সরকারি চাকরি: ৩০ লাখ আবেদন, ৫ হাজার পদ
পর্ব ১: একটা ছেলের পাঁচ বছর
সুমনের বাবা শরীয়তপুরের একটা মফস্বল শহরে মুদি দোকান চালায়। মাসিক আয় ১৫-২০ হাজার টাকা। সুমন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করলো ২০২০ সালে। রেজাল্ট ভালো, ফার্স্ট ক্লাস। বাবার একটাই স্বপ্ন: ছেলে বিসিএস দেবে, ক্যাডার হবে, সরকারি চাকরি পাবে।
সুমন ঢাকায় এলো ২০২০ সালের শেষে। মিরপুরে একটা মেসে সিট নিলো, মাসিক ভাড়া ৩,৫০০ টাকা। তারপর ভর্তি হলো একটা বিসিএস কোচিং সেন্টারে। ভর্তি ফি ১৮,০০০ টাকা। বইপত্র ৮,০০০ টাকা। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পড়াশোনা।
৪৩তম বিসিএস দিলো। প্রিলিমিনারি পাশ করলো না। ৪৪তম দিলো, প্রিলি পাশ, রিটেন পাশ করলো না। ৪৫তম দিলো, প্রিলি পাশ, রিটেন পাশ, ভাইভায় বাদ পড়লো। ৪৬তম দিলো, এখনো ফলাফল বের হয়নি।
চার বছরের বেশি কেটে গেছে। সুমনের বয়স এখন ২৮। বাবার দোকান থেকে প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকা আসে। মেসের ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া, কোচিং, বই, মডেল টেস্ট। এতদিনে বাবার পাঠানো টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ টাকা।
সুমন একটা ব্যতিক্রম না। সুমনের মতো লাখ লাখ তরুণ এখন ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীর মেসে বসে বিসিএস প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের প্রত্যেকের পেছনে একটা পরিবার আছে, একটা দোকান আছে, একটা জমি আছে যেটা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে একটা অনিশ্চিত স্বপ্নের জন্য।
সংখ্যাগুলো দেখলে বুঝবেন এই স্বপ্ন কতটা অনিশ্চিত।
৩৫তম বিসিএসে আবেদন করেছিল ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ। ৪৬তম বিসিএসে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২ লাখ। এক দশকে ১৪ গুণ বৃদ্ধি। কিন্তু পদ সংখ্যা? সেটা প্রায় একই জায়গায় আটকে আছে।
পর্ব ২: ১ পদে ৬০০ আবেদন
বিসিএস পরীক্ষার সবচেয়ে নির্মম সত্যটা এই চার্টে:
৪৬তম বিসিএসে ৩২ লাখ আবেদনের বিপরীতে পদ ছিল ৪,৫০০-৫,০০০। মানে প্রতি ১ পদে প্রায় ৬৪০ জন আবেদন করেছে। সিলেকশন রেট ০.১৫%। একশো জনে একজনও না, হাজার জনে দেড়জন।
এটা বুঝতে আরেকভাবে ভাবুন। আপনি যদি একটা ঘরে ৬৪০ জন মানুষকে দাঁড় করান আর বলেন "তোমাদের মধ্যে একজন চাকরি পাবে," বাকি ৬৩৯ জন শুধু সময় নষ্ট করেছে।
কিন্তু এই ৬৩৯ জন শুধু সময় নষ্ট করেনি। তারা টাকাও খরচ করেছে। সেখানেই আসে কোচিং ব্যবসার গল্প।
বিসিএস কোচিং শিল্পের আকার এখন আনুমানিক ৪,৫০০ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে এটা ছিল ১,২০০ কোটি। এক দশকে প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি। শুধু ঢাকায় প্রধান বিসিএস কোচিং সেন্টার আছে ৫০টারও বেশি। ফার্মগেট, মতিঝিল, মিরপুর, উত্তরা, এই এলাকাগুলোতে প্রতিটা গলিতে কোচিং সেন্টারের সাইনবোর্ড। ক্র্যাশ কোর্স ১৫,০০০ টাকা। ফুল কোর্স ২৫,০০০-৩৫,০০০ টাকা। স্পেশাল ব্যাচ ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত।
এই কোচিং সেন্টারগুলো কী বিক্রি করে? জ্ঞান না, আশা বিক্রি করে। "আমাদের ব্যাচ থেকে গত বিসিএসে ২৫ জন ক্যাডার হয়েছে।" এই একটা লাইন দিয়ে তারা হাজার হাজার ছাত্রকে টানে। কিন্তু কেউ বলে না যে সেই ব্যাচে ৫,০০০ জন ছাত্র ছিল, আর বাকি ৪,৯৭৫ জন কিছুই পায়নি।
পর্ব ৩: কেন এত মরিয়া?
একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন: কেন লাখ লাখ তরুণ এত মরিয়া সরকারি চাকরির জন্য? বেসরকারি খাতে কি চাকরি নেই?
উত্তরটা এই চার্টে:
সরকারি চাকরির বেতন কি আসলেই বেশি? শুরুতে না। একজন নবম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তার মূল বেতন ২২,০০০ টাকা। কিন্তু ভাতা, বোনাস, পেনশন, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, সব মিলিয়ে প্যাকেজটা দাঁড়ায় ৫৫,০০০-৬৫,০০০ টাকা। ২০ বছর পর সেটা দাঁড়ায় ১,২০,০০০ টাকা প্লাস পেনশন, গ্র্যাচুইটি, সরকারি বাড়ি। বেসরকারি খাতে শুরুতে ২০,০০০-৩০,০০০ টাকা পাওয়া যায়, কিন্তু পেনশন নেই, চাকরির নিশ্চয়তা নেই, বয়স ৪৫ হলে অনেক কোম্পানি বিদায় দেয়।
তবে আসল কারণ টাকা না। আসল কারণ ক্ষমতা আর সামাজিক মর্যাদা। বাংলাদেশে একজন সরকারি কর্মকর্তা মানেই "বড় মানুষ।" উপজেলায় গেলে চেয়ারম্যান, ইউএনও, ওসি, এরা রাজার মতো। বিয়ের বাজারে একজন বিসিএস ক্যাডার সবচেয়ে দামি পাত্র। পরিবারের সামাজিক মর্যাদা রাতারাতি বদলে যায়। একটা মুদি দোকানদারের ছেলে যখন বিসিএস ক্যাডার হয়, গ্রামে তার বাবাকে সবাই "স্যারের বাবা" বলে ডাকে।
এই মর্যাদার লোভে লাখ লাখ তরুণ জীবনের সবচেয়ে উৎপাদনশীল বছরগুলো বিসিএস প্রস্তুতিতে কাটাচ্ছে। কতটা সময়? এই চার্ট দেখুন:
বিসিএস পরীক্ষার্থীদের গড় বয়স ২৬.৫ বছর। সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী ২৫-২৮ বয়সী। আর বয়সসীমা ৩০ বছর (মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩২)। মানে একজন তরুণ গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ২২-২৩ বছর বয়সে বিসিএস প্রস্তুতি শুরু করে, আর ২৮-৩০ বছর পর্যন্ত চেষ্টা করে। ৫-৭ বছর।
গড় পরীক্ষার্থী ৩-৪ বার বিসিএস পরীক্ষা দেয়। ১৮% পরীক্ষার্থী ৫ বার বা তার বেশি দেয়। প্রতিটা চেষ্টার মধ্যে ১-১.৫ বছর সময় লাগে। ৫ বার মানে ৫-৭ বছর। জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময়। আর শেষে ৯৯.৮৫% মানুষ খালি হাতে ফেরে।
পর্ব ৪: কোটা যুদ্ধ
২০২৪ সালে বাংলাদেশ জ্বলে উঠেছিল। রাস্তায় নেমেছিল হাজার হাজার ছাত্র। দাবি ছিল একটাই: কোটা সংস্কার। কেন?
বিসিএসে মোট পদের ৫৬% কোটায় পূরণ হতো। মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০%, জেলা কোটা ১০%, নারী কোটা ১০%, উপজাতি ৫%, প্রতিবন্ধী ১%। বাকি ৪৪% মেধা কোটা।
সমস্যাটা কোথায়? মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০% মানে মোট পদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শুধু মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য সংরক্ষিত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন আনুমানিক ২ লাখ। তাদের সন্তান, নাতি-নাতনি মিলিয়ে এই কোটার সুবিধাভোগী সম্ভবত ১০-১৫ লাখ মানুষ। কিন্তু আবেদনকারী ৩২ লাখ। মানে একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী পদের এক-তৃতীয়াংশ পাচ্ছে, আর বাকি কোটি কোটি মানুষ লড়াই করছে বাকি ৪৪% পদের জন্য।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর সরকার কোটা কমিয়ে ৭%-এ নামিয়ে আনে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৫%, প্রতিবন্ধী ১%, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ১%। বাকি ৯৩% মেধা ভিত্তিতে। এটা একটা বড় সংস্কার। কিন্তু মূল সমস্যা অমীমাংসিত: পদ কম, আবেদনকারী অগণিত।
পর্ব ৫: সরকারি পদ কোথায়?
সরকার প্রতি বছর কত পদে নিয়োগ দেয়? সেটা কি বাড়ছে?
বিগত দশ বছরে সরকারি শূন্য পদ ঘোষণা ছিল গড়ে ৩০,০০০-৪০,০০০ প্রতি বছর। কিন্তু প্রকৃত নিয়োগ হয়েছে ২০,০০০-৩০,০০০। বাকি পদ ঝুলে থাকে, বছরের পর বছর। সরকারি চাকরিতে মোট কর্মী সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। কিন্তু প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছে ৮-১০ লাখ গ্র্যাজুয়েট। মানে প্রতি বছরের নতুন গ্র্যাজুয়েটদের মাত্র ২-৩% সরকারি চাকরি পাবে। বাকি ৯৭-৯৮% পাবে না।
এটা গাণিতিকভাবে অসম্ভব সমীকরণ। আপনি যতই পড়ুন, যতই কোচিং করুন, যতই পরীক্ষা দিন, সংখ্যাগুলো আপনার পক্ষে না।
পর্ব ৬: বাংলাদেশ একা না, কিন্তু সবচেয়ে খারাপ
সরকারি চাকরি নিয়ে এই ধরনের পাগলামি কি শুধু বাংলাদেশে? না। ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশেই এই সমস্যা আছে। কিন্তু মাত্রাটা দেখুন:
ভারতের UPSC (Civil Services) পরীক্ষায় প্রতি বছর ১০-১২ লাখ আবেদন পড়ে, নির্বাচিত হয় ৮০০-১,০০০ জন। সিলেকশন রেট ০.০৮%। পাকিস্তানের CSS-এ ২০,০০০-২৫,০০০ আবেদন, নির্বাচিত ২৫০-৪০০। সিলেকশন রেট ১.২-১.৬%। বাংলাদেশের বিসিএসে ৩০-৩২ লাখ আবেদন, নির্বাচিত ৪,৫০০-৫,০০০। সিলেকশন রেট ০.১৫%।
জনসংখ্যার অনুপাতে বিচার করলে বাংলাদেশে প্রতি মিলিয়ন জনসংখ্যায় আবেদনকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ভারতে প্রতি মিলিয়নে ৮০০ জন UPSC-তে আবেদন করে। বাংলাদেশে? ১৮,০০০ জন। ভারতের ২২ গুণেরও বেশি।
কেন বাংলাদেশে এত বেশি? কারণ ভারতে বেসরকারি খাত অনেক বড়। Infosys, TCS, Wipro, Reliance, Tata. এই কোম্পানিগুলো প্রতি বছর লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট নিয়োগ দেয়। বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে ভালো চাকরির সুযোগ সীমিত। গার্মেন্টস ছাড়া বড় শিল্প নেই বললেই চলে। আইটি খাত বাড়ছে, কিন্তু এখনো ছোট। ব্যাংকিং, ফার্মা, টেলিকম, এগুলোতে পদ সীমিত। ফলে সবাই ছুটছে সরকারি চাকরির দিকে।
এবার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা:
একজন বিসিএস প্রার্থী গড়ে ৪ বছর প্রস্তুতিতে ব্যয় করে। এই ৪ বছরে সে কোনো আয় করে না (অথবা সামান্য টিউশনি)। কোচিং, বই, থাকা-খাওয়া বাবদ খরচ হয় ৪-৬ লাখ টাকা। যদি সে এই ৪ বছর একটা চাকরি করতো, মাসে ২০,০০০ টাকাও যদি আয় করতো, তাহলে ৪ বছরে আয় হতো ৯.৬ লাখ টাকা। মানে একজন বিসিএস প্রার্থীর opportunity cost (সুযোগ ব্যয়) গড়ে ১৩-১৬ লাখ টাকা।
এখন ধরুন ৩০ লাখ মানুষ এই পথে আছে। গড়ে ধরি ১৫ লাখ সক্রিয় প্রার্থী যেকোনো সময়ে। তাদের সম্মিলিত সুযোগ ব্যয়? বছরে প্রায় ৩৬,০০০ কোটি টাকা। এটা বাংলাদেশের মোট শিক্ষা বাজেটের চেয়ে বেশি। একটা দেশ তার সবচেয়ে শিক্ষিত তরুণদের কোচিং সেন্টারে বসিয়ে রেখে প্রতি বছর ৩৬,০০০ কোটি টাকার উৎপাদনশীলতা হারাচ্ছে।
এবার ফিরে যাই সুমনের কাছে।
সুমন এখনো মিরপুরের মেসে থাকে। ৪৬তম বিসিএসের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছে। এটা তার চতুর্থ চেষ্টা। বয়স ২৮, বয়সসীমা ৩০। আর সর্বোচ্চ দুটো সুযোগ আছে। বাবা এখনো প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকা পাঠায়। দোকানের আয় কমছে, কারণ পাশে সুপারশপ খুলেছে।
সুমনের বন্ধু রাকিব ২০২১ সালে বিসিএস প্রস্তুতি ছেড়ে দিয়ে একটা আইটি কোম্পানিতে জুনিয়র ডেভেলপার হিসেবে ঢুকেছিল। তখন বেতন ছিল ২০,০০০ টাকা। চার বছর পর রাকিবের বেতন ৬৫,০০০ টাকা। সে গত বছর ঢাকায় একটা ফ্ল্যাটের ডাউন পেমেন্ট দিয়েছে। সুমন এই খবর শুনে চুপ করে যায়।
কিন্তু সুমন বিসিএস ছাড়বে না। কারণ বাবাকে মুখ দেখাবে কীভাবে? গ্রামে লোকে বলবে "এত পড়াশোনা করে কিছু হলো না।" আর সুমন নিজেও বিশ্বাস করে, পরের বার হবে। এই বিশ্বাসটাই তাকে আটকে রেখেছে।
সরকারি চাকরি ব্যবস্থার সংস্কার দরকার, সেটা সত্য। পদ বাড়ানো দরকার, নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত করা দরকার, কোটা ব্যবস্থা আরো যৌক্তিক করা দরকার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা। এমন একটা অর্থনীতি তৈরি করা যেখানে ৩০ লাখ তরুণকে ৫,০০০ পদের জন্য লড়াই করতে হয় না। যেখানে রাকিবের পথটাই স্বাভাবিক পথ, আর বিসিএস হলো অনেকগুলো সমান-মর্যাদার বিকল্পের একটা।
সেই দিন আসার আগে পর্যন্ত, সুমনের মতো লাখ লাখ তরুণ মিরপুরের মেসে বসে প্রিলিমিনারির মডেল টেস্ট দিতে থাকবে। আর তাদের বাবারা মফস্বলের দোকানে বসে ছেলের ফোনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকবে। সেই ফোনে হয়তো একদিন খবর আসবে, "বাবা, হয়ে গেছে।" কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, ৯৯.৮৫% ক্ষেত্রে সেই ফোন আসবে না।