পাসপোর্টের লাইনে কত ঘণ্টা?
পর্ব ১: আগারগাঁওয়ের লাইন
ভোর সাড়ে চারটা। ঢাকার আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের সামনে রাস্তায় মানুষ বসে আছে। কেউ প্লাস্টিকের চেয়ারে, কেউ ফুটপাতে। কেউ কেউ রাত দুটো থেকে। কারণ সকাল আটটায় অফিস খুলবে, আর টোকেন সীমিত। দেরি করলে আজও পারা যাবে না। গতকালও আসা হয়েছিল, "সার্ভার ডাউন" বলে ফেরত পাঠিয়েছে। তার আগের দিনও।
রফিকুল ইসলাম। বয়স ৩২। গাজীপুরের টঙ্গী থেকে এসেছে। সৌদি আরবে কাজ করে, ছুটিতে এসেছে দুই মাসের জন্য। ই-পাসপোর্ট করাতে হবে, পুরনো এমআরপি পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ। এজেন্ট বলেছিল ২১ দিনে হয়ে যাবে। দুই মাস হয়ে গেছে, পাসপোর্ট পায়নি। ভিসার মেয়াদ চলে যাচ্ছে। চাকরি হারাবে।
রফিকুলের পাশে বসে আছে ফাতেমা খাতুন। বয়স ৫৫। ছেলে ইতালিতে, ফ্যামিলি ভিসা পাঠিয়েছে মায়ের জন্য। কিন্তু পাসপোর্ট ছাড়া ভিসা প্রসেস হবে না। ফাতেমা আগারগাঁও অফিসে এসেছে সাতবার। প্রথমবার ফর্ম ভুল ছিল। দ্বিতীয়বার ছবি রিজেক্ট। তৃতীয়বার ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন নষ্ট। চতুর্থবার সার্ভার ডাউন। পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম বার বিভিন্ন কারণে ফেরত। প্রতিবার টঙ্গী থেকে আসতে বাস ভাড়া ৬০ টাকা, যেতে ৬০ টাকা, খাওয়া ১০০ টাকা। সাতবারে ১,৫৪০ টাকা শুধু যাতায়াতে।
এটা কোনো ব্যতিক্রম না। এটা বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবস্থার দৈনন্দিন বাস্তবতা। প্রতিদিন আগারগাঁও, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, জেলা পাসপোর্ট অফিসগুলোতে হাজার হাজার মানুষ লাইনে দাঁড়ায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে, আর বেশিরভাগ ফেরত যায় খালি হাতে।
কতজন মানুষ এই যন্ত্রণায় পড়ছে? সংখ্যাটা দেখুন:
২০১৫ সালে বাংলাদেশে পাসপোর্ট আবেদন ছিল বছরে প্রায় ২০ লাখ। ২০২৫ সালে সেটা ৬০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। দশ বছরে তিনগুণ। কিন্তু অফিসের সংখ্যা, কর্মচারীর সংখ্যা, আর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে: ব্যাকলগ, বিলম্ব, আর দুর্নীতি।
পর্ব ২: ই-পাসপোর্টের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা
২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট চালু করলো। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রথম ই-পাসপোর্ট গ্রহণ করলেন। বলা হলো, এটা ডিজিটাল বাংলাদেশের মাইলফলক। আন্তর্জাতিক মানের বায়োমেট্রিক পাসপোর্ট, ICAO 9303 স্ট্যান্ডার্ড, পলিকার্বোনেট ডেটা পেজ, RFID চিপ। জার্মান কোম্পানি Veridos এর প্রযুক্তি। চুক্তি হয়েছিল প্রায় ৪,৬০০ কোটি টাকায়।
প্রতিশ্রুতি ছিল বড় বড়: দ্রুত ডেলিভারি, লাইন কমবে, দালাল থাকবে না, সব কিছু অনলাইনে। বাস্তবতা? ভিন্ন।
ই-পাসপোর্ট চালু হওয়ার পর পুরনো এমআরপি পাসপোর্ট বাতিল হয়ে গেছে। সবাইকে ই-পাসপোর্ট নিতে বাধ্য করা হয়েছে। ফলে ২০২০ সালে যাদের পাসপোর্ট ছিল, তাদেরও নতুন করে আবেদন করতে হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে আবেদনের চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। কিন্তু সিস্টেমের ধারণক্ষমতা বাড়েনি।
তাহলে ডেলিভারিতে কত সময় লাগছে? এই চার্টটা দেখুন:
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী "সাধারণ" (regular) আবেদনে পাসপোর্ট পাওয়ার কথা ২১ কার্যদিবসে। জরুরি (emergency) তে ৭ দিনে। কিন্তু বাস্তবে? সাধারণ আবেদনে গড়ে ৩ থেকে ৬ মাস লাগছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৯ মাস। জরুরি আবেদনেও ৩০ থেকে ৪৫ দিন। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন, আর প্রিন্টিং ব্যাকলগ, প্রতিটা ধাপে আটকে যায়।
কেন এত দেরি? কারণ সক্ষমতা আর চাহিদার মধ্যে বিশাল ফারাক। এই চার্টটা দেখুন:
বাংলাদেশে মোট পাসপোর্ট অফিস ৭৩টি (৬৪ জেলায় একটি করে, আর ঢাকায় ৯টি আঞ্চলিক অফিস)। দৈনিক মোট প্রসেসিং সক্ষমতা প্রায় ২৫,০০০ আবেদন। কিন্তু দৈনিক আবেদন আসছে ৩৫,০০০ থেকে ৪০,০০০। মানে প্রতিদিন ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ আবেদন ব্যাকলগে জমা হচ্ছে। মাসে প্রায় ৩ থেকে ৪.৫ লাখ। ছয় মাসে ২০ লাখের বেশি। এই ব্যাকলগ তুষারগোলার মতো বাড়ছে।
আর ই-পাসপোর্টের প্রিন্টিং? পুরো দেশে প্রিন্টিং সেন্টার মাত্র একটি, আগারগাঁওয়ে। জার্মান মেশিনে প্রিন্ট হয়। দৈনিক ক্ষমতা ২০,০০০ থেকে ২৫,০০০ পাসপোর্ট। কিন্তু মেশিনের যন্ত্রাংশ জার্মানি থেকে আসে, টেকনিশিয়ান বিদেশি। মেশিন বন্ধ হলে দিনের পর দিন প্রিন্টিং বন্ধ। এমন ঘটনা ২০২৩ সালে অন্তত তিনবার ঘটেছে।
পর্ব ৩: দালালের রাজত্ব
যেখানে দীর্ঘ লাইন, সেখানে দালাল। এটা বাংলাদেশের চিরায়ত সূত্র। পাসপোর্ট অফিসেও এর ব্যতিক্রম নেই।
আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের গেটের বাইরে দালালরা দাঁড়িয়ে থাকে। তারা প্রকাশ্যে বলে, "২,০০০ টাকা দিলে আজই ফাইল জমা হবে, লাইনে দাঁড়াতে হবে না।" "৫,০০০ দিলে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দুই দিনে।" "১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ দিলে ১৫ দিনে পাসপোর্ট হাতে।" "২০,০০০ থেকে ২৫,০০০ দিলে জরুরি পাসপোর্ট ৭ দিনে।"
এই হিসাবটা বুঝুন:
একটা সাধারণ পাসপোর্টের সরকারি ফি ৩,৪৫০ টাকা (৪৮ পৃষ্ঠা, ৫ বছর)। জরুরি পাসপোর্টে ৬,৯০০ টাকা। কিন্তু দালালের মাধ্যমে করালে মোট খরচ ১৫,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা। মানে সরকারি ফির চার থেকে সাত গুণ। এই অতিরিক্ত টাকা কোথায় যাচ্ছে? দালালের পকেটে, অফিসের কিছু কর্মচারীর পকেটে, আর পুলিশ ভেরিফিকেশনে।
TIB (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) এর ২০২৩ সালের জরিপে দেখা গেছে, পাসপোর্ট সেবা গ্রহণকারীদের ৬৫% কোনো না কোনো ধরনের অনিয়মিত অর্থ প্রদান করেছে। এর মধ্যে ৪২% দালালের মাধ্যমে, ২৩% সরাসরি কর্মচারীকে। গড় ঘুষের পরিমাণ ৮,৫০০ টাকা। বছরে ৬০ লাখ আবেদনের ৬৫%, মানে প্রায় ৩৯ লাখ আবেদনে ঘুষ দেওয়া হচ্ছে। মোট ঘুষের পরিমাণ? বছরে আনুমানিক ৩,৩০০ কোটি টাকা। শুধু পাসপোর্ট সেবায়।
একটা দেশের নাগরিক পরিচয়পত্র পেতে নিজের সরকারকে ঘুষ দিতে হচ্ছে। এটা শুধু দুর্নীতির সমস্যা না, এটা নাগরিক মর্যাদার সমস্যা।
মানুষ কি এই সেবায় সন্তুষ্ট? জরিপের ফলাফল দেখুন:
সেবার মান নিয়ে সন্তোষজনক বললেছে মাত্র ১৮% মানুষ। ৪৫% বলেছে "অসন্তুষ্ট" বা "খুবই অসন্তুষ্ট"। প্রধান অভিযোগ: দীর্ঘ অপেক্ষার সময়, অনলাইন সিস্টেমে সমস্যা, কর্মচারীদের অসহযোগিতা, আর দালালদের উৎপাত।
পর্ব ৪: অন্যরা কীভাবে করছে?
বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবস্থা কতটা পিছিয়ে, সেটা বুঝতে অন্য দেশের সাথে তুলনা করা দরকার।
মালয়েশিয়ায় পাসপোর্ট পেতে সময় লাগে ১ দিন। আবেদন অনলাইনে, বায়োমেট্রিক দেওয়া যায় নিকটতম পোস্ট অফিসে, আর পাসপোর্ট পৌঁছে যায় কুরিয়ারে পরদিন। ভারতে ৩ থেকে ৫ কার্যদিবস। Passport Seva Kendra (PSK) নামে ৫২১টি সেবাকেন্দ্র আছে সারা দেশে। অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট, নির্দিষ্ট সময়ে গেলে ৩০ মিনিটে সব শেষ। ইন্দোনেশিয়ায় ৩ থেকে ৭ দিন। ফিলিপাইনে ১০ দিন।
বাংলাদেশ? সরকারি ঘোষণায় ২১ দিন, বাস্তবে ৯০ থেকে ১৮০ দিন।
ভারতের মডেলটা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ২০১০ সালের আগে ভারতের পাসপোর্ট ব্যবস্থাও বাংলাদেশের মতো ছিল, দীর্ঘ লাইন, দালাল, মাসের পর মাস অপেক্ষা। তারপর তারা Tata Consultancy Services (TCS) এর সাথে পিপিপি (Public-Private Partnership) চুক্তি করলো। সারা দেশে PSK চালু করলো। পুরো সিস্টেম ডিজিটাল করলো। ফলাফল? ভারতে পাসপোর্ট প্রসেসিং সময় ৬০ দিন থেকে নেমে এসেছে ৩ দিনে।
বাংলাদেশ ই-পাসপোর্টে ৪,৬০০ কোটি টাকা খরচ করেছে। কিন্তু সেই অর্থ গেছে মূলত কার্ডের ফিজিক্যাল প্রযুক্তিতে (চিপ, পলিকার্বোনেট, প্রিন্টিং)। ব্যাক-এন্ড সিস্টেম, ডেটাবেজ, অনলাইন পোর্টাল, এসবে বিনিয়োগ ছিল সামান্য। তাই পাসপোর্ট দেখতে আধুনিক, কিন্তু পেতে গেলে একশো বছর আগের আমলাতন্ত্রের মুখোমুখি হতে হয়।
পর্ব ৫: শুধু পাসপোর্ট না, পুরো ব্যবস্থাটাই এমন
পাসপোর্ট সংকটকে আলাদা করে দেখলে ভুল হবে। এটা বাংলাদেশের সরকারি সেবার একটা বৃহত্তর সমস্যার অংশ। পাসপোর্ট, জন্ম নিবন্ধন, জমির দলিল, ট্রেড লাইসেন্স, ড্রাইভিং লাইসেন্স, প্রতিটা সরকারি সেবায় একই সমস্যা: লাইন, দালাল, বিলম্ব, আর ঘুষ।
জমির দলিল নামজারিতে গড়ে ৯ মাস লাগে। ট্রেড লাইসেন্সে ২ থেকে ৪ মাস। ড্রাইভিং লাইসেন্সে ৩ থেকে ৬ মাস। ইউটিলিটি সংযোগে ১ থেকে ৩ মাস। প্রতিটা সেবায় অফিসে অফিসে ঘুরতে হয়, ফর্ম ভরতে হয়, ফটোকপি দিতে হয়, দালাল ধরতে হয়। ডিজিটাল বাংলাদেশ, স্মার্ট বাংলাদেশ, এসব স্লোগান বাস্তবতার সাথে কতটা মিলছে?
ডিজিটাল সেবা দেওয়ার সক্ষমতা কতটুকু আছে? এই চার্টটা দেখুন:
জাতিসংঘের ই-গভর্নমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে (EGDI) বাংলাদেশের স্কোর ০.৫৬ (১ এর মধ্যে), যেখানে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ০.৭১, শ্রীলঙ্কা ০.৬৬, মালয়েশিয়া ০.৮১। বাংলাদেশ ১৯৩ দেশের মধ্যে ১১১তম। মালয়েশিয়া ৪৭তম, ভারত ৬১তম।
সমস্যাটা তিনটা স্তরে:
প্রথমত, অবকাঠামো। সরকারি দপ্তরে ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল। অনেক জেলা অফিসে ব্রডব্যান্ড নেই, মোবাইল ডেটায় কাজ চলে। সার্ভার ঢাকায়, জেলা থেকে এক্সেস করতে গেলে স্লো, ক্র্যাশ করে। "সার্ভার ডাউন" কথাটা বাংলাদেশের সরকারি অফিসের সবচেয়ে পরিচিত বাক্য।
দ্বিতীয়ত, মানবসম্পদ। সরকারি কর্মচারীদের ডিজিটাল দক্ষতা কম। অনেকে কম্পিউটারে কাজ করতে পারে না। প্রশিক্ষণ হয় নামকাওয়াস্তে। ফলে ডিজিটাল সিস্টেম চালু হলেও কর্মচারীরা পারে না, বা করতে চায় না। কারণ ম্যানুয়াল সিস্টেমে ঘুষের সুযোগ বেশি।
তৃতীয়ত, ইচ্ছার অভাব। ই-পাসপোর্টে ৪,৬০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে, কিন্তু একটা কার্যকর অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেম তৈরিতে লাগতো হয়তো ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা। সেটাও হয়নি। ভারতের PSK মডেল কপি করতে লাগতো কয়েক শত কোটি টাকা। বাংলাদেশ এর চেয়ে অনেক বেশি খরচ করেছে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলে। পাসপোর্ট ব্যবস্থা আধুনিক করার ইচ্ছা নেই, কারণ বিদ্যমান ব্যবস্থায় অনেকের আয় আছে।
পর্ব ৬: কত টাকা আসে, কত টাকা যায়
পাসপোর্ট সেবা সরকারের জন্য একটা বড় রাজস্বের উৎস। এই চার্টটা দেখুন:
বছরে ৬০ লাখ আবেদন, গড় ফি ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা (সাধারণ ও জরুরি মিলিয়ে), সরকারের বার্ষিক পাসপোর্ট রাজস্ব প্রায় ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ কোটি টাকা। এটা বিশাল অঙ্ক। কিন্তু এই রাজস্বের কতটুকু আবার পাসপোর্ট সেবায় পুনর্বিনিয়োগ হচ্ছে? অতি সামান্য। DIP (ডিপার্টমেন্ট অফ ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্টস) এর বার্ষিক বাজেট ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা। মানে যে অর্থ আসছে তার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। বাকি ৮০ শতাংশ চলে যাচ্ছে সাধারণ তহবিলে।
এই অর্থনীতিটা বুঝলে বোঝা যায় কেন সরকারের পাসপোর্ট সেবা উন্নত করার প্রণোদনা কম। পাসপোর্ট সেবা একটা ক্যাশ কাউ (cash cow), ঘরে দুধ দেয় কিন্তু ঘাস খেতে দেওয়া হয় না।
ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, এসব দেশ পাসপোর্ট সেবাকে নাগরিক অধিকার হিসেবে দেখে। বাংলাদেশে পাসপোর্ট সেবা একটা সরকারি একচেটিয়া ব্যবসা। নাগরিকের কোনো বিকল্প নেই, অভিযোগের কার্যকর জায়গা নেই, আর ঘুষ দেওয়া ছাড়া কোনো শর্টকাট নেই।
কী করা দরকার?
প্রথমত, ভারতের PSK মডেল অনুসরণ করে সারা দেশে ৩০০ থেকে ৫০০ পাসপোর্ট সেবাকেন্দ্র চালু করা। PPP মডেলে হতে পারে, যেমন ভারতে TCS করেছে। প্রতিটা উপজেলায় অন্তত একটি। তাহলে মানুষকে জেলা সদরে যেতে হবে না।
দ্বিতীয়ত, সম্পূর্ণ অনলাইন আবেদন ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেম। ফর্ম পূরণ, ডকুমেন্ট আপলোড, পেমেন্ট, সব অনলাইনে। শুধু বায়োমেট্রিক ক্যাপচারের জন্য একবার অফিসে যেতে হবে, নির্দিষ্ট সময়ে, ৩০ মিনিটে শেষ।
তৃতীয়ত, বিকেন্দ্রীকৃত প্রিন্টিং। আগারগাঁওয়ের একটিমাত্র প্রিন্টিং সেন্টারের বদলে অন্তত ৮টি বিভাগীয় প্রিন্টিং সেন্টার। প্রতিটিতে দৈনিক ৫,০০০ পাসপোর্ট প্রিন্টিং সক্ষমতা। তাহলে মোট ক্ষমতা ৪০,০০০ হবে, চাহিদার সাথে মিলবে।
চতুর্থত, স্বচ্ছতা। প্রতিটা আবেদনের রিয়েল-টাইম স্ট্যাটাস ট্র্যাকিং, যেমন কুরিয়ারের ট্র্যাকিং নম্বর। আবেদনকারী জানবে তার পাসপোর্ট কোন ধাপে আছে। পুলিশ ক্লিয়ারেন্সে আটকে আছে? প্রিন্টিং লাইনে? ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত? এই স্বচ্ছতা থাকলে দালালের দরকার কমবে।
আসুন শেষ করি যেখান থেকে শুরু করেছিলাম।
রফিকুল ইসলাম শেষ পর্যন্ত দালালকে ১৫,০০০ টাকা দিয়েছে। তিন সপ্তাহ পর পাসপোর্ট পেয়েছে। সৌদি আরবে ফিরতে পেরেছে। কিন্তু সরকারি ফি ৩,৪৫০ টাকার জায়গায় মোট খরচ হয়েছে প্রায় ২০,০০০ টাকা (দালাল, যাতায়াত, কাজ হারানো দিনের হিসাব মিলিয়ে)। এটা রফিকুলের দুই মাসের বাড়ি পাঠানো রেমিট্যান্সের সমান।
ফাতেমা খাতুন? আটবারের মাথায় পাসপোর্ট পেয়েছে। পেতে লেগেছে চার মাস। ততদিনে ছেলের পাঠানো ফ্যামিলি ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ছেলে আবার নতুন করে আবেদন করবে। আরো ছয় মাস অপেক্ষা।
বাংলাদেশে পাসপোর্ট শুধু একটা ভ্রমণ দলিল না। এটা প্রবাসে কাজের সুযোগ, এটা পরিবারের সাথে মিলনের মাধ্যম, এটা একজন নাগরিকের আন্তর্জাতিক পরিচয়। যখন এই মৌলিক দলিলটা পেতে মানুষকে ভোর সাড়ে চারটায় লাইনে দাঁড়াতে হয়, দালালকে ঘুষ দিতে হয়, মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়, তখন রাষ্ট্র তার নাগরিকদের বলছে: "তুমি গুরুত্বপূর্ণ না।"
মালয়েশিয়া পারে ১ দিনে, ভারত পারে ৩ দিনে। বাংলাদেশ কেন পারবে না? প্রযুক্তি আছে, টাকা আছে (পাসপোর্ট ফি থেকেই যথেষ্ট আসে), মডেলও আছে (ভারতের PSK)। যা নেই, সেটা ইচ্ছা। আর ইচ্ছা না থাকার কারণ সরল: বিদ্যমান ব্যবস্থায় অনেকের লাভ আছে। নাগরিকের ক্ষতি হচ্ছে, কিন্তু সেই ক্ষতির কোনো রাজনৈতিক মূল্য নেই।
রফিকুল আবার দেশে আসবে দুই বছর পর। তখনো কি লাইনে দাঁড়াতে হবে ভোর সাড়ে চারটায়?