Back to publications
Narrative 2026-03-06

জনশক্তি রপ্তানি: দালালের ফি কত?

অভিবাসনের খরচ, প্রতারণা, আর অসম বাণিজ্য

জনশক্তি রপ্তানি: দালালের ফি কত?

পর্ব ১: জাহাঙ্গীরের গল্প

জাহাঙ্গীর কুমিল্লার দাউদকান্দির ছেলে। বয়স ২৮। দুই বিঘা জমি বন্ধক রেখে, মায়ের গহনা বিক্রি করে, আর স্থানীয় এনজিও থেকে ৩ লাখ টাকা ধার নিয়ে সে সৌদি আরব গেছে। মোট খরচ পড়েছে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। মানে প্রায় ৬,০০০ ডলার। রিয়াদে একটা নির্মাণ কোম্পানিতে কাজ করে, মাসে বেতন ১,২০০ রিয়াল, মানে প্রায় ৩৫,০০০ টাকা। খাওয়া, থাকা, ফোন বিল বাদ দিলে মাসে ২০,০০০ টাকা পাঠাতে পারে বাড়িতে। হিসাবটা সহজ: যে টাকা খরচ করে বিদেশ গেছে, সেটা উশুল হতে প্রায় তিন বছর লাগবে।

জাহাঙ্গীর ভাগ্যবান। সে অন্তত গেছে। তার পাশের বাড়ির সবুজ একই দালালকে ৫ লাখ টাকা দিয়েছিল মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য। দালাল টাকা নিয়ে উধাও। সবুজ এখন ঋণের বোঝা নিয়ে গ্রামে বসে আছে। কোনো মামলা করেনি, কারণ দালাল স্থানীয় চেয়ারম্যানের আত্মীয়। থানায় গেলেও লাভ নেই, দালালের বিরুদ্ধে মামলা করার আইনি প্রক্রিয়া এত জটিল আর সময়সাপেক্ষ যে গরিব মানুষের পক্ষে সেটা চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

কিন্তু এই সংখ্যার পেছনে একটা প্রশ্ন কেউ জোরে করে না: প্রতিটা শ্রমিকের বিদেশে যাওয়ার টিকিটের আসল দাম কত?
৭ থেকে ১০ লাখ শ্রমিক
জাহাঙ্গীরের গল্প
৪,০০০ থেকে ৬,০০০ ডলার
দামটা কত
প্রায় ৩৫-৪০%
কোথায় যায় বাংলাদেশের শ্রমিক

এই গল্পটা শুধু জাহাঙ্গীর আর সবুজের না। এটা বাংলাদেশের প্রতিটা জেলার, প্রতিটা উপজেলার গল্প। সিলেটে, কুমিল্লায়, চট্টগ্রামে, টাঙ্গাইলে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, প্রতিটা বাড়িতে একজন না একজন আছে যে বিদেশে গেছে বা যাওয়ার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশ প্রতি বছর ৭ থেকে ১০ লাখ শ্রমিক বিদেশে পাঠায়। এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটা। ভারত, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়ার সাথে বাংলাদেশ এই তালিকায় শীর্ষে। কিন্তু এই রপ্তানির পেছনে একটা বিশাল, অস্বচ্ছ, আর প্রায়ই নিষ্ঠুর ব্যবস্থা কাজ করে, যেখানে দালাল, সাব-এজেন্ট, রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি, আর সরকারি দপ্তর মিলে শ্রমিকের পকেট থেকে হাজার হাজার ডলার তুলে নেয়।

এই গল্পটা সেই ব্যবস্থার গল্প। দালালের ফি-র গল্প। আর সেই ফি-র পেছনে লুকানো অসম বাণিজ্যের গল্প।

বিএমইটি (জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো) এর হিসাবে, ২০০৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ শ্রমিক বিদেশে গেছে। কিছু বছর সংখ্যাটা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ২০০৮ সালে রেকর্ড ৮.৩ লাখ, ২০১৭ সালে প্রথমবার ১০ লাখের ওপরে। কোভিড-১৯ এর সময় ২০২০ সালে ধস নেমে সংখ্যাটা ২.১ লাখে নেমে গিয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে আবার ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে প্রায় ১১ লাখ করে শ্রমিক বিদেশে গেছে।

এই সংখ্যাগুলো চমকপ্রদ। মানে প্রতিদিন গড়ে ৩,০০০ বাংলাদেশি বিমানে চড়ে বিদেশে যাচ্ছে কাজ করতে। প্রতি ঘণ্টায় ১২৫ জন। ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের ডিপার্চার লাউঞ্জে গেলে দৃশ্যটা চোখে পড়বে: নতুন জুতা পরা, নতুন ব্যাগ হাতে, চোখে উত্তেজনা আর ভয় মেশানো তরুণেরা, প্রথমবার দেশ ছাড়ছে।

কিন্তু এই সংখ্যার পেছনে একটা প্রশ্ন কেউ জোরে করে না: প্রতিটা শ্রমিকের বিদেশে যাওয়ার টিকিটের আসল দাম কত?


পর্ব ২: দামটা কত?

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার খরচ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি। এটা কোনো অতিশয়োক্তি না। আইএলও, বিশ্বব্যাংক, আর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বারবার এটা বলেছে।

একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের সৌদি আরব যেতে গড়ে ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ ডলার খরচ হয়। মালয়েশিয়ায় ৩,৫০০ থেকে ৫,০০০। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৫,০০০ থেকে ৮,০০০। কিছু ক্ষেত্রে ১০,০০০ ডলার পর্যন্ত গেছে। একই গন্তব্যে একজন ফিলিপাইন শ্রমিকের খরচ ৮০০ থেকে ১,৫০০ ডলার। ভারতীয় শ্রমিকের ১,৫০০ থেকে ২,৫০০। নেপালি শ্রমিকের ১,২০০ থেকে ২,০০০।

মানে বাংলাদেশি শ্রমিক তার প্রতিবেশী দেশের শ্রমিকের তুলনায় ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি খরচ করে একই চাকরির জন্য। কেন?

উত্তরটা জটিল, কিন্তু এর কেন্দ্রে আছে একটা শব্দ: দালাল।

বাংলাদেশে অভিবাসন প্রক্রিয়া কাগজে-কলমে সোজা। সরকারি লাইসেন্সধারী রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি (প্রায় ১,৫০০টা) শ্রমিক নিয়োগ করে, ভিসা প্রসেস করে, বিদেশে পাঠায়। কিন্তু বাস্তবে এই এজেন্সিগুলোর হাত-পা হিসেবে কাজ করে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার সাব-এজেন্ট বা দালাল। এরাই গ্রামে গিয়ে শ্রমিক খোঁজে, টাকা নেয়, প্রতিশ্রুতি দেয়।

টিআইবি'র গবেষণায় দেখা গেছে, মোট অভিবাসী শ্রমিকের প্রায় ৬০-৭০% দালালের মাধ্যমে বিদেশে যায়। সরাসরি এজেন্সি বা সরকারি চ্যানেলে যায় মাত্র ৩০-৪০%। আর দালালের মাধ্যমে গেলে খরচ বাড়ে ২ থেকে ৩ গুণ। কারণ প্রতিটা স্তরে কমিশন কাটে: গ্রামের দালাল তার ভাগ নেয়, উপজেলার দালাল তার ভাগ নেয়, ঢাকার এজেন্সি তার ভাগ নেয়, গন্তব্য দেশের স্পনসরও একটা অংশ নেয়।

সরকার নির্ধারিত মাইগ্রেশন কস্ট সিলিং আছে। যেমন সৌদি আরবের জন্য সরকারি খরচ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তবে শ্রমিকরা দিচ্ছে ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা। এই পার্থক্যটা যায় কোথায়? দালালের পকেটে, এজেন্সির হিসাবের বাইরের খাতে, আর কখনো কখনো সরকারি কর্মকর্তার টেবিলের নিচে।

আর এই খরচ কমছে না, বাড়ছে। ২০১০ সালে গড় অভিবাসন খরচ ছিল প্রায় ২,৫০০ ডলার। ২০২৫ সালে সেটা দাঁড়িয়েছে ৫,০০০ থেকে ৬,০০০ ডলারে। টাকার অঙ্কে এটা আরো ভয়াবহ, কারণ এই সময়ে টাকার মান কমেছে। ২০১০ সালে ১ ডলার ছিল ৭০ টাকা, এখন ১২০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।


পর্ব ৩: কোথায় যায় বাংলাদেশের শ্রমিক?

বাংলাদেশের শ্রমিকদের মূল গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো।

সৌদি আরব সবচেয়ে বড় গন্তব্য, মোট অভিবাসীর প্রায় ৩৫-৪০%। এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওমান, কাতার, সিঙ্গাপুর, বাহরাইন। এই দেশগুলোতে বাংলাদেশি শ্রমিকরা মূলত নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, গৃহকর্ম, আর সেবা খাতে কাজ করে।

সমস্যাটা কোথায়? এই দেশগুলোতে কাফালা (স্পনসরশিপ) ব্যবস্থা চলে। মানে শ্রমিকের ভিসা, থাকা, কাজ সবকিছু একজন স্থানীয় স্পনসরের উপর নির্ভরশীল। স্পনসর চাইলে পাসপোর্ট আটকে রাখতে পারে, বেতন কমাতে পারে, চাকরি বদলাতে দেবে না। শ্রমিক আটকা পড়ে। আর অভিযোগ করতে গেলে ডিপোর্টেশনের ভয় থাকে।

কাতারে ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপের আগে স্টেডিয়াম নির্মাণে যে শ্রমিকরা কাজ করেছে, তাদের একটা বড় অংশ ছিল বাংলাদেশি। দ্য গার্ডিয়ানের তদন্তে দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কাতারে ৬,৫০০ এরও বেশি দক্ষিণ এশীয় শ্রমিক মারা গেছে। বাংলাদেশি শ্রমিকরা ছিল এই তালিকায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ১২ ঘণ্টা কাজ, অপর্যাপ্ত পানি, ঘুমানোর জায়গায় ১০ জন একটা ঘরে। এই পরিস্থিতিতে হৃদরোগ বা হিটস্ট্রোকে মৃত্যুকে বলা হতো "স্বাভাবিক মৃত্যু"।

আর বৈচিত্র্যহীনতা আরেকটা সমস্যা। বাংলাদেশের শ্রমবাজার মূলত উপসাগরীয় ৬-৭টা দেশে সীমাবদ্ধ। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপ, এসব উচ্চ-বেতনের বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি নগণ্য। দক্ষিণ কোরিয়ার EPS (Employment Permit System) কর্মসূচিতে বাংলাদেশ অংশ নেয়, কিন্তু বরাদ্দ পায় বছরে মাত্র কয়েক হাজার। জাপানে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন প্রোগ্রামে বাংলাদেশি শ্রমিক যায়, তবে সংখ্যা এখনো কম।

আরেকটা বড় সমস্যা: বাংলাদেশ থেকে যারা যায়, তাদের অধিকাংশ অদক্ষ বা আধা-দক্ষ শ্রমিক। মোট অভিবাসীর ৫০% এর বেশি অদক্ষ, ৩০% আধা-দক্ষ, আর মাত্র ১৫-২০% দক্ষ বা পেশাদার। ফিলিপাইন থেকে তুলনায় ৪০% এর বেশি দক্ষ শ্রমিক যায়: নার্স, ইঞ্জিনিয়ার, আইটি পেশাদার। তারা বেশি বেতন পায়, ভালো কাজের পরিবেশ পায়, অভিবাসন খরচও কম। বাংলাদেশের শ্রমিক কম দক্ষ বলে কম বেতন পায়, আর বেশি খরচ করে যায়। এটা দ্বিগুণ ক্ষতি।

হিসাবটা সোজা। একজন দক্ষ ইলেক্ট্রিশিয়ান সৌদি আরবে মাসে ২,০০০-২,৫০০ রিয়াল পায়। একজন অদক্ষ নির্মাণ শ্রমিক পায় ৮০০-১,২০০ রিয়াল। মানে দক্ষতার পার্থক্যটা বেতনে দ্বিগুণ। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শ্রমিকদের ৮০% এর বেশি সেই নিচের ধাপে আটকে আছে। কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ না করে বাংলাদেশ তার শ্রমিকদের সবচেয়ে কম মজুরির, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠাচ্ছে।


পর্ব ৪: যে মূল্য কেউ গোনে না

বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মৃত্যু একটা নীরব মহামারি। প্রতি বছর শত শত বাংলাদেশি শ্রমিকের লাশ দেশে ফিরে আসে।

জনশক্তি মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবে, ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কমপক্ষে ৫০,০০০ বাংলাদেশি শ্রমিক বিদেশে মারা গেছে। প্রতি বছর গড়ে ৩,০০০ থেকে ৪,০০০। এই সংখ্যাটা একটু ভেবে দেখুন। প্রতিদিন গড়ে ১০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক বিদেশে মারা যাচ্ছে। প্রতিদিন ১০টা পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারাচ্ছে।

মৃত্যুর কারণ: কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, তাপজনিত অসুস্থতা (বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশে ৪৫-৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় বাইরে কাজ), হৃদরোগ, আত্মহত্যা। আত্মহত্যার বিষয়টা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। একাকীত্ব, ঋণের চাপ, নিম্নমানের জীবনযাত্রা, আর বাড়ি ফেরার সামর্থ্য না থাকা, এই সবকিছু মিলে অনেক শ্রমিক মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য সেবা? বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য এরকম কোনো ব্যবস্থা নেই।

অনেক মৃত্যুর কারণ "অজানা" বা "স্বাভাবিক" লেখা হয়, কোনো তদন্ত হয় না। পরিবার লাশ ফেরত পায়, ক্ষতিপূরণ পায় না। ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়, কিন্তু সেটা নগণ্য, প্রায়ই ২-৩ লাখ টাকা, যেখানে শ্রমিকটা বিদেশে যেতেই খরচ করেছিল ৫-৮ লাখ।

বেতন চুরি বা মজুরি আটকে রাখা আরেকটা বিশাল সমস্যা।

বিএমইটি ও প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কে প্রতি বছর হাজার হাজার অভিযোগ আসে। চুক্তি অনুযায়ী বেতন না দেওয়া, ওভারটাইম না দেওয়া, বেতন কয়েক মাস আটকে রাখা, চুক্তি ভঙ্গ করে অন্য কাজে লাগানো (যেমন ড্রাইভার হিসেবে নিয়ে গিয়ে পরিচ্ছন্নতার কাজ করানো), এগুলো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু অভিযোগের সংখ্যা আসল সমস্যার একটা ছোট অংশ মাত্র। অধিকাংশ শ্রমিক অভিযোগ করে না, কারণ ভাষা জানে না, আইন জানে না, আর ডিপোর্টেশনের ভয় থাকে।

এখন হিসাবটা করুন। একজন শ্রমিক ৫,০০০ ডলার খরচ করে বিদেশ যায়। মাসে বাড়িতে পাঠায় ২০০ ডলার। মানে শুধু অভিবাসন খরচ তুলতে ২৫ মাস, প্রায় ২ বছর লাগে। ৩ বছরের চুক্তিতে গেলে প্রথম ২ বছর শুধু ঋণ শোধ হয়, শেষ ১ বছর নিজের জন্য। আর যদি বেতন চুরি হয়, অসুস্থ হয়, বা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়, তাহলে পুরো বিনিয়োগটাই লোকসান। সেই ক্ষতি বহন করে তার পরিবার, তার গ্রাম, আর ঋণের চক্রে আটকে পড়ে পরবর্তী প্রজন্ম।


পর্ব ৫: নারী অভিবাসীর কথা

বাংলাদেশে নারী শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়ার গল্পটা আলাদাভাবে বলা দরকার।

দীর্ঘদিন বাংলাদেশ সরকার নারী শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছিল। ২০০৩ সালে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ছিল, পরে শর্তসাপেক্ষে শিথিল হয়েছে। ২০১৫ এর পর নারী অভিবাসন বাড়তে শুরু করে। ২০২৪ সালে প্রায় ৮০,০০০ নারী শ্রমিক বিদেশে গেছে, যা মোটের প্রায় ৭-৮%।

নারী শ্রমিকরা মূলত গৃহকর্মী হিসেবে যায়, বিশেষ করে সৌদি আরব, জর্ডান, লেবানন, ওমানে। তাদের সমস্যাগুলো পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে আলাদা এবং অনেক ক্ষেত্রে আরো গুরুতর। গৃহকর্মীরা শ্রম আইনের আওতায় পড়ে না অনেক দেশে। তারা বাড়ির ভেতরে কাজ করে, তাই তাদের উপর নির্যাতন হলে বাইরের কেউ জানে না। যৌন নিপীড়ন, শারীরিক নির্যাতন, খাবার না দেওয়া, ঘর থেকে বের হতে না দেওয়ার অসংখ্য ঘটনা আছে। অনেকে পালিয়ে দূতাবাসে আশ্রয় নেয়, অনেকে নেয় না, পারে না।

ফিলিপাইন তাদের নারী গৃহকর্মীদের জন্য ন্যূনতম বেতন ৪০০ ডলার নির্ধারণ করে দিয়েছে। কোনো দেশ এটা মানতে না চাইলে ফিলিপাইন শ্রমিক পাঠায় না। ইন্দোনেশিয়াও একই ধরনের নীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ এরকম কোনো অবস্থান নেয়নি। কারণটা সহজ: বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা নেই। শ্রমিকের সরবরাহ এত বেশি, আর দক্ষতা এত কম যে গন্তব্য দেশগুলো জানে, বাংলাদেশ শর্ত মানতে বাধ্য হবে। না মানলে অন্য দেশ থেকে শ্রমিক আনবে।

এটাই অসম বাণিজ্যের চেহারা। বাংলাদেশ শ্রম রপ্তানি করে, কিন্তু সেই রপ্তানিতে তার নিজের কোনো শর্ত নেই। দাম ঠিক করে গন্তব্য দেশ, শর্ত ঠিক করে গন্তব্য দেশ, আর মুনাফা ভোগ করে মধ্যস্বত্বভোগীরা।


পর্ব ৬: কী করা যেত, কী করা হয়নি

ফিলিপাইনের কথাই ধরুন। তারাও শ্রমিক পাঠায়, বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পাঠায়। কিন্তু তাদের ব্যবস্থাটা আলাদা।

ফিলিপাইনে POEA (এখন DMW: Department of Migrant Workers) নামে একটা শক্তিশালী সরকারি সংস্থা আছে যেটা পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। রিক্রুটমেন্ট ফি সরকারি সিলিং-এর বেশি নিলে এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল হয়। শ্রমিকদের যাওয়ার আগে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়: ভাষা, আইনি অধিকার, জরুরি যোগাযোগ। প্রতিটা দেশে ফিলিপাইন দূতাবাসে "POLO" (Philippine Overseas Labor Office) আছে, যেটা শ্রমিকদের সমস্যায় সরাসরি সাহায্য করে। বেতন চুরি হলে সরকার নিজে মামলা করে।

বাংলাদেশে? বিএমইটি আছে, কিন্তু তার সক্ষমতা সীমিত। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক আছে, কিন্তু ঋণ পেতে জটিলতা বেশি। শ্রম উইং আছে দূতাবাসে, কিন্তু জনবল নগণ্য। সৌদি আরবে ২৫ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক আছে, আর শ্রম উইংয়ে কর্মকর্তা আছেন হাতে গোনা কয়েকজন।

সরকারের উচিত ছিল তিনটা কাজ করা।

প্রথমত, দালাল ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেখানে শ্রমিক সরাসরি চাকরির বিজ্ঞাপন দেখতে পারে, আবেদন করতে পারে, এজেন্সি মূল্যায়ন দেখতে পারে। "প্রবাসী বন্ধু" অ্যাপ নামে একটা উদ্যোগ আছে, কিন্তু সেটা এখনো দালাল ব্যবস্থার বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।

দ্বিতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়ন। অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর বদলে দক্ষ শ্রমিক পাঠানো। যদি একজন শ্রমিককে ৬ মাসের টেকনিক্যাল ট্রেনিং দিয়ে ইলেক্ট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, বা ওয়েল্ডার হিসেবে পাঠানো যায়, তাহলে তার বেতন দ্বিগুণ হবে। অভিবাসন খরচ উশুল হবে ১ বছরে, ২ বছরে না। কিন্তু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা অপ্রতুল, মানও প্রশ্নবিদ্ধ।

তৃতীয়ত, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি শক্তিশালী করা। শ্রমিক পাঠানোর আগে গন্তব্য দেশের সাথে স্পষ্ট চুক্তি করা: ন্যূনতম বেতন কত হবে, কাজের সময় কত ঘণ্টা, ছুটি কত দিন, বেতন চুরি হলে কী ব্যবস্থা হবে। ফিলিপাইন এটা করে। বাংলাদেশ করে না, বা করলেও বাস্তবায়ন হয় না।

আর একটা কথা। বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটা বিশাল সুযোগ আছে যেটা কাজে লাগানো হচ্ছে না: ডেটা। বিএমইটি-র কাছে ২০ বছরের মাইগ্রেশন ডেটা আছে। কোন এজেন্সি কত শ্রমিক পাঠিয়েছে, কোন দেশে কত মৃত্যু হয়েছে, কোন এজেন্সির বিরুদ্ধে কত অভিযোগ আছে, সব তথ্য আছে। এই ডেটা যদি পাবলিক করা হয়, যদি প্রতিটা এজেন্সির রেটিং অনলাইনে দেওয়া হয়, তাহলে শ্রমিকরা নিজেরাই জানতে পারবে কোন এজেন্সি বিশ্বাসযোগ্য আর কোনটা না। ডেটা হতে পারে দালাল ব্যবস্থা ভাঙার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।


শেষ করি জাহাঙ্গীরের কথা দিয়ে।

জাহাঙ্গীর এখন রিয়াদে তৃতীয় বছরে। ঋণ শোধ হয়েছে। এবার থেকে যা পাঠাবে সেটা নিজের। মা বলেছে ছোট ভাইকেও পাঠাতে। জাহাঙ্গীর ভাবছে, আবার সেই ৬ লাখ টাকা? আবার সেই দালাল? আবার সেই অনিশ্চয়তা?

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ১০ লাখ জাহাঙ্গীর বিদেশে যায়। তারা বছরে ২২ বিলিয়ন ডলার পাঠায় দেশে। এই টাকায় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ টিকে আছে, আমদানি বিল মেটে, গ্রামের অর্থনীতি চলে। কিন্তু এই টাকা আসার জন্য প্রতিটা জাহাঙ্গীরকে দালালের হাতে হাজার হাজার ডলার দিতে হয়, ঝুঁকিপূর্ণ কাজের পরিবেশে জীবন দিতে হয়, পরিবার থেকে বছরের পর বছর দূরে থাকতে হয়।

এই ব্যবস্থাটা বদলানো সম্ভব। ফিলিপাইন দেখিয়েছে। কিন্তু বদলাতে হলে দালালদের স্বার্থে আঘাত লাগবে, রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির মুনাফা কমবে, আর সরকারি দপ্তরে যে "অনানুষ্ঠানিক আয়" আসে সেটা বন্ধ হবে। তাই বদলায় না।

জাহাঙ্গীর জানে না ফিলিপাইনের শ্রমিকরা কত কম খরচে বিদেশে যায়। সে জানে না আইএলও কী বলে। সে শুধু জানে, বিদেশে যেতে হলে দালালকে টাকা দিতে হয়। এটাই নিয়ম। এটাই বাংলাদেশ।

কিন্তু এটা নিয়ম না। এটা একটা ব্যবস্থা, যেটা কিছু মানুষের লাভের জন্য কোটি মানুষের ক্ষতি করছে। এটা বদলানো যায়। শুধু বদলানোর ইচ্ছাটা থাকতে হবে।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50