Back to publications
Narrative 2026-03-06

রান্নার গ্যাস কেন পাচ্ছেন না?

গ্যাস রিজার্ভ শেষ, এলএনজি মহার্ঘ, এলপিজি বিকল্প

রান্নার গ্যাস কেন পাচ্ছেন না?

পর্ব ১: নীল শিখা

ঢাকার মিরপুরে ফাতেমা বেগমের রান্নাঘর। সকাল সাতটা। স্বামী অফিসে যাবে নয়টায়, দুই ছেলেমেয়ে স্কুলে যাবে আটটায়। ফাতেমা চুলার নব ঘোরালেন। গ্যাস আসলো, কিন্তু শিখা এত ছোট যে পানি গরম হতে পনেরো মিনিট লাগলো। ভাত চড়ালেন, আধাসেদ্ধ হতে হতে গ্যাস আরো কমে গেলো। শেষ পর্যন্ত রান্না শেষ করতে দেড় ঘণ্টা লাগলো, যেটা আগে চল্লিশ মিনিটে হতো।

এটা ফাতেমার একার গল্প না। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, সব শহরে একই অবস্থা। গ্যাসের চাপ কম। রান্না হয় না। সকালে তাড়াহুড়ো, রাতে অপেক্ষা। কেউ কেউ রাত দুইটায় উঠে রান্না করেন, কারণ তখন চাপ একটু বেশি থাকে। কেউ পোর্টেবল এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন, মাসে বাড়তি দুই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ।

পথ ৩: গ্যাসের দাম বাস্তবসম্মত করা এটা সবচেয়ে কঠিন কিন্তু সবচেয়ে জরুরি।
১০ কোটি পরিবার
ফাতেমার রান্নাঘর, ২০৩০
প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার
মহার্ঘ বিকল্প
৩,০০০-৫,০০০ টাকা
তিন পথ

আর ঢাকায় নতুন বাড়ি বানাচ্ছেন? গ্যাসের সংযোগ পাবেন না। ২০১৭ সাল থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে নতুন গৃহস্থালি গ্যাস সংযোগ প্রায় বন্ধ। তিতাস গ্যাসের ওয়েটিং লিস্টে লাখ লাখ নাম। কবে পাবেন? কেউ জানে না।

কিন্তু কেন? বাংলাদেশ তো গ্যাসের দেশ ছিল। ১৯৫৫ সালে সিলেটে হরিপুরে গ্যাস আবিষ্কার হয়েছিল। এরপর একের পর এক গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া গেছে। বিবিয়ানা, তিতাস, বাখরাবাদ, রশিদপুর, কৈলাসটিলা। বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি ছিল এই সস্তা গ্যাস। সার কারখানা চলেছে গ্যাসে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র চলেছে গ্যাসে। শিল্প কারখানা চলেছে গ্যাসে। আর কোটি কোটি পরিবারের রান্না হয়েছে গ্যাসে।

তাহলে সেই গ্যাস কোথায় গেলো?


পর্ব ২: তলানি

উত্তরটা সোজা: গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে। এই চার্টটা দেখুন:

বাংলাদেশের প্রমাণিত গ্যাসের মজুদ ২০০৫ সালে ছিল প্রায় ১৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (TCF)। ২০২৫ সালে সেটা নেমে এসেছে আনুমানিক ৯.৭ TCF। প্রতি বছর প্রায় ১ TCF গ্যাস তোলা হচ্ছে। নতুন আবিষ্কার? গত পনেরো বছরে কোনো বড় গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া যায়নি। পেট্রোবাংলার নিজস্ব অনুসন্ধান সক্ষমতা সীমিত। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো আগ্রহ হারিয়েছে, কারণ সরকার নির্ধারিত গ্যাসের দাম বাজারমূল্যের অনেক নিচে। কেন কোনো কোম্পানি বিনিয়োগ করবে যদি মুনাফার সুযোগ না থাকে?

বর্তমান হারে উত্তোলন চলতে থাকলে ২০৩৫ সালের আগেই গ্যাস কার্যত শেষ হয়ে যাবে। দশ বছরেরও কম সময়।

আর উত্তোলনের প্রবণতা দেখুন:

উৎপাদন ২০১৮-১৯ সালে সর্বোচ্চ ছিল, প্রায় ২,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট দিনে (MMCFD)। তারপর থেকে ক্রমাগত কমছে। ২০২৫ সালে দৈনিক উৎপাদন প্রায় ২,২০০ MMCFD। পুরনো কূপগুলো থেকে আউটপুট কমছে। নতুন কূপ খনন হচ্ছে না পর্যাপ্ত পরিমাণে। বিবিয়ানা ক্ষেত্র, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র, সেখানেও উৎপাদন কমতে শুরু করেছে।

এদিকে চাহিদা? বাড়ছে।

ক্রমবর্ধমান ফাঁক। চাহিদা প্রতিদিন ৩,৫০০-৪,০০০ MMCFD, সরবরাহ ২,৫০০-২,৭০০ MMCFD (দেশীয় উৎপাদন আর আমদানি মিলিয়ে)। প্রতিদিন ১,০০০ MMCFD-এর বেশি ঘাটতি। এই ঘাটতি মানে ফাতেমা বেগমের চুলায় চাপ কম। এই ঘাটতি মানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরো ক্ষমতায় চলে না। এই ঘাটতি মানে সার কারখানা বন্ধ থাকে, কৃষক সার পায় না।

কিন্তু এই গ্যাস যেটুকু আছে, সেটা কোথায় যাচ্ছে? সবাই কি সমান ভাগ পাচ্ছে?

বিদ্যুৎ খাত একাই নিচ্ছে ৪০% এর বেশি গ্যাস। তারপর শিল্প ১৮%, গৃহস্থালি ১৪%, সার ১২%, ক্যাপটিভ পাওয়ার (কারখানার নিজস্ব জেনারেটর) ৯%, বাণিজ্যিক ৪%, অন্যান্য ৩%। মানে পরিবারগুলো মোট গ্যাসের মাত্র ১৪% পায়। কিন্তু সেই ১৪% ছাড়া কোটি পরিবারের রান্না বন্ধ।

সরকার কী করছে? দুটো কাজ করছে। এক, এলএনজি আমদানি। দুই, নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ। প্রথমটা ব্যয়বহুল, দ্বিতীয়টা কষ্টকর।


পর্ব ৩: মহার্ঘ বিকল্প

এলএনজি। Liquefied Natural Gas। প্রাকৃতিক গ্যাসকে মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঠান্ডা করে তরল বানানো হয়, জাহাজে করে আনা হয়, তারপর আবার গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনে ছাড়া হয়। বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি করছে। মহেশখালীতে দুটো ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল আছে।

কিন্তু এলএনজি সস্তা না। মোটেও সস্তা না।

২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি খরচ ছিল প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে সেটা প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম আকাশ ছুঁয়েছিল, বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে কেনা কমাতে হয়েছিল। ডলার সংকটে কয়েকটা কার্গো বাতিল করতে হয়েছিল। ফলে গ্যাসের চাপ আরো কমে গিয়েছিল, লোডশেডিং বেড়ে গিয়েছিল।

এলএনজি আমদানির মূল সমস্যা তিনটা। প্রথম, ডলারে দাম দিতে হয়। বাংলাদেশের ফরেন রিজার্ভ এখন প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার। তার ৬-৭% শুধু এলএনজি আমদানিতে যাচ্ছে। রিজার্ভ কমলে এলএনজি কেনা কঠিন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়, বিশ্ববাজারে দাম ওঠানামা করে। কাতার, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, এদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর বাংলাদেশের রান্নাঘরের গ্যাস নির্ভর করে, এটা কি নিরাপদ? তৃতীয়, অবকাঠামো সীমিত। মাত্র দুটো টার্মিনাল দিয়ে যতটুকু আনা যায়, সেটা চাহিদার ভগ্নাংশ।

আর যেটুকু গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, দেশীয় হোক বা আমদানি, সেটার দাম কত? ফাতেমা বেগম গ্যাসের জন্য কত দেন আর এলপিজি কিনলে কত দিতে হবে?

পাইপলাইন গ্যাসে রান্নার জন্য মাসিক বিল গড়ে ১,০০০-১,২০০ টাকা (মিটারযুক্ত সংযোগে)। একটা ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার ১,৩০০-১,৪৫০ টাকা, একটা পরিবারের মাসে দেড় থেকে দুটো সিলিন্ডার লাগে। মানে এলপিজিতে মাসিক খরচ ২,০০০-২,৯০০ টাকা। পাইপলাইন গ্যাসের দ্বিগুণেরও বেশি। যে পরিবারের মাসিক আয় ২০,০০০-২৫,০০০ টাকা, তার কাছে এই পার্থক্য বিশাল।

তাহলে মানুষ কী করছে? গ্যাস পাচ্ছে না, এলপিজি ব্যয়বহুল, বিকল্প কী?

বাংলাদেশের মোট পরিবারের মধ্যে এখনো ৪৩% পরিবার কাঠ, খড়, গোবর, অর্থাৎ প্রচলিত জ্বালানিতে রান্না করে। পাইপলাইন গ্যাসের সংযোগ আছে মাত্র ২২% পরিবারের। এলপিজি ব্যবহার করে প্রায় ২৮%। বিদ্যুতে রান্না করে ৩%। বাকি ৪% অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহার করে। শহরে গ্যাস আর এলপিজি প্রধান। গ্রামে এখনো কাঠের চুলা।

কিন্তু একটা আশার কথা আছে। এলপিজি বাজার দ্রুত বাড়ছে:

এলপিজি ব্যবহারকারী পরিবার ২০১৫ সালে ছিল ৫%। ২০২৫ সালে প্রায় ২৮%। দশ বছরে পাঁচ গুণের বেশি বেড়েছে। কেন? কারণ পাইপলাইন গ্যাসের সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে সংযোগ আছে সেখানে চাপ নেই। আর এলপিজি কোম্পানিগুলো আক্রমণাত্মক বিপণন করছে। ডেলিভারি সহজ করেছে। ছোট ৫ কেজি সিলিন্ডার এনেছে কম আয়ের পরিবারের জন্য।

কিন্তু এটা কি সমাধান? এলপিজিও আমদানি করতে হয়। প্রোপেন, বিউটেন, সব আসে বাইরে থেকে। ডলারে কিনতে হয়। দাম বিশ্ববাজারের উপর নির্ভর করে। মানে আমরা এক আমদানি নির্ভরতা থেকে আরেক আমদানি নির্ভরতায় যাচ্ছি।


পর্ব ৪: সংযোগ বিচ্ছিন্ন

গ্যাসের সংকট শুধু রান্নাঘরের সমস্যা না। এটা অর্থনীতির সমস্যা, নিরাপত্তার সমস্যা, জনস্বাস্থ্যের সমস্যা।

সার কারখানাগুলো গ্যাসের অভাবে পূর্ণ ক্ষমতায় চলতে পারছে না। বাংলাদেশ ইউরিয়া সার আমদানি করছে, যেটা আগে নিজেই উৎপাদন করতো। সিরামিক শিল্প, কাচ শিল্প, টেক্সটাইল, সব গ্যাস-নির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত। কারখানার মালিকরা এলপিজিতে স্থানান্তর করছেন, খরচ বাড়ছে, পণ্যের দাম বাড়ছে, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।

নতুন গৃহস্থালি সংযোগ বন্ধের অবস্থা দেখুন:

২০১৫-১৬ সালে তিতাস গ্যাস প্রতি বছর ৫০,০০০ এর বেশি নতুন সংযোগ দিতো। ২০১৭ সালে সরকার ঢাকা ও আশপাশে নতুন সংযোগ কার্যত বন্ধ করে দিলো। ২০২৫ সালে নতুন সংযোগ প্রায় শূন্যের কাছে। পুরনো সংযোগে চাপ কম। নতুন সংযোগ বন্ধ। মানে গ্যাস পাওয়া এখন একটা বিশেষ সুবিধা, অধিকার না।

আর বাংলাদেশের একার সমস্যা না এটা। আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের দিকে তাকান:

মিয়ানমার একসময় গ্যাস রপ্তানি করতো থাইল্যান্ড আর চীনে। এখন নিজের দেশের চাহিদা মেটাতে পারছে না। রিজার্ভ দ্রুত কমছে। ভারতের নিজস্ব উৎপাদন চাহিদার মাত্র অর্ধেক মেটাতে পারে, বাকিটা এলএনজি আমদানি করতে হয়। পাকিস্তানে গ্যাস সংকট আরো ভয়াবহ, শীতকালে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি, কিন্তু পথটা একই।


পর্ব ৫: তিন পথ

বাংলাদেশের সামনে তিনটা পথ আছে। তিনটাই কঠিন, কিন্তু বেছে নিতেই হবে।

পথ ১: সমুদ্রে খোঁজা

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বিশাল। ২০১২ আর ২০১৪ সালে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা বাংলাদেশের। সেখানে গ্যাস থাকার সম্ভাবনা আছে। USGS-এর ২০১০ সালের একটা প্রাক্কলন অনুযায়ী বঙ্গোপসাগর অববাহিকায় ১১-২১ TCF অনাবিষ্কৃত গ্যাস থাকতে পারে।

কিন্তু অনুসন্ধান হচ্ছে না। গত দশ বছরে গভীর সমুদ্রে কোনো কূপ খননের কাজ হয়নি। আন্তর্জাতিক কোম্পানি আকৃষ্ট করতে হলে মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্র্যাক্ট (PSC) আকর্ষণীয় করতে হবে। গ্যাসের দাম বাজারমূল্যে নির্ধারণ করতে হবে। নিয়ন্ত্রক কাঠামো স্বচ্ছ করতে হবে। এগুলো রাজনৈতিকভাবে কঠিন সিদ্ধান্ত, কিন্তু নিতেই হবে।

পথ ২: রান্নায় বৈদ্যুতিকীকরণ

পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে ইন্ডাকশন কুকারের দিকে। ইউরোপে, চীনে, জাপানে বৈদ্যুতিক রান্না দ্রুত বাড়ছে। ইন্ডাকশন কুকার গ্যাস চুলার চেয়ে দ্বিগুণ দক্ষ, অর্থাৎ কম শক্তিতে বেশি তাপ দেয়। ঘরের বাতাসে দূষণ হয় না। বাংলাদেশে যদি বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্ভরযোগ্য হয় (সৌরশক্তি দিয়ে সেটা সম্ভব), তাহলে ইন্ডাকশন কুকার একটা বাস্তব বিকল্প।

কিন্তু সেজন্য দুটো শর্ত পূরণ করতে হবে। এক, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করতে হবে, লোডশেডিং থাকা অবস্থায় ইন্ডাকশন কুকার চলবে না। দুই, ইন্ডাকশন কুকারের দাম কমাতে হবে, আমদানি শুল্ক তুলে দিতে হবে, ভর্তুকি দিতে হবে। একটা ভালো মানের ইন্ডাকশন কুকার এখন ৩,০০০-৫,০০০ টাকা। এটা ১,৫০০-২,০০০ টাকায় আনতে পারলে মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী হবে।

পথ ৩: গ্যাসের দাম বাস্তবসম্মত করা

এটা সবচেয়ে কঠিন কিন্তু সবচেয়ে জরুরি। বাংলাদেশে গ্যাসের দাম কৃত্রিমভাবে কম। সরকার নির্ধারিত দাম উৎপাদন খরচের চেয়ে কম, আমদানি খরচের চেয়ে অনেক কম। ফলে তিনটা সমস্যা হচ্ছে। এক, অপচয় বাড়ছে। গ্যাস সস্তা বলে মানুষ চুলা জ্বালিয়ে রাখে, ব্যবহার না করলেও। দুই, অনুসন্ধানে বিনিয়োগ হচ্ছে না, কারণ কোম্পানি লাভ পায় না। তিন, বিকল্প জ্বালানিতে (সৌরশক্তি, ইন্ডাকশন) স্থানান্তর হচ্ছে না, কারণ গ্যাস "সস্তা" দেখায়।

গ্যাসের দাম ধাপে ধাপে বাড়ালে তিনটা ফল পাওয়া যাবে। অপচয় কমবে, অনুসন্ধানে বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, আর বিকল্প জ্বালানি প্রতিযোগিতামূলক হবে। হ্যাঁ, গরিব পরিবারের কষ্ট বাড়বে। তাই দরিদ্র পরিবারের জন্য সরাসরি নগদ ভর্তুকি (targeted subsidy) দিতে হবে। গ্যাসের দাম কম রেখে সবাইকে ভর্তুকি দেওয়ার চেয়ে, দাম বাস্তবসম্মত রেখে শুধু দরিদ্রদের নগদ সহায়তা দেওয়া অনেক বেশি দক্ষ।


পর্ব ৬: ফাতেমার রান্নাঘর, ২০৩০

ধরুন, ২০৩০ সাল। পাঁচ বছর পরে। ফাতেমা বেগম এখনো মিরপুরে আছেন। কিন্তু তার রান্নাঘরটা বদলে গেছে।

গ্যাসের সংযোগ আছে, কিন্তু উনি আর গ্যাসে রান্না করেন না। ছাদে একটা সোলার প্যানেল বসেছে, সরকারের ভর্তুকি প্রোগ্রামে। রান্নাঘরে ইন্ডাকশন কুকার। বিদ্যুৎ আসছে সোলার প্যানেল থেকে, বাকিটা গ্রিড থেকে। মাসিক রান্নার খরচ? আগে এলপিজিতে ২,৫০০ টাকা দিতেন। এখন বিদ্যুতে ৮০০-১,০০০ টাকা। কারণ সোলার প্যানেল থেকে দিনের বেলার বিদ্যুৎ প্রায় বিনামূল্যে।

রান্নাঘরে ধোঁয়া নেই। আগে গ্যাসের চুলায় রান্না করতে গিয়ে চোখ জ্বালা করতো, শ্বাসকষ্ট হতো। WHO বলছে, ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৭৮,০০০ মানুষ মারা যায়। ইন্ডাকশন কুকারে সেই দূষণ শূন্য।

এটা কি অবাস্তব কল্পনা? চীনে গত দশ বছরে গ্রামাঞ্চলে ইন্ডাকশন কুকার বিতরণ করা হয়েছে কোটি কোটি ইউনিট। ভারতের উজ্জ্বলা স্কিমে ১০ কোটি পরিবারকে এলপিজি সংযোগ দেওয়া হয়েছে, আর এখন ইন্ডাকশনে স্থানান্তরের কথা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া কেরোসিন থেকে এলপিজিতে স্থানান্তর করেছে সরকারি প্রোগ্রামে, মাত্র পাঁচ বছরে।

বাংলাদেশও পারে। কিন্তু সেজন্য আজ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

গ্যাসের মজুদ শেষ হচ্ছে। এটা পরিবর্তন করা সম্ভব না। যে গ্যাস নেই সেটা তৈরি করা যায় না। কিন্তু কীভাবে রান্না হবে, কীভাবে শিল্প চলবে, কীভাবে বিদ্যুৎ আসবে, সেটা বেছে নেওয়া যায়।

ফাতেমা বেগম প্রতিদিন সকালে চুলার নব ঘোরান আর আশা করেন গ্যাস আসবে। সেই আশা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা প্রতিদিন কমছে। তার হাতে আর কত বছর আছে? এই প্রশ্নের উত্তর চার্টগুলো দিয়ে দিচ্ছে। দশ বছর, হয়তো তার কম।

কিন্তু দশ বছরে অনেক কিছু করা যায়। যদি আমরা শুরু করি আজ।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50