সংখ্যালঘু জনসংখ্যা: ১৯৪৭ থেকে ২০২২
পর্ব ১: একটি সংখ্যার গল্প
১৯৪১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, অবিভক্ত বাংলার পূর্বাঞ্চলে (বর্তমান বাংলাদেশ) হিন্দু জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮%। ২০২২ সালের আদমশুমারিতে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭.৯৫%।
একটু থামুন। এই দুটো সংখ্যা পাশাপাশি রাখুন। ২৮% আর ৭.৯৫%। আশি বছরে একটি জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক উপস্থিতি প্রায় এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। পৃথিবীর খুব কম দেশে শান্তিকালীন সময়ে এত বড় জনমিতিক পরিবর্তন ঘটেছে।
এই চার্টটা দেখুন। ১৯৪১ থেকে ২০২২, প্রতিটি আদমশুমারিতে হিন্দু জনসংখ্যার শতাংশ কমেছে। কোনো দশকে ব্যতিক্রম নেই। রেখাটি শুধুই নিচের দিকে গেছে। কিন্তু এই নিম্নগামী রেখায় কিছু বিশেষ পতন চোখে পড়ে: ১৯৪৭ এর দেশভাগ, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯২ এর বাবরি মসজিদ-পরবর্তী সহিংসতা, ২০০১ এর নির্বাচন-পরবর্তী আক্রমণ।
প্রতিটি পতনের পেছনে একটি প্যাটার্ন: সহিংসতা, ভয়, পলায়ন। তারপর আর ফেরা হয়নি।
কিন্তু শুধু শতাংশের গল্প বললে অর্ধেক বলা হয়। পরম সংখ্যাটাও দেখতে হবে।
এই চার্টটা দেখুন। হিন্দু জনসংখ্যার পরম সংখ্যা কিন্তু বেড়েছে, ১৯৫১ সালে ৯.২ মিলিয়ন থেকে ২০২২ সালে ১৩.১ মিলিয়ন। কিন্তু একই সময়ে মোট জনসংখ্যা বেড়েছে ৪.২ মিলিয়ন থেকে ১৬৫ মিলিয়ন। মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার হিন্দু জনসংখ্যার তুলনায় ধারাবাহিকভাবে বেশি ছিল। কারণ দুটো: অভিবাসন (হিন্দুদের ভারতে চলে যাওয়া) এবং জন্মহারের পার্থক্য। তবে প্রধান কারণ অভিবাসন, জন্মহার নয়।
তাহলে প্রশ্ন: কেন এত মানুষ চলে গেল?
পর্ব ২: অর্পিত সম্পত্তি আইন, নীরব জবরদখল
উত্তরের একটা বড় অংশ লুকিয়ে আছে একটি আইনে। নামটা শুনতে নিরীহ: "অর্পিত সম্পত্তি আইন।" কিন্তু এটি সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষতিকর আইনগুলোর একটি।
গল্পটা শুরু হয় ১৯৬৫ সালে। পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকার "শত্রু সম্পত্তি আদেশ" (Enemy Property Order) জারি করে। এই আদেশ অনুযায়ী, ভারতে চলে যাওয়া (বা চলে গেছে বলে ধরে নেওয়া) হিন্দুদের সম্পত্তি সরকার "শত্রু সম্পত্তি" হিসেবে অধিগ্রহণ করতে পারত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই আইনের নাম বদলে হলো "অর্পিত সম্পত্তি আইন" (Vested Property Act), কিন্তু মূল কাঠামো রয়ে গেল।
এই আইনের ফলে কত জমি হাতবদল হয়েছে?
এই চার্টটা দেখুন। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, অর্পিত সম্পত্তি আইনের আওতায় প্রায় ২৬ লাখ একর জমি হিন্দু পরিবারের কাছ থেকে চলে গেছে। এটি বাংলাদেশের মোট আবাদযোগ্য জমির প্রায় ৫.৩%। অধ্যাপক আবুল বারকাতের গবেষণা অনুযায়ী, এই আইনে প্রায় ১.২ কোটি হিন্দু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, মানে প্রায় সমগ্র হিন্দু জনগোষ্ঠী।
আইনটির মেকানিজম ছিল সহজ এবং নির্মম। কোনো হিন্দু পরিবারের একজন সদস্যও যদি ভারতে যেত (চিকিৎসার জন্য, পড়ালেখার জন্য, বেড়াতে), তার পুরো পরিবারের সম্পত্তি "অর্পিত" ঘোষণা করা যেত। প্রমাণের ভার ছিল মালিকের উপর, রাষ্ট্রের উপর নয়। স্থানীয় প্রভাবশালীরা মিথ্যা তালিকা তৈরি করে জমি দখল করতে পারত। এবং করেছে। দলমত নির্বিশেষে, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, সব সরকারের আমলেই এই আইনের অপব্যবহার হয়েছে।
২০০১ সালে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন পাস হয়। ২০১১ সালে সংশোধনী আসে। কিন্তু বাস্তবে প্রত্যর্পণ হয়েছে নগণ্য। ২০২৫ সাল পর্যন্ত, দায়ের করা মামলার ৫% এরও কম নিষ্পত্তি হয়েছে। আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই। যে জমি চলে গেছে, সেটা ফেরত আসেনি।
এই একটি আইনই হিন্দু অভিবাসনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। জমি হারানোর ভয়, অথবা জমি হারানোর পর জীবিকার সংকট, এগুলো মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে।
পর্ব ৩: সহিংসতার মানচিত্র
কিন্তু অর্পিত সম্পত্তি আইন একমাত্র কারণ নয়। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ইতিহাস দীর্ঘ এবং পুনরাবৃত্তিমূলক।
এই চার্টটা দেখুন। ১৯৪৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বড় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাগুলো। প্রতিটি ঘটনার পেছনে একটি ট্রিগার: দেশভাগ (১৯৪৭), পাক-ভারত যুদ্ধ (১৯৬৫), মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১), বাবরি মসজিদ ভাঙা (১৯৯২), নির্বাচনী সহিংসতা (২০০১), রামু বৌদ্ধ বিহার আক্রমণ (২০১২), দুর্গাপূজায় হামলা (২০২১)।
প্যাটার্নটা লক্ষ্য করুন। অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতার ট্রিগার ছিল বাংলাদেশের বাইরের ঘটনা (বাবরি মসজিদ, ভারতের রাজনীতি), কিন্তু মূল্য দিয়েছে বাংলাদেশের নিরীহ সংখ্যালঘুরা। কখনো ফেসবুকে একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে শত শত বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কখনো নির্বাচনী ফলাফলের জের ধরে মন্দিরে হামলা হয়েছে।
২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ছিল সম্ভবত সবচেয়ে ভয়াবহ। দেশজুড়ে হিন্দু বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মন্দিরে হামলা হয়। Ain o Salish Kendra (ASK) এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যমতে, ৬৪ জেলার ৪০টিতে সহিংসতা ঘটেছিল। নারী ধর্ষণের অসংখ্য ঘটনা রিপোর্ট হয়েছিল। কিন্তু বিচার? প্রায় শূন্য।
প্রতিটি সহিংসতার পরে একই চক্র: হামলা, ক্ষতি, প্রতিশ্রুতি, বিস্মৃতি। এবং প্রতিটি সহিংসতার পরে আরেকটি ঢেউ ভারতে চলে যায়।
এই চার্টটা দেখুন। ভারতে হিন্দু অভিবাসনের ঢেউগুলো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। ১৯৪৭ এ দেশভাগের সময় সবচেয়ে বড় ঢেউ। তারপর ১৯৬৫, ১৯৭১, ১৯৯২, ২০০১। প্রতিটি সংকটের পর লাখ লাখ মানুষ সীমান্ত পার করেছে। অধ্যাপক আবুল বারকাতের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৬৪ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৬৩২ জন হিন্দু বাংলাদেশ ছেড়ে গেছে। প্রতিদিন। পঞ্চাশ বছর ধরে।
এই অভিবাসন "স্বেচ্ছায়" বলা যায় কিনা, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। যখন আপনার জমি কেড়ে নেওয়া হয়, আপনার বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়, আপনার মেয়ের নিরাপত্তা নেই, তখন সীমান্ত পার হওয়া কি "স্বেচ্ছায়" যাওয়া?
পর্ব ৪: প্রতিনিধিত্ব, অর্থনীতি, শিক্ষা
সংখ্যালঘু হ্রাসের প্রভাব শুধু জনমিতিতে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, অর্থনৈতিক অবস্থান, শিক্ষা, প্রতিটি ক্ষেত্রে এর ছাপ স্পষ্ট।
এই চার্টটা দেখুন। জাতীয় সংসদে হিন্দু প্রতিনিধিত্ব তাদের জনসংখ্যার অনুপাতের চেয়ে সবসময় কম ছিল। ৭.৯৫% জনসংখ্যা হলে ৩০০ আসনের সংসদে প্রায় ২৪ জন সংসদ সদস্য থাকার কথা। বাস্তবে সাধারণত ১০-১৫ জন নির্বাচিত হন। সংরক্ষিত মহিলা আসন বাদ দিলে প্রত্যক্ষ নির্বাচনে সংখ্যাটা আরও কম। মন্ত্রিসভায় হিন্দু প্রতিনিধিত্ব নগণ্য। সচিব পর্যায়ে প্রায় অনুপস্থিত। সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিচার বিভাগের উচ্চপদে একই চিত্র।
অর্থনৈতিক প্রান্তিকতার চিত্রও উদ্বেগজনক।
এই চার্টটা দেখুন। হিন্দু পরিবারগুলোর গড় জমির মালিকানা মুসলিম পরিবারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এটি অর্পিত সম্পত্তি আইনের প্রত্যক্ষ ফল। ভূমিহীনতার হার হিন্দুদের মধ্যে বেশি। আবাদযোগ্য জমি কম মানে আয় কম, সঞ্চয় কম, বিনিয়োগ কম। একটি দুষ্টচক্র।
এই চার্টটা দেখুন। হিন্দু পরিবারের দারিদ্র্যের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি। HIES (Household Income and Expenditure Survey) এর তথ্য অনুযায়ী, হিন্দু পরিবারের মধ্যে দারিদ্র্যের হার মুসলিম পরিবারের তুলনায় ৩-৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। চরম দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে পার্থক্য আরও বেশি। জমি হারানো, ব্যবসা হারানো, সামাজিক পুঁজি ক্ষয়, সব মিলিয়ে একটি জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে।
শিক্ষায়ও একটি ফারাক আছে, যদিও সেটা কমছে।
এই চার্টটা দেখুন। প্রাথমিক শিক্ষায় হিন্দু-মুসলিম পার্থক্য এখন প্রায় নেই। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় একটি ফারাক রয়ে গেছে। বিশেষত গ্রামীণ হিন্দু মেয়েদের ক্ষেত্রে মাধ্যমিকের পর ঝরে পড়ার হার বেশি। দারিদ্র্য এবং নিরাপত্তাহীনতা, দুটোই কারণ।
পর্ব ৫: আন্তর্জাতিক তুলনা
বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখ্যা হ্রাস কি দক্ষিণ এশিয়ায় অনন্য? তুলনা করলে কী দেখা যায়?
এই চার্টটা দেখুন। পাকিস্তানে হিন্দু জনসংখ্যা ১৯৪১ সালে ছিল প্রায় ১৪.৫%, ২০২৩ সালে সেটা ১.৭৩%। বাংলাদেশে ২৮% থেকে ৭.৯৫%। ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা একই সময়ে বেড়েছে, ৯.৮% থেকে ১৪.২%। এই তুলনা থেকে কয়েকটি জিনিস স্পষ্ট।
প্রথমত, পাকিস্তানে সংখ্যালঘু হ্রাস বাংলাদেশের চেয়েও চরম। সেখানে হিন্দু জনসংখ্যা প্রায় বিলুপ্তির কাছাকাছি। দ্বিতীয়ত, ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা শুধু টিকে থাকেনি, শতাংশে বেড়েছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ পাকিস্তান আর ভারতের মাঝামাঝি, তবে প্রবণতা পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে।
এই তুলনা কাউকে দোষারোপ করার জন্য নয়। এটা একটি আয়না। একটি দেশ তার সংখ্যালঘুদের সাথে কেমন আচরণ করে, সেটা সেই দেশের গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের মাপকাঠি।
পর্ব ৬: এখন কী করা যায়?
সংখ্যাগুলো পরিষ্কার। প্রবণতা নিম্নমুখী। কিন্তু প্রবণতা পাল্টানো অসম্ভব নয়। কিছু সুপারিশ:
প্রথম, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই, এই অবস্থা থেকে বের হতে হবে। একটি স্বতন্ত্র ট্রাইব্যুনাল গঠন করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সব মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে।
দ্বিতীয়, সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি। প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত বিচার, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙতে হবে।
তৃতীয়, সংখ্যালঘু কমিশনকে সাংবিধানিক মর্যাদা ও ক্ষমতা দিতে হবে। বর্তমানে এটি একটি দন্তহীন প্রতিষ্ঠান।
চতুর্থ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক পদক্ষেপ। সরকারি চাকরিতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেনাবাহিনীতে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
পঞ্চম, জমি রেকর্ড ডিজিটাইজেশন সম্পন্ন করতে হবে, যাতে জবরদখল কঠিন হয়।
এই পদক্ষেপগুলো কি যথেষ্ট? সম্ভবত না। কিন্তু শুরু করতে হবে কোথাও না কোথাও।
আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।
২৮% থেকে ৭.৯৫%। এই সংখ্যার পেছনে লাখ লাখ পরিবারের গল্প আছে। যে দাদা ১৯৬৫ সালে জমি হারিয়েছেন। যে বাবা ১৯৯২ সালে বাড়ি পুড়তে দেখেছেন। যে মেয়ে ২০০১ সালে নিরাপত্তাহীনতায় পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছে। যে পরিবার ২০২১ সালে দুর্গাপূজায় মন্দির ভাঙতে দেখেছে।
এদের প্রত্যেকে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে: থাকবো, নাকি যাবো? যারা গেছে, তারা ফেরেনি। যারা থেকেছে, তারা প্রতিদিন এই সিদ্ধান্তটা নতুন করে নেয়।
একটি দেশের মহত্ত্ব মাপা হয় সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের সাথে কেমন আচরণ করে তা দিয়ে। ২৮% থেকে ৭.৯৫%, এই সংখ্যা বাংলাদেশের জন্য একটি লজ্জা। এই লজ্জা মোছার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সমাজের এবং প্রতিটি নাগরিকের।
প্রশ্নটা সোজা: আরও কত কমলে আমরা জেগে উঠবো?