Back to publications
Narrative 2026-03-06

ঢাকায় একটা ফ্ল্যাটের দাম কত জীবন?

আবাসন সংকট, মূল্য বৃদ্ধি, আর মধ্যবিত্তের স্বপ্নভঙ্গ

ঢাকায় একটা ফ্ল্যাটের দাম কত জীবন?

পর্ব ১: শাহেদের স্বপ্ন

শাহেদ আহমেদ সরকারি চাকরি করে। BCS পাশ, ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা। মাসিক বেতন ৪৫,০০০ টাকা। বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা মিলিয়ে বছরে আয় প্রায় ৭ লাখ টাকা। বাংলাদেশের মানদণ্ডে শাহেদ "মধ্যবিত্ত"। সে ভালো আছে। অনেকের চেয়ে ভালো আছে।

শাহেদের একটাই স্বপ্ন: নিজের একটা ফ্ল্যাট। ঢাকায়। খুব বড় না, ১,০০০ বর্গফুট হলেই চলবে। দুই রুম, একটা রান্নাঘর, একটা বাথরুম। স্ত্রী আর দুই বাচ্চা নিয়ে একটু শান্তিতে থাকবে। বাসাওয়ালার মুখ দেখতে হবে না। ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ পেলে বুক কাঁপবে না।

কিন্তু ঢাকায় ভাড়া এত বেশি কেন? উত্তরটা সহজ: চাহিদা অনেক বেশি, সরবরাহ অনেক কম।
৪৫,০০০ টাকা
শাহেদের স্বপ্ন
১২,০০০ থেকে ১৮,০০০ টাকা
ভাড়ার কারাগার
৩৫ থেকে ৩৮%
RAJUK, অননুমোদিত ভবন, আর নিয়মহীনতা

কিন্তু ঢাকায় ১,০০০ বর্গফুটের একটা ফ্ল্যাটের দাম কত? এলাকা ভেদে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। মিরপুর, মোহাম্মদপুরের মতো মধ্যবিত্ত এলাকায় বর্গফুট ৫,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকা। গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিতে ১০,০০০ থেকে ১২,০০০। একটু ভালো জায়গায় সাধারণ মানের ফ্ল্যাটের দাম ধরুন ৮০ লাখ টাকা।

শাহেদের বার্ষিক আয় ৭ লাখ। ফ্ল্যাটের দাম ৮০ লাখ। মানে ফ্ল্যাটটা কিনতে শাহেদের পুরো আয় (একটা টাকাও খরচ না করে) জমাতে হবে সাড়ে ১১ বছর। কিন্তু শাহেদ তো শূন্যে বাঁচে না। ভাড়া দিতে হয়, খেতে হয়, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে হয়। আয়ের ২০% সঞ্চয় করতে পারলে (যেটা বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের জন্য অত্যন্ত আশাবাদী হিসাব) মাসে ৯,০০০ টাকা জমবে। বছরে ১ লাখ ৮ হাজার। ৮০ লাখ টাকা জমাতে সময় লাগবে ৭৪ বছর।

শাহেদের বয়স ৩২। ৭৪ বছর পরে তার বয়স হবে ১০৬। বাংলাদেশে গড় আয়ু ৭৩ বছর।

মানে, শাহেদ যদি তার পুরো কর্মজীবনে প্রতি মাসে সঞ্চয় করে, তবুও জীবদ্দশায় ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট কিনতে পারবে না। এটা শুধু শাহেদের গল্প না। এটা বাংলাদেশের লাখ লাখ মধ্যবিত্ত পরিবারের বাস্তবতা।

ফ্ল্যাটের দাম গত দেড় দশকে কোথায় গেছে, সেটা দেখুন।

২০১০ সালে ঢাকায় ফ্ল্যাটের গড় দাম ছিল বর্গফুটে ৩,২০০ টাকা। ২০১৫ সালে ৫,০০০। ২০২০ সালে ৭,৫০০। ২০২৫ সালে ১১,৫০০। পনেরো বছরে দাম প্রায় সাড়ে তিন গুণ। কিন্তু একই সময়ে মধ্যবিত্তের আয় কতটা বেড়েছে? সরকারি কর্মচারীর বেতন গত পনেরো বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বেসরকারি খাতে হয়তো আড়াই গুণ। আয় দ্বিগুণ, কিন্তু ফ্ল্যাটের দাম সাড়ে তিন গুণ। ফাঁকটা প্রতিবছর বাড়ছে।

এই ফাঁকটা বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো price-to-income ratio, অর্থাৎ ফ্ল্যাটের দাম আর বার্ষিক আয়ের অনুপাত।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে, একটা সুস্থ আবাসন বাজারে এই অনুপাত থাকে ৩ থেকে ৫-এর মধ্যে। মানে, একটা পরিবারের ৩ থেকে ৫ বছরের আয় দিয়ে একটা ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব। কুয়ালালামপুরে এই অনুপাত ৭.৮। কলকাতায় ৮.৫। দিল্লিতে ১২.৩। ঢাকায়? ১৫.২। পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপগুলোর একটি।

এর মানে হলো ঢাকায় একটা গড় আয়ের পরিবারের পনেরো বছরের সম্পূর্ণ আয় লাগবে একটা ফ্ল্যাট কিনতে। কোনো খরচ ছাড়া। বাস্তবে? অসম্ভব।


পর্ব ২: ভাড়ার কারাগার

ফ্ল্যাট কেনা যখন অসম্ভব, তখন ভাড়ায় থাকতে হয়। ঢাকায় বেশিরভাগ মানুষ ভাড়াটিয়া। কিন্তু ভাড়ায় থাকাটাও সহজ না।

ঢাকায় দুই রুমের একটা ফ্ল্যাটের ভাড়া মিরপুরে ১২,০০০ থেকে ১৮,০০০ টাকা। মোহাম্মদপুরে ১৫,০০০ থেকে ২২,০০০। উত্তরায় ১৮,০০০ থেকে ২৫,০০০। গুলশানে? ৪০,০০০ থেকে শুরু। আর এর সাথে যোগ করুন সার্ভিস চার্জ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি। মোট আবাসন খরচ মাসিক আয়ের কত শতাংশ হয়ে দাঁড়ায়?

নিম্নবিত্ত পরিবার, যাদের মাসিক আয় ২০,০০০ টাকার নিচে, তাদের আয়ের ৫২% যায় শুধু বাড়িভাড়ায়। নিম্ন-মধ্যবিত্তের ৪৫%। মধ্যবিত্তেরও ৩৮%। আন্তর্জাতিক মানে, আয়ের ৩০%-এর বেশি বাড়িভাড়ায় গেলে সেটাকে "অতিরিক্ত আবাসন ব্যয়" ধরা হয়। ঢাকায় নিচের তিনটি আয়শ্রেণীর প্রত্যেকেই এই সীমার উপরে।

ভাড়ার পরে কী বাকি থাকে? ধরুন একটা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার, মাসিক আয় ৩৫,০০০ টাকা। ভাড়া ১৫,০০০। বাকি ২০,০০০ টাকায় চার জনের খাবার, বাচ্চাদের স্কুলের বেতন, চিকিৎসা, যাতায়াত, কাপড়চোপড়, সব। মাসের শেষে সঞ্চয়? শূন্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঋণাত্মক। মাসের শেষ সপ্তাহে ধার করতে হয়, পরের মাসের বেতন থেকে শোধ করতে হয়। এটা চক্র। ভাড়ার চক্র। বেরোনোর উপায় নেই।

কিন্তু ঢাকায় ভাড়া এত বেশি কেন? উত্তরটা সহজ: চাহিদা অনেক বেশি, সরবরাহ অনেক কম।

ঢাকায় প্রতি বছর নতুন আবাসনের চাহিদা প্রায় ১,৫০,০০০ থেকে ১,৭০,০০০ ইউনিট। কিন্তু তৈরি হয় ৩০,০০০ থেকে ৩৫,০০০। চাহিদার মাত্র ২০ থেকে ২৫%। বাকি ৭৫%? তারা পুরনো বাড়িতে গাদাগাদি করে থাকে, বস্তিতে যায়, অথবা শহরতলীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাতায়াত করে। ২০২০ সালে মহামারির সময় সরবরাহ আরো কমে গেছিল, নির্মাণ কাজ বন্ধ ছিল। কিন্তু চাহিদা কমেনি। ফলে দাম লাফিয়ে উঠেছে।


পর্ব ৩: RAJUK, অননুমোদিত ভবন, আর নিয়মহীনতা

ঢাকার আবাসন সংকটের পেছনে শুধু বাজারের চাপ নেই। আছে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। তার কেন্দ্রে আছে RAJUK (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ)।

RAJUK ঢাকার ভবন নকশা অনুমোদন করে। কিন্তু অনুমোদনের প্রক্রিয়াটা এত জটিল, এত সময়সাপেক্ষ, আর এত দুর্নীতিগ্রস্ত যে বেশিরভাগ নির্মাতা অনুমোদন ছাড়াই ভবন তৈরি করে ফেলে। এই চার্টটা দেখুন।

প্রতি বছর ১০,০০০ থেকে ১৩,০০০ ভবন নকশা আবেদন জমা পড়ে। অনুমোদন পায় মাত্র ৩,০০০ থেকে ৪,৫০০। অনুমোদন হার ৩৫ থেকে ৩৮%। বাকি ৬২%? তারা কি ভবন বানায় না? বানায়। শুধু অনুমোদন ছাড়া বানায়।

Transparency International Bangladesh (TIB) এর রিপোর্ট অনুযায়ী, RAJUK-এ একটা ভবন নকশা অনুমোদন পেতে গড়ে ৬ থেকে ১৮ মাস সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে ২ বছর। আর এই প্রক্রিয়ায় "অনানুষ্ঠানিক খরচ" (ঘুষ) দিতে হয় ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা। একজন ছোট ডেভেলপার, যে ৫ তলা বাড়ি বানাতে চায়, তার পক্ষে এই খরচ আর সময় বহন করা অসম্ভব। ফলে সে অনুমোদন ছাড়াই বানায়।

এর ফলাফল? ঢাকা ভরে গেছে অননুমোদিত ভবনে। এলাকাভিত্তিক চিত্রটা দেখুন।

পুরান ঢাকায় ৭২% ভবন অননুমোদিত। কেরানীগঞ্জে ৮০%। মিরপুরে ৫৫%। এমনকি গুলশান-বনানীর মতো "পরিকল্পিত" এলাকাতেও ২৮%। এই অননুমোদিত ভবনগুলোতে ভূমিকম্প সহনশীলতা নেই, ফায়ার সেফটি নেই, পর্যাপ্ত সিঁড়ি নেই। রানা প্লাজা ধসে পড়েছিল ২০১৩ সালে, ১,১৩৪ জন মারা গেছিল। সেটা একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ছিল। কিন্তু ঢাকার আবাসিক ভবনগুলোর অবস্থা কি খুব আলাদা? BUET-র গবেষণা বলছে, ঢাকায় রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ৭০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ ভবন ধসে পড়তে পারে। কারণ এগুলো কোনো কোড মেনে তৈরি হয়নি।


পর্ব ৪: ব্যাংক ঋণের ফাঁদ

যারা ফ্ল্যাট কেনার চেষ্টা করে, তাদের একমাত্র রাস্তা ব্যাংক ঋণ। কিন্তু বাংলাদেশে গৃহঋণ নেওয়া একটা আলাদা যন্ত্রণা।

২০২০ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হারে ৯% ক্যাপ বসিয়েছিল। সেই সময়ে কিছু মধ্যবিত্ত পরিবার ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কিনেছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে সেই ক্যাপ তুলে নেওয়া হলো। এখন গৃহঋণের সুদ ১১ থেকে ১২%। কোনো কোনো ব্যাংকে ১৩%।

হিসাবটা করুন। ৮০ লাখ টাকার ফ্ল্যাট। ২০% ডাউন পেমেন্ট, মানে ১৬ লাখ নিজের (যেটা জোগাড় করাই প্রায় অসম্ভব)। বাকি ৬৪ লাখ ব্যাংক ঋণ। ১১.৫% সুদে ২০ বছরের মেয়াদে মাসিক কিস্তি হয় প্রায় ৭২,০০০ টাকা। শাহেদের মাসিক বেতন ৪৫,০০০। মাসিক কিস্তি তার বেতনের দেড় গুণ।

ব্যাংকও জানে এটা অসম্ভব। তাই ব্যাংক ঋণ দেয় না, যদি না মাসিক আয় কিস্তির তিন গুণ হয়। মানে শাহেদকে মাসে ২ লাখ টাকা আয় করতে হবে গৃহঋণ পেতে। বাংলাদেশে কত শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ২ লাখ? ৩ থেকে ৫%। বাকি ৯৫ থেকে ৯৭% পরিবারের জন্য ব্যাংক ঋণে ফ্ল্যাট কেনা একটা অলীক স্বপ্ন।

তুলনায় অন্য দেশের শহরগুলোতে ফ্ল্যাটের দাম কেমন? শুধু দাম নয়, আয়ের তুলনায় দাম কেমন, সেটা দেখুন।

ঢাকার গুলশানে বর্গফুট ৯৫ ডলার। দিল্লিতে ১২০, কুয়ালালামপুরে ১১০। ঢাকার দাম দিল্লি বা কুয়ালালামপুরের চেয়ে কম, এটা সত্য। কিন্তু দিল্লির মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের প্রায় সমান হলেও ভারতে গৃহঋণের সুদ ৮ থেকে ৯%। মালয়েশিয়ায় ৪%। বাংলাদেশে ১১ থেকে ১২%। আর মালয়েশিয়ার মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের সাড়ে চার গুণ। মানে কুয়ালালামপুরে ফ্ল্যাটের দাম বেশি হলেও, মানুষের কেনার সামর্থ্যও অনেক বেশি।

আয়শ্রেণী অনুযায়ী ঢাকায় ফ্ল্যাট কিনতে কত বছর লাগবে, সেটা দেখলে ছবিটা পরিষ্কার হয়।

নিম্নবিত্তের জন্য ২০৮ বছর। নিম্ন-মধ্যবিত্তের জন্য ১০৪ বছর। মধ্যবিত্তের জন্য ৬০ বছর। এমনকি উচ্চ-মধ্যবিত্ত, যারা মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা আয় করে, তাদেরও লাগবে ৩৫ বছর। কর্মজীবন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ বছর। মানে উচ্চ-মধ্যবিত্তও সারা জীবন ধরে সঞ্চয় করলে কোনোমতে একটা ফ্ল্যাট কিনতে পারে, কিন্তু তখন অবসরের সময় হয়ে যায়। বাকি সবার জন্য? "নিজের বাড়ি" একটা রূপকথা।


পর্ব ৫: সরকার কোথায়?

প্রশ্ন হলো, সরকার কী করছে? বাংলাদেশে জাতীয় আবাসন নীতি আছে। National Housing Authority (NHA) আছে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আবাসনের লক্ষ্যমাত্রা থাকে। কিন্তু বাস্তবায়ন?

৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১১-১৫) সরকারি আবাসনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০,০০০ ইউনিট। বাস্তবায়ন? ৮,৫০০। মানে ১৭%। ৭ম পরিকল্পনায় (২০১৬-২০) লক্ষ্যমাত্রা ৮০,০০০, বাস্তবায়ন ১২,০০০। ১৫%। ৮ম পরিকল্পনায় (২০২১-২৫) লক্ষ্যমাত্রা ১,২০,০০০, বাস্তবায়ন ১৫,০০০। ১২.৫%। লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে, কিন্তু বাস্তবায়ন সেই একই জায়গায় আটকে আছে। প্রতিটা পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় লক্ষ্যমাত্রার ৮৫% অপূর্ণ থাকছে।

ভারতে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার মাধ্যমে ২০১৫ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ১ কোটি ২০ লাখ সাশ্রয়ী মূল্যের ঘর তৈরি হয়েছে। মালয়েশিয়ায় PR1MA প্রকল্পের মাধ্যমে বাজারমূল্যের ২০ থেকে ৩০% কম দামে মধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে। সিঙ্গাপুরে ৮০% মানুষ সরকারি HDB ফ্ল্যাটে থাকে, সাশ্রয়ী মূল্যে। বাংলাদেশে? সরকারি আবাসন বলতে গেলে অস্তিত্বহীন।


পর্ব ৬: কী করা সম্ভব?

সমস্যাটা বিশাল, কিন্তু সমাধান আছে। অন্য দেশগুলো করেছে, আমরাও পারি।

১. RAJUK সংস্কার। ভবন অনুমোদন প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা দরকার। অনলাইনে আবেদন, স্বয়ংক্রিয় যাচাই, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত। ভারতের কিছু রাজ্যে (তেলেঙ্গানা, কর্ণাটক) অনলাইন বিল্ডিং পারমিট ৩০ দিনে পাওয়া যায়। ঢাকায় ১৮ মাস লাগে। এই পার্থক্যটা শুধু প্রযুক্তির না, এটা সদিচ্ছার।

২. সাশ্রয়ী আবাসন নীতি। সরকার যদি ডেভেলপারদের বলে, "তোমার প্রকল্পের ২০% ইউনিট ৩,০০০ টাকা বর্গফুটে বিক্রি করো, বিনিময়ে FAR (Floor Area Ratio) বাড়িয়ে দেবো", তাহলে বাজারেই সাশ্রয়ী ফ্ল্যাটের সরবরাহ বাড়বে। এটা inclusionary zoning, পৃথিবীর অনেক শহরে এটা কাজ করেছে।

৩. গৃহঋণে ভর্তুকি। নিম্ন-মধ্যবিত্তের জন্য গৃহঋণের সুদ ৫ থেকে ৬%-এ নামিয়ে আনা দরকার। সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের পার্থক্যটা ভর্তুকি হিসেবে দিতে পারে। ভারতের PMAY Credit-Linked Subsidy Scheme ঠিক এটাই করে। ৬.৫% সুদে ঋণ দেয় যেখানে বাজারে সুদ ৮ থেকে ৯%।

৪. বিকেন্দ্রীকরণ। সব কিছু ঢাকায় কেন্দ্রীভূত থাকলে ঢাকার আবাসন সংকট কোনোদিন সমাধান হবে না। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেটে কর্মসংস্থান তৈরি হলে ঢাকায় চাপ কমবে। IT পার্ক, সরকারি অফিসের শাখা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, এগুলো ঢাকার বাইরে গেলে মানুষও যাবে।

৫. ভাড়া নিয়ন্ত্রণ। ঢাকায় বাড়িভাড়া সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত। বাসাওয়ালা যখন খুশি যত খুশি ভাড়া বাড়াতে পারে। একটা ন্যায্য ভাড়া আইন দরকার, যেখানে বার্ষিক ভাড়া বৃদ্ধির সীমা থাকবে, ভাড়াটিয়ার অধিকার সংরক্ষিত থাকবে।


আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।

শাহেদ আজ রাতেও ভাড়া বাড়ির ছোট রুমে বসে হিসাব করবে। পরের মাসে বাসাওয়ালা ভাড়া ২,০০০ টাকা বাড়াবে বলেছে। কোথায় যাবে? আরেকটা বাড়ি খুঁজবে, আরেকটু দূরে, আরেকটু ছোট, আরেকটু অন্ধকার। বাচ্চাদের স্কুল বদলাতে হবে, স্ত্রীর চেনা পাড়া ছেড়ে যেতে হবে। এভাবে শাহেদ গত ৮ বছরে ৫ বার বাড়ি বদলেছে। প্রতিবার আরো দূরে, আরো ছোট।

শাহেদের বাবা গ্রামে থাকে। বাবার নিজের বাড়ি আছে, টিনের ছাদ, মাটির উঠোন, পুকুরপাড়ে আমগাছ। বাবা বলে, "ঢাকায় থাকিস কেন? এসো গ্রামে।" কিন্তু শাহেদ জানে গ্রামে চাকরি নেই, হাসপাতাল নেই, বাচ্চাদের ভালো স্কুল নেই। ঢাকা ছাড়া উপায় নেই। আবার ঢাকায় থাকারও উপায় নেই।

এটাই ঢাকার আবাসন সংকটের সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিক। ঢাকায় ফ্ল্যাটের দাম শুধু একটা সংখ্যা না। এটা একটা জীবনের দাম। একটা পরিবারের স্থিতিশীলতার দাম। একটা বাচ্চার নিরাপদ ছাদের দাম। যখন সেই দাম মানুষের সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়, তখন মানুষ ভেঙে পড়ে না, মানুষ ছোট হয়ে যায়। ছোট ঘরে, ছোট স্বপ্নে, ছোট জীবনে।

ঢাকায় একটা ফ্ল্যাটের দাম কত জীবন? শাহেদকে জিজ্ঞেস করুন। সে জানে।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50