Back to publications
Narrative 2026-03-06

আপনার সন্তানের ডিগ্রি কি বেকারত্বের সার্টিফিকেট?

শিক্ষা, দক্ষতা, আর চাকরির বাজারের সংযোগহীনতা

আপনার সন্তানের ডিগ্রি কি বেকারত্বের সার্টিফিকেট?

পর্ব ১: মাস্টার্স ডিগ্রি, মাসিক আয় ৫,০০০ টাকা

রহিম সাহেবের একটাই ছেলে। নাম তানভীর। বগুড়ার একটা গ্রাম থেকে এসেছে। রহিম সাহেব সারাজীবন চাষবাস করেছে। জমির ফসল, গরুর দুধ, মুরগির ডিম বেচে টাকা জমিয়েছে। একটাই স্বপ্ন ছিল: ছেলে পড়াশোনা করবে, বড় চাকরি করবে, পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবে।

তানভীর পড়াশোনায় খারাপ ছিল না। স্কুলে ফার্স্ট হতো। কলেজে ভালো রেজাল্ট করলো। তারপর ঢাকার একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। বিবিএ, চার বছর। মোট খরচ ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। টিউশন ফি, বই, ঢাকায় থাকা-খাওয়া। রহিম সাহেব জমির একটা অংশ বিক্রি করলো। বাকি টাকা আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার নিলো।

প্রাথমিকে ৯৮% ভর্তি হয়, কিন্তু পঞ্চম শ্রেণি শেষে মাত্র ৩৫% শিশু বাংলা আর গণিতে ন্যূনতম দক্ষতা দেখাতে পারে।
৫,০০০ টাকা
মাস্টার্স ডিগ্রি, মাসিক আয় ৫,০০০ টাকা
২.৩%
যত পড়াশোনা, তত বেকার
১.৯%
টাকা কোথায়, শিক্ষক কোথায়

তানভীর গ্র্যাজুয়েশন শেষ করলো ২০২৩ সালে। এরপর মাস্টার্স। মোট ছয় বছর পড়াশোনা। সার্টিফিকেটে লেখা MBA. বাবা গর্বে বুক ফুলিয়ে সবাইকে বললো, "আমার ছেলে ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করেছে।"

এরপর দুই বছর কেটে গেছে। তানভীর এখনো চাকরি পায়নি।

প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে bdjobs.com খোলে। "ফ্রেশার" লিখে সার্চ দেয়। যা পায় তাতে লেখা: "অভিজ্ঞতা ২-৩ বছর প্রয়োজন।" ফ্রেশারের চাকরিতে অভিজ্ঞতা লাগবে। এই হলো বাংলাদেশের চাকরির বাজার।

সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়েছে ১৪টা। রেজাল্ট হয়নি বেশিরভাগের। যেগুলো হয়েছে, সেগুলোতে হয়নি। একটা পদের বিপরীতে আবেদন ৩ লাখ। পাশ করেছে ৫,০০০ জন। নিয়োগ হবে ১৫০ জন। এই প্রতিযোগিতায় তানভীর থাকতে পারেনি।

এখন সে পাড়ার বাচ্চাদের টিউশনি পড়ায়। মাসে আয় ৫,০০০ টাকা। রহিম সাহেবের বিক্রি করা জমির টাকা ফিরে আসেনি। ধার শোধ হয়নি। আর তানভীরের MBA সার্টিফিকেট আলমারিতে পড়ে আছে।

তানভীরের গল্প একটা ব্যতিক্রম মনে হতে পারে। কিন্তু সংখ্যাগুলো দেখলে বুঝবেন, এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।


পর্ব ২: সংখ্যায় সাফল্য, বাস্তবে ব্যর্থতা

বাংলাদেশের শিক্ষাখাতের একটা গল্প আছে যেটা সরকার সবসময় বলে: ভর্তির হার বেড়েছে। আর এটা মিথ্যা না। এই চার্টটা দেখুন:

২০০০ সালে প্রাথমিকে ভর্তি ছিল ৯০%। এখন ৯৮%। মাধ্যমিকে ৪৫% থেকে বেড়ে ৮০%। উচ্চশিক্ষায় ৪% থেকে ২৫%। এই সংখ্যাগুলো সত্যিই চমকপ্রদ। মেয়েদের ভর্তিতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে। প্রাথমিক শিক্ষা প্রায় সর্বজনীন হয়ে গেছে। এটা একটা বিশাল অর্জন।

কিন্তু ভর্তি করানো আর শেখানো দুটো আলাদা জিনিস।

এই চার্টটা দেখুন। নীল বার: ভর্তি হার। লাল বার: ন্যূনতম দক্ষতা অর্জনের হার। প্রাথমিকে ৯৮% ভর্তি হয়, কিন্তু পঞ্চম শ্রেণি শেষে মাত্র ৩৫% শিশু বাংলা আর গণিতে ন্যূনতম দক্ষতা দেখাতে পারে। মাধ্যমিকে? ২৫%। উচ্চমাধ্যমিকে? ১৮%।

মানে আমরা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তারা কিছু শিখছে না। তারা ক্লাসে বসে, পরীক্ষা দেয়, পাশ করে, কিন্তু বাস্তব দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক এটাকে বলে "learning poverty", শিক্ষা দারিদ্র্য। বাংলাদেশে ১০ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৫৮% একটা সাধারণ গল্প পড়ে বুঝতে পারে না।

৫৮ শতাংশ।

এই শিশুরাই বড় হয়ে কলেজে যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, ডিগ্রি নিচ্ছে। কিন্তু যে ভিত্তি তৈরি হওয়ার কথা ছিল প্রাথমিকে, সেটাই হয়নি। বাকিটা বালির উপর দালান তোলার মতো।

আর এই দুর্বল ভিত্তির উপর দালান তুলতে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামি।

২০০০ সালে বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ২০টার মতো। ২০২৫ সালে? ১১২টা। পঁচিশ বছরে পাঁচ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি। প্রতি বছর গড়ে ৩-৪টা নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পাচ্ছে।

এটা কি খারাপ? শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো তো ভালো কথা। সমস্যা হলো মানে। এই ১১২টা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতগুলোতে গবেষণা হয়? কতগুলোতে যোগ্য শিক্ষক আছে? কতগুলোতে ল্যাব আছে? কতগুলোর নিজস্ব ক্যাম্পাস আছে? UGC-র হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩০% বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই। তারা ভাড়া বাড়িতে চলে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক ৮-১০টা কোর্স পড়ান। গবেষণার বরাদ্দ শূন্যের কাছাকাছি।

এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত সার্টিফিকেট বিক্রি করছে। পড়াশোনা না, শুধু কাগজ। আর সেই কাগজ নিয়ে তানভীরের মতো লাখ লাখ তরুণ চাকরির বাজারে ঢুকছে।


পর্ব ৩: যত পড়াশোনা, তত বেকার

বাংলাদেশে একটা অদ্ভুত প্যারাডক্স আছে। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে শিক্ষিত মানুষের বেকারত্ব কম। বাংলাদেশে উল্টো। এই চার্টটা দেখুন:

কোনো শিক্ষা নেই, বেকারত্ব ২.৩%। প্রাথমিক শিক্ষা, ৩.১%। মাধ্যমিক, ৫.৮%। উচ্চমাধ্যমিক, ১১.২%। স্নাতক, ১৬.৪%। স্নাতকোত্তর, ১২.৮%।

ভালো করে দেখুন। স্নাতক ডিগ্রিধারীদের বেকারত্বের হার যাদের কোনো শিক্ষা নেই তাদের চেয়ে সাত গুণ বেশি।

এটা কীভাবে সম্ভব? কারণ যাদের শিক্ষা নেই তারা যেকোনো কাজ করতে রাজি। রিকশা চালানো, দিনমজুরি, কৃষিকাজ। তারা "বেকার" থাকার সুযোগ নেই, তাদের খেতে হবে। কিন্তু একজন MBA পাশ করা তানভীর রিকশা চালাবে না। সে "ভালো চাকরি" খুঁজছে। আর "ভালো চাকরি" নেই।

কেন নেই? কারণ চাকরির বাজার যা চায়, বিশ্ববিদ্যালয় তা শেখায় না।

নিয়োগকর্তারা কী চান? ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা, ৮৮% নিয়োগকর্তা এটা চান। গ্র্যাজুয়েটদের কতজন পারে? ৩২%। প্রযুক্তি দক্ষতা, ৮২% চান, ২৮% পারে। সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, ৭৮% চান, ২২% পারে। সৃজনশীল চিন্তা, ৭০% চান, ১৮% পারে।

ব্যবধানটা বিশাল। বিশ্ববিদ্যালয়ে যা পড়ানো হচ্ছে আর বাজারে যা দরকার, এই দুইয়ের মধ্যে সংযোগ নেই। শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করছে, পরীক্ষা দিচ্ছে, পাশ করছে। কিন্তু একটা ইমেইল ইংরেজিতে লিখতে পারছে না। একটা এক্সেল শিট বানাতে পারছে না। একটা সমস্যা দেখে নিজে থেকে সমাধান ভাবতে পারছে না।

আর এই সমস্যাটা আরো গভীর হচ্ছে কারণ বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ভুল বিষয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশে ৬২% ডিগ্রি কলা ও মানবিক বিভাগে। STEM (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গণিত) মাত্র ১৮%। তুলনা করুন ভিয়েতনামের সাথে: সেখানে STEM ৪৫%। দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪২%। এমনকি ভারতেও ৩২%।

এটা বলছি না যে কলা বা মানবিক অপ্রয়োজনীয়। একটা সমাজের দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য, সবই দরকার। কিন্তু যখন ৬২% গ্র্যাজুয়েট একই ধরনের ডিগ্রি নিয়ে বের হয়, আর বাজারে সেই ডিগ্রির চাহিদা সীমিত, তখন বেকারত্ব অনিবার্য।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতে মিড-লেভেল ইঞ্জিনিয়ার দরকার, কিন্তু পাওয়া যায় না। আইটি খাত বছরে ৫০,০০০ নতুন কর্মী চায়, কিন্তু যোগ্য ক্যান্ডিডেট পায় ১০,০০০। ফার্মা শিল্পে কেমিস্ট দরকার, নেই। এদিকে বাংলা সাহিত্য, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানে লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে যাদের জন্য চাকরি নেই।


পর্ব ৪: টাকা কোথায়, শিক্ষক কোথায়?

এতক্ষণ আমরা শিক্ষার আউটপুট দেখলাম। এবার ইনপুট দেখি। বাংলাদেশ শিক্ষায় কত খরচ করে?

বাংলাদেশ জিডিপির মাত্র ১.৯% শিক্ষায় ব্যয় করে। এটা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। পাকিস্তানও ২.৫% খরচ করে। ভারত ৪.৫%। ভিয়েতনাম ৪.২%। বিশ্ব গড় ৪.৫%।

মানে বাংলাদেশ বিশ্ব গড়ের অর্ধেকেরও কম খরচ করছে শিক্ষায়। আর এই কম খরচের ফলাফল সরাসরি দেখা যায় শিক্ষকের সংখ্যায়।

বাংলাদেশে প্রাথমিকে একজন শিক্ষকের বিপরীতে ৩৮ জন শিক্ষার্থী। মাধ্যমিকে ৪২ জন। ভিয়েতনামে? প্রাথমিকে ২০, মাধ্যমিকে ১৮। মালয়েশিয়ায়? ১২ আর ১৩। বিশ্ব গড়? ২৩ আর ১৭।

একটা ক্লাসে ৪২ জন শিক্ষার্থী থাকলে শিক্ষক কী করবেন? ব্ল্যাকবোর্ডে লিখবেন, শিক্ষার্থী কপি করবে। পরীক্ষায় সেটাই লিখবে। মুখস্থ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ব্যক্তিগত মনোযোগ অসম্ভব। দুর্বল শিক্ষার্থী আরো পিছিয়ে পড়ে। শক্তিশালীরা নিজের চেষ্টায় এগিয়ে যায়, কিন্তু সেটা স্কুলের কৃতিত্ব না।

আর শিক্ষকদের মানও প্রশ্নবিদ্ধ। প্রাথমিক স্কুলে অনেক শিক্ষকের নিজেরই বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান দুর্বল। একটা গবেষণায় দেখা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণির গণিত শিক্ষকদের ২৩% নিজেরাই ষষ্ঠ শ্রেণির গণিত পরীক্ষায় পাশ নম্বর পান না। যে শিক্ষক নিজেই বিষয়টা জানেন না, তিনি কী শেখাবেন?

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বেতন মাসে ১২,০০০-১৮,০০০ টাকা দিয়ে শুরু হয়। এই বেতনে মেধাবী মানুষ শিক্ষকতায় আসবে কেন? ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার হওয়ার সুযোগ থাকতে কে প্রাইমারি স্কুলে পড়াবে? ফলে শিক্ষকতা পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে "আর কিছু না পেলে" শেষ অবলম্বন।

সিঙ্গাপুর, ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, এই দেশগুলো শিক্ষায় সেরা কেন? কারণ তারা শিক্ষকদের সম্মান দেয়, ভালো বেতন দেয়, কঠোর বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ করে। সিঙ্গাপুরে প্রতি ১০ জন আবেদনকারীর মধ্যে ১ জন শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পায়। বাংলাদেশে? রাজনৈতিক সুপারিশ, ঘুষ, নিয়োগ বাণিজ্য।


পর্ব ৫: মেধা পাচার আর ভিয়েতনামের শিক্ষা

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যে অল্প কিছু মেধাবী তৈরি করে, তারা দেশে থাকে না।

প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার বাংলাদেশি দক্ষ গ্র্যাজুয়েট যুক্তরাষ্ট্রে। ৯৫ হাজার যুক্তরাজ্যে। ৭২ হাজার অস্ট্রেলিয়ায়। ৬৫ হাজার কানাডায়। এরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক, আইটি পেশাদার। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে সামান্য বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার সবচেয়ে ভালো ফসল কেটে নিচ্ছে অন্য দেশ।

এটাকে তারা "brain drain" বলে না, "brain gain" বলে। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া সচেতনভাবে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে মেধাবীদের টেনে নিচ্ছে। তাদের পয়েন্ট-বেসড ইমিগ্রেশন সিস্টেম ঠিক সেটাই করে: সবচেয়ে ভালো মানুষগুলোকে বেছে নেয়।

আর বাংলাদেশ? তাদের ধরে রাখার কোনো চেষ্টা নেই। গবেষণায় বরাদ্দ জিডিপির ০.০৩%। বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাব নেই। ফান্ডিং নেই। একটা পিএইচডি করতে গেলে বিদেশে যেতে হয়। গেলে আর ফিরে আসে না। কেন আসবে? দেশে কী আছে তার জন্য?

এবার ভিয়েতনামের দিকে তাকাই। ভিয়েতনাম ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের চেয়ে গরিব ছিল। মাথাপিছু আয় কম ছিল। কিন্তু আজ?

Learning-Adjusted Years of Schooling, এটা বিশ্বব্যাংকের শিক্ষার মান পরিমাপের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক। একটা শিশু কত বছর স্কুলে যায় আর আসলে কতটুকু শেখে, দুটো মিলিয়ে হিসাব। বাংলাদেশ: ৬.৫ বছর। ভিয়েতনাম: ১০.৭ বছর।

ভিয়েতনাম কী করলো?

প্রথমত, শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ালো। জিডিপির ৪.২% শিক্ষায় ব্যয় করে, বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও বেশি। দ্বিতীয়ত, STEM-এ ফোকাস করলো। ভিয়েতনামে ৪৫% গ্র্যাজুয়েট STEM থেকে আসে। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ আর মূল্যায়নে কঠোর ব্যবস্থা আনলো। চতুর্থত, শিল্পের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি সংযোগ তৈরি করলো। Samsung, Intel, LG, সব ভিয়েতনামে কারখানা করেছে। কেন? কারণ সেখানে প্রশিক্ষিত শ্রমিক পাওয়া যায়।

ফলাফল? ভিয়েতনামের ইলেকট্রনিক্স রপ্তানি এখন বাংলাদেশের মোট রপ্তানির চেয়ে বেশি। Samsung-এর বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোনের ৫০% ভিয়েতনামে তৈরি হয়। বাংলাদেশ এখনো টি-শার্ট সেলাই করছে।

বাংলাদেশকে Samsung আনতে হবে এমন না। কিন্তু যেটা করতেই হবে: শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। শুধু ভর্তির হার বাড়ালে হবে না, শেখার হার বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের যোগ্যতা আর বেতন দুটোই বাড়াতে হবে। STEM শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে শিল্পের সংযোগ তৈরি করতে হবে।

পাঁচটা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ:

এক. শিক্ষা বাজেট জিডিপির ১.৯% থেকে ৩.৫%-এ নিয়ে যাওয়া। পাঁচ বছরে। এটা মাত্র ৪০,০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত। বাংলাদেশ প্রতি বছর ৩০,০০০+ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয় বিদ্যুৎ আর জ্বালানিতে। শিক্ষায় সেই অগ্রাধিকার দেওয়া যায়।

দুই. শিক্ষক নিয়োগে সংস্কার। রাজনৈতিক সুপারিশ বন্ধ। যোগ্যতাভিত্তিক বাছাই। শিক্ষকদের বেতন দ্বিগুণ করা। সিঙ্গাপুর মডেল: সেরা ১০% স্নাতকদের শিক্ষকতায় আনা।

তিন. STEM বৃত্তি চালু করা। মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশলে পড়তে উৎসাহিত করতে সরকারি বৃত্তি। ভিয়েতনাম মডেল: প্রতি ১০০ সরকারি বৃত্তির ৬০টা STEM-এ।

চার. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কঠোর মানদণ্ড। যাদের ক্যাম্পাস নেই, পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, গবেষণা নেই, তাদের লাইসেন্স বাতিল। ১১২টা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে ৫০টা মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় অনেক ভালো।

পাঁচ. শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগ। প্রতিটা বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ। কারিকুলাম তৈরিতে শিল্প প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ। গার্মেন্টস, আইটি, ফার্মা, ব্যাংকিং, প্রতিটা খাতের সাথে সরাসরি সংযোগ।


এবার ফিরে যাই তানভীরের কাছে।

তানভীর আজকেও সকালে উঠে bdjobs.com খুলবে। আজকেও "ফ্রেশার" লিখে সার্চ দেবে। আজকেও হতাশ হবে। বিকালে পাড়ার তিনটা বাচ্চাকে পড়াবে। মাস শেষে ৫,০০০ টাকা পাবে। রহিম সাহেব চুপচাপ বসে থাকবে, ভাববে কোথায় ভুল হলো।

ভুলটা তানভীরের না। ভুলটা রহিম সাহেবেরও না। ভুলটা একটা ব্যবস্থার, যেটা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠায় কিন্তু শেখায় না। যেটা বিশ্ববিদ্যালয় খোলে কিন্তু মান রাখে না। যেটা সার্টিফিকেট দেয় কিন্তু দক্ষতা দেয় না। যেটা জিডিপির ২% শিক্ষায় খরচ করে আর তারপর আশ্চর্য হয় কেন গ্র্যাজুয়েটরা বেকার।

তানভীরের MBA সার্টিফিকেটটা আলমারিতে পড়ে আছে। সেটা শুধু একটা কাগজ না। সেটা একটা পরিবারের স্বপ্ন ছিল। একটা বাবার জমি বিক্রির টাকা ছিল। ছয় বছরের পরিশ্রম ছিল।

সেই স্বপ্নের দাম ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব এই দেশের। শুধু তানভীরের কাছে না, লাখ লাখ তানভীরের কাছে, যাদের ডিগ্রি আজ বেকারত্বের সার্টিফিকেট হয়ে গেছে।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50