Back to publications
Narrative 2026-03-06

জমি নিয়ে মামলা: আদালতে ৩০ লাখ মামলা

ভূমি বিরোধের অর্থনীতি, দীর্ঘসূত্রতা, আর ডিজিটাইজেশন

জমি নিয়ে মামলা: আদালতে ৩০ লাখ মামলা

পর্ব ১: রহিমের জমি

রহিম উদ্দিন কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার একজন কৃষক। বয়স ৫৮। বাবার কাছ থেকে পাওয়া দুই বিঘা জমি আছে, আর সেই জমি নিয়ে মামলা চলছে ১৭ বছর ধরে।

গল্পটা সোজা। রহিমের বাবা ১৯৯৫ সালে মারা যান। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে জমি ভাগ হয়। রহিম পেয়েছে দুই বিঘা, দলিল তার নামে। কিন্তু ২০০৮ সালে পাশের জমির মালিক দাবি করল যে এই দুই বিঘার একটা অংশ তার। সে একটা পুরনো দলিল দেখালো, যেটা রহিমের বাবার দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক। সেই দলিল আসল নাকি জাল, সেটা নিয়ে মামলা হলো। সহকারী জজ আদালতে। ২০০৮ সালে।

কিন্তু অন্য দেশেরা কি এই সমস্যার সমাধান করেছে? হ্যাঁ।
৩১ লাখ পরিবার
রহিমের জমি
১৫ লাখ পরিবার
তিনটি পথ
১০-১৫%
জাল দলিল আর ক্ষমতার খেলা

আজ ২০২৬ সাল। মামলা এখনো চলছে।

এই ১৭ বছরে রহিম কী হারিয়েছে? প্রতি মাসে আদালতে যেতে হয়, বাসভাড়া ৫০০ টাকা। উকিলের ফি, তারিখ প্রতি ৫০০-১,০০০ টাকা। ১৭ বছরে প্রায় ২০০ তারিখ পড়েছে। ধরুন গড়ে ১,০০০ টাকা তারিখ প্রতি, সেটাই ২ লাখ টাকা। বাসভাড়া আর খাওয়া মিলিয়ে আরো ১ লাখ। মোট প্রত্যক্ষ খরচ প্রায় ৩ লাখ টাকা।

কিন্তু আসল ক্ষতি এটা না। আসল ক্ষতি হলো রহিম সেই জমি দিয়ে কিছু করতে পারে না। ব্যাংকে জামানত দিয়ে ঋণ নিতে পারে না, কারণ মামলাধীন জমি ব্যাংক গ্রহণ করে না। জমি বিক্রি করতে পারে না। ইজারা দিতে ভয় পায়, কারণ প্রতিপক্ষ তাতে আপত্তি জানাবে। দুই বিঘা জমি, বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩০ লাখ টাকা, সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে আছে।

এবার জুম আউট করুন।

রহিম একা না। বাংলাদেশের আদালতে এই মুহূর্তে ভূমি সংক্রান্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৩১ লাখ। দেশের মোট বিচারাধীন মামলার ৬৫-৭০% ভূমি সংক্রান্ত। এটা শুধু একটা সংখ্যা না। এটা ৩১ লাখ পরিবারের গল্প। ৩১ লাখ রহিম।

এই চার্টটা দেখুন:

২০১০ সালে ভূমি মামলা ছিল প্রায় ২০ লাখ। ২০১৫ সালে ২৪ লাখ। ২০২০ সালে ২৮ লাখ। আর ২০২৫ সালে ৩১.৫ লাখ। প্রতি বছর নতুন মামলা যোগ হচ্ছে নিষ্পত্তির চেয়ে বেশি। সংখ্যাটা বাড়ছে। কমছে না, কমার কোনো লক্ষণও নেই।

কিন্তু শুধু সংখ্যা দেখলে আসল যন্ত্রণাটা বোঝা যায় না। আসল যন্ত্রণা হলো সময়। একটা ভূমি মামলা শেষ হতে কত সময় লাগে?


পর্ব ২: ১৫ বছরের মামলা

বাংলাদেশে একটা ভূমি মামলা গড়ে কত দিন চলে? উত্তরটা জানলে মাথা ঘুরবে।

সহকারী জজ আদালতে গড়ে ৫ বছরের বেশি লাগে। যুগ্ম জেলা জজ আদালতে আরো ৫ বছর। হাইকোর্টে আপিল করলে আরো ৪ বছর। আর সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গেলে মোট সময় দাঁড়ায় ১৫-২০ বছর। কোনো কোনো মামলা ৩০ বছরেও শেষ হয় না। বাদী মারা যান, তার উত্তরাধিকারীরা মামলা চালান। প্রতিপক্ষও মারা যান, তার ছেলেরা প্রতিপক্ষ হন। এক প্রজন্মের বিরোধ পরের প্রজন্মে গড়ায়।

কেন এত সময় লাগে?

প্রথম কারণ: বিচারকের সংখ্যা অত্যন্ত কম। বাংলাদেশে প্রতি লাখ জনসংখ্যায় বিচারক আছেন মাত্র ২ জন। ভারতে ২.৫। ইউরোপে ১৫-২০। আমেরিকায় ১০-১২। মানে বিচারকদের সংখ্যা জনসংখ্যার তুলনায় হাস্যকর রকম কম। একজন বিচারক প্রতিদিন ৩০-৪০টা মামলার তারিখ ধরেন। কোনো মামলায় ১০ মিনিটের বেশি সময় দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে "তারিখ" পড়ে, পরের তারিখ আসে, সেদিনও "তারিখ" পড়ে।

দ্বিতীয় কারণ: ইচ্ছাকৃত বিলম্ব। মামলার যে পক্ষ দখলে আছে, তার তাড়া নেই। সে চায় মামলা যতদিন সম্ভব চলুক। কারণ যতদিন মামলা চলবে, ততদিন সে দখলে থাকবে। তাই সে বারবার "স্থগিতাদেশ" আনে, সাক্ষী হাজির করতে সময় নেয়, নতুন আবেদন দায়ের করে। আইনজীবীরাও বিলম্বে উৎসাহী, কারণ তারিখ প্রতি ফি পান। মামলা যত বেশিদিন চলে, আইনজীবীর আয় তত বেশি।

তৃতীয় কারণ: জমির রেকর্ড বিশৃঙ্খল। বাংলাদেশের ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা ব্রিটিশ আমলের। জরিপ হয়েছে কয়েকবার: সিএস (১৯১০-২০), এসএ (১৯৫৬-৬২), আরএস (১৯৬০-৮০), সিটি জরিপ (শহরে)। প্রতিটা জরিপে আলাদা খতিয়ান, আলাদা দাগ নম্বর। একই জমির বিভিন্ন জরিপে ভিন্ন ভিন্ন মালিকানা দেখায়। রেকর্ড কাগজে, হাতে লেখা, অনেকগুলো নষ্ট বা অপঠনযোগ্য। তহশিল অফিসে গেলে রেকর্ড বের করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগে, আর ঘুষ ছাড়া কিছুই হয় না।

এই তিন কারণ মিলে বাংলাদেশের ভূমি বিচার ব্যবস্থা একটা অচলাবস্থায় আটকে গেছে। নতুন মামলা ঢুকছে, পুরনো মামলা বের হচ্ছে না। আর এই অচলাবস্থার মূল্য শুধু সময় আর টাকা না। মূল্য রক্তও।

প্রতি বছর ভূমি বিরোধের কারণে গড়ে ১৫০ জনের বেশি মানুষ খুন হয়। প্রায় ৯০০ জন হামলায় আহত হয়। আর হুমকি ও ভয়ভীতির শিকার হয় ২,৫০০ জনের বেশি। এগুলো শুধু রিপোর্ট করা ঘটনা। প্রকৃত সংখ্যা এর কয়েক গুণ বেশি হবে, কারণ গ্রামে অনেক ঘটনা পুলিশ পর্যন্ত যায় না।

জমি নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে খুন হয়। বাপে ছেলেতে মামলা হয়। পাড়ায় পাড়ায় দীর্ঘদিনের শত্রুতা তৈরি হয়। নির্বাচনে ভূমি বিরোধ মূল ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা ভূমি দখলকারীদের পক্ষ নেন, কারণ তাদের ভোট দরকার। ভূমি বিরোধ শুধু একটা আইনি সমস্যা না। এটা সামাজিক বিষ, যেটা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটা জাতিকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

কিন্তু এত মামলা হয় কেন? শুধুই কি জমির অভাব? না। সমস্যাটা আরো গভীর।


পর্ব ৩: জাল দলিল আর ক্ষমতার খেলা

বাংলাদেশে ভূমি বিরোধ এত বেশি হওয়ার পেছনে কয়েকটা কাঠামোগত কারণ আছে।

মোট মামলার ৩২% মালিকানা বিরোধ, ২২% সীমানা বিরোধ, ১৮% উত্তরাধিকার বিরোধ, ১২% জাল দলিল সংক্রান্ত, ১০% খাস জমি দখল, আর ৬% ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত।

এই সংখ্যাগুলোর পেছনে কী আছে?

জাল দলিল একটা মহামারি। বাংলাদেশে জমির দলিল জালিয়াতি এত সহজ যে এটা প্রায় একটা শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ দিয়ে ভুয়া দলিল রেজিস্ট্রি করা যায়। পুরনো দলিলে নাম পরিবর্তন করা যায়। একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা যায়। কারণ কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেস নেই যেখানে তাৎক্ষণিক যাচাই করা সম্ভব। একজন ক্রেতা জানতে পারে না যে তার কেনা জমি আগেই অন্য কাউকে বিক্রি করা হয়েছে, যতক্ষণ না সে রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দেখে।

আর জমি দখল? এটা বাংলাদেশের ক্ষমতা কাঠামোর সাথে সরাসরি জড়িত। রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় প্রভাবশালী, সরকারি কর্মকর্তা, তারা খাস জমি, নদীর চর, ওয়াকফ সম্পত্তি, এমনকি সাধারণ মানুষের জমিও দখল করে নেয়। পুলিশে রিপোর্ট করলে পুলিশ আসে না। মামলা করলে মামলা ১৫ বছর চলে। ততদিনে দখলদার সেই জমিতে বাড়ি বানিয়ে ফেলে, দোকান বসায়, রাস্তা কেটে ফেলে। আদালতের রায় যখন আসে, বাস্তবে তা কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

প্রতি বছর ভূমি দখল সংক্রান্ত অভিযোগ বাড়ছে। ২০১৫ সালে ছিল ১৮,৫০০। ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৩০,৮০০। বছরে প্রায় ৭% হারে বাড়ছে। আর এই অভিযোগের কত শতাংশে ব্যবস্থা নেওয়া হয়? অনুমান বলে ১০-১৫%।

এবার ভূমি মালিকানার বৈষম্যের ছবিটা দেখুন:

বাংলাদেশের ৫৬% পরিবার কার্যত ভূমিহীন, তাদের মালিকানায় আছে মোট জমির মাত্র ২%। অন্যদিকে ৩% বৃহৎ মালিক নিয়ন্ত্রণ করে ৪০% জমি। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা না। এটা বিরোধের মূল কারণ। যেখানে জমি কম, চাহিদা বেশি, আর দাম আকাশচুম্বী, সেখানে প্রতিটা ইঞ্চি জমি নিয়ে লড়াই হবে। আর যখন আদালত সেই লড়াই মেটাতে ১৫ বছর নেয়, তখন মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেয়।

আর জমি কেনাবেচা করাটাই কত কঠিন? এটা দেখুন:

বাংলাদেশে জমি রেজিস্ট্রেশনে খরচ পড়ে সম্পত্তি মূল্যের প্রায় ১১%। এটা আনুষ্ঠানিক খরচ। এর ওপর আছে অনানুষ্ঠানিক ঘুষ, আরো ৩-৫%। মোট খরচ ১৪-১৬%। থাইল্যান্ডে এই খরচ ৬.৩%, মালয়েশিয়ায় ৩.৫%। বাংলাদেশে জমি কেনা মানে সম্পত্তি মূল্যের প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ শুধু সরকার আর দালালদের পকেটে যাওয়া। এই উচ্চ খরচ অনেককে অনানুষ্ঠানিক লেনদেনে ঠেলে দেয়, যেখানে কোনো আইনি সুরক্ষা নেই, আর পরে বিরোধ হলে আদালতে যেতে হয়।

এই পুরো ব্যবস্থার অর্থনৈতিক মূল্য কত? এটা কেউ সঠিকভাবে হিসাব করেনি। কিন্তু একটা অনুমান করা যাক।


পর্ব ৪: ২২ বিলিয়ন ডলারের ক্ষত

ভূমি বিরোধের অর্থনৈতিক ক্ষতি সরাসরি দেখা যায় না, কিন্তু এটা বিশাল।

আটকে থাকা সম্পত্তি মূল্য: ৩১ লাখ মামলায় আটকে থাকা জমির বাজারমূল্য আনুমানিক ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এই জমি বিক্রি হচ্ছে না, ব্যাংকে জামানত দেওয়া যাচ্ছে না, বিনিয়োগ হচ্ছে না। মৃত পুঁজি হয়ে পড়ে আছে। হারানো কৃষি উৎপাদনশীলতা: বিরোধের কারণে যে জমি অনাবাদি পড়ে থাকে বা যেখানে দীর্ঘমেয়াদি ফসল লাগানো হয় না, তার মূল্য বছরে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার। আদালত ও আইনি খরচ: ৩১ লাখ মামলায় বাদী-বিবাদীর আইনজীবী ফি, আদালত ফি, যাতায়াত খরচ, সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলার। সহিংসতার খরচ: চিকিৎসা, কর্মদিবস হারানো, পুনর্বাসন, সব মিলিয়ে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার। আর হারানো বিদেশি বিনিয়োগ? বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে জমি পেতে যে জটিলতার সম্মুখীন হয়, তাতে অনেকেই পিছিয়ে আসে। এই খরচ আনুমানিক ২.৫ বিলিয়ন ডলার।

মোট? প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার। জিডিপির প্রায় ৪.৮%। প্রতি বছর। এটা একটা মামলা বা দুটো মামলার কথা না। এটা একটা পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতার মূল্য।

কিন্তু অন্য দেশেরা কি এই সমস্যার সমাধান করেছে? হ্যাঁ। আর তাদের কাছ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে।

রুয়ান্ডা। আফ্রিকার একটা ছোট দেশ। ১৯৯৪ সালে গণহত্যা হয়েছিল। দেশটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। জমির রেকর্ড পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারা কী করলো? ২০০৮ সালে একটা উচ্চাভিলাষী প্রকল্প শুরু করলো: Land Tenure Regularization Programme। পুরো দেশের সব জমি জরিপ করলো, প্রতিটা প্লটের GPS স্থানাঙ্ক নিলো, প্রতিটা মালিকানা যাচাই করলো, আর সব কিছু একটা ডিজিটাল ডাটাবেসে ঢুকালো। পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের ৯০% ভূমি নিবন্ধিত হলো। জমি সংক্রান্ত মামলা ৭০% কমে গেলো। জমি রেজিস্ট্রেশন এখন অনলাইনে, কয়েক ঘণ্টায় হয়ে যায়।

থাইল্যান্ড ১৯৮০-এর দশকেই ভূমি রেকর্ড ডিজিটাইজ করে ফেলেছে। ভারত ২০০৮ সালে DILRMP (Digital India Land Records Modernization Programme) শুরু করেছে, এবং ধীরে হলেও অনেক রাজ্যে রেকর্ড ডিজিটাল হয়ে গেছে।

বাংলাদেশে? স্কোর দেখুন। আইনি কাঠামোতে ৩৫, রেজিস্ট্রেশন দক্ষতায় ২৮, ডিজিটাল রেকর্ডে ৪৫, বিরোধ নিষ্পত্তিতে ২০, স্বচ্ছতায় ২৫। প্রতিটা সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে। শুধু ভারত বা থাইল্যান্ডের চেয়ে না, রুয়ান্ডার চেয়েও। একটা দেশ যেটা তিন দশক আগে গণহত্যায় বিধ্বস্ত হয়েছিল, তারা আমাদের চেয়ে ভালো ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে।


পর্ব ৫: ডিজিটাইজেশনের আলো এবং অন্ধকার

বাংলাদেশেও কিন্তু চেষ্টা হচ্ছে। পুরোপুরি অন্ধকার না।

ই-পর্চা (অনলাইন খতিয়ান) ব্যবস্থায় এখন ৭৮% রেকর্ড অনলাইনে পাওয়া যায়। ই-মিউটেশন (অনলাইন নামজারি) ৬৮% সম্পন্ন। ডিজিটাল রেকর্ড রূপান্তর ৫৫% হয়েছে। এগুলো ভালো খবর। ২০১৫ সালে যেখানে ই-পর্চার হার ছিল মাত্র ৫%, সেখানে ২০২৫ সালে ৭৮%, এটা তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি।

কিন্তু সমস্যা আছে। ই-পর্চায় যে রেকর্ড দেখানো হয়, সেটা পুরনো জরিপের কাগজের রেকর্ডেরই ডিজিটাল কপি। ভুল ছিল কাগজে, সেই ভুল এখন ডিজিটালেও আছে। দুটো সাংঘর্ষিক দলিল কাগজে ছিল, এখন দুটোই অনলাইনে দেখা যায়। ডিজিটাইজেশন ছাড়াও দরকার জমির নতুন জরিপ, GPS ভিত্তিক সীমানা নির্ধারণ, আর সব রেকর্ডের সামঞ্জস্য যাচাই। সেই কাজ হচ্ছে, কিন্তু অত্যন্ত ধীরে।

তাহলে সমাধান কী?


পর্ব ৬: তিনটি পথ

বাংলাদেশের ভূমি সমস্যার সমাধান একদিনে হবে না। কিন্তু তিনটি পদক্ষেপ নিলে পাঁচ বছরের মধ্যে চিত্র বদলাতে শুরু করবে।

পদক্ষেপ ১: জাতীয় ভূমি জরিপ, GPS ভিত্তিক। পুরো দেশে নতুন করে জরিপ চালাতে হবে। প্রতিটা প্লটের GPS স্থানাঙ্ক রেকর্ড করতে হবে। প্রতিটা মালিকানা যাচাই করতে হবে। সব রেকর্ড একটা কেন্দ্রীয় ডাটাবেসে রাখতে হবে। রুয়ান্ডা এটা ৫ বছরে করেছে, ১.১ কোটি প্লট জরিপ করেছে। বাংলাদেশে প্লট সংখ্যা বেশি, কিন্তু প্রযুক্তিও এখন অনেক উন্নত। ড্রোন জরিপ, স্যাটেলাইট ইমেজিং, মোবাইল অ্যাপ দিয়ে ডাটা সংগ্রহ, এগুলো দিয়ে ৫-৭ বছরে পুরো দেশের জরিপ সম্ভব। খরচ? আনুমানিক ১-২ বিলিয়ন ডলার। মনে হতে পারে অনেক টাকা। কিন্তু ভূমি বিরোধের বার্ষিক ক্ষতি ২২ বিলিয়ন ডলার। একবার জরিপ করলে সেই ক্ষতি অর্ধেক কমে যাবে। এক বছরের সাশ্রয় দিয়েই পুরো জরিপের খরচ উঠে আসবে।

পদক্ষেপ ২: ভূমি ট্রাইব্যুনাল, শুধু জমির মামলার জন্য। বর্তমানে ভূমি মামলা সাধারণ দেওয়ানি আদালতে চলে, যেখানে অন্য সব ধরনের মামলাও চলে। ভূমি মামলার জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করতে হবে, প্রতিটা জেলায়। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিচারক, সময়সীমা বাধ্যতামূলক (সর্বোচ্চ ২ বছর), ডিজিটাল রেকর্ডের সাথে সরাসরি সংযোগ। ভারতে কিছু রাজ্যে (কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ) এই মডেল কাজ করছে। বাংলাদেশে ৬৪ জেলায় ৬৪টি ভূমি ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা সম্ভব।

পদক্ষেপ ৩: ব্লকচেইন ভিত্তিক রেজিস্ট্রেশন। এটা শুনে "ফ্যাশনেবল প্রযুক্তি" মনে হতে পারে, কিন্তু ভূমি রেকর্ডের ক্ষেত্রে ব্লকচেইনের ব্যবহার বাস্তবসম্মত। প্রতিটা জমি কেনাবেচা একটা অপরিবর্তনীয় ডিজিটাল রেকর্ডে যাবে। কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না, কেউ মুছতে পারবে না। জাল দলিল তৈরি অসম্ভব হবে। জর্জিয়া (দেশটি, মার্কিন রাজ্য নয়) ২০১৬ সাল থেকে ব্লকচেইনে ভূমি রেকর্ড রাখছে। সুইডেন পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছে। বাংলাদেশেও এটা সম্ভব, বিশেষত নতুন জরিপের সাথে একসাথে চালু করলে।

এই তিনটি পদক্ষেপে কতটা পরিবর্তন আসবে? রুয়ান্ডার অভিজ্ঞতা বলে, সঠিক জরিপ আর ডিজিটাইজেশনের পর ভূমি মামলা ৬০-৭০% কমে। বাংলাদেশে যদি ৫০%ও কমে, তাহলে ১৫ লাখ মামলা কমবে। ১৫ লাখ পরিবার মুক্তি পাবে। ১১ বিলিয়ন ডলারের মৃত পুঁজি সচল হবে। সহিংসতা কমবে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে।


আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।

কুমিল্লার রহিম উদ্দিন আজও প্রতি মাসে আদালতে যায়। ১৭ বছর হলো। তার উকিল বলছেন, "আর দুই-তিন বছর লাগতে পারে।" রহিম জানে, দুই-তিন বছর মানে পাঁচ-সাত বছর। তার বয়স ৫৮। মামলা শেষ হতে হতে সে ৬৫ পার করবে। তার দুই বিঘা জমি, যেটা তার বাবা রেখে গেছে, সেটা তার জীবদ্দশায় তার হাতে আসবে কি না সে নিশ্চিত না।

রহিম একা না। ৩১ লাখ মামলা মানে ৩১ লাখ পরিবার। কোটি মানুষ আটকে আছে এই ব্যবস্থায়। তাদের জমি, তাদের সম্পদ, তাদের ভবিষ্যৎ, সব আটকে আছে ঘুণে ধরা ফাইলের স্তূপে, ভেঙে পড়া আদালতের বেঞ্চে, আর একটা ব্যবস্থায় যেটা ব্রিটিশ আমলে তৈরি হয়েছিল আর তারপর আর কেউ ঠিক করেনি।

রুয়ান্ডা পেরেছে। একটা গণহত্যা থেকে উঠে এসে পেরেছে। ভারত চেষ্টা করছে। থাইল্যান্ড বহু আগেই করে ফেলেছে।

বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষ কি আর ১৫ বছর অপেক্ষা করবে? প্রশ্নটা প্রযুক্তির না, টাকার না। প্রশ্নটা ইচ্ছার।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50