পদ্মা সেতু থেকে রূপপুর: উন্নয়নের দাম কত?
পর্ব ১: সেতুর উপর দাঁড়িয়ে
আপনি দাঁড়িয়ে আছেন পদ্মা সেতুর ঠিক মাঝখানে। নিচে পদ্মা নদী, বাংলাদেশের সবচেয়ে খরস্রোতা নদীগুলোর একটা। দুই পাশে ৬.১৫ কিলোমিটার ইস্পাত আর কংক্রিট। এই সেতু বানাতে ৩০,১৯৩ কোটি টাকা খরচ হয়েছে, প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন ডলার। পুরোটাই বাংলাদেশের নিজের টাকায়। কোনো বিদেশি ঋণ নেই। বিশ্বব্যাংক সরে গেছিল দুর্নীতির অভিযোগে, বাংলাদেশ একা করে দেখিয়েছে।
জাতীয় গর্বের প্রতীক। সন্দেহ নেই।
কিন্তু এখন একটু জুম আউট করুন। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলোর মাত্র একটা। বর্তমানে ১২টির বেশি মেগা প্রকল্প চলমান বা সম্প্রতি শেষ হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকা মেট্রো রেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা রেল সংযোগ, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। মোট খরচ? ৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
এবার এই চার্টটা দেখুন:
প্রতিটা প্রকল্পের নাম, বাজেট, আর সময়সীমা। একসাথে দেখলে বোঝা যায় বাংলাদেশ কতটা বিশাল পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। প্রশ্ন হলো: এই পরিকল্পনার দাম কত? আর সেই দাম কে দিচ্ছে?
পর্ব ২: বাজেটের জাদু
মেগা প্রকল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো বাজেট সংশোধন। প্রতিটা প্রকল্প শুরু হয় একটা সংখ্যা দিয়ে। কিছু বছর পর সেই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। কখনো তিনগুণ।
পদ্মা সেতুর কথাই ধরুন। ২০০৭ সালে প্রাথমিক প্রাক্কলন ছিল ১০,১৬২ কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৩০,১৯৩ কোটি। তিনগুণ।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রাথমিক প্রাক্কলন ছিল প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার। সর্বশেষ সংশোধিত প্রাক্কলন ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার। প্রায় ৬০% বৃদ্ধি। আর এটা এখনো শেষ হয়নি, তাই চূড়ান্ত খরচ আরো বাড়তে পারে।
ঢাকা মেট্রো রেল লাইন-৬। ২০১২ সালে প্রাক্কলন ছিল ২১,৯৮৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ সংশোধিত ৩৩,৪৭২ কোটি। প্রায় ৫২% বেশি।
এবার ছয়টা বড় প্রকল্পের মূল আর সংশোধিত বাজেট পাশাপাশি দেখুন:
প্রতিটা ক্ষেত্রে নীল বার হলো মূল বাজেট, লাল বার হলো সংশোধিত বাজেট। পার্থক্যটা চোখে পড়ার মতো।
কেন এত বাড়ে? কারণ অনেকগুলো। প্রথমত, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রকল্প অনুমোদন হয় কম খরচে, কারণ বেশি লিখলে অনুমোদন পাওয়া কঠিন। দ্বিতীয়ত, ডিজাইন পরিবর্তন। পদ্মা সেতুর মূল নকশায় রেল সংযোগ ছিল না, পরে যোগ হয়েছে। তৃতীয়ত, জমি অধিগ্রহণ। বাংলাদেশে জমির দাম অবিশ্বাস্য হারে বাড়ে, আর অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া ধীর ও দুর্নীতিগ্রস্ত। চতুর্থত, সময় বিলম্ব। প্রকল্প যত দেরি হয়, খরচ তত বাড়ে। সুদ বাড়ে, উপকরণের দাম বাড়ে, পরামর্শক ফি বাড়ে।
আর একটা বিষয় কেউ জোরে বলে না: দুর্নীতি। Transparency International Bangladesh এর একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বড় প্রকল্পে গড়ে ১৫-২০% টাকা অনিয়মে হারিয়ে যায়। ৬০ বিলিয়ন ডলারের ২০% মানে ১২ বিলিয়ন ডলার। চারটা পদ্মা সেতুর সমান।
আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণ কি সত্যিই দামি? এই চার্টটা দেখুন:
প্রতি কিলোমিটার সেতু, সড়ক, আর রেলপথ নির্মাণ খরচ। বাংলাদেশ, ভারত, ভিয়েতনাম, চীনের তুলনা। বাংলাদেশের খরচ প্রায় সব ক্ষেত্রে বেশি। নরম মাটি, বন্যাপ্রবণ ভূমি, ঘন জনবসতি, এগুলো প্রকৃত কারণ। কিন্তু শুধু ভূগোল দিয়ে পুরো পার্থক্য ব্যাখ্যা করা যায় না।
পর্ব ৩: কে দিচ্ছে টাকা?
পদ্মা সেতু ব্যতিক্রম, কারণ সেটা নিজের টাকায়। বাকি প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগ বিদেশি ঋণে চলছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১১.৩৮ বিলিয়ন আসছে রাশিয়া থেকে। সুদের হার ১.৫% হলেও ৩০ বছর ধরে শোধ করতে হবে। মেট্রো রেলের বড় অংশ জাপানের JICA ঋণে। মাতারবাড়ীর অর্থায়নও জাপান। কর্ণফুলী টানেল চীনের Exim Bank ঋণে।
এবার দেখুন কোন প্রকল্পে কোন দেশের টাকা:
বিভিন্ন রঙে বিভিন্ন উৎস: রাশিয়া, জাপান, চীন, নিজস্ব অর্থায়ন, আর বহুপক্ষীয় সংস্থা (ADB, World Bank)। একটা জিনিস স্পষ্ট: বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পের অর্থায়ন বহুমুখী। এটা একদিক থেকে ভালো (একটা দেশের উপর নির্ভরতা নেই), কিন্তু অন্যদিক থেকে জটিল (প্রতিটা ঋণের শর্ত আলাদা, পরিশোধের সময়সীমা আলাদা, সুদের হার আলাদা)।
আর এই ঋণগুলো জমে যাচ্ছে। এই চার্টটা দেখুন:
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ২০১৫ সাল থেকে দ্রুত বাড়ছে। মেগা প্রকল্পগুলো এই ঋণ বৃদ্ধির একটা বড় কারণ। ২০১৫ সালে বৈদেশিক ঋণ ছিল প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার, ২০২৫ সালে সেটা ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই ঋণ শোধ করতে হবে আগামী ২০-৩০ বছর ধরে।
ঋণ নেওয়া খারাপ না, যদি সেই ঋণে যা তৈরি হয় তার রিটার্ন ঋণের সুদের চেয়ে বেশি হয়। একটা ব্রিজ যদি প্রতি বছর ঋণের সুদের চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করে, তাহলে ঋণটা বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু প্রশ্ন হলো: আমাদের মেগা প্রকল্পগুলো কি সত্যিই সেই রিটার্ন দিচ্ছে?
পর্ব ৪: ফল কোথায়?
পদ্মা সেতু খোলার পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কী বদলেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এই চার্টটা দেখুন:
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার আগে ও পরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু সূচক। যাতায়াত সময় কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ঢাকার সাথে বরিশাল, খুলনা, ফরিদপুরের সড়ক যোগাযোগ আগে ৭-৮ ঘণ্টা লাগতো, এখন ৩-৪ ঘণ্টা। জমির দাম বেড়েছে সেতুর দুই পাশে। কিছু নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু ব্যাপক অর্থনৈতিক রূপান্তর এখনো ঘটেনি। কারণ সেতু একা যথেষ্ট না, দরকার সড়ক নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ সরবরাহ, শিল্প অঞ্চল, দক্ষ শ্রমিক।
রূপপুরের কথায় আসি। এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প। ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার। একটা ২,৪০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কিন্তু টাইমলাইনটা দেখুন:
মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালে চালু হওয়ার কথা ছিল। তারপর ২০২৪ হলো। এখন ২০২৬ বলা হচ্ছে। এই ধরনের বিলম্ব পারমাণবিক প্রকল্পে অস্বাভাবিক না, কিন্তু প্রতিটা বছর বিলম্বের মানে কোটি কোটি ডলার অতিরিক্ত খরচ।
মেট্রো রেলের কথাও একটু বলি। লাইন-৬ আংশিকভাবে চালু হয়েছে। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী প্রতিদিন ৫ লাখ যাত্রী বহন করার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবে কত? এই চার্টটা দেখুন:
প্রক্ষেপিত যাত্রী সংখ্যা আর বাস্তব যাত্রী সংখ্যার পার্থক্য। নতুন সিস্টেমে এটা স্বাভাবিক, সময়ের সাথে বাড়বে। কিন্তু প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাব্যতা নির্ভর করে সেই প্রক্ষেপিত সংখ্যার উপর। যদি বাস্তব সংখ্যা প্রক্ষেপণের চেয়ে অনেক কম থাকে, তাহলে প্রকল্পটা আর্থিকভাবে লোকসানি।
পর্ব ৫: বিকল্প হিসাব
এখন একটু থামুন। ৬০ বিলিয়ন ডলার। এই টাকাটা কতটা বড়, সেটা বোঝার জন্য একটু অন্যভাবে ভাবুন। এই চার্টটা দেখুন:
৬০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে কী কী করা যেত? বাংলাদেশের শিক্ষা বাজেটের ১০ বছরের সমান। স্বাস্থ্য খাতে খরচের ২০ বছরের সমান। প্রতিটা উপজেলায় একটি করে আধুনিক হাসপাতাল, প্রতিটা ইউনিয়নে একটি করে ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার, পুরো দেশে ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট, ৫০,০০০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন।
এর মানে এই না যে মেগা প্রকল্প করাই ভুল। অবকাঠামো দরকার। পদ্মা সেতু দরকার ছিল, মেট্রো রেল দরকার। প্রশ্ন হলো অগ্রাধিকারের। প্রশ্ন হলো দামের। প্রশ্ন হলো স্বচ্ছতার।
বাংলাদেশের অবকাঠামোর মান আন্তর্জাতিক তুলনায় কোথায়? এই চার্টটা দেখুন:
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অবকাঠামো মান সূচক। বাংলাদেশ ধীরে ধীরে উন্নতি করছে, কিন্তু ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে এখনো পিছিয়ে। শুধু মেগা প্রকল্প দিয়ে এই ব্যবধান কমবে না। দরকার সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট অবকাঠামো: গ্রামীণ সড়ক, সেচ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ বিতরণ, ইন্টারনেট সংযোগ।
একটা দেশ যখন উন্নয়নের মডেল বেছে নেয়, তখন দুটো পথ থাকে। একটা পথ: কয়েকটা বিশাল প্রকল্প, দেখতে চমকদার, রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল। আরেকটা পথ: হাজার হাজার ছোট প্রকল্প, দেখতে কম আকর্ষণীয়, কিন্তু ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে থাকে, বেশি মানুষের জীবন বদলায়।
বাংলাদেশ প্রথম পথটা বেছে নিয়েছে। ৬০ বিলিয়ন ডলার ঢেলেছে কয়েকটা প্রকল্পে। এই প্রকল্পগুলো শেষ হলে কিছু সুফল আসবে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়: এই টাকা অন্যভাবে খরচ করলে কি আরো বেশি মানুষের জীবন বদলানো যেত?
ফিরে আসি পদ্মা সেতুতে।
সেতুর উপর দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালে পদ্মা নদী বয়ে যাচ্ছে। এই সেতু সত্যিই একটা প্রকৌশল বিস্ময়। বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা, শ্রমিকরা, এটা তৈরি করে দেখিয়েছে যে আমরা পারি। এই গর্ব প্রাপ্য।
কিন্তু সেতুর ওপাশে, বরিশালের একটা গ্রামে, একজন কৃষক এখনো ঋণে জর্জরিত। তার ছেলে ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করে, মাসে ৮,০০০ টাকায়। নিকটতম হাসপাতাল ২০ কিলোমিটার দূরে। স্কুলে শিক্ষক আসে না। বিদ্যুৎ দিনে ৮ ঘণ্টা থাকে।
সেতু হয়েছে। রেল হচ্ছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে। মেট্রো চলছে। কিন্তু সেই কৃষকের জীবন কতটা বদলেছে?
৬০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন কার জন্য? শুধু ঢাকার জন্য? শুধু ঠিকাদারদের জন্য? শুধু পরিসংখ্যানের জন্য? নাকি সেই কৃষকের জন্যও?
উত্তরটা আমরা জানি। কিন্তু স্বীকার করতে চাই না।