বাতি কেন নেভে?
পর্ব ১: অন্ধকার
গাজীপুরে একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। মালিকের নাম ধরুন জাহিদ সাহেব। তিনতলা ভবন, ২০০ শ্রমিক, চারটা ফ্লোরে সেলাই মেশিন চলে। অর্ডার আছে একটা ইউরোপিয়ান ব্র্যান্ডের, ডেডলাইন দুই সপ্তাহ পর।
বিকেল তিনটায় বিদ্যুৎ চলে গেলো।
জাহিদ সাহেবের ২০০ শ্রমিক বসে আছে। মেশিন চলে না। লাইট নেই। ফ্যান নেই। এপ্রিলের গরমে ভবনের ভেতরে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি।
তিনি জেনারেটর চালু করলেন। ডিজেল জেনারেটর। ঘণ্টায় ১৫ লিটার ডিজেল পোড়ায়। প্রতি লিটার ১২৫ টাকা। মানে ঘণ্টায় প্রায় ১,৯০০ টাকা শুধু জ্বালানি খরচ। দিনে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং হলে মাসে জেনারেটর খরচ প্রায় ৩ লাখ টাকা।
এই ৩ লাখ টাকা কোথা থেকে আসে? শ্রমিকের বেতন থেকে? মুনাফা থেকে? বায়ারের দাম বাড়িয়ে? বায়ার দাম বাড়াবে না, কারণ ভিয়েতনাম আর কম্বোডিয়া কম দামে দিতে রাজি। তাহলে? জাহিদ সাহেব মুনাফা থেকে কাটেন। মুনাফা কমে যায়। নতুন মেশিন কেনা হয় না। কারখানা আপগ্রেড হয় না। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।
এটা একটা কারখানার গল্প। বাংলাদেশে এরকম কারখানা লাখ লাখ। ছোট ওয়ার্কশপ, বেকারি, কোল্ড স্টোরেজ, হাসপাতাল, স্কুল, সবার একই সমস্যা। বিদ্যুৎ যায়, আসে, যায়, আসে।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুতায়নের গল্পটা আসলে একটা সাফল্যের গল্প। একটা বিশাল সাফল্যের গল্প।
এই চার্টটা দেখুন:
১৯৯০ সালে বাংলাদেশের মাত্র ১০% মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ ছিল। ২০২৫ সালে সেটা ৯৭%। পঁয়ত্রিশ বছরে একটা দেশ প্রায় শূন্য থেকে প্রায় সর্বজনীন বিদ্যুতায়নে পৌঁছে গেছে। এটা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় অর্জন। গ্রামে গ্রামে তার গেছে, সোলার হোম সিস্টেম বসেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হয়েছে।
তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
সমস্যা হলো, আমরা বিদ্যুৎ পৌঁছানোর দিকে এত মনোযোগ দিয়েছি যে কীভাবে বিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে সেদিকে তাকাইনি। বিদ্যুৎ তৈরির পুরো ব্যবস্থাটা দাঁড়িয়ে আছে একটা জ্বালানির উপর, যেটা ফুরিয়ে যাচ্ছে। আর যে বিকল্প সারা পৃথিবী গ্রহণ করছে, আমরা সেটা প্রায় উপেক্ষা করেছি।
পর্ব ২: যেভাবে বিদ্যুৎ আসে
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসে? এই চার্টটা দেখুন:
অর্ধেক বিদ্যুৎ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। ৫০%। তারপর ভারত থেকে আমদানি ১৫%, তেল ও ডিজেল ১০%, কয়লা ১০%, আর নবায়নযোগ্য শক্তি (সোলার, বায়ু, জলবিদ্যুৎ)? মাত্র ৩%।
এই ছবিটা ভালো করে দেখুন। একটা দেশ তার অর্ধেক বিদ্যুৎ একটাই জ্বালানি থেকে পায়। সেই জ্বালানি যদি কমে আসে, গোটা ব্যবস্থা টলে যায়।
আর সেটাই হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ প্রতি বছর কমছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হচ্ছে না, কারণ গত দুই দশকে সমুদ্র বা স্থলভাগে কোনো উল্লেখযোগ্য অনুসন্ধান হয়নি। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো আগ্রহ হারিয়েছে, কারণ গ্যাসের দাম সরকার নির্ধারিত, বাজারমূল্যের অনেক নিচে। পেট্রোবাংলার নিজস্ব সক্ষমতা সীমিত।
এই চার্টটা দেখুন:
প্রমাণিত গ্যাসের মজুদ ২০০৫ সালে ছিল ১৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। ২০২৫ সালে নেমে এসেছে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে। বর্তমান উত্তোলনের হারে ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্যাস প্রায় শেষ হয়ে যাবে। দশ বছর। মাত্র দশ বছর।
এটা শুধু বিদ্যুতের সমস্যা না। বাংলাদেশে গ্যাস ব্যবহার হয় সার কারখানায়, সিরামিক শিল্পে, কাচ শিল্পে, চা শিল্পে, রান্নায়। ঢাকায় লাখ লাখ পরিবার গ্যাসের চুলায় রান্না করে। গ্যাস ফুরিয়ে গেলে শুধু বাতিই নেভে না, চুলাও নেভে।
তাহলে গ্যাস কমলে বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসবে? সরকারের উত্তর: আমদানি। ভারত থেকে বিদ্যুৎ কিনো। এলএনজি (তরল প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করো। কয়লা আমদানি করো।
কিন্তু আমদানি মানে ডলার খরচ। আর ডলার মানে ঝুঁকি।
এই চার্টটা দেখুন:
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির খরচ ২০১৬ সালে ছিল ১২০ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে সেটা ১,৬০০ মিলিয়ন ডলার, মানে ১.৬ বিলিয়ন ডলার। দশ বছরে তেরো গুণ বেড়েছে। আর এটা শুধু বিদ্যুৎ আমদানি। এলএনজি আমদানি যোগ করলে আরো ২ বিলিয়ন ডলার। মানে জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করছে।
এটা কি টেকসই? বাংলাদেশের ফরেন রিজার্ভ ২০২৫ সালে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার। তার ১৫% শুধু জ্বালানি আমদানিতে যাচ্ছে। রিজার্ভ আরো কমলে? ২০২২ সালে যখন রিজার্ভ সংকট হয়েছিল, সরকারকে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়েছিল কারণ এলএনজি কেনার ডলার ছিল না। লোডশেডিং বেড়ে গিয়েছিল দিনে ৮-১০ ঘণ্টা। কারখানা বন্ধ হয়েছিল। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটা প্যারাডক্স আছে যেটা বেশিরভাগ মানুষ জানে না:
বাংলাদেশের ইনস্টল করা বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮,০০০ মেগাওয়াট। পিক ডিমান্ড ১৬,০০০ মেগাওয়াট। মানে সক্ষমতা চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ! তাহলে লোডশেডিং কেন?
কারণ এই সক্ষমতার একটা বড় অংশ কাগজে-কলমে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস নেই, তাই চলে না। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ে ৩০-৪০ টাকা, তাই চালানো হয় না। ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়া হচ্ছে ব্যক্তিমালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে, বিদ্যুৎ না নিয়েও। মানে সরকার টাকা দিচ্ছে এমন বিদ্যুৎকেন্দ্রকে যেগুলো বিদ্যুৎ তৈরি করছে না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ সরকার দিয়েছে প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকা।
এই পুরো ব্যবস্থাটা চলছে ভর্তুকিতে:
বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ ইউনিটপ্রতি ১১.৫ টাকা। গ্রাহক দেন গড়ে ৭.৫ টাকা। বাকি ৪ টাকা সরকার দেয় ভর্তুকি হিসেবে। বছরে ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ২৫,০০০-৩০,০০০ কোটি টাকা। এই টাকা স্বাস্থ্য খাতে, শিক্ষায়, গবেষণায় যেতে পারতো।
তাহলে পুরো ছবিটা দেখুন: গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে, আমদানি নির্ভরতা বাড়ছে, ডলার খরচ বাড়ছে, ভর্তুকি বাড়ছে, কিন্তু বিদ্যুৎ ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। এটা একটা ডুবন্ত জাহাজে জল সেচার মতো, সেচছেন কিন্তু ফুটোটা বন্ধ করছেন না।
কিন্তু পৃথিবীর অনেক দেশ এই একই সমস্যায় ছিল। তারা কী করলো? তারা সূর্যের দিকে তাকালো।
পর্ব ৩: সূর্যের দেশে সূর্যের অভাব
বাংলাদেশকে বলা হয় "রোদের দেশ"। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অবস্থান, বছরে ৩০০ দিনের বেশি রোদ, সৌর বিকিরণ প্রায় ১,৭০০ কিলোওয়াট-আওয়ার প্রতি বর্গমিটার প্রতি বছর। এটা জার্মানির প্রায় দ্বিগুণ। জার্মানি, যে দেশ পৃথিবীর সৌরশক্তি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছে, তার সৌর বিকিরণ বাংলাদেশের অর্ধেক।
তাহলে বাংলাদেশে কতটুকু সৌরশক্তি ব্যবহার হচ্ছে?
এই চার্টটা দেখুন:
বাংলাদেশে মোট বিদ্যুতে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ মাত্র ৩%। ভারত ৪০%। ভিয়েতনাম ২৫%। চীন ৩০%। বৈশ্বিক গড় ৩০%। বাংলাদেশ শুধু পিছিয়ে না, বাংলাদেশ এক দশক পিছিয়ে।
ভারত ২০১৫ সালে ঘোষণা করেছিল ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য শক্তি স্থাপনের লক্ষ্য। তারা এগিয়ে যাচ্ছে। রাজস্থানের মরুভূমিতে বিশাল সোলার পার্ক, তামিলনাড়ুতে বায়ু বিদ্যুৎ, গুজরাটে ছাদে সোলার। ভিয়েতনাম ২০১৯ থেকে ২০২১-এর মধ্যে সৌরশক্তি শূন্য থেকে ১৬ গিগাওয়াটে নিয়ে গেছে। মাত্র দুই বছরে।
বাংলাদেশ? ৮০০ মেগাওয়াট। পুরো দেশে।
SREDA (Sustainable and Renewable Energy Development Authority) নিজেই বলেছে বাংলাদেশে কারিগরি সম্ভাবনা ৫০,০০০ মেগাওয়াট। বর্তমান স্থাপনা ৮০০ মেগাওয়াট। মানে সম্ভাবনার ১.৬% ব্যবহার হচ্ছে।
কেন? কারণ কয়েকটা।
প্রথমত, জমির সংকট। বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটা। বড় সোলার পার্কের জন্য জমি পাওয়া কঠিন। কৃষিজমিতে সোলার বসানো মানে খাদ্য উৎপাদন কমে। এটা সত্যি একটা চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু এটা সমাধানযোগ্য। ছাদ আছে। বাংলাদেশে কোটি কোটি বাড়ি, কারখানা, অফিস ভবন, শপিং মলের ছাদ আছে। ফ্লোটিং সোলার আছে, জলাশয়ে ভাসমান সোলার প্যানেল বসানো যায়। কাপ্তাই হ্রদে, হাওরে, খালে, নদীর শান্ত অংশে। অ্যাগ্রি-সোলার আছে, যেখানে একই জমিতে নিচে চাষ হয়, উপরে সোলার প্যানেল থাকে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি নীতির ব্যর্থতা। নেট মিটারিং নীতি আছে কাগজে, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। গ্রিড সংযোগ পেতে মাসের পর মাস লাগে। অনুমতি পেতে ঘুরতে হয় দশ অফিসে। ব্যাংক থেকে সোলারের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন।
তৃতীয়ত, গ্যাসের সস্তা দাম। সরকার গ্যাসের দাম কৃত্রিমভাবে কম রাখে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ দেখতে "সস্তা" লাগে (ভর্তুকি হিসাব না করলে)। সোলারকে "ব্যয়বহুল" মনে হয়। কিন্তু আসল খরচ হিসাব করলে, ভর্তুকি, পরিবেশগত ক্ষতি, আমদানি নির্ভরতা, সব মিলিয়ে গ্যাস আর সস্তা নেই। আর সৌরশক্তির দাম প্রতি বছর কমছে। ২০১০ সালে সোলার প্যানেলের দাম ওয়াটপ্রতি ২ ডলার ছিল। ২০২৫ সালে ০.২০ ডলার। দশ ভাগের এক ভাগ।
আর একটা তুলনা দেখুন:
বাংলাদেশে মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার বছরে ৪০০ কিলোওয়াট-আওয়ার। ভারতে ১,০০০। ভিয়েতনামে ২,৮০০। মালয়েশিয়ায় ৫,০০০। মানে বাংলাদেশি মানুষ এখনো যেটুকু বিদ্যুৎ পায় সেটা অত্যন্ত কম। অর্থনীতি বাড়লে, জীবনযাত্রার মান বাড়লে, শিল্পায়ন বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদা তিনগুণ, চারগুণ বাড়বে। সেই বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসবে? গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে। কয়লা পরিবেশের জন্য ধ্বংসাত্মক। আমদানি নির্ভরতা বিপজ্জনক।
একটাই উত্তর আছে: সূর্য।
পর্ব ৪: কল্পনা করুন
ধরুন, বাংলাদেশের মাত্র ১০% ছাদে সোলার প্যানেল বসানো হলো। মাত্র ১০%। একটা বিশাল সংখ্যা না। বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি শহুরে ও আধা-শহুরে ভবনের ছাদ আছে। তার ১০% মানে ১০ লাখ ছাদ। প্রতিটায় গড়ে ৩ কিলোওয়াট সিস্টেম। কী হবে?
৩,০০০ মেগাওয়াট সৌরশক্তি। এটা বর্তমান সৌরশক্তির প্রায় চার গুণ। বছরে ২৫ লাখ টন কার্বন নিঃসরণ কম হবে। আমদানি ব্যয় বাঁচবে বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলার।
কিন্তু এটা শুধু শুরু।
ছাদে সোলারের আসল শক্তি হলো বিকেন্দ্রীকরণ। বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র লাগে না। ট্রান্সমিশন লাইন লাগে না। যেখানে বিদ্যুৎ দরকার, সেখানেই উৎপাদন। একটা গার্মেন্টস কারখানা তার নিজের ছাদে সোলার বসিয়ে দিনের বেলা নিজের বিদ্যুৎ নিজে তৈরি করতে পারে। বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করতে পারে। লোডশেডিং? তার জন্য আর সমস্যা না।
ভারতে এটা হচ্ছে। গুজরাটের কৃষকরা জমিতে সোলার বসিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করছে, নিজে ব্যবহার করছে, বাকিটা বিক্রি করে আয় করছে। কুসুম স্কিমে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। কৃষকের আয় দ্বিগুণ হচ্ছে।
বাংলাদেশে IDCOL সোলার হোম সিস্টেম প্রোগ্রাম পৃথিবীর সবচেয়ে সফল অফ-গ্রিড সোলার প্রোগ্রামগুলোর একটা। ৬০ লাখের বেশি বাড়িতে সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। এই সক্ষমতা, এই অভিজ্ঞতা, এই নেটওয়ার্ক আমাদের আছে। শুধু স্কেল আপ করতে হবে। অফ-গ্রিড থেকে অন-গ্রিড সোলারে যেতে হবে।
কী লাগবে?
প্রথমত, নেট মিটারিং সহজ করুন। যে কেউ ছাদে সোলার বসাবে, বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে দেবে, বিল থেকে কাটা যাবে। অনুমতি অনলাইনে, এক সপ্তাহে। জটিলতা শূন্য।
দ্বিতীয়ত, সোলার ঋণ সহজ করুন। বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিক, সোলার সিস্টেমের জন্য ৫% সুদে ঋণ। সিস্টেম নিজেই জামানত। পরিশোধ বিদ্যুৎ সাশ্রয় থেকে।
তৃতীয়ত, সরকারি ভবনে বাধ্যতামূলক সোলার। প্রতিটা সরকারি অফিস, স্কুল, হাসপাতালের ছাদে সোলার বসানো হোক। এটা সরকারের নিজের বিদ্যুৎ বিল কমাবে আর বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করবে।
চতুর্থত, গ্যাসের ভর্তুকি কমিয়ে সোলারে ভর্তুকি দিন। যে ৩০,০০০ কোটি টাকা বিদ্যুৎ ভর্তুকিতে যাচ্ছে, তার ১০% (৩,০০০ কোটি টাকা) সোলারে বিনিয়োগ করলে প্রতি বছর ১,০০০ মেগাওয়াট নতুন সৌরশক্তি যোগ হতে পারে।
পঞ্চমত, ফ্লোটিং সোলার। বাংলাদেশে জলাভূমি, হাওর, বিল, খাল, নদী অসংখ্য। কাপ্তাই হ্রদেই শত শত মেগাওয়াট ফ্লোটিং সোলার বসানো সম্ভব। জমির সংকট? সমাধান পানির উপরে।
এটা কি অসম্ভব কল্পনা? ভিয়েতনাম দুই বছরে ১৬ গিগাওয়াট সোলার বসিয়েছে। ভারত প্রতি বছর ১০+ গিগাওয়াট যোগ করছে। বাংলাদেশের চেয়ে কম রোদ পায় এমন দেশ, জার্মানি, সোলারে বিশ্বে শীর্ষে। বাংলাদেশের সমস্যা প্রযুক্তি না, অর্থ না, রোদের অভাব না। সমস্যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভাব।
গাজীপুরে ফিরে যাই।
জাহিদ সাহেবের কারখানার ছাদটা ১০,০০০ বর্গফুট। সেখানে ৫০ কিলোওয়াটের একটা সোলার সিস্টেম বসানো যায়। খরচ? প্রায় ৩০ লাখ টাকা। ব্যাংক ঋণে ৫ বছরে পরিশোধযোগ্য। মাসিক কিস্তি প্রায় ৬০,০০০ টাকা। কিন্তু সেই সিস্টেম থেকে মাসে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে প্রায় ৭০,০০০-৮০,০০০ টাকা। মানে প্রথম মাস থেকেই লাভ। আর পাঁচ বছর পর? ঋণ শেষ, বিদ্যুৎ প্রায় বিনামূল্যে। জেনারেটরের সেই ৩ লাখ টাকা মাসিক খরচ? শূন্য।
জাহিদ সাহেবের ২০০ শ্রমিক আর বসে থাকবে না বিকেলে। মেশিন চলবে। অর্ডার সময়মতো ডেলিভারি হবে। মুনাফা বাড়বে। নতুন মেশিন কেনা হবে। আরো শ্রমিক নিয়োগ হবে।
আর শুধু জাহিদ সাহেব না। লাখ লাখ কারখানা, কোটি কোটি বাড়ি, হাজার হাজার হাসপাতাল, স্কুল, অফিস। প্রতিটার ছাদে সূর্যের আলো পড়ে। সেই আলো এখন নষ্ট হচ্ছে। সেই আলোকে বিদ্যুতে বদলানোর প্রযুক্তি আমাদের হাতে আছে, দাম কমে এসেছে, বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে।
শুধু আমরা দাঁড়িয়ে আছি। গ্যাসের পাইপলাইনে ধরে।
বাতি নেভে কারণ আমরা সূর্যকে উপেক্ষা করেছি। আর বাতি জ্বলবে যেদিন আমরা ছাদের দিকে তাকাবো।