Back to publications
Narrative 2026-03-06

মোটরসাইকেলে বদলে গেছে গ্রাম

৫ লাখ থেকে ৪০ লাখ: দুই চাকায় অর্থনৈতিক বিপ্লব

মোটরসাইকেলে বদলে গেছে গ্রাম

পর্ব ১: দুই চাকার গল্প

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা। সকাল সাতটা। আমিনুল হকের বয়স ৩৫। সে একজন সবজি ব্যবসায়ী। প্রতিদিন ভোরে নিজের জমি থেকে শাক, টমেটো, লাউ তুলে বাজারে নিয়ে যায়। দশ বছর আগে এই কাজটা করতে তাকে ভ্যানগাড়িতে দুই ঘণ্টা লাগতো। এখন? মোটরসাইকেলের পেছনে বস্তা বেঁধে ত্রিশ মিনিটে পৌঁছে যায়। বাকি দেড় ঘণ্টায় সে আরেকটা ট্রিপ দিতে পারে, অথবা অন্য কাজ করতে পারে।

আমিনুলের মোটরসাইকেলটা একটা চায়না বাইক। দাম দিয়েছে ৮৫,০০০ টাকা, কিস্তিতে। মাসে কিস্তি ৩,৫০০ টাকা। পেট্রল লাগে দিনে ১০০-১৫০ টাকা। কিন্তু এই মোটরসাইকেলটা তার আয় বাড়িয়ে দিয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আগে দিনে একবার বাজারে যেতে পারতো, এখন দুইবার। আগে শুধু গোদাগাড়ী বাজারে বিক্রি করতো, এখন রাজশাহী শহরেও যায়, যেখানে দাম ভালো পায়।

কিন্তু এত কিছুর পরেও মোটরসাইকেলের সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থনৈতিক না।
প্রায় ১২ লাখ মানুষ
দুই চাকায় অর্থনীতি
২০ লাখ মানুষ
রক্তের দাম
১৭ কোটি মানুষ
সামনের রাস্তা

আমিনুল একা না। তার গ্রামে প্রায় প্রতিটা পরিবারে কমপক্ষে একটা মোটরসাইকেল আছে। পাঁচ বছর আগে ছিল হাতে গোনা কয়েকটা। এখন রাস্তায় বের হলে চারদিকে মোটরসাইকেল। স্কুলের শিক্ষক মোটরসাইকেলে আসেন। ডাক্তার মোটরসাইকেলে রোগী দেখতে যান। কৃষক মোটরসাইকেলে সার আনেন। এমনকি বিয়ের বরযাত্রী এখন মোটরসাইকেলে যায়।

বাংলাদেশে গত পনেরো বছরে যে পরিবর্তনটা সবচেয়ে নীরবে, কিন্তু সবচেয়ে গভীরভাবে গ্রামীণ জীবন বদলে দিয়েছে, সেটা গার্মেন্টস না, মোবাইল ফোন না, বিকাশ না। সেটা মোটরসাইকেল।

এই চার্টটা দেখুন:

২০০৮ সালে বাংলাদেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল ছিল প্রায় ৫ লাখ। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। সতেরো বছরে আট গুণ বৃদ্ধি। বাংলাদেশের পরিবহন খাতে এত দ্রুত বৃদ্ধি আর কোনো যানবাহনে হয়নি। বাস বাড়েনি, ট্রেন বাড়েনি, এমনকি রিকশাও কমেছে অনেক জায়গায়। কিন্তু মোটরসাইকেল? প্রতি বছর গড়ে ৩-৪ লাখ নতুন মোটরসাইকেল রাস্তায় নামছে।

কেন এই বিস্ফোরণ? তিনটা কারণ। প্রথমত, দাম কমেছে। চায়না ও ভারতীয় ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল ৭০,০০০-১,২০,০০০ টাকায় পাওয়া যায়। কিস্তিতে কিনলে মাসে ৩,০০০-৫,০০০ টাকা। একজন দিনমজুরও এটা বহন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, গ্রামের রাস্তা ভালো হয়েছে। এলজিইডি (স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর) গত দুই দশকে প্রায় ১ লাখ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক পাকা করেছে। মোটরসাইকেল চলার মতো রাস্তা না থাকলে শুধু দাম কমলেও কাজ হতো না। তৃতীয়ত, গণপরিবহনের বিকল্প নেই। গ্রামে বাস নেই, অটোরিকশা সব জায়গায় পৌঁছায় না, সিএনজি ব্যয়বহুল। মোটরসাইকেল হলো নিজের যানবাহন, নিজের সময়সূচি, নিজের স্বাধীনতা।

কিন্তু মোটরসাইকেল শুধু যাতায়াতের বাহন না। এটা একটা অর্থনৈতিক হাতিয়ার। আর এই কথাটা বুঝতে হলে আমাদের তাকাতে হবে গ্রামীণ অর্থনীতির গভীরে।


পর্ব ২: দুই চাকায় অর্থনীতি

অর্থনীতিবিদরা "মার্কেট অ্যাকসেস" নিয়ে কথা বলেন। একজন কৃষক তার ফসলের ন্যায্য দাম পায় কি না, সেটা নির্ভর করে সে কতগুলো বাজারে যেতে পারে তার উপর। যদি শুধু একটা স্থানীয় হাটে বিক্রি করতে হয়, মধ্যস্বত্বভোগী দাম ঠিক করে দেবে। কিন্তু যদি তিনটা বাজারে যেতে পারে, সে সবচেয়ে ভালো দাম বেছে নিতে পারে। মোটরসাইকেল এই মার্কেট অ্যাকসেস বদলে দিয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মোটরসাইকেল মালিক কৃষক পরিবারের গড় আয় মোটরসাইকেলবিহীন পরিবারের তুলনায় ২৫-৩৫% বেশি। এর কারণ শুধু ফসল বিক্রি না। মোটরসাইকেল থাকলে স্বাস্থ্যসেবায় দ্রুত যাওয়া যায়, ছেলেমেয়েকে দূরের ভালো স্কুলে পাঠানো যায়, জরুরি পরিস্থিতিতে সময়মতো পৌঁছানো যায়। একটা মোটরসাইকেল একটা পরিবারের পুরো সক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।

কিন্তু মোটরসাইকেলের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব এসেছে সম্পূর্ণ নতুন একটা খাত থেকে: রাইড-শেয়ারিং।

২০১৬ সালে পাঠাও চালু হলো। তারপর এলো উবার মোটো, ওবন, সহজ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল রাইড-শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত রাইডার প্রায় ৮ লাখ। এদের বেশিরভাগ তরুণ, ১৮-৩০ বছর বয়সী। অনেকে ছাত্র, পার্টটাইম রাইড দেয়। অনেকে বেকার ছিল, এখন পুরোদস্তুর রাইডার। মাসে আয় ১৫,০০০-২৫,০০০ টাকা। ঢাকায় ভালো রাইডার মাসে ৩০,০০০ টাকাও আয় করে।

এটা শুধু ঢাকার গল্প না। চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, প্রায় সব বিভাগীয় শহরে এবং অনেক জেলা শহরে মোটরসাইকেল রাইড-শেয়ারিং চালু হয়েছে। মফস্বলে যেখানে উবার বা পাঠাও নেই, সেখানে অ্যাপ ছাড়াই "বাইক ভাড়া" চলে। বাসস্ট্যান্ডে, রেলস্টেশনে, হাসপাতালের সামনে মোটরসাইকেল দাঁড়িয়ে থাকে, যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করে।

মোটরসাইকেল সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি করেছে প্রায় ১২ লাখ মানুষের জন্য। রাইড-শেয়ারিং রাইডার ৮ লাখ। মেকানিক ও সার্ভিসিং সেন্টার চালান প্রায় ২ লাখ মানুষ। পার্টস ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশের ব্যবসায় আরো ১ লাখ। ডিলারশিপ, শোরুম, এজেন্ট মিলিয়ে আরো ১ লাখ। পরোক্ষ কর্মসংস্থান ধরলে সংখ্যাটা ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। একটা মাত্র পণ্য, দুই চাকার একটা যানবাহন, ২০ লাখ মানুষের জীবিকা দিচ্ছে।

কিন্তু এই মোটরসাইকেলগুলো কোথা থেকে আসছে? বাংলাদেশ কি নিজে তৈরি করছে? উত্তরটা জটিল।


পর্ব ৩: আমদানি ও শিল্প

বাংলাদেশ মোটরসাইকেল তৈরি করে না, এটা বললে পুরোপুরি সত্য হবে না। বাংলাদেশে এখন কয়েকটা কোম্পানি মোটরসাইকেল "অ্যাসেম্বল" করে। বাজাজ, হিরো, টিভিএস, হোন্ডা, ইয়ামাহা, এরা সবাই ভারত বা জাপান থেকে যন্ত্রাংশ এনে বাংলাদেশে জোড়া লাগায়। স্থানীয় সংযোজনের হার (local content) মাত্র ১৫-২৫%। মানে মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন, ইলেকট্রনিক্স, ফ্রেমের বড় অংশ আমদানি। বাংলাদেশে হয় শুধু চাকা, সিট, প্লাস্টিকের কভার, আর ফাইনাল অ্যাসেম্বলি।

তার মানে প্রতিটা মোটরসাইকেল বিক্রির সাথে সাথে বিদেশে ডলার যাচ্ছে। কত যাচ্ছে?

২০১০ সালে মোটরসাইকেল ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ব্যয় ছিল প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে সেটা প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার। ছয় গুণ বৃদ্ধি। এই ১.২ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশের মোট আমদানি ব্যয়ের প্রায় ১.৫%। শুনতে ছোট লাগে, কিন্তু এটা পুরো চা রপ্তানি আয়ের চেয়ে বেশি।

প্রশ্ন হলো: বাংলাদেশ কি নিজে মোটরসাইকেল তৈরি করতে পারে? ভিয়েতনাম পেরেছে। ২০০০ সালের দিকে ভিয়েতনামে চায়না মোটরসাইকেল ঢুকলো, ঠিক বাংলাদেশের মতো। কিন্তু ভিয়েতনাম সরকার একটা কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিলো: শুধু আমদানি না, উৎপাদন করো। আজ ভিয়েতনামে হোন্ডা, ইয়ামাহা, পিয়াজিও সবার কারখানা আছে। স্থানীয় সংযোজনের হার ৮০-৯০%। ভিয়েতনাম মোটরসাইকেল রপ্তানিও করে। বাংলাদেশ এখনো ১৫-২৫% স্থানীয় সংযোজনে আটকে আছে।

মোটরসাইকেলের দাম নিয়ে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা আছে:

গত দশ বছরে মোটরসাইকেলের দাম আসলে কমেনি, বরং বেড়েছে। ২০১৫ সালে একটা এন্ট্রি-লেভেল ১০০সিসি মোটরসাইকেল পাওয়া যেত ৬০,০০০-৭০,০০০ টাকায়। ২০২৫ সালে একই ক্যাটাগরির বাইকের দাম ৮৫,০০০-১,১০,০০০ টাকা। কারণ? ডলারের বিপরীতে টাকার দাম কমেছে (২০১৫ সালে ১ ডলার ছিল ৭৮ টাকা, ২০২৫ সালে ১২০+ টাকা), আমদানি শুল্ক বেড়েছে, আর কাঁচামালের দাম বেড়েছে। তবুও মানুষ কিনছে, কারণ বিকল্প নেই। গণপরিবহন যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে মোটরসাইকেল ছাড়া চলে না।

আর জ্বালানি? মোটরসাইকেলের সবচেয়ে বড় চলমান খরচ পেট্রল।

বাংলাদেশে ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল খাতে পেট্রল ব্যবহার প্রায় ১.৮ বিলিয়ন লিটার। এটা দেশের মোট পেট্রল ব্যবহারের প্রায় ৬৫%। হ্যাঁ, বাংলাদেশে যত পেট্রল পোড়ে তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পোড়ে মোটরসাইকেলে। এই পেট্রল পুরোটাই আমদানি করা। ২০২৫ সালে শুধু মোটরসাইকেলের জ্বালানি বাবদ আমদানি ব্যয় প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার। মোটরসাইকেল ও তার যন্ত্রাংশ আমদানি (১.২ বিলিয়ন) আর জ্বালানি (১.৫ বিলিয়ন) মিলিয়ে মোটরসাইকেল খাতে মোট বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় প্রায় ২.৭ বিলিয়ন ডলার। এটা বাংলাদেশের মোট গার্মেন্টস রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬%।

কিন্তু এত কিছুর পরেও মোটরসাইকেলের সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থনৈতিক না। সমস্যাটা রাস্তায়। আর সেই সমস্যার নাম দুর্ঘটনা।


পর্ব ৪: রক্তের দাম

২০২৪ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে প্রায় ৬,৫০০ মানুষ। এর মধ্যে মোটরসাইকেল-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় মৃত্যু প্রায় ২,৮০০, মানে মোট সড়ক মৃত্যুর ৪৩%। দশ বছর আগে এই অনুপাত ছিল ২০%। মোটরসাইকেলের সংখ্যা যত বেড়েছে, মৃত্যুও তত বেড়েছে। কিন্তু মৃত্যুর হার মোটরসাইকেলের সংখ্যা বৃদ্ধির চেয়েও দ্রুত বেড়েছে।

কেন? কারণগুলো জানা, কিন্তু সমাধান হয়নি। প্রথমত, হেলমেট ব্যবহার। আইনে বাধ্যতামূলক, বাস্তবে মানা হয় না। গ্রামে হেলমেট পরার হার মাত্র ১৫-২০%। শহরে কিছুটা বেশি, প্রায় ৪০%। তুলনায় ভিয়েতনামে হেলমেট পরার হার ৯০% এর বেশি, কারণ সেখানে ২০০৭ সালে কঠোর আইন প্রয়োগ শুরু হয়েছিল এবং প্রথম বছরেই মোটরসাইকেল মৃত্যু ১৮% কমে গিয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, লাইসেন্স। বাংলাদেশে মোটরসাইকেল চালকদের প্রায় ৬০% এর বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। তারা চালাতে "শিখেছে" বন্ধু বা আত্মীয়ের কাছ থেকে, কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই। ট্রাফিক আইন জানে না, রাতে হেডলাইট জ্বালায় না, ভুল দিক দিয়ে চলে, ওভারটেক করে বিপদ ডেকে আনে।

তৃতীয়ত, অবকাঠামো। বাংলাদেশের রাস্তা মোটরসাইকেলের জন্য ডিজাইন করা হয়নি। কোনো আলাদা লেন নেই, কোনো গার্ডরেল নেই, রাস্তার পাশে গভীর খাদ থাকে, ম্যানহোলের ঢাকনা নেই। ট্রাক, বাস, রিকশা, মোটরসাইকেল, পথচারী, সবাই একই রাস্তায়, একই লেনে। এটা মৃত্যুর রেসিপি।

এখন একটা আন্তর্জাতিক তুলনা দেখা যাক:

ভিয়েতনাম আর ইন্দোনেশিয়া, দুটো দেশেই মোটরসাইকেল বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। ভিয়েতনামে ৭ কোটি, ইন্দোনেশিয়ায় ১৩ কোটি মোটরসাইকেল। কিন্তু প্রতি লাখ মোটরসাইকেলে মৃত্যুর হার বাংলাদেশে অনেক বেশি। ভিয়েতনামে প্রতি লাখ মোটরসাইকেলে মৃত্যু প্রায় ১২, ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৫, আর বাংলাদেশে? প্রায় ৭০। পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি।

কারণ ওই দেশগুলো মোটরসাইকেলকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করেছে। ভিয়েতনাম হেলমেট আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করেছে। ইন্দোনেশিয়া মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা লেন তৈরি করেছে বড় শহরগুলোতে। থাইল্যান্ড মোটরসাইকেল ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করেছে। বাংলাদেশ? বাংলাদেশ মোটরসাইকেলকে একটা সমস্যা হিসেবে দেখে, সমাধান হিসেবে না। নীতিনির্ধারকদের কাছে মোটরসাইকেল মানে "যানজট", "দুর্ঘটনা", "শব্দদূষণ"। কিন্তু ৪০ লাখ মোটরসাইকেল রাস্তায়, ২০ লাখ মানুষের জীবিকা এর সাথে জড়িত, এটা উপেক্ষা করার উপায় নেই।

প্রতিটা মোটরসাইকেল মৃত্যুর পেছনে একটা পরিবারের ভেঙে পড়ার গল্প আছে। ২৮ বছরের একজন রাইড-শেয়ারিং রাইডার যখন ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে মারা যায়, তার পেছনে থাকে একজন স্ত্রী, দুটো ছোট বাচ্চা, আর বাইক কেনার কিস্তির ঋণ। বাংলাদেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত-নিহতদের কোনো বিমা নেই, কোনো ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা নেই, রাইড-শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর কোনো দায় নেই।

এটা শুধু দুঃখের গল্প না। এটা অর্থনৈতিক ক্ষতিও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতি জিডিপির প্রায় ২-৩%। এর একটা বড় অংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা থেকে আসে।


পর্ব ৫: অন্যরা কী করেছে?

ভিয়েতনাম আর ইন্দোনেশিয়ার গল্প বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা ঠিক একই পথ দিয়ে গেছে, কিন্তু অনেক আগে।

ভিয়েতনামে ১৯৯০-এর দশকে মোটরসাইকেল বিপ্লব শুরু হয়। সস্তা চায়না বাইক বাজার দখল করলো। ২০০০ সালের মধ্যে মোটরসাইকেল হয়ে গেলো মূল পরিবহন। তারপর কী হলো? ভিয়েতনাম সরকার তিনটা কাজ করলো। এক: হোন্ডা, ইয়ামাহা, পিয়াজিওকে স্থানীয় উৎপাদনে আনলো। কারখানা বসালো, কর্মসংস্থান হলো, রপ্তানি শুরু হলো। দুই: ২০০৭ সালে হেলমেট আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করলো। প্রথম দুই মাসে ২০ লাখ জরিমানা দিলো। মৃত্যু কমলো নাটকীয়ভাবে। তিন: শহরগুলোতে মোটরসাইকেল-বান্ধব অবকাঠামো তৈরি করলো, পার্কিং, লেন, সিগন্যাল।

ইন্দোনেশিয়ায়? একই রকম। জাকার্তায় মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা লেন আছে। Go-Jek, ইন্দোনেশিয়ার রাইড-শেয়ারিং জায়ান্ট, এখন ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের কোম্পানি। তারা শুধু রাইড-শেয়ারিং করে না, খাবার ডেলিভারি, পার্সেল ডেলিভারি, পেমেন্ট, সব করে। একটা মোটরসাইকেল অ্যাপ থেকে তৈরি হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় টেক কোম্পানি।

বাংলাদেশে মোটরসাইকেল এখন মোট নিবন্ধিত যানবাহনের ৬৫% এর বেশি। এটাই দেশের প্রধান পরিবহন মাধ্যম। কিন্তু জাতীয় পরিবহন নীতিতে মোটরসাইকেলের জন্য কোনো আলাদা অধ্যায় নেই। সড়ক নকশায় মোটরসাইকেল লেনের কোনো বিধান নেই। রাইড-শেয়ারিং নিয়ন্ত্রণের কোনো পূর্ণাঙ্গ আইন নেই। মোটরসাইকেল শিল্পনীতি বলে কিছু নেই।


পর্ব ৬: সামনের রাস্তা

বাংলাদেশে মোটরসাইকেল আর ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। ৪০ লাখ মোটরসাইকেল রাস্তায় আছে, প্রতি বছর আরো ৩-৪ লাখ যোগ হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৬০-৭০ লাখ হবে। প্রশ্ন হলো: আমরা কি এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে পরিকল্পনা করবো, নাকি চোখ বুজে থাকবো আর প্রতি বছর আরো হাজার হাজার মানুষ মরবে?

তিনটা কাজ করতে হবে।

প্রথমত, নিরাপত্তা। ভিয়েতনাম মডেল অনুসরণ করে হেলমেট আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। শুধু আইন না, প্রয়োগ। প্রথম ছয় মাস নিরবচ্ছিন্ন অভিযান চালাতে হবে। এই একটা পদক্ষেপেই মোটরসাইকেল মৃত্যু ১৫-২০% কমানো সম্ভব। সাথে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, তবে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক রাখতে হবে। মোবাইল অ্যাপে লাইসেন্সের জন্য আবেদন, কাছের সেন্টারে ব্যবহারিক পরীক্ষা, সবমিলিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে লাইসেন্স পাওয়া যাবে এমন ব্যবস্থা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, শিল্প। বাংলাদেশকে মোটরসাইকেল আমদানিকারক থেকে উৎপাদক হতে হবে। ভিয়েতনাম যেভাবে হোন্ডা আর ইয়ামাহার কারখানা টেনে এনেছে, বাংলাদেশও পারে। ১৭ কোটি মানুষের বাজার, প্রতি বছর ৩-৪ লাখ ইউনিটের চাহিদা, সস্তা শ্রম, এগুলো সবই আকর্ষণ। শুধু দরকার একটা পরিষ্কার শিল্পনীতি: ১০ বছরের মধ্যে স্থানীয় সংযোজনের হার ৭০% এ নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য, কর সুবিধা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি বরাদ্দ।

আর সবচেয়ে বড় সুযোগ? ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল। বাংলাদেশ যদি এখনই ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলে বিনিয়োগ শুরু করে, দ্বিতীয় প্রজন্মের মোটরসাইকেল বিপ্লবে সে এগিয়ে থাকতে পারে। পেট্রল আমদানি বাবদ বছরে ১.৫ বিলিয়ন ডলার বাঁচবে। কার্বন নিঃসরণ কমবে। আর ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলের প্রযুক্তি সহজ, ব্যাটারি আর মোটর, এটা পেট্রল ইঞ্জিনের চেয়ে কম জটিল, স্থানীয়ভাবে তৈরি করা সহজ।

তৃতীয়ত, রাইড-শেয়ারিং নিয়ন্ত্রণ। ৮ লাখ রাইডারের কোনো সামাজিক সুরক্ষা নেই। কোনো স্বাস্থ্য বিমা নেই। দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের কোনো ব্যবস্থা নেই। তারা "গিগ ওয়ার্কার", মানে কোনো কোম্পানির কর্মচারী না, তাই কোনো শ্রম আইনের আওতায় পড়ে না। ইন্দোনেশিয়া এই সমস্যার সমাধান করেছে: Go-Jek রাইডারদের বীমা দেয়, দুর্ঘটনা তহবিল আছে, ন্যূনতম আয়ের গ্যারান্টি আছে। বাংলাদেশে পাঠাও বা উবার কোনো রাইডারকে কোনো সুরক্ষা দেয় না।

আমিনুল হক, গোদাগাড়ীর সেই সবজি ব্যবসায়ী, তার মোটরসাইকেলটা তার জীবন বদলে দিয়েছে। তার আয় বেড়েছে, তার ছেলেমেয়ে ভালো স্কুলে যাচ্ছে, তার পরিবারের খাবারে প্রোটিন বেড়েছে। কিন্তু গত বছর তার পাশের বাড়ির ছেলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছে। ২২ বছর বয়স, সদ্য বিয়ে হয়েছিল। হেলমেট পরেনি, রাতে রাস্তায় একটা গর্তে পড়ে পিছলে গেছে, পেছন থেকে ট্রাক এসেছে।

মোটরসাইকেল বাংলাদেশের গ্রামকে বদলে দিয়েছে, এটা সত্য। কিন্তু এই বদলের দাম আমরা রক্ত দিয়ে শোধ করছি। সেই দাম কমানো যায়। অন্য দেশ দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে। শুধু দরকার একটু মনোযোগ, একটু পরিকল্পনা, আর একটু সদিচ্ছা।

দুই চাকায় বিপ্লব হয়েছে। এবার সেই বিপ্লবকে নিরাপদ, টেকসই, আর উৎপাদনশীল করার পালা।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50