মধ্যবিত্ত কোথায়?
পর্ব ১: রিনার হিসাব
রিনা বেগম ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটা দুই রুমের ফ্ল্যাটে থাকে। ভাড়া মাসে ১২,০০০ টাকা। স্বামী একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে, মাসে বেতন ৩৫,০০০ টাকা। রিনা নিজে একটা স্কুলে পড়ায়, মাসে পায় ১৮,০০০ টাকা। দুজন মিলে ৫৩,০০০ টাকা। এই টাকায় দুই সন্তান, বৃদ্ধ শাশুড়ি, ভাড়া, খাবার, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ছেলেমেয়ের স্কুল, সব চালাতে হয়।
রিনা নিজেকে মধ্যবিত্ত বলে। তার বাবা-মাও মধ্যবিত্ত ছিল। কিন্তু বাবা একা চাকরি করে চারজনের সংসার চালাতো, দুই বেলা মাছ-ভাত খেতো, বছরে একবার গ্রামে যেতো, ছেলেমেয়েদের স্কুলের বেতন দিতে কষ্ট হতো না। রিনা আর তার স্বামী দুজন মিলে আয় করে, তবু মাসের শেষে টাকা থাকে না। মাছ কেনে সপ্তাহে দুইদিন। গরুর মাংস কেনে ঈদে। ছেলের প্রাইভেট টিউটরের খরচ দিতে গিয়ে মেয়ের জন্য রাখতে পারে না। সঞ্চয়? শূন্য।
রিনা কি আসলেই মধ্যবিত্ত?
এই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে "মধ্যবিত্ত" শব্দটা সবাই ব্যবহার করে, কিন্তু কেউ সংজ্ঞা দেয় না। সরকার বলে মধ্যবিত্ত বাড়ছে। অর্থনীতিবিদরা বলেন জিডিপি বাড়ছে, মানুষ ধনী হচ্ছে। কিন্তু রিনার জীবনে ধনী হওয়ার কোনো চিহ্ন নেই। বরং তার মা-বাবার চেয়ে তার জীবন কঠিন হচ্ছে।
আসলে কী হচ্ছে? বাংলাদেশের আয় বণ্টনের ছবিটা দেখলে বোঝা যায়। আর সেই ছবি ভয়ংকর।
এই চার্টটা দেখুন:
এটা বাংলাদেশের আয় বণ্টনের বক্ররেখা। আদর্শ অবস্থায় এটা ঘণ্টার মতো দেখায়, মাঝখানে উঁচু (বেশিরভাগ মানুষ মধ্যম আয়ে), দুই প্রান্তে নিচু (কম মানুষ খুব গরিব বা খুব ধনী)। কিন্তু বাংলাদেশের বক্ররেখা দেখুন। বাম দিকে বিশাল একটা ঢিবি (নিম্ন আয়), ডান দিকে ছোট একটা ঢিবি (উচ্চ আয়), আর মাঝখানে? খাদ। মধ্যবিত্ত যেখানে থাকার কথা, সেখানে ফাঁকা।
এটাকে বলে বাইমোডাল ডিস্ট্রিবিউশন। দুটো চূড়া, মাঝে গর্ত। মানে বাংলাদেশে মানুষ হয় গরিব, নয় ধনী। মাঝামাঝি যারা আছে, তারা সংখ্যায় কমছে। দুই মেরুতে ভাগ হয়ে যাচ্ছে সমাজ।
পর্ব ২: সংখ্যার ভাষায়
বৈষম্য মাপার সবচেয়ে পরিচিত মাপকাঠি হলো জিনি সহগ। ০ মানে পুরো সমতা (সবাই সমান আয় করে), ১ মানে পুরো বৈষম্য (একজন সব পায়, বাকিরা শূন্য)। বাস্তবে কোনো দেশ ০ বা ১ এ থাকে না। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো ০.২৫-০.৩০ এর মধ্যে। আমেরিকা ০.৩৯। ব্রাজিল ০.৪৮। দক্ষিণ আফ্রিকা ০.৬৩।
বাংলাদেশ কোথায়? এই চার্টটা দেখুন:
১৯৯১ সালে বাংলাদেশের জিনি সহগ ছিল ০.৩২। মানে তুলনামূলকভাবে সমতাভিত্তিক সমাজ। গরিব ছিল, কিন্তু অতি ধনীও কম ছিল। দারিদ্র্যের সমতা বলতে পারেন। তারপর কী হলো? ২০০০ সালে ০.৩৭। ২০১০ সালে ০.৪৩। ২০১৬ সালে ০.৪৮। আর ২০২৫ এর সর্বশেষ অনুমান? ০.৫০ ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে।
তিন দশকে জিনি সহগ ০.৩২ থেকে ০.৫০। এটা বিশাল লাফ। বাংলাদেশ এখন লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর কাতারে চলে যাচ্ছে, যেসব দেশ ঐতিহাসিকভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বৈষম্যপূর্ণ।
কিন্তু জিনি একটা বিমূর্ত সংখ্যা। আসল ছবিটা আরো স্পষ্ট হয় যখন দেখি কে কত পাচ্ছে।
বাংলাদেশে শীর্ষ ১০% পরিবার মোট জাতীয় আয়ের ৪১% নিয়ে যায়। নিচের ১০%? মাত্র ১.৫%। মানে সবচেয়ে ধনী ১০% মানুষ সবচেয়ে গরিব ১০% এর চেয়ে ২৭ গুণ বেশি আয় করে। আর এই ব্যবধান প্রতি বছর বাড়ছে। ২০০০ সালে শীর্ষ ১০% পেতো ৩৫%। এখন ৪১%। নিচের ১০% পেতো ২.৫%। এখন ১.৫%।
টাকা উপরে যাচ্ছে। নিচ থেকে উপরে। মাঝখান থেকেও উপরে। আর মাঝখানটা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
কিন্তু একটু থামুন। "মধ্যবিত্ত" বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি? রিনা কি মধ্যবিত্ত? তার স্বামীর বস যিনি মাসে দুই লাখ টাকা আয় করেন, তিনি কি মধ্যবিত্ত? নাকি ধনী? এই প্রশ্নের উত্তর না দিলে আলোচনা এগোবে না।
পর্ব ৩: মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা
মধ্যবিত্ত সংজ্ঞায়িত করা সোজা না। বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন সংজ্ঞা দেয়।
বিশ্বব্যাংক বলে দৈনিক ৬.৮৫-২১.৭০ ডলার (PPP) আয় করলে আপনি মধ্যবিত্ত। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) বলে ২-২০ ডলার। পিউ রিসার্চ বলে ১০-২০ ডলার। বাংলাদেশের হিসাবে (BBS-HIES) মাসিক পারিবারিক আয় ৩০,০০০-১,০০,০০০ টাকা হলে আপনি মধ্যবিত্ত।
সমস্যাটা দেখছেন? সংজ্ঞা অনুযায়ী মধ্যবিত্তের আকার বদলে যায়। ADB-র ২ ডলারের সংজ্ঞায় বাংলাদেশের ৬০% মানুষ "মধ্যবিত্ত"। বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞায় ২০%। পিউ-র সংজ্ঞায় মাত্র ৫%।
সরকার যখন বলে "মধ্যবিত্ত বাড়ছে", তখন কোন সংজ্ঞা ব্যবহার করে? সাধারণত ADB-র নিচু সীমা। দিনে ২ ডলার মানে মাসে ৬,০০০ টাকা (PPP)। এটাকে "মধ্যবিত্ত" বলা প্রায় হাস্যকর। দিনে ২ ডলারে ঢাকায় একবেলা খাওয়া যায়, দুই বেলা না।
বাস্তবসম্মত সংজ্ঞা যদি ধরি, যেমন বিশ্বব্যাংকের ৬.৮৫ ডলার, তাহলে বাংলাদেশে প্রকৃত মধ্যবিত্তের আকার কত? আর সেটা বাড়ছে না কমছে? এই চার্টটা দেখুন:
বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞায় বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের আকার ২০১০ সালে ছিল জনসংখ্যার প্রায় ১২%। ২০১৬ তে বেড়ে হয়েছিল ২০%। কিন্তু তারপর? ২০২০ তে কোভিডের ধাক্কায় নেমে গেছে ১৫% এ। ২০২৫ এ কিছুটা সামলেছে, ১৮%। কিন্তু ২০১৬ এর শীর্ষবিন্দু আর ফিরে আসেনি।
মানে কী দাঁড়ালো? জিডিপি বেড়েছে, প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬-৭% হারে, কিন্তু মধ্যবিত্ত বাড়েনি। প্রবৃদ্ধির সুফল কে পাচ্ছে? শীর্ষ ১০%। বাকি ৯০% হয় স্থির আছে, নয় পিছিয়ে যাচ্ছে।
আর একটা জিনিস লক্ষ করুন। "মধ্যবিত্ত" হওয়া আর মধ্যবিত্তের মতো বাঁচা এক কথা না। আয় বাড়লেও যদি খরচ আরো দ্রুত বাড়ে, তাহলে আয়ের সংখ্যা দিয়ে কিছু বোঝা যায় না। আর ঠিক এটাই হচ্ছে বাংলাদেশে।
পর্ব ৪: চেপে ধরা
রিনার কথা মনে আছে? মাসে ৫৩,০০০ টাকা আয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে সে মধ্যবিত্তের সীমানায় পড়ে। কিন্তু তার জীবনে মধ্যবিত্তের চিহ্ন কোথায়?
সমস্যাটা একটা শব্দে বলা যায়: ভোগ সংকোচন। আয় বাড়ছে, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় আরো দ্রুত বাড়ছে। ফলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে।
২০১০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় বেড়েছে প্রায় ১৫০%। কিন্তু একই সময়ে খাদ্যমূল্য বেড়েছে ১৯০%। বাড়ি ভাড়া বেড়েছে ২২০%। শিক্ষা খরচ বেড়েছে ২৮০%। স্বাস্থ্য খরচ বেড়েছে ২৫০%। মানে আয়ের চেয়ে খরচ দ্রুত বেড়েছে, প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ খাতে।
রিনার বাবা ১৯৯৫ সালে মাসে ৮,০০০ টাকা আয় করতো। বাড়ি ভাড়া ছিল ১,৫০০ টাকা। আয়ের ১৯%। রিনা এখন ৫৩,০০০ টাকা আয় করে, ভাড়া ১২,০০০ টাকা। আয়ের ২৩%। আয় ছয় গুণ বেড়েছে, কিন্তু ভাড়ার বোঝা শতাংশের হিসাবে আরো ভারী হয়েছে।
আর এটা শুধু ভাড়া না। শিক্ষা খরচ দেখুন। রিনার বাবা সরকারি স্কুলে পড়িয়েছে, খরচ প্রায় শূন্য। রিনা সরকারি স্কুলে ভর্তি করেছে ঠিকই, কিন্তু শিক্ষার মান এতটা খারাপ যে প্রাইভেট টিউটর ছাড়া উপায় নেই। প্রতি মাসে দুই সন্তানের টিউটরে যায় ৮,০০০ টাকা। স্বাস্থ্যও তাই। সরকারি হাসপাতালে যায়, কিন্তু ওষুধ কিনতে হয় বাইরে থেকে, পরীক্ষা করাতে হয় প্রাইভেট ল্যাবে। বাবার সময়ে এত খরচ ছিল না।
এবার এটাকে একটু বড় পরিসরে দেখুন:
এটা বাংলাদেশে আয় বনাম জীবনযাত্রার ব্যয়ের সূচক। ২০১০ কে ১০০ ধরলে, ২০২৫ এ মাথাপিছু আয় সূচক ২৫০। কিন্তু মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় সূচক ৩২০। মানে আয় আড়াই গুণ বেড়েছে, কিন্তু খরচ বেড়েছে তিন গুণের বেশি। ফাঁকটা দেখুন। এই ফাঁক প্রতি বছর চওড়া হচ্ছে। এই ফাঁকের মধ্যেই মধ্যবিত্ত হারিয়ে যাচ্ছে।
আর সম্পদের কেন্দ্রীভবন? সেটা আরো ভয়ংকর।
বাংলাদেশে শীর্ষ ১% পরিবারের কাছে আছে মোট জাতীয় সম্পদের ১৬%। শীর্ষ ৫% এর কাছে ৩৮%। শীর্ষ ১০% এর কাছে ৫৫%। মানে দেশের অর্ধেকের বেশি সম্পদ মাত্র ১০% মানুষের হাতে। বাকি ৯০% ভাগাভাগি করছে বাকি ৪৫%। আর নিচের ৫০%? তাদের কাছে মোট সম্পদের মাত্র ৮%।
জমি দেখুন। ঢাকায় একটা ৩ কাঠার প্লটের দাম এখন ২-৩ কোটি টাকা। একজন সাধারণ চাকরিজীবী সারাজীবন আয় করলেও এটা কিনতে পারবে না। কিন্তু কিছু পরিবারের কাছে ঢাকায় শত শত প্লট আছে। এই সম্পদ পুরুষানুক্রমে বাড়ছে, কর দিতে হচ্ছে না (বাংলাদেশে সম্পদ কর নেই), আর বৈষম্য আরো গভীর হচ্ছে।
পর্ব ৫: বাকিরা কী করছে?
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় সমান দুটো দেশ আছে: ভিয়েতনাম আর ভারত (মাথাপিছু আয়ের হিসাবে)। তাদের মধ্যবিত্ত কেমন আছে?
ভিয়েতনামে প্রকৃত মধ্যবিত্ত (বিশ্বব্যাংক সংজ্ঞায়) ২০১০ সালে ছিল ১০%। ২০২৫ এ ৩২%। তিন গুণ বেড়েছে। ভারতে ১৫% থেকে ৩১% হয়েছে। থাইল্যান্ডে ৩৫% থেকে ৪৫%। ইন্দোনেশিয়ায় ১৫% থেকে ২৫%।
আর বাংলাদেশ? ১২% থেকে ১৮%। সবচেয়ে কম বৃদ্ধি। জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ এই দেশগুলোর সমান বা বেশি। কিন্তু মধ্যবিত্ত তৈরিতে সবার পেছনে। কেন?
ভিয়েতনাম কী করেছে? তিনটা জিনিস। এক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করেছে। ভিয়েতনাম জিডিপির ৫.৫% শিক্ষায় ব্যয় করে, বাংলাদেশ করে ২%। দুই, শিল্পায়ন করেছে। স্যামসাং, ইন্টেল, ফক্সকনের মতো কোম্পানি ভিয়েতনামে কারখানা বসিয়েছে। উচ্চ বেতনের চাকরি তৈরি হয়েছে। তিন, দুর্নীতি কমিয়েছে। ভিয়েতনামের "ব্লেজিং ফার্নেস" দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে মন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে।
ভারত কী করেছে? ডিজিটাল পরিকাঠামো তৈরি করেছে। UPI (ইউনিফায়েড পেমেন্ট ইন্টারফেস) দিয়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়িয়েছে। GST দিয়ে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি আনুষ্ঠানিক করেছে। IT ও সেবা খাতে লাখ লাখ মধ্যবিত্ত চাকরি তৈরি করেছে।
আর বাংলাদেশ? গার্মেন্টস দিয়ে দারিদ্র্য কমিয়েছে, এটা সত্য। কিন্তু গার্মেন্টস নিম্ন-বেতনের চাকরি দেয়। দারিদ্র্যরেখার উপরে তোলে, কিন্তু মধ্যবিত্তে পৌঁছায় না। দেশে বৈচিত্র্যময় শিল্প তৈরি হয়নি। আইটি সেক্টর ক্ষুদ্র। দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে না। আর প্রবৃদ্ধির ফল কুক্ষিগত হচ্ছে একটা ছোট গোষ্ঠীর কাছে।
আর সবচেয়ে ভয়ের কথা? গরিব থেকে মধ্যবিত্ত হওয়ার সিঁড়িটা ভেঙে পড়ছে।
এটা আন্তঃপ্রজন্ম আয় গতিশীলতার চিত্র। ১৯৯০ এর দশকে বাংলাদেশে নিচের ২০% পরিবারের সন্তানদের ৩৫% পরবর্তী প্রজন্মে মধ্যবিত্তে উঠতে পারতো। ২০০০ এর দশকে এটা ছিল ২৮%। ২০১০ এর দশকে ২০%। আর ২০২০ এর দশকে? মাত্র ১৫%।
মানে গরিব পরিবারে জন্ম নিলে মধ্যবিত্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রতি দশকে কমছে। সিঁড়ি ভাঙছে। সমাজ জমাট বাঁধছে। যে যেখানে আছে, সেখানেই আটকে যাচ্ছে।
কেন? কারণ উপরে ওঠার পথগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ভালো শিক্ষা ব্যয়বহুল হচ্ছে। সরকারি চাকরিতে ঘুষ ছাড়া ঢোকা যায় না, ১০-২০ লাখ টাকা লাগে। ব্যবসা শুরু করতে হলে "যোগাযোগ" লাগে। জমি কেনা অসম্ভব হচ্ছে। আর রাজনৈতিক সংযোগ ছাড়া কিছুই হয় না।
পর্ব ৬: এখন কী করবেন?
আসুন একটু সৎ হই।
বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত হারিয়ে যাচ্ছে। জিডিপি বাড়ছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি শীর্ষ ১০% এর পকেটে যাচ্ছে। আয় বৈষম্য লাতিন আমেরিকার পর্যায়ে পৌঁছেছে। মধ্যবিত্ত যেটুকু ছিল, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি তাকে চেপে ধরছে। আর গরিব থেকে উপরে ওঠার সিঁড়ি ভেঙে পড়ছে।
এটা শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা না। মধ্যবিত্ত হলো সমাজের মেরুদণ্ড। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সুশাসন, এসব টিকে থাকে মধ্যবিত্তের জোরে। মধ্যবিত্ত ভোটার, করদাতা, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, ডাক্তার, সাংবাদিক। মধ্যবিত্ত সংকুচিত হলে গণতন্ত্রও সংকুচিত হয়। ইতিহাস সাক্ষী: যেসব দেশে মধ্যবিত্ত দুর্বল, সেসব দেশে কর্তৃত্ববাদ শক্তিশালী।
কী করা যায়? তিনটা জিনিস। অন্য দেশে পরীক্ষিত, বাস্তবসম্মত।
এক, প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা। বাংলাদেশে সম্পদ কর নেই। উত্তরাধিকার কর নেই। মূলধন লাভ কর (ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স) প্রায় নেই। ধনীরা সম্পদ জমাচ্ছে, কর দিচ্ছে না। অথচ সাধারণ মানুষ ভ্যাটের মাধ্যমে প্রতিটা পণ্যে কর দিচ্ছে। এটা উল্টাতে হবে। সম্পদ কর চালু করুন, শীর্ষ ১% এর ওপর। বাড়তি রাজস্ব দিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করুন। এটা ক্ষমতাসীনদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, জানি। কিন্তু বিকল্প কী? সমাজ ভেঙে পড়া?
দুই, শিক্ষা ও দক্ষতায় বিনিয়োগ। বাংলাদেশ জিডিপির ২% শিক্ষায় ব্যয় করে। এটা পৃথিবীর সর্বনিম্নগুলোর একটা। অন্তত ৪% এ নিতে হবে। কিন্তু শুধু টাকা ঢাললেই হবে না। শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। আইটি, ইলেকট্রনিক্স, হেলথকেয়ার, এসব খাতে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। ভিয়েতনাম যেভাবে স্যামসাংয়ের জন্য দক্ষ শ্রমিক তৈরি করেছে, বাংলাদেশকেও সেই পথে যেতে হবে।
তিন, বৈচিত্র্যময় শিল্পায়ন। গার্মেন্টস দারিদ্র্য কমায়, কিন্তু মধ্যবিত্ত তৈরি করে না। ইলেকট্রনিক্স, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি সেবা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, এসব খাতে শিল্পায়ন দরকার। এগুলো উচ্চ মূল্য সংযোজনের খাত। এখানে বেতন বেশি। এখানে মধ্যবিত্ত তৈরি হয়।
এসব কি হবে? সৎ উত্তর: কঠিন। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় যারা লাভবান, ক্ষমতায়ও তারাই। শীর্ষ ১০% সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দুটোই ধরে রেখেছে। তারা কেন নিজেদের ওপর কর বসাবে? কেন ব্যবস্থা বদলাবে?
কিন্তু ইতিহাস একটা জিনিস বারবার দেখিয়েছে। যেসব দেশ মধ্যবিত্ত তৈরি করেনি, সেসব দেশ স্থিতিশীল থাকেনি। দুই মেরুর সমাজ ভেঙে পড়ে। প্রশ্ন শুধু কখন।
রিনা আজ রাতে মোহাম্মদপুরের সেই ছোট ফ্ল্যাটে বসে হিসাব করবে। মাসের বাজার কত হলো, ছেলের টিউশন ফি দিতে পারবে কিনা, শাশুড়ির ওষুধের টাকা জোগাড় হবে কিনা। সে নিজেকে মধ্যবিত্ত বলে। কিন্তু সংখ্যা বলছে, তার মতো মানুষ কমছে। মধ্যবিত্ত হারিয়ে যাচ্ছে। আর কেউ খুঁজছে না।