Back to publications
Narrative 2026-03-06

হজের অর্থনীতি: ধর্মের নামে কত টাকা যায়?

হজ খরচ, এজেন্সি মুনাফা, আর বৈদেশিক মুদ্রা বহিঃপ্রবাহ

হজের অর্থনীতি: ধর্মের নামে কত টাকা যায়?

পর্ব ১: একটা স্বপ্নের দাম

হাজী আবদুল মজিদ সারাজীবন কুমিল্লার একটা ছোট কাপড়ের দোকানে বসেছেন। দোকান বড় না, তিনতলা বাড়ির নিচতলায় একটা ঘর। কাপড় কাটেন, মাপ নেন, সেলাই করেন। সকাল আটটা থেকে রাত নয়টা। মাসে আয়? ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা।

মজিদ সাহেব গত তিরিশ বছর ধরে একটা স্বপ্ন দেখেন: হজে যাবেন। মক্কায় যাবেন। কাবার সামনে দাঁড়াবেন। তওয়াফ করবেন। আরাফাতের ময়দানে দোয়া করবেন। এই স্বপ্নের জন্য তিনি প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা আলাদা করে রাখেন। তিরিশ বছরে জমেছে প্রায় ১৮ লাখ টাকা।

কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: ১.২ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা বহিঃপ্রবাহ কি কমানো সম্ভব?
প্রায় ৮-৯ লাখ টাকা
একটা স্বপ্নের দাম
৫০-১০০%
হিসাবের খাতা
প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার
ডলারের হিসাব

২০২৫ সালে তিনি হজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। বয়স ষাট, আর কত অপেক্ষা করবেন? তিনি সরকারি প্যাকেজে নাম লেখালেন। খরচ? ৬ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। সরকারি প্যাকেজ, সবচেয়ে সস্তা অপশন।

কিন্তু মজিদ সাহেবের প্রতিবেশী করিম উদ্দিন গেলেন বেসরকারি এজেন্সি দিয়ে। "ভিআইপি প্যাকেজ"। খরচ? ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রায় দ্বিগুণ। একই হজ, একই মক্কা, একই আরাফাত। তফাৎটা কোথায়? হোটেলের দূরত্ব কিছুটা কম, খাবার কিছুটা ভালো, গাইড আলাদা। ১২ লাখের মধ্যে আসল সেবার মূল্য কত? সেটা কেউ জানে না। কারণ হিসাবটা স্বচ্ছ না।

এবার একটু জুম আউট করুন।

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ হজে যান। প্রতিজনের গড় খরচ সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ৮-৯ লাখ টাকা। মোট? প্রায় ১০,০০০-১২,৫০০ কোটি টাকা। প্রতি বছর। শুধু হজে। এর সাথে যোগ করুন ওমরাহ, সেটা আলাদা।

এই চার্টটা দেখুন।

বিশ বছরের হজযাত্রী সংখ্যা। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৭০ হাজার মানুষ হজে গেছেন। ২০১৫ সালে ১ লাখ ৯ হাজার। ২০১৯ সালে ১ লাখ ২৭ হাজার। কোভিড বছরগুলোতে প্রায় শূন্য। তারপর আবার ঘুরে দাঁড়ানো। ২০২৪ সালে ১ লাখ ৩১ হাজার। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের কোটা ১ লাখ ৩৭ হাজার।

সংখ্যাটা বড়, কিন্তু আসল প্রশ্ন সংখ্যায় না। আসল প্রশ্ন হলো: এই ১ লাখ ৩৭ হাজার মানুষের প্রত্যেকের পকেট থেকে যে ৬-১২ লাখ টাকা বের হচ্ছে, সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে? কত টাকা আসল সেবায় খরচ হচ্ছে, আর কত টাকা মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে ঢুকছে?

এই চার্টটা দেখুন।

হজের খরচ গত দশ বছরে কীভাবে বেড়েছে। ২০১৫ সালে সরকারি প্যাকেজের দাম ছিল ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা। ২০২৫ সালে ৬ লাখ ৮৩ হাজার। দশ বছরে দ্বিগুণেরও বেশি। মূল্যস্ফীতির চেয়ে অনেক দ্রুত বেড়েছে। রিয়ালের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন একটা কারণ, কিন্তু সেটাই একমাত্র কারণ না।


পর্ব ২: হিসাবের খাতা

একজন হজযাত্রীর খরচ কোথায় যায়? এটা জানাটা জরুরি। কারণ "হজ প্যাকেজ" শব্দটা শুনলে মনে হয় একটা ফিক্সড প্রাইস, কিন্তু ভেতরে অনেকগুলো খাত আছে।

এই চার্টটা দেখুন।

সরকারি প্যাকেজের খরচ ভাঙলে দেখা যায়: সৌদি সরকারকে দিতে হয় হজ ফি (প্রায় ২৬%), এয়ারলাইন্সের টিকিট (প্রায় ২২%), মক্কা ও মদিনার হোটেল (প্রায় ২৮%), পরিবহন ও খাবার (প্রায় ১৪%), আর প্রশাসনিক খরচ ও অন্যান্য (প্রায় ১০%)। সরকারি প্যাকেজে মুনাফা নেই বলা হয়, কিন্তু "প্রশাসনিক খরচ" কত হওয়া উচিত, সেটা তর্কের বিষয়।

আসল সমস্যা বেসরকারি প্যাকেজে। বেসরকারি এজেন্সিগুলোর দাম সরকারি প্যাকেজের চেয়ে ৫০-১০০% বেশি। ১২ লাখের "ভিআইপি" প্যাকেজে আসল সেবার মূল্য কত? অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ৭-৮ লাখের বেশি না। বাকি ৪-৫ লাখ? এজেন্সির মুনাফা, দালালের কমিশন, আর "অদৃশ্য" খরচ।

এবার সরকারি আর বেসরকারি প্যাকেজের তুলনাটা দেখুন।

দুটো বার পাশাপাশি, প্রতি বছরের জন্য। সরকারি প্যাকেজ আর বেসরকারি গড় প্যাকেজ। ফাঁকটা দেখুন। ২০১৫ সালে পার্থক্য ছিল দেড় লাখ। ২০২৫ সালে পার্থক্য ৫ লাখের বেশি। ফাঁকটা বাড়ছে, কমছে না।

কেন বাড়ছে? কারণ হজ এজেন্সির সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু প্রতিযোগিতা দাম কমায়নি। বরং এজেন্সিগুলো "প্রিমিয়াম" লেবেল দিয়ে দাম বাড়িয়েছে। হজ একটা ধর্মীয় আবেগের বিষয়। মানুষ দাম নিয়ে দরকষাকষি করতে সংকোচ বোধ করেন। "আল্লাহর ঘরে যাচ্ছি, টাকার হিসাব করবো?" এই মানসিকতাকে কাজে লাগায় এজেন্সিরা।

এই চার্টটা দেখুন।

বাংলাদেশে নিবন্ধিত হজ এজেন্সির সংখ্যা। ২০১০ সালে ছিল প্রায় ৬০০। ২০২৫ সালে প্রায় ১,৮০০। তিনগুণ বৃদ্ধি। কিন্তু হজযাত্রী বেড়েছে দ্বিগুণেরও কম। মানে প্রতি এজেন্সির ভাগে এখন কম যাত্রী পড়ছে। তাহলে এজেন্সিগুলো কীভাবে টিকে আছে? প্রতি যাত্রী থেকে বেশি মুনাফা নিয়ে। আর অনেক এজেন্সি শুধু হজ না, ওমরাহ, ভিসা সার্ভিস, টিকিটিং, সব মিলিয়ে একটা "ধর্মীয় ট্যুরিজম" ব্যবসা চালায়।


পর্ব ৩: ডলারের হিসাব

এবার ব্যক্তিগত খরচ থেকে একটু বড় ছবিতে আসি। বাংলাদেশ থেকে হজে যাওয়ার মানে কী? মানে হলো বাংলাদেশি টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করে সৌদি আরবে পাঠানো। প্রতিটা হজযাত্রী ডলার বা রিয়াল কিনে সেটা বাংলাদেশ থেকে বের করেন। ফেরত আসে না। কারণ হজে গিয়ে কেউ কিছু রপ্তানি করে না। এটা একমুখী বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ।

এই চার্টটা দেখুন।

হজ ও ওমরাহ মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর কত বৈদেশিক মুদ্রা বের হয়। ২০১৫ সালে ছিল প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে? প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার। হজ আর ওমরাহ মিলিয়ে। এটা বাংলাদেশের মোট আমদানি ব্যয়ের প্রায় ১.৫%। তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু যখন দেশের ফরেন রিজার্ভ ২০-২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে, তখন ১.২ বিলিয়ন ডলারের বহিঃপ্রবাহ নগণ্য না।

তুলনা করুন: বাংলাদেশ মেডিকেল ট্যুরিজমে (মূলত ভারতে চিকিৎসার জন্য) বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার খরচ করে। হজ-ওমরাহ তার অর্ধেকেরও বেশি। শিক্ষার জন্য বিদেশে যায় প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার। হজ-ওমরাহ তার দ্বিগুণেরও বেশি।

আর এই টাকাটা যাচ্ছে কোথায়? সৌদি আরবে। সৌদি আরব হজকে একটা বিশাল অর্থনৈতিক সেক্টর হিসেবে দেখে। Vision 2030-এর অংশ হিসেবে তারা ধর্মীয় পর্যটনকে আরো বাড়াতে চায়। হজযাত্রীদের সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্য আছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ লাখে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা। প্রতিটা হজযাত্রী সৌদি অর্থনীতিতে হাজার হাজার ডলার ঢালেন।

কিন্তু অন্য দেশের হজযাত্রীরা কত খরচ করেন? বাংলাদেশের তুলনায় কি বেশি, না কম?

দেশভিত্তিক হজ খরচের তুলনা। ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, মিশর, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ভারত, আর বাংলাদেশ। ইন্দোনেশিয়া সবচেয়ে সস্তা, কারণ তাদের সরকার হজ ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে দক্ষ। একটা আলাদা হজ ফান্ড আছে (BPKH), বিনিয়োগ করে, মুনাফা দিয়ে খরচ ভর্তুকি দেয়। মালয়েশিয়ার তাবুং হাজি (Tabung Haji) পৃথিবীর সবচেয়ে সফল হজ সঞ্চয় প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ? মাঝামাঝি থেকে ব্যয়বহুল দিকে। আর সেবার মান বিবেচনা করলে সবচেয়ে বেশি দামের একটা।


পর্ব ৪: অদৃশ্য বাজার

হজের বাইরে আরেকটা বিশাল বাজার আছে যেটা নিয়ে খুব কম কথা হয়: ওমরাহ।

হজ বছরে একবার, নির্দিষ্ট সময়ে। কিন্তু ওমরাহ সারা বছর করা যায়। এবং ওমরাহর জনপ্রিয়তা বাড়ছে দ্রুত। রমজানে ওমরাহ করলে হজের সমান সওয়াব, এই বিশ্বাস থেকে রমজানে ওমরাহ যাত্রীর সংখ্যা বিশাল।

বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ যাত্রীর সংখ্যা। ২০১৫ সালে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার। ২০২৫ সালে? প্রায় ৫ লাখ। তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি। ওমরাহ যাত্রী এখন হজযাত্রীর প্রায় চারগুণ।

ওমরাহর গড় খরচ কম, ২-৪ লাখ টাকা। কিন্তু সংখ্যা এত বেশি যে মোট বৈদেশিক মুদ্রা বহিঃপ্রবাহ হজের চেয়ে বেশি। ৫ লাখ ওমরাহ যাত্রী, গড়ে ৩ লাখ টাকা করে, মোট ১৫,০০০ কোটি টাকা। হজের ১২,৫০০ কোটির চেয়ে বেশি।

আর ওমরাহ বাজারে নিয়ন্ত্রণ হজের চেয়ে অনেক কম। হজের জন্য সরকারি নিবন্ধন আছে, কোটা আছে, কিছুটা তদারকি আছে। ওমরাহ? প্রায় অনিয়ন্ত্রিত। যেকোনো ট্রাভেল এজেন্সি ওমরাহ প্যাকেজ বিক্রি করতে পারে। ভুয়া ভিসা, নিম্নমানের হোটেল, প্রতারণা, এসব ওমরাহ সেক্টরে বেশি। প্রতি বছর শত শত ওমরাহ যাত্রী প্রতারণার শিকার হন।

সৌদি আরব ওমরাহ ভিসা নীতি সহজ করেছে। ই-ভিসা চালু হয়েছে। এর ফলে ওমরাহ যাত্রীর সংখ্যা আরো বাড়বে। সৌদি সরকার চায় বছরে ৩ কোটি ওমরাহ যাত্রী আকর্ষণ করতে। বাংলাদেশ থেকে এই সংখ্যা আগামী পাঁচ বছরে ১০ লাখ ছাড়াতে পারে।

কিন্তু সৌদি আরব কি বাংলাদেশকে যত কোটা দেয় সেটা বাংলাদেশ পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারে? এই চার্টটা দেখুন।

সৌদি আরব প্রতি ১০ লাখ মুসলিম জনসংখ্যার জন্য ১,০০০ কোটা বরাদ্দ করে। বাংলাদেশের মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি, তাই কোটা হওয়া উচিত ১ লাখ ৫০ হাজার। বাস্তবে বাংলাদেশ পায় ১ লাখ ২৭-১৩৭ হাজার। আর এই কোটা পুরোটা ব্যবহার হয় না সবসময়। ২০১৮ সালে কোটার ৯২% ব্যবহৃত হয়েছিল। ২০২৪ সালে ৯৬%। বাকি ৪-৮% কেন যায় না? কারণ শেষ মুহূর্তে ভিসা জটিলতা, প্যাকেজের টাকা জোগাড় করতে না পারা, স্বাস্থ্য সমস্যা, নানা কারণ।


পর্ব ৫: অভিযোগের খাতা

মজিদ সাহেব হজ থেকে ফিরে কী বললেন?

"হজ হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু কষ্ট হয়েছে অনেক। মক্কায় হোটেল ছিল হারাম শরীফ থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে। বলেছিল কাছে হবে। খাবারের মান খারাপ ছিল। এয়ারপোর্টে ১০ ঘণ্টা বসে থাকতে হয়েছে। গাইড ঠিকমতো সাহায্য করেনি।"

মজিদ সাহেবের অভিযোগ একটুও অস্বাভাবিক না। বরং এটা গড় অভিজ্ঞতা।

ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দায়ের হওয়া হজ-সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা। ২০১৫ সালে প্রায় ১,৮০০। ২০২৫ সালে ৪,৫০০ এর বেশি। আড়াই গুণ বৃদ্ধি। আর এগুলো শুধু আনুষ্ঠানিক অভিযোগ। বেশিরভাগ মানুষ অভিযোগ করেন না। "হজের কথা, ধৈর্য ধরতে হবে," এই মানসিকতা থেকে চুপ করে থাকেন। গবেষকদের ধারণা, প্রকৃত অসন্তুষ্টির হার ৩০-৪০%।

প্রধান অভিযোগ কী কী? হোটেলের মান প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী না (৩৮%)। খাবারের মান খারাপ (২২%)। পরিবহন সমস্যা (১৮%)। গাইডের অদক্ষতা (১২%)। আর বাকিটা নানা বিষয়। এজেন্সিরা বাংলাদেশে বসে চমৎকার ব্রোশার দেখায়। পাঁচ তারা হোটেলের ছবি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের ছবি। বাস্তবে? তিন তারা হোটেল, অনেক সময় দুই তারাও না। বাস আছে, কিন্তু একটায় ৬০ জন চেপে যেতে হয়।

সরকার কি কিছু করছে? কিছু পদক্ষেপ আছে। ২০২১ সাল থেকে হজ প্রি-রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ডিজিটাল নিবন্ধন, অনলাইন পেমেন্ট, কিছু স্বচ্ছতা এসেছে। কিন্তু মূল সমস্যাটা কাঠামোগত। ১,৮০০ এজেন্সির তদারকি করার সক্ষমতা সরকারের নেই। অনেক এজেন্সির মালিক রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন।


পর্ব ৬: কল্পনা করুন

ইন্দোনেশিয়ার কথা বলি।

ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মুসলিম জনসংখ্যার দেশ। তাদের হজযাত্রী সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি, প্রায় ২ লাখ ২১ হাজার। কিন্তু তাদের হজ ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ভালো। কেন?

প্রথমত, তাদের আছে BPKH (Badan Pengelola Keuangan Haji), হজ তহবিল ব্যবস্থাপনা সংস্থা। হজযাত্রীরা আগে থেকে টাকা জমা রাখেন। সেই টাকা BPKH বিনিয়োগ করে, সরকারি বন্ড, শরিয়াহ-সম্মত বিনিয়োগ, রিয়েল এস্টেট। বিনিয়োগের মুনাফা দিয়ে হজ খরচ ভর্তুকি দেওয়া হয়। ফলে ইন্দোনেশিয়ার হজযাত্রীদের খরচ বাংলাদেশের চেয়ে কম, সেবার মান ভালো।

মালয়েশিয়ার তাবুং হাজি (Tabung Haji) আরো চমৎকার উদাহরণ। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত। এটা একটা হজ সঞ্চয় ব্যাংক। মালয়েশিয়ার মুসলমানরা জন্মের পর থেকেই তাবুং হাজিতে অ্যাকাউন্ট খোলেন। প্রতি মাসে ৫০-১০০ রিংগিত জমান। তাবুং হাজি সেই টাকা শরিয়াহ-সম্মত বিনিয়োগে খাটায়। প্লান্টেশন, রিয়েল এস্টেট, শেয়ার বাজার। বিনিয়োগের মুনাফা থেকে হজ খরচের একটা বড় অংশ মেটানো হয়। তাবুং হাজির মোট সম্পদ প্রায় ৮০ বিলিয়ন রিংগিত (প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার)।

বাংলাদেশে কি এটা সম্ভব? পুরোপুরি সম্ভব।

ধরুন, বাংলাদেশ সরকার একটা "হজ সঞ্চয় তহবিল" চালু করে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাথে মিলে। প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা জমালে ১৫ বছরে হজের পুরো খরচ জমা হবে। তহবিলের বিনিয়োগ আয় থেকে খরচের ২০-৩০% ভর্তুকি দেওয়া যাবে। মজিদ সাহেবের মতো মানুষদের তিরিশ বছর অপেক্ষা করতে হবে না।

আর এজেন্সি সংস্কার? ১,৮০০ এজেন্সির ১,০০০টাই বাদ দেওয়া যায়। ইন্দোনেশিয়ায় সরকার নিজে হজ ব্যবস্থাপনার বড় অংশ সামলায়। বেসরকারি এজেন্সি আছে, কিন্তু কঠোর নিয়ন্ত্রণে। পারফরম্যান্স রেটিং আছে, যাত্রীদের ফিডব্যাকের ভিত্তিতে। খারাপ পারফরম্যান্স করলে লাইসেন্স বাতিল।

কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: ১.২ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা বহিঃপ্রবাহ কি কমানো সম্ভব?

সম্ভব না। হজ একটা ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য জীবনে একবার হজ ফরজ। সরকার এটা বন্ধ করতে পারে না, করা উচিতও না। কিন্তু সরকার নিশ্চিত করতে পারে যে প্রতিটা টাকা যেন সঠিকভাবে খরচ হয়। মধ্যস্বত্বভোগীদের লাভ ৫০% থেকে ১০%-এ নামানো গেলে যাত্রী প্রতি ২-৩ লাখ টাকা বাঁচবে। ১ লাখ ৩৭ হাজার যাত্রীর জন্য সেটা প্রায় ৩,০০০-৪,০০০ কোটি টাকা।


আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।

মজিদ সাহেব তিরিশ বছর ধরে টাকা জমিয়েছিলেন। প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা। একটা ছোট দোকানদারের জন্য এটা সামান্য অঙ্ক না। সেই টাকার একটা বড় অংশ গেছে এজেন্সির মুনাফায়, দালালের কমিশনে, অদক্ষ ব্যবস্থাপনার খরচে।

হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটা। এটা ব্যবসা না। কিন্তু বাংলাদেশে হজকে ঘিরে যে ব্যবসা গড়ে উঠেছে, সেটা কোটি কোটি টাকার। প্রতি বছর ১০,০০০ কোটি টাকার বেশি এই খাতে ঘোরে। এই টাকার একটা বড় অংশ ধর্মপ্রাণ মানুষদের পকেট থেকে অন্যায়ভাবে বের হয়ে যাচ্ছে।

মজিদ সাহেব হজ করে সন্তুষ্ট। তার ইবাদত কবুল হোক। কিন্তু তিনি যদি ৬ লাখ ৮৩ হাজারের বদলে ৪ লাখে হজ করতে পারতেন (যেমন ইন্দোনেশিয়ার মানুষ পারে), তাহলে বাকি ২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা তার সংসারে কাজে লাগতো। তার নাতনির পড়ালেখায় খরচ হতো। তার দোকানে বিনিয়োগ হতো।

ধর্মের নামে যা খরচ হচ্ছে, তার একটা বড় অংশ ধর্মের কাজে যাচ্ছে না। যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। আর বাকিটা বৈদেশিক মুদ্রা হয়ে দেশ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, একমুখী, ফেরত আসার কোনো পথ নেই।

মজিদ সাহেবের মতো লাখ লাখ মানুষ একটা ন্যায্য, স্বচ্ছ, আর সাশ্রয়ী হজ ব্যবস্থা ডিজার্ভ করেন। সেটা তৈরি করা অসম্ভব না। অন্যরা করে দেখিয়েছে। শুধু সদিচ্ছা দরকার।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50