আপনার নিকটতম হাসপাতাল আপনাকে বাঁচাতে পারবে না
পর্ব ১: রাত তিনটার ফোন
ভোলার চরফ্যাশনে রাত তিনটা। রহিমা বেগমের পেটে ব্যথা শুরু হয়েছে ঘণ্টা দুয়েক আগে। প্রথম সন্তান। বয়স বাইশ। তার শ্বশুর বাড়ির পাশে কোনো হাসপাতাল নেই। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে, দুই কিলোমিটার দূরে। কিন্তু ওখানে রাতে কেউ থাকে না। দরজায় তালা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১৮ কিলোমিটার দূরে। সেখানে যেতে হবে নৌকায়, তারপর ভ্যানে, তারপর অটোরিকশায়। রাত তিনটায়।
শ্বশুর একটা নৌকা জোগাড় করলেন। ঘণ্টা খানেকে নদী পার। তারপর মেঠো পথে ভ্যান। রহিমা কাতরাচ্ছে। উপজেলা হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ভোর পাঁচটা। দুই ঘণ্টা লেগেছে।
হাসপাতালে গিয়ে শুনলো: গাইনি ডাক্তার নেই। ডাক্তার ট্রান্সফার হয়ে গেছে, নতুন কেউ আসেনি। তিন মাস হয়ে গেছে। নার্স আছে একজন, তিনি বললেন, "বরিশাল শহরে যান, জেলা হাসপাতালে।" বরিশাল আরো ৬০ কিলোমিটার।
এটা কোনো বিশেষ ঘটনা না। এটা বাংলাদেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার দৈনন্দিন বাস্তবতা। ১৮ কোটি মানুষের দেশে, প্রতিদিন হাজার হাজার রহিমা এই যাত্রা করছে। কেউ পৌঁছায়, কেউ পৌঁছায় না।
কেন এমন হচ্ছে? সংখ্যাগুলো দেখলে উত্তর পরিষ্কার।
এই চার্টটা দেখুন:
বাংলাদেশে প্রতি ১০,০০০ মানুষের জন্য মাত্র ৬.৭ জন চিকিৎসক। WHO বলছে ন্যূনতম ১০ জন দরকার। ভারতে ৭.৪, শ্রীলঙ্কায় ১১.৭, থাইল্যান্ডে ৮.১। মানে বাংলাদেশে ডাক্তার আছে, কিন্তু যথেষ্ট না। আর যতটুকু আছে, তার বেশিরভাগ ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটে। চরফ্যাশনে না।
আর শুধু ডাক্তার না, হাসপাতালে শয্যারও অভাব। এই চার্টটা দেখুন:
বিশ বছরে হাসপাতাল শয্যা বেড়েছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু এখনো প্রতি ১০,০০০ জনে মাত্র ৮টি শয্যা। WHO সুপারিশ করে ৩০। মানে আমরা যেখানে থাকা উচিত, তার এক-চতুর্থাংশে আছি। ঢাকা মেডিকেলে একটা বেডে দুজন রোগী শুয়ে থাকে, মেঝেতে আরো দুজন। এটা ব্যতিক্রম না, এটা নিয়ম।
পর্ব ২: ডাক্তারের সংকট
বাংলাদেশে মেডিকেল কলেজ আছে ১১৫টি (সরকারি ৩৭, বেসরকারি ৭২, সামরিক ৬)। প্রতি বছর প্রায় ১২,০০০ ডাক্তার পাস করে বের হয়। সংখ্যাটা খারাপ না। কিন্তু তাহলে ডাক্তার কম কেন?
তিনটা কারণ।
প্রথমত, ব্রেইন ড্রেইন। প্রতি বছর প্রায় ২,০০০ থেকে ২,৫০০ বাংলাদেশি ডাক্তার দেশ ছেড়ে চলে যায়। গন্তব্য? আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য। কারণ? বেতন। বাংলাদেশে একজন সরকারি ডাক্তারের শুরুর বেতন মাসে প্রায় ৩৫,০০০-৪০,০০০ টাকা। আমেরিকায় একজন রেসিডেন্ট ডাক্তারের শুরুর বেতন মাসে ৫,০০০ ডলার, মানে প্রায় ৫.৫ লাখ টাকা। পার্থক্য ১৫ গুণ। কে থাকবে?
দ্বিতীয়ত, শহর-গ্রাম বৈষম্য। যে ডাক্তাররা দেশে থাকে, তাদের বেশিরভাগ ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটে প্র্যাকটিস করে। গ্রামে পোস্টিং হলে ডাক্তাররা যোগ দেয় না, বা যোগ দিয়ে পালিয়ে আসে। কারণ গ্রামের হাসপাতালে যন্ত্রপাতি নেই, ওষুধ নেই, বাসস্থান নেই, ছেলেমেয়ের স্কুল নেই। একজন ডাক্তার যে পাঁচ-ছয় বছর পড়াশোনা করেছে, সে কেন স্টেথোস্কোপ ছাড়া আর কিছু নেই এমন একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বসে থাকবে?
এই বৈষম্যটা কতটা ভয়াবহ, এই চার্টটা দেখুন:
শহরে প্রতি ১০,০০০ জনে ১৪ জন ডাক্তার। গ্রামে? মাত্র ২ জন। সাত গুণ পার্থক্য। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ক্ষেত্রে পার্থক্য ১৭ গুণ। গ্রামে প্রতি ১০,০০০ জনে মাত্র ০.৩ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আছে। মানে প্রায় ৩৩,০০০ মানুষের জন্য একজন বিশেষজ্ঞ। এই হিসাবে চরফ্যাশনে রহিমার জন্য কোনো গাইনি ডাক্তার না থাকাটা অবাক হওয়ার কিছু না। এটাই স্বাভাবিক।
তৃতীয়ত, ডাক্তারদের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব। নার্স, মিডওয়াইফ, প্যারামেডিক, এদের সংকট ডাক্তারের চেয়েও বেশি। WHO বলে প্রতি একজন ডাক্তারের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকা উচিত। বাংলাদেশে অনুপাত ১:০.৪। মানে প্রতি ১০ জন ডাক্তারের বিপরীতে মাত্র ৪ জন নার্স। এই ঘাটতি পূরণ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।
পর্ব ৩: খরচের ফাঁদ
ডাক্তার নেই, হাসপাতাল নেই। তাহলে মানুষ কী করে? প্রাইভেট ক্লিনিকে যায়। ওষুধের দোকানে যায়। হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে যায়। আর এই প্রতিটা পথে তাকে নিজের পকেট থেকে টাকা দিতে হয়।
এই চার্টটা দেখুন:
বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৪% আসে মানুষের নিজের পকেট থেকে। এটা পৃথিবীর সর্বোচ্চ হারগুলোর একটা। ভারতে ৫৫%, সেটাও খারাপ। শ্রীলঙ্কায় ৪৬%। কিন্তু থাইল্যান্ডে? মাত্র ১১%। কারণ থাইল্যান্ডে সরকার স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশ করেনি।
৭৪% মানে কী? মানে একটা পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে পরিবারকে নিজে সব খরচ বহন করতে হয়। সরকারি হাসপাতালে ফ্রি চিকিৎসা আছে, তত্ত্বে। বাস্তবে? ওষুধ কিনতে হয় বাইরে থেকে, কারণ হাসপাতালে নেই। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হয় বাইরের ল্যাবে, কারণ হাসপাতালের যন্ত্র নষ্ট। বেড পেতে অপেক্ষা করতে হয় দিনের পর দিন, তাই প্রাইভেটে যায়। আর প্রাইভেটে খরচ? একটা সিজারিয়ান ডেলিভারি ৫০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকা। একটা হার্ট সার্জারি ৩ থেকে ৮ লাখ টাকা। ক্যান্সারের চিকিৎসা? ৫ থেকে ২০ লাখ টাকা।
একটা পরিবার যার মাসিক আয় ২০,০০০-৩০,০০০ টাকা, তাদের জন্য ৫ লাখ টাকার চিকিৎসা খরচ মানে সর্বনাশ। জমি বিক্রি, সঞ্চয় ভাঙা, মহাজনের কাছ থেকে ধার। ঠিক যেভাবে সোহেল বিদেশে যেতে ঋণ করেছিল, একই রকম ঋণের চক্র শুরু হয় একটা অসুখের কারণে।
এটাকে বলে বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয় (catastrophic health expenditure)। যখন একটা পরিবারের আয়ের ১০% এর বেশি স্বাস্থ্যসেবায় চলে যায়, সেটাকে WHO "বিপর্যয়কর" বলে। বাংলাদেশে কতটা পরিবার এই ফাঁদে পড়ে? এই চার্টটা দেখুন:
বাংলাদেশে প্রায় ২৫% পরিবার বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়ের শিকার। মানে প্রতি চারটা পরিবারের একটা। ভারতে ১৮%, সেটাও গুরুতর। কিন্তু থাইল্যান্ডে মাত্র ২%। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। এই সংখ্যাটা আবার পড়ুন। ৫০ লাখ মানুষ। প্রতি বছর। শুধু অসুস্থতার কারণে গরিব হয়ে যাচ্ছে।
সরকার কেন এই খরচ বহন করতে পারে না? কারণ সরকার স্বাস্থ্যে খরচই করে না। এই চার্টটা দেখুন:
বাংলাদেশ সরকার স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির মাত্র ১.১% ব্যয় করে। WHO বলছে ন্যূনতম ৫% দরকার। ভারত ২.২% দেয়, থাইল্যান্ড ৪.২%। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে কম স্বাস্থ্য ব্যয়কারী দেশ। আফগানিস্তান পর্যন্ত বেশি খরচ করে। জিডিপির ১.১% মানে প্রতি নাগরিকের জন্য বছরে মাত্র ৪ ডলার (প্রায় ৪৫০ টাকা) সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয়। ৪৫০ টাকায় কী চিকিৎসা হয়?
পর্ব ৪: অগ্রগতি আর প্যারাডক্স
এতক্ষণ যা বললাম, তাতে মনে হতে পারে বাংলাদেশে কিছুই হয়নি। সেটা সত্যি না। বাংলাদেশ স্বাস্থ্যসেবায় কিছু অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে। সমস্যা হলো, এই সাফল্যগুলো একটা বিভ্রান্তি তৈরি করে, যেন সবকিছু ঠিক আছে।
প্রথম সাফল্য: মাতৃমৃত্যু কমানো। এই চার্টটা দেখুন:
২০০০ সালে বাংলাদেশে প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্মে ৪৩৪ জন মা মারা যেত। ২০২৫ সালে সেটা কমে ১২৩ হয়েছে। তিনগুণের বেশি হ্রাস। এটা সত্যিই চমৎকার অগ্রগতি। কিন্তু SDG লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ৭০ এ নামিয়ে আনা। আর মাত্র চার বছর বাকি, আমরা এখনো ১২৩ তে। এই গতিতে ২০৩০ এর লক্ষ্য পূরণ হবে না। থাইল্যান্ডে এই হার ২৯, শ্রীলঙ্কায় ২৯, মালয়েশিয়ায় ২১।
দ্বিতীয় সাফল্য: শিশুমৃত্যু কমানো। এই চার্টটা দেখুন:
২০০০ সালে প্রতি ১,০০০ জীবিত জন্মে ৮৭ জন শিশু পাঁচ বছর বয়সের আগেই মারা যেত। ২০২৫ সালে সেটা ২৬। অসামান্য অগ্রগতি। SDG লক্ষ্য ২৫, বাংলাদেশ প্রায় পৌঁছে গেছে। এটা সম্ভব হয়েছে মূলত টিকাদান কর্মসূচি, ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপি (ORS), আর সাম্প্রদায়িক স্বাস্থ্যকর্মীদের কারণে। BRAC এর মতো NGO এখানে বিশাল ভূমিকা রেখেছে।
তৃতীয় সাফল্য: টিকাদান। এই চার্টটা দেখুন:
বাংলাদেশের টিকাদান কভারেজ ৯৭%। এটা অনেক উন্নত দেশের চেয়ে ভালো। কোভিডের সময় কিছুটা কমেছিল, কিন্তু দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়েছে। এটা বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
তাহলে প্যারাডক্সটা কোথায়?
প্যারাডক্স হলো, বাংলাদেশ সম্প্রদায়ভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় (টিকা, ORS, পরিবার পরিকল্পনা) অসাধারণ সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু যখনই চিকিৎসা ব্যবস্থার দরকার হয় (হাসপাতাল, ডাক্তার, অপারেশন, জরুরি সেবা), সেখানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। একটা শিশুকে টিকা দিতে পারি, কিন্তু সেই শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি করতে পারি না। একজন গর্ভবতী মাকে আয়রন ট্যাবলেট দিতে পারি, কিন্তু প্রসবে জটিলতা হলে সিজারিয়ান করার ডাক্তার নেই।
সহজ ভাষায়, বাংলাদেশ মানুষকে অসুখ থেকে বাঁচাতে মোটামুটি পারে। কিন্তু কেউ অসুস্থ হয়ে গেলে তাকে চিকিৎসা দিতে পারে না।
পর্ব ৫: অন্যরা কী করলো?
থাইল্যান্ডের কথাই ধরুন। ২০০১ সালে থাইল্যান্ড "৩০ বাট স্কিম" চালু করলো। প্রতিটা হাসপাতাল ভিজিটে রোগী দেবে ৩০ বাট (তখনকার হিসাবে ১ ডলারের কম)। বাকি সব সরকার দেবে। ওষুধ, পরীক্ষা, অপারেশন, সব। মানুষ বললো, "এটা অসম্ভব, সরকার দেউলিয়া হয়ে যাবে।" হয়নি। থাইল্যান্ড জিডিপির ৪.২% স্বাস্থ্যে খরচ করে, আর প্রতিটা নাগরিক মানসম্পন্ন চিকিৎসা পায়। আউট-অফ-পকেট খরচ ১১%।
থাইল্যান্ড কোনো ধনী দেশ না। ২০০১ সালে থাইল্যান্ডের মাথাপিছু আয় ছিল ১,৯০০ ডলার। বাংলাদেশের এখন ২,৭০০ ডলার। মানে বাংলাদেশ এখন থাইল্যান্ডের ২০০১ সালের চেয়ে ধনী। থাইল্যান্ড পেরেছে, বাংলাদেশ কেন পারবে না?
UHC সূচক দেখলে বাংলাদেশ কোথায় আছে, সেটা পরিষ্কার হয়। এই চার্টটা দেখুন:
থাইল্যান্ডের স্কোর ৮৩, বৈশ্বিক গড় ৬৮। বাংলাদেশ ৫১। নেপাল (৪৮) আর মিয়ানমার (৪৪) ছাড়া এই অঞ্চলে সবার পেছনে।
বাংলাদেশের জন্য কী করা দরকার?
প্রথমত, স্বাস্থ্য বাজেট দ্বিগুণ করা। জিডিপির ১.১% থেকে অন্তত ২.৫% এ নিয়ে যাওয়া। এটা বিশাল পরিবর্তন মনে হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের জিডিপি এখন ৪৬০ বিলিয়ন ডলার। ১.৪% বাড়তি বরাদ্দ মানে প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত। এটা পদ্মা সেতুর দুটো খরচের সমান। প্রতি বছর। সেই টাকায় ১০,০০০ কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রাখা যায়, ৫০,০০০ নার্স নিয়োগ দেওয়া যায়, প্রতিটা উপজেলা হাসপাতালে অন্তত দুজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রাখা যায়।
দ্বিতীয়ত, গ্রামে ডাক্তার রাখার জন্য প্রণোদনা তৈরি করা। যেমন: গ্রামে পোস্টিং হলে বেতন দ্বিগুণ, বিনামূল্যে আবাসন, সন্তানদের জন্য বিশেষ শিক্ষা সুবিধা, তিন বছর গ্রামে থাকলে বিদেশে উচ্চশিক্ষার বৃত্তি। এগুলো ব্যয়বহুল, কিন্তু গ্রামে ডাক্তার না থাকার খরচ আরো বেশি।
তৃতীয়ত, সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা (Universal Health Coverage)। থাইল্যান্ডের মতো না হোক, অন্তত শুরু করা যায়। প্রতিটা পরিবারের জন্য বছরে ৫,০০০ টাকার প্রিমিয়ামে ৫০,০০০ টাকার কভারেজ। সরকার ভর্তুকি দেবে। গরিব পরিবারের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। এটা শুরু হলে আউট-অফ-পকেট খরচ ৭৪% থেকে ধীরে ধীরে কমে আসবে।
চতুর্থত, টেলিমেডিসিন। বাংলাদেশে ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে গ্রামে গ্রামে। স্মার্টফোন আছে প্রায় সবার হাতে। চরফ্যাশনে গাইনি ডাক্তার নেই, কিন্তু ঢাকায় আছে। ভিডিও কলে রোগী দেখা, প্রেসক্রিপশন দেওয়া, জরুরি কেসে রেফারেল দেওয়া, এসব এখনই সম্ভব। প্রযুক্তি তৈরি, শুধু ব্যবস্থা করার ইচ্ছা দরকার।
আসুন শেষ করি যেখান থেকে শুরু করেছিলাম।
চরফ্যাশনে রহিমা বেগম শেষ পর্যন্ত বরিশাল জেলা হাসপাতালে পৌঁছেছিল। সকাল আটটায়। রাত তিনটা থেকে সকাল আটটা, পাঁচ ঘণ্টা। নৌকা, ভ্যান, অটোরিকশা, তারপর আবার অটোরিকশা। সিজারিয়ান হয়েছে। বাচ্চা বেঁচে আছে। রহিমাও বেঁচে আছে।
কিন্তু সবাই এত ভাগ্যবান না।
প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৫,০০০ মা প্রসবকালীন জটিলতায় মারা যায়। প্রতি বছর ৫০ লাখ মানুষ চিকিৎসা খরচে দরিদ্র হয়ে পড়ে। প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ অসুস্থ হয়ে ডাক্তার পায় না, হাসপাতাল পায় না, চিকিৎসা পায় না।
বাংলাদেশ একটা দেশ যেখানে আপনি টিকা পাবেন, কিন্তু হাসপাতাল পাবেন না। যেখানে ওষুধের দোকান আছে প্রতি মোড়ে, কিন্তু ডাক্তার নেই। যেখানে সরকার জিডিপির ১.১% স্বাস্থ্যে খরচ করে, আর বাকি ৭৪% আপনার পকেট থেকে নেয়।
রহিমার গল্পটা প্রতিদিন ঘটছে। প্রতিটা গ্রামে, প্রতিটা চরে, প্রতিটা বস্তিতে। রাত তিনটায় কেউ না কেউ অসুস্থ হচ্ছে, আর আবিষ্কার করছে যে তার নিকটতম হাসপাতাল তাকে বাঁচাতে পারবে না।
এই পরিবর্তন সম্ভব। থাইল্যান্ড করেছে, শ্রীলঙ্কা করেছে, রুয়ান্ডা পর্যন্ত করেছে। বাংলাদেশ পারে না, এটা সত্যি না। বাংলাদেশ করেনি, এটাই সত্যি।