলো, বাংলাদেশের রপ্তানি এক ধাক্কায় ১৮% পড়ে গিয়েছিল। লাখ লাখ শ্রমিক চাকরি হারালো। ফ্যাক্টরি বন্ধ হলো। আর কোনো বিকল্প ছিল না, কারণ গার্মেন্টস ছাড়া রপ্তানি করার মতো আর কিছু নেই।

কিন্তু শুধু একমুখী নির্ভরতা সমস্যা না। আসল সমস্যা হলো, বাংলাদেশ এই শিল্পের সবচেয়ে নিচের ধাপে আটকে আছে। সবচেয়ে কম মূল্য সংযোজনের ধাপে। সবচেয়ে সস্তা শ্রমের ধাপে।

রহিমার মজুরি কত, সেটা দেখুন প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায়:

বাংলাদেশে গার্মেন্টস শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি মাসে ১১৩ ডলার। ভিয়েতনামে ২৫০ ডলার। চীনে ৩৫০ ডলার। তুরস্কে ৪৯০ ডলার। শুধু ইথিওপিয়া বাংলাদেশের চেয়ে কম, ২৬ ডলার।

"সস্তা শ্রম আমাদের সুবিধা!" এই কথাটা বাংলাদেশে গর্বের সাথে বলা হয়। কিন্তু একটু থামুন। সস্তা শ্রম মানে কী? মানে রহিমা মাসে ১২,৫০০ টাকায় বেঁচে থাকে। মানে তার সন্তানের জন্য ভালো স্কুলের সামর্থ্য নেই। মানে অসুখ হলে সরকারি হাসপাতালের লাইনে দাঁড়াতে হয়। "সস্তা শ্রম" শুনতে অর্থনৈতিক সুবিধা মনে হয়, কিন্তু এটা আসলে দারিদ্র্যের আরেক নাম।

আর সবচেয়ে বড় সমস্যা: বাংলাদেশ গত তিন দশকে ভ্যালু চেইনে উপরে উঠতে পারেনি। এই চার্টটা দেখুন:

গার্মেন্টস উৎপাদনে তিনটা ধাপ আছে। সবচেয়ে নিচে সিএমটি (কাটা-সেলাই-ট্রিম), বায়ার কাপড় দেয়, ডিজাইন দেয়, আপনি শুধু কাটেন, সেলাই করেন, পাঠিয়ে দেন। এতে মূল্য সংযোজন সবচেয়ে কম। এরপর এফওবি, যেখানে আপনি নিজে কাঁচামাল সংগ্রহ করেন। সবচেয়ে উপরে ওডিএম/ওবিএম, যেখানে আপনি নিজে ডিজাইন করেন, নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করেন।

বাংলাদেশের ৮৫% উৎপাদন সিএমটি। শুধু কাটা-সেলাই। ভিয়েতনাম? তাদের ৫০% এফওবি, ২০% ওডিএম। তারা নিজেরা কাপড় কিনছে, ডিজাইন করছে, ব্র্যান্ড তৈরি করছে। বাংলাদেশ তিন দশক ধরে সেলাই করেই যাচ্ছে।

সিএমটি-তে আটকে থাকা মানে কী? মানে আপনি শুধু হাত ভাড়া দিচ্ছেন। কাপড়ের দাম বায়ার ঠিক করে, ডিজাইন বায়ার দেয়, দাম বায়ার নির্ধারণ করে। আপনার কোনো দরকষাকষির ক্ষমতা নেই। বায়ার যেদিন বলবে "ভিয়েতনাম সস্তায় দিচ্ছে, ওদের দিচ্ছি অর্ডার," সেদিন আপনি কিছুই করতে পারবেন না।

আর সেই বায়ারদের ক্ষমতা কতটা? এই চার্টটা দেখুন:

বাংলাদেশের গার্মেন্টস রপ্তানির ৬১% যায় মাত্র পাঁচটা দেশে: যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স। আর এই বাজারগুলোতে ক্রেতা কারা? জারা, এইচঅ্যান্ডএম, ওয়ালমার্ট, প্রাইমার্ক, নেক্সট। হাতে গোনা কয়েকটা বহুজাতিক কোম্পানি। তারা দাম ঠিক করে, শর্ত ঠিক করে, ডেলিভারি সময় ঠিক করে। বাংলাদেশের হাজার হাজার ছোট-বড় কারখানা তাদের শর্তে কাজ করে। এটা বাজার অর্থনীতি না, এটা একপক্ষীয় ক্ষমতার কাঠামো।


পর্ব ৩: ঝড় আসছে

বাংলাদেশ সস্তা শ্রমের সুবিধায় তিন দশক ধরে গার্মেন্টস রপ্তানি করে আসছে। কিন্তু সেই সুবিধা টিকবে কতদিন?

তিনটা ঝড় আসছে। একসাথে।

প্রথম ঝড়: অটোমেশন। সেলাই মেশিন চালাতে এখন রহিমা লাগে। কিন্তু চীন, তুরস্ক, ভিয়েতনামে রোবটিক সেলাই মেশিন আসছে। SoftWear Automation নামের একটা কোম্পানি ইতোমধ্যে টি-শার্ট বানানোর পুরো প্রক্রিয়া অটোমেট করেছে। একটা রোবোটিক লাইনে যেখানে আগে ১০ জন শ্রমিক লাগতো, এখন লাগে ১ জন অপারেটর।

চীনে প্রতি ১০,০০০ শ্রমিকে ৩৯২টা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট আছে। বাংলাদেশে? ১টা। এই পার্থক্যটা এখন বাংলাদেশের সুবিধা, কারণ শ্রমিক সস্তা তাই রোবটের দরকার নেই। কিন্তু রোবটের দাম প্রতি বছর কমছে। যেদিন একটা রোবোটিক সেলাই ইউনিটের খরচ রহিমার মজুরির সমান হবে, সেদিন কারখানার মালিকের কাছে রহিমা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে।

আর সেদিন খুব দূরে না। ম্যাকিনসির হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে গার্মেন্টস শিল্পের ৬০-৭০% কাজ অটোমেটেড হতে পারে। ৪০ লাখ শ্রমিকের মধ্যে ২৫-৩০ লাখের কাজ ঝুঁকিতে।

দ্বিতীয় ঝড়: প্রতিযোগী দেশগুলোর উত্থান। বাংলাদেশ একা নেই এই খেলায়।

ভিয়েতনাম ২০১৫ থেকে ২০২৫ এর মধ্যে গার্মেন্টস রপ্তানি দ্বিগুণের বেশি করেছে। তারা শুধু সস্তায় বানাচ্ছে না, ভালোও বানাচ্ছে। নাইকি, অ্যাডিডাস, আন্ডার আর্মার, এরা সব ভিয়েতনামে শিফট করেছে। কারণ ভিয়েতনামে কাঁচামাল সরবরাহ চেইন শক্তিশালী, শ্রমিকরা বেশি দক্ষ, সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করেছে। ইথিওপিয়া নতুন প্রতিযোগী হিসেবে উঠে আসছে। তাদের শ্রমিকের মজুরি বাংলাদেশের চারভাগের একভাগ। ভারত তার বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার আর কাঁচামালের সুবিধা কাজে লাগাচ্ছে।

তৃতীয় ঝড়: রানা প্লাজার উত্তরাধিকার আর ESG চাপ। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ভবন ধসে ১,১৩৪ জন গার্মেন্টস শ্রমিক মারা গিয়েছিল। সেটা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনাগুলোর একটা।

রানা প্লাজার পর অবস্থা অনেক উন্নতি হয়েছে। Accord ও Alliance পরিদর্শনে হাজার হাজার কারখানা মেরামত হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু নাটকীয়ভাবে কমেছে। কিন্তু এখন নতুন চাপ আসছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ESG (পরিবেশ, সামাজিক, গভর্ন্যান্স) বিধিমালা আনছে। সাপ্লাই চেইন ডিউ ডিলিজেন্স আইন আসছে। মানে ইউরোপীয় কোম্পানিকে প্রমাণ করতে হবে যে তাদের সাপ্লায়ার দেশে শ্রমিক শোষণ হচ্ছে না, পরিবেশ ক্ষতি হচ্ছে না। বাংলাদেশের কারখানাগুলো এই মান পূরণ করতে পারবে? সবগুলো পারবে না। যেগুলো পারবে না, তারা অর্ডার হারাবে।

এবার শ্রমিকের উৎপাদনশীলতার দিকে তাকানো যাক:

বাংলাদেশের শ্রমিক প্রতি বার্ষিক মূল্য সংযোজন ৪,৮০০ ডলার। ভিয়েতনামে ৭,৫০০। চীনে ১২,৫০০। তুরস্কে ১৫,০০০। মানে একজন চীনা শ্রমিক একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের আড়াই গুণ উৎপাদনশীল। এর কারণ কী? প্রশিক্ষণের অভাব, পুরনো মেশিন, খারাপ ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘ কাজের সময়ে ক্লান্তি। রহিমা ১২ ঘণ্টা কাজ করে বেশি বানায় না, সে ১২ ঘণ্টা কাজ করে কারণ প্রতি ঘণ্টায় তার উৎপাদন কম।

তিনটা ঝড় আসছে। অটোমেশন, প্রতিযোগিতা, আর নিয়ন্ত্রক চাপ। এর যেকোনো একটাই বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পকে বিপদে ফেলতে পারে। তিনটা একসাথে? ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে।


পর্ব ৪: ভিয়েতনাম কী করলো, আমরা কী করলাম না

ভিয়েতনাম আর বাংলাদেশ প্রায় একই সময়ে গার্মেন্টস রপ্তানি শুরু করেছিল। নব্বইয়ের দশকে দুটো দেশই সস্তা শ্রমের উপর ভর করে এই শিল্পে ঢুকেছিল। কিন্তু তিন দশক পর দুটো দেশ সম্পূর্ণ আলাদা জায়গায়।

ভিয়েতনাম যা করেছে:

প্রথমত, কাঁচামাল সরবরাহ চেইন তৈরি করেছে। ভিয়েতনামে এখন নিজস্ব কাপড়ের কল, ডাইং ইউনিট, সুতা উৎপাদন আছে। তারা কাঁচামাল আমদানি নির্ভরতা ৭০% থেকে ৪০% এ নামিয়ে এনেছে। বাংলাদেশ? এখনো ৬৫% কাপড় আমদানি করে।

দ্বিতীয়ত, সিএমটি থেকে এফওবি ও ওডিএম-এ উঠে গেছে। ভিয়েতনামের কারখানাগুলো এখন নিজেরা কাপড় সোর্স করে, ডিজাইন করে, পুরো পণ্য তৈরি করে রপ্তানি করে। তাদের মূল্য সংযোজন বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি।

তৃতীয়ত, বাণিজ্য চুক্তি কাজে লাগিয়েছে। ভিয়েতনাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (EVFTA) করেছে, CPTPP তে যোগ দিয়েছে। এই চুক্তিগুলো তাদের রপ্তানিতে শুল্ক সুবিধা দিচ্ছে। বাংলাদেশ? ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর GSP সুবিধা হারাবে। তখন ইউরোপে রপ্তানিতে ১২% শুল্ক লাগবে। সেই শুল্কটা কে বহন করবে? কারখানার মালিক? না। রহিমার মজুরি থেকে কেটে নেওয়া হবে, অথবা অর্ডারই আসবে না।

চতুর্থত, শ্রমিকের দক্ষতায় বিনিয়োগ করেছে। ভিয়েতনামে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে, সরকারি উদ্যোগে শ্রমিকদের আধুনিক মেশিন চালানো শেখানো হচ্ছে। বাংলাদেশে? গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য কোনো জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি কার্যত নেই।

এখন প্রশ্ন: বাংলাদেশ কি এখনো বদলাতে পারে? উত্তর: হ্যাঁ, তবে সময় কমে আসছে।


পর্ব ৫: যদি আমরা চাইতাম

কল্পনা করুন, ২০৩৫ সাল। বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়ি দেখতে এরকম:

বাম দিকে বর্তমান ছবি: ৮৪% গার্মেন্টস, বাকি সব মিলে ১৬%। ডান দিকে লক্ষ্য: গার্মেন্টস ৫০%, আইটি ও সফটওয়্যার ১৫%, ফার্মাসিউটিক্যালস ১০%, চামড়া ও পাদুকা ৮%, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত ৭%, জাহাজ নির্মাণ ৫%।

এটা কি অবাস্তব? না। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প শক্তিশালী। দেশের ওষুধের ৯৭% দেশীয় কোম্পানি তৈরি করে। রপ্তানিও বাড়ছে। আইটি খাতে তরুণ জনশক্তি আছে। জাহাজ নির্মাণে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে রপ্তানি করছে। সম্ভাবনা আছে, শুধু দরকার কৌশলগত বিনিয়োগ আর নীতি সহায়তা।

আর গার্মেন্টস শিল্পকে ত্যাগ করতে হবে না। সেটাকেও উপরে তুলতে হবে। সিএমটি থেকে এফওবি, এফওবি থেকে ওডিএম। নিজেদের কাপড়ের কল বানাতে হবে। ডিজাইন সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। "মেড ইন বাংলাদেশ" কে একটা ব্র্যান্ড বানাতে হবে, শুধু একটা লেবেল না।

কিন্তু এর জন্য কী দরকার?

প্রথমত, কাঁচামাল সরবরাহ চেইন গড়ে তোলা। বাংলাদেশ ৬৫% কাপড় আমদানি করে। এটা সিংহভাগ আসে চীন ও ভারত থেকে। দেশে বড় আকারের টেক্সটাইল মিল স্থাপনে বিনিয়োগ দরকার। ম্যান-মেইড ফাইবার (পলিয়েস্টার, রেয়ন) উৎপাদন শুরু করতে হবে, কারণ বৈশ্বিক চাহিদা তুলা থেকে সিনথেটিকে সরে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এখনো তুলা-নির্ভর।

দ্বিতীয়ত, শ্রমিকের দক্ষতা উন্নয়ন। রহিমা এখন সেলাই মেশিন চালায়। ২০৩৫ সালে রোবোটিক সেলাই ইউনিট চালাতে হবে। CAD সফটওয়্যার, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, মেশিন মেইনটেন্যান্স, এগুলো শেখাতে হবে। প্রতিটা শিল্পাঞ্চলে (গাজীপুর, আশুলিয়া, চট্টগ্রাম) সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দরকার।

তৃতীয়ত, বাণিজ্য কূটনীতি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, সবার সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি দরকার। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর আগেই এই চুক্তিগুলো করতে হবে। ভিয়েতনাম এটা আগেই করে ফেলেছে।

চতুর্থত, নতুন বাজার খোঁজা। বাংলাদেশের ৬১% গার্মেন্টস যায় পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, এসব বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি নগণ্য। বাজার বৈচিত্র্য না আনলে কয়েকটা দেশের অর্থনৈতিক মন্দাতেই সব ভেঙে পড়বে।

পঞ্চমত, রহিমার মজুরি বাড়ানো। এটা শুধু মানবিক দায়িত্ব না, অর্থনৈতিক প্রয়োজন। রহিমা বেশি পেলে বেশি খরচ করবে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়বে। তার সন্তানরা ভালো শিক্ষা পাবে, ভবিষ্যতের দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি হবে। সস্তা শ্রমের দৌড়ে জেতা সম্ভব না, কারণ সবসময় কেউ না কেউ আপনার চেয়ে সস্তা থাকবে। ইথিওপিয়া আজ, আগামীকাল অন্য কেউ।


আসুন শেষ করি যেখান থেকে শুরু করেছিলাম।

রহিমা আজ রাতেও ফ্যাক্টরিতে ওভারটাইম করবে। ১২ ঘণ্টার পর ক্লান্ত শরীরে হেঁটে যাবে তার ছোট ঘরে। রাতে ভাত রান্না করবে। মেয়েকে ঘুম পাড়াবে। সকালে আবার সেলাই মেশিনের সামনে বসবে।

সে জানে না ভিয়েতনাম কী করেছে। সে জানে না ভ্যালু চেইন কী, ESG কী, অটোমেশন কী। সে শুধু জানে তার বেতন ১২,৫০০ টাকা, আর এই টাকায় তিনজনের সংসার চালাতে হয়।

কিন্তু রহিমা একটা জিনিস জানে যেটা নীতিনির্ধারকরা ভুলে যান: তার কাজটা কঠিন। প্রতিটা সেলাই কঠিন। প্রতিটা দিন কঠিন। এই কঠিন কাজ করে সে আর তার মতো ৪০ লাখ শ্রমিক বাংলাদেশকে ৪৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি এনে দিয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক বানিয়েছে।

তারা আরো ভালো প্রাপ্য। শুধু বেশি মজুরি না, একটা শিল্প যেটা টিকবে। একটা অর্থনীতি যেটা একটা মাত্র পণ্যের উপর দাঁড়িয়ে না থেকে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। একটা ভবিষ্যৎ যেখানে রহিমার মেয়ে শুধু সেলাই মেশিনের সামনে বসবে না, সে চাইলে সেই মেশিনের সফটওয়্যার লিখতে পারবে।

রানা প্লাজা ভেঙে পড়ার এক দশকেরও বেশি হয়ে গেছে। আমরা ভবনটা পুনর্নির্মাণ করিনি, কিন্তু পুরো শিল্পটাকে পুনর্নির্মাণ করার সুযোগ এখনো আছে। প্রশ্ন হলো: আমরা কি সেটা করবো, নাকি আরেকটা ভবন ভাঙার জন্য অপেক্ষা করবো?

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50