Back to publications
Narrative 2026-03-06

বাঙালির সোনার প্রেম: সঞ্চয় না অপচয়?

স্বর্ণ আমদানি, বিয়ের খরচ, আর বৈদেশিক মুদ্রা চাপ

বাঙালির সোনার প্রেম: সঞ্চয় না অপচয়?

পর্ব ১: শিউলির গলার হার

শিউলির বিয়ে হচ্ছে আগামী মাসে। নারায়ণগঞ্জের একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। বাবা কাপড়ের ব্যবসা করেন, মাসিক আয় ৫০-৬০ হাজার টাকা। শিউলির বিয়েতে বরপক্ষ কী চেয়েছে জানেন? দশ ভরি সোনা। ন্যূনতম।

দশ ভরি সোনার দাম আজকের বাজারে? ১২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।

কিন্তু দাম যতই বাড়ুক, বাঙালির সোনার ক্ষুধা কমছে না। বরং বাড়ছে।
৫০-৬০ হাজার টাকা
শিউলির গলার হার
প্রায় ৮৫,০০০ ডলার
অদৃশ্য সোনা
প্রায় ২,৮০০ ডলার
বিয়ের সোনা

শিউলির বাবা হিসাব কষছেন। বিয়ের হল, খাবার, কাপড়চোপড়, বাকি খরচ মিলিয়ে আরো ৫-৬ লাখ। মোট? প্রায় ১৮ লাখ টাকা। তিনি সারাজীবন যা জমিয়েছেন তার চেয়ে বেশি। জমি বিক্রি করবেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেন। আত্মীয়দের কাছে হাত পাতবেন। মেয়ের বিয়ে তো দিতে হবে।

পাঁচ বছর আগে, ২০২০ সালে, দশ ভরি সোনার দাম ছিল ৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। আজ ১২ লাখের বেশি। পাঁচ বছরে দ্বিগুণেরও বেশি। শিউলির বাবার আয় কি পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে? না।

এই চার্টটা দেখুন।

প্রতি ভরি সোনার দাম ২০১৫ সালে ছিল ৪২,৫৮০ টাকা। ২০২০ সালে ৫৮,৬০০। ২০২৫ সালে ১,২৩,৫০০। দশ বছরে প্রায় তিন গুণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে সোনার দাম এত দ্রুত কখনো বাড়েনি। ধূসর ডটেড লাইনটা দেখুন: ১ লাখ টাকার সীমানা। ২০২৪ সালে প্রথমবার এই সীমানা পার হয়েছে। আর ফেরত আসেনি।

কিন্তু দাম যতই বাড়ুক, বাঙালির সোনার ক্ষুধা কমছে না। বরং বাড়ছে। প্রতি বছর বাংলাদেশে কত সোনা ঢুকছে?

আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আমদানি ২০১৫ সালে ছিল মাত্র ৪.২ মেট্রিক টন। ২০২৫ সালে সেটা ২২ টন। পাঁচ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি। সরকার ২০১৮ সালে ব্যাগেজ রুলে ব্যক্তিগত স্বর্ণ আনার সীমা বাড়িয়েছে, ব্যাংকগুলোকে স্বর্ণ আমদানির লাইসেন্স দিয়েছে। ফলে আনুষ্ঠানিক আমদানি লাফ দিয়ে বেড়েছে।

কিন্তু ২২ টন কি পুরো ছবি? একদমই না।


পর্ব ২: অদৃশ্য সোনা

বাংলাদেশে প্রতি বছর যত সোনা ঢোকে, তার অর্ধেকেরও বেশি আসে অনানুষ্ঠানিক পথে। চোরাচালান। দুবাই থেকে, ভারত থেকে, মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে। বিমানবন্দরে যাত্রীর জুতার তলায়, শরীরে গোপন করে, ক্যারিয়ার মারফত। আর স্থলপথে? ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ৪,০৯৬ কিলোমিটারের প্রতিটা ছিদ্র দিয়ে।

এই চার্টটা দেখুন।

নীল অংশটা আনুষ্ঠানিক আমদানি। লাল অংশটা চোরাচালানের অনুমিত পরিমাণ। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট স্বর্ণ খরচ প্রতি বছর ৩৫ থেকে ৪০ মেট্রিক টনের কাছাকাছি। এর মধ্যে আনুষ্ঠানিক পথে আসে ২০-২২ টন। বাকি ১৫-২০ টন? চোরাচালান।

চোরাচালানের প্রধান রুট দুবাই। দুবাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণ ব্যবসাকেন্দ্র। সেখানে সোনা কেনায় কোনো ভ্যাট নেই, ন্যূনতম কাগজপত্র লাগে। একজন ক্যারিয়ার দুবাই থেকে ঢাকায় আসে, শরীরে এক কেজি সোনা বহন করে। এক কেজি সোনার আন্তর্জাতিক দাম প্রায় ৮৫,০০০ ডলার। ক্যারিয়ারের পারিশ্রমিক ১-২ লাখ টাকা। শুল্ক, ভ্যাট, ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে যে মুনাফা হয়, তাতে এই ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক।

কেন চোরাচালান হয়? কারণ বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সোনা আমদানিতে শুল্ক আছে, ভ্যাট আছে, অগ্রিম আয়কর আছে। মিলিয়ে খরচ বাড়ে ১৫-২০%। চোরাচালানে? শুধু ক্যারিয়ারের খরচ, ৩-৫%। পার্থক্যটা বিশাল। যতদিন এই পার্থক্য থাকবে, ততদিন চোরাচালান চলবে।

আর এই চোরাচালানের ফলে কী হচ্ছে? বিদেশি মুদ্রা বাইরে চলে যাচ্ছে, কিন্তু রেকর্ডে আসছে না। রিজার্ভে কোনো প্রভাব পড়ছে না। শুধু আনুষ্ঠানিক আমদানিতেই কত ডলার যাচ্ছে দেখুন।

২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিক স্বর্ণ আমদানিতে ব্যয় ছিল ৩৬ কোটি ডলার। ২০২৫ সালে সেটা ২১৫ কোটি ডলার। ছয় গুণ। এটা শুধু আনুষ্ঠানিক। চোরাচালান যোগ করলে? বছরে ৩-৪ বিলিয়ন ডলার শুধু সোনার জন্য দেশ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। তুলনা করুন: বাংলাদেশের পুরো শিক্ষা বাজেট প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার।

আমরা একটা দেশের শিক্ষা বাজেটের সমান টাকা প্রতি বছর সোনায় রূপান্তর করে তালায় ভরে রাখছি।


পর্ব ৩: বিয়ের সোনা

কেন বাঙালি এত সোনা কেনে? উত্তরটা সহজ: বিয়ে।

বাংলাদেশে মোট স্বর্ণ চাহিদার ৫৫% আসে বিয়ের অলংকার থেকে। এটা দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। ভারতেও একই চিত্র। তবে বাংলাদেশে বিষয়টা আরো জটিল, কারণ এখানে সোনা শুধু অলংকার না, এটা যৌতুকের অংশ। আইনত যৌতুক নিষিদ্ধ। বাস্তবে? "উপহার" নামে চলে। আর সেই "উপহার"-এর কেন্দ্রে থাকে সোনা।

একটা গড় মধ্যবিত্ত বিয়েতে বরপক্ষ চায় ৮-১২ ভরি সোনা। নিম্নবিত্তে ৩-৫ ভরি। উচ্চবিত্তে ২০ ভরির বেশি। এই সোনা না দিলে বিয়ে ভেঙে যায়। মেয়ের বাবার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। "অমুকের মেয়ের বিয়েতে মাত্র পাঁচ ভরি দিয়েছে" কথাটা গ্রামের চায়ের দোকানে ফিসফিস করে ছড়ায়।

ফলাফল? মেয়ের বাবা ঋণ করেন। জমি বিক্রি করেন। সঞ্চয় ভাঙেন। কখনো কখনো আত্মহত্যা করেন। বিআইডিএস-এর একটা গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে গ্রামীণ পরিবারের ঋণের ২৩% আসে বিয়ের খরচ থেকে, আর সেই খরচের সবচেয়ে বড় অংশ হলো সোনা।

ভারতে কী পরিস্থিতি? ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণ ভোক্তা। বছরে প্রায় ৭৫০ টন। তাদের জনসংখ্যা ১৪০ কোটি। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক মিলিয়ে প্রায় ৪০ টন খরচ করে, জনসংখ্যা ১৭ কোটি। মাথাপিছু হিসাবে দেখলে ছবিটা কেমন?

মাথাপিছু স্বর্ণ খরচে বাংলাদেশ বৈশ্বিক গড়ের নিচে। ভারত, তুরস্ক, চীনের চেয়ে কম। কিন্তু সংখ্যাটা বিভ্রান্তিকর। কারণ বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ও এই দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় প্রায় ২,৮০০ ডলার। ভারতের ২,৫০০ ডলার (কাছাকাছি), কিন্তু তুরস্কের ১৩,০০০ আর চীনের ১২,৫০০ ডলার। তুরস্ক বা চীনের মানুষ সোনা কিনলে তাদের বাজেটের ছোট অংশ যায়। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবার যখন বিয়ের জন্য ১০ ভরি সোনা কেনে, তখন তাদের সম্পূর্ণ সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়।

আর আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের স্বর্ণ আমদানি কোথায় দাঁড়ায়?

চীন আর ভারত শীর্ষে, শত শত টন। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ২২ টন। কিন্তু চোরাচালান মিলিয়ে অনুমিত মোট ৪০ টন। সেই হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১৫ স্বর্ণ ভোক্তার একটি। একটা দেশ যার ফরেন রিজার্ভ ২০২৩ সালে ২১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল, সেই দেশ বছরে ৩-৪ বিলিয়ন ডলার সোনায় ব্যয় করছে।


পর্ব ৪: যুক্তি আর অযুক্তি

কেউ বলবেন, "সোনা তো ভালো বিনিয়োগ। টাকার মান কমে, সোনার দাম বাড়ে। সঞ্চয় সুরক্ষিত থাকে।" কথাটা কি সত্য?

দশ বছরের রিটার্ন তুলনা। সোনা বছরে গড়ে ১১.২% রিটার্ন দিয়েছে। জমি দিয়েছে ৮.৫%। ব্যাংক এফডি ৬.২%। স্টক মার্কেট মাত্র ৩.৮%। ধূসর ডটেড লাইনটা দেখুন: গড় মূল্যস্ফীতি ৭.৫%। মানে ব্যাংক এফডি আর স্টক মার্কেট মূল্যস্ফীতির হারের নিচে রিটার্ন দিয়েছে। প্রকৃত অর্থে আপনার টাকা কমেছে। সোনা আর জমি মূল্যস্ফীতির উপরে রিটার্ন দিয়েছে।

তাহলে তো সোনা কেনা বুদ্ধিমানের কাজ? আংশিক সত্য। কিন্তু পুরো ছবিটা দেখুন।

প্রথমত, সোনা কোনো উৎপাদনশীল সম্পদ না। একটা কারখানায় বিনিয়োগ করলে সেটা পণ্য তৈরি করে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, অর্থনীতিতে মূল্য যোগ করে। জমিতে ফসল হয়। ব্যাংকে রাখা টাকা ঋণ হিসেবে ব্যবসায়ীর কাছে যায়, সে কারখানা চালায়। কিন্তু তিজোরিতে রাখা সোনা? কিছুই করে না। শুধু বসে থাকে। পুরো অর্থনীতি থেকে সেই মূলধন হারিয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে বেশিরভাগ সোনা থাকে অলংকার হিসেবে। আর অলংকারে মেকিং চার্জ, ওয়েস্টেজ, ডিজাইন খরচ মিলিয়ে ১০-১৫% বেশি দামে কেনা হয়। বিক্রি করার সময়? শুধু সোনার ওজনের দাম পাওয়া যায়, মেকিং চার্জ ফেরত আসে না। তাই অলংকার হিসেবে সোনার প্রকৃত রিটার্ন বিনিয়োগ-গ্রেড সোনার (বার বা কয়েন) চেয়ে অনেক কম।

তৃতীয়ত, সোনা কেনার জন্য বৈদেশিক মুদ্রা লাগে। বাংলাদেশ সোনা উৎপাদন করে না, পুরোটা আমদানি। প্রতি টন সোনা আমদানিতে প্রায় ৮.৫ কোটি ডলার দরকার। এই ডলার যদি যন্ত্রপাতি আমদানিতে ব্যয় হতো, কারখানা তৈরি হতো, রপ্তানি বাড়তো। বাংলাদেশে তো সোনা শুধু গলায় ঝুলে থাকে।

চতুর্থত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ মজুদ। বাংলাদেশ ব্যাংকে কত সোনা আছে?

মাত্র ১৪ টন। ভারতে ৮৭৬ টন। তুরস্কে ৫৮৫ টন। এমনকি পাকিস্তানেও ৬৪ টন। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মজুদ পাকিস্তানের এক-পঞ্চমাংশেরও কম। অথচ বাংলাদেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত মালিকানায় আনুমানিক ৪০০-৫০০ টন সোনা আছে। মানে ব্যক্তিগত মজুদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মজুদের ৩০ গুণেরও বেশি।

এটা একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি। দেশের মানুষের কাছে বিপুল সোনা আছে, কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে এর কোনো ভূমিকা নেই। এই সোনা তালাবদ্ধ। অর্থনীতির চাকায় কোনো তেল দিচ্ছে না।

তবে একটা ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসছে।


পর্ব ৫: স্বর্ণ ঋণের নতুন জোয়ার

বাংলাদেশে স্বর্ণ ঋণের বাজার দ্রুত বাড়ছে।

২০১৭ সালে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে স্বর্ণ জামানতে ঋণের পরিমাণ ছিল ১২.৫ বিলিয়ন টাকা। ২০২৫ সালে সেটা ৬৮ বিলিয়ন টাকা। আট বছরে পাঁচ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি।

এটা ভালো খবর, কিছুটা হলেও। কারণ স্বর্ণ ঋণ মানে তালাবদ্ধ সোনা অন্তত আংশিকভাবে অর্থনীতিতে ফিরে আসছে। একজন গৃহবধূ তার সোনার গয়না ব্যাংকে জামানত রেখে ঋণ নিচ্ছেন। সেই টাকায় হয়তো ছেলেমেয়ের পড়াশোনা চলছে, ছোট ব্যবসা শুরু হচ্ছে, জরুরি চিকিৎসা ব্যয় মেটাচ্ছে। সোনা তিজোরি থেকে বের হয়ে কাজে লাগছে।

ভারতে স্বর্ণ ঋণ বাজার অনেক বড়। মুথুট ফিনান্স, মানাপ্পুরম গোল্ড ফিনান্স এই কোম্পানিগুলো শুধু স্বর্ণ ঋণ দিয়ে হাজার হাজার কোটি ডলারের ব্যবসা গড়েছে। বাংলাদেশে এই বাজার এখনো শৈশবে। কিন্তু সম্ভাবনা বিশাল। যদি বাংলাদেশের ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকা ৪০০-৫০০ টন সোনার ১০% ঋণ বাজারে আসে, সেটা ৪০-৫০ টন সোনা, যার মূল্য প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার। এই মূলধন অর্থনীতিতে ঢোকে।

তবে স্বর্ণ ঋণ একটা আংশিক সমাধান। মূল সমস্যা থেকে যায়: বাংলাদেশ প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার খরচ করে এমন একটা পণ্য আমদানি করছে যেটা কোনো উৎপাদনশীল কাজে লাগে না।


পর্ব ৬: কী করা যায়?

সমস্যাটা সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, আর কাঠামোগত। তিনটা স্তরে সমাধান দরকার।

কাঠামোগত: বিকল্প সঞ্চয় মাধ্যম তৈরি করুন। বাঙালি সোনা কেনে কারণ বিকল্প নেই। ব্যাংকে এফডি দিলে মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম রিটার্ন। স্টক মার্কেট অবিশ্বস্ত, ম্যানিপুলেশনে ভরা। সঞ্চয়পত্রে সীমা আছে, কেনা ঝামেলার। জমির দাম বেশি, ছোট বিনিয়োগকারীর নাগালের বাইরে। সরকারকে মূল্যস্ফীতি-সংযুক্ত বন্ড আনতে হবে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য মিউচুয়াল ফান্ড সহজলভ্য করতে হবে। স্টক মার্কেটে নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। মানুষ যখন দেখবে সোনার চেয়ে ভালো বিকল্প আছে, তখন নিজে থেকেই সরে আসবে।

আর্থিক: চোরাচালান কমাতে শুল্ক যৌক্তিক করুন। ভারত ২০২৩ সালে স্বর্ণ আমদানি শুল্ক ১৫% থেকে কমিয়ে ৬% করেছে। ফলাফল? আনুষ্ঠানিক আমদানি ৩০% বেড়েছে, চোরাচালান কমেছে, সরকারের রাজস্ব বেড়েছে। বাংলাদেশও একই কাজ করতে পারে। শুল্ক কমালে আনুষ্ঠানিক পথে সোনা আসবে, চোরাচালান কমবে, রাজস্ব বাড়বে, ডলার রিজার্ভে ধরা পড়বে।

সামাজিক: বিয়ের সোনার বোঝা কমাতে হবে। এটা সবচেয়ে কঠিন কাজ। সংস্কৃতি বদলানো আইন দিয়ে হয় না। তবে সচেতনতা বাড়ানো যায়। যৌতুক আইনের বাস্তবায়ন জোরদার করতে হবে। গণমাধ্যমে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিয়ের খরচ কমানোর বার্তা পৌঁছাতে হবে। কেরালায় কিছু গির্জা সম্প্রদায় বিয়ের সোনায় ন্যূনতম সীমা (ক্যাপ) আরোপ করেছে। ফলাফল দেখা গেছে। বাংলাদেশেও সামাজিক আন্দোলন দরকার।

আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ মজুদ বাড়ানো দরকার। ১৪ টন দিয়ে কিছু হবে না। ভারত গত পাঁচ বছরে ৩০০ টনের বেশি সোনা কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য। বাংলাদেশও অন্তত ৫০-১০০ টন লক্ষ্য রাখতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা বাড়লে মুদ্রা স্থিতিশীলতা বাড়ে, আন্তর্জাতিক ঋণযোগ্যতা বাড়ে।


শিউলির বাবা জমি বিক্রি করবেন। মেয়ের গলায় দশ ভরি সোনা ঝুলবে। বরপক্ষ খুশি হবে। বিয়ের পর সেই সোনা আলমারিতে তালাবদ্ধ থাকবে। বছরের পর বছর। কেউ পরবে না, কারণ "চুরি হলে?" কেউ বিক্রি করবে না, কারণ "সোনা বিক্রি করলে লোকে কী বলবে?"

শিউলির বাবার বিক্রি করা জমিতে ধান হতো। সেই ধান বাজারে যেত। মানুষ খেত। অর্থনীতি চলতো। এখন সেই জমির দাম পরিণত হয়েছে একটুকরো হলুদ ধাতুতে, যেটা তিজোরিতে বসে আছে। উৎপাদনশীল সম্পদ থেকে অনুৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তর।

বাঙালির সোনার প্রেম কি সঞ্চয়? কিছুটা হ্যাঁ, ব্যক্তিগত পর্যায়ে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে? এটা একটা বিলিয়ন ডলারের অপচয়। প্রতি বছর ৩-৪ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, তালায় বন্দি হচ্ছে, অর্থনীতি থেকে উধাও হচ্ছে। সেই টাকায় কারখানা হতে পারতো, হাসপাতাল হতে পারতো, স্কুল হতে পারতো।

সোনার দাম ভরিতে দেড় লাখ ছুঁলে সবাই বলবে, "আহা, যারা সোনা কিনেছিল তারা বুদ্ধিমান!" কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করবে না: সেই সোনার বদলে যদি কারখানা তৈরি হতো, কত মানুষের চাকরি হতো? কত পরিবার দারিদ্র্য থেকে বের হতো? দেশটা কোথায় থাকতো?

শিউলির গলার হার সুন্দর। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মূল্য একটা দেশের ভবিষ্যৎ।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50