Back to publications
Narrative 2026-03-06

অবসরে কী হবে?

সার্বজনীন পেনশন নেই, ৮৫% অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক

অবসরে কী হবে?

পর্ব ১: আব্দুর রহিমের শেষ বয়স

আব্দুর রহিম। বয়স ৬৮। চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর একটা গ্রামে থাকে। সারাজীবন রিকশা চালিয়েছে। শহরে। ভোর ৫টায় বেরিয়ে রাত ৯টায় ফিরতো। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, কোনো কিছুতে ছুটি নেই। দিনে আয় ছিল ৩০০-৪০০ টাকা। তিন ছেলেমেয়ে বড় করেছে। বউয়ের চিকিৎসা করিয়েছে। একটা টিনের ঘর বানিয়েছে।

এখন আর রিকশা চালাতে পারে না। হাঁটুতে ব্যথা। চোখে ঝাপসা দেখে। শরীরে আগের শক্তি নেই।

কিন্তু কিছু দেশ এই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রম যোগী মান-ধন (PM-SYM) স্কিম দেখুন।
৩.৬ কোটি মানুষ
আব্দুর রহিমের শেষ বয়স
প্রায় ৫৭ লাখ মানুষ
পেনশন যাদের আছে, যাদের নেই
৫ কোটি মানুষ
সার্বজনীন পেনশন স্কিম, স্বপ্ন নাকি বাস্তব

আব্দুর রহিমের সঞ্চয় কত? শূন্য। পেনশন? নেই। বিমা? নেই। প্রভিডেন্ট ফান্ড? সে তো সারাজীবন রিকশা চালিয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেনি। সরকারি বয়স্ক ভাতা? আবেদন করেছে, তালিকায় নাম ওঠেনি।

এখন সে বড় ছেলের উপর নির্ভরশীল। বড় ছেলে ঢাকায় একটা গার্মেন্টসে কাজ করে। মাসে ১২,০০০ টাকা বেতন। বউ, দুই বাচ্চা আছে। সেই ১২,০০০ টাকায় নিজের সংসার চালায়, আর বাবাকে মাসে ২,০০০ টাকা পাঠায়। কখনো পাঠাতে পারে, কখনো পারে না।

আব্দুর রহিমের গল্প একটা ব্যতিক্রম মনে হতে পারে। কিন্তু সংখ্যাগুলো দেখলে বুঝবেন, এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা। কারণ বাংলাদেশে ৮৫% মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে, যেখানে পেনশনের ধারণাই নেই।

এই চার্টটা দেখুন। বাংলাদেশের শ্রমশক্তির ৮৫.১% অনানুষ্ঠানিক খাতে। রিকশাচালক, দিনমজুর, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গৃহকর্মী, নির্মাণ শ্রমিক। তাদের কোনো নিয়োগপত্র নেই। কোনো বেতন স্লিপ নেই। কোনো প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। তারা যখন কাজ করতে পারে, খায়। যখন পারে না, সন্তানদের দিকে তাকিয়ে থাকে।

আর এই দেশটা দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে।

২০০০ সালে বাংলাদেশে ৬০ বছরের উপরে মানুষ ছিল প্রায় ৬০ লাখ। ২০২৫ সালে প্রায় ১.৫ কোটি। ২০৫০ সালে হবে ৩.৬ কোটি। মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০%। প্রতি পাঁচজনে একজন প্রবীণ।

এই ৩.৬ কোটি মানুষের অবসর কীভাবে কাটবে? কে তাদের খাওয়াবে? কে তাদের চিকিৎসা দেবে? পরিবার? পরিবারের কাঠামোও বদলে যাচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। ছেলেমেয়েরা শহরে চলে যাচ্ছে। গ্রামে বয়স্ক বাবা-মা একা থাকছে। আর শহরেও সন্তানদের আয় এত কম যে নিজের পরিবার চালাতেই হিমশিম, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার সামর্থ্য কমে আসছে।

এই সমস্যার একটাই প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান আছে: পেনশন ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশে পেনশন আছে কাদের?


পর্ব ২: পেনশন যাদের আছে, যাদের নেই

বাংলাদেশে পেনশন পায় কারা? সরকারি কর্মচারী। ব্যস। প্রায় ১৩ লাখ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবার সরকারি পেনশন পায়। বেসরকারি খাতে কিছু বড় প্রতিষ্ঠানে প্রভিডেন্ট ফান্ড আছে, কিন্তু সেটা মোট শ্রমশক্তির ৫%-এর কম। বাকি ৮৫%+ মানুষ? কিছুই নেই।

এই চার্টটা দেখুন। বাংলাদেশে পেনশন বা অবসর সুবিধার আওতায় আছে শ্রমশক্তির মাত্র ৬%। ৯৪% মানুষের অবসরের কোনো আর্থিক পরিকল্পনা নেই। ভারতে এই কাভারেজ ২৪%। থাইল্যান্ডে ৫৬%। ভিয়েতনামে ৩২%।

"কিন্তু বয়স্ক ভাতা তো আছে!" হ্যাঁ, আছে। সরকার বয়স্ক ভাতা দেয়। মাসে ৫০০ টাকা। পাঁচশত টাকা। এক কেজি মুরগির দামের কম। এই টাকায় কী হয়?

বয়স্ক ভাতা পায় প্রায় ৫৭ লাখ মানুষ। কিন্তু ৬০ বছরের উপরে মানুষ ১.৫ কোটি। মানে যোগ্যদের মধ্যে অর্ধেকেরও কম পাচ্ছে। আর যারা পাচ্ছে, তারা মাসে ৫০০ টাকা পাচ্ছে। ২০২৫ সালে ৫০০ টাকায় এক সপ্তাহের বাজারও হয় না। বিশ্বব্যাংকের দারিদ্র্যসীমা (দৈনিক ২.১৫ ডলার) অনুযায়ী, এই ভাতা মাসিক দারিদ্র্যসীমার মাত্র ৭%।

এটা ভাতা না, এটা প্রতীকী অনুদান। এতে কারো জীবন চলে না। এটা সরকারের পরিসংখ্যানে একটা লাইন আইটেম, বাস্তবে প্রায় অর্থহীন।

তাহলে বৃদ্ধ বয়সে বাংলাদেশের মানুষ কীভাবে বাঁচে? সন্তানদের উপর নির্ভর করে। যেটা শত বছর ধরে চলে আসছে। কিন্তু এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। কারণ পরিবারের আকার ছোট হচ্ছে, শহরায়ন বাড়ছে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তরুণদের নিজেদেরই আয় এত কম যে দুই প্রজন্মের ভরণপোষণ সম্ভব না।

আর এই সমস্যাটা প্রতি বছর বড় হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশ বুড়িয়ে যাচ্ছে এমন গতিতে যা আমরা ভাবছি তার চেয়ে অনেক দ্রুত।


পর্ব ৩: বুড়িয়ে যাওয়া দেশ

জনতাত্ত্বিকরা একটা সূচক ব্যবহার করেন: বৃদ্ধ নির্ভরশীলতা অনুপাত। প্রতি ১০০ জন কর্মক্ষম মানুষের (১৫-৬৪ বছর) বিপরীতে কতজন প্রবীণ (৬৫+) আছে।

২০০০ সালে বাংলাদেশে এই অনুপাত ছিল ৬.৪। প্রতি ১০০ জন কর্মক্ষম মানুষের পেছনে ৬.৪ জন প্রবীণ। ২০২৫ সালে ৮.২। ২০৫০ সালে হবে ১৮.৫। আর ২০৭৫ সালে? ৩১.২।

এই সংখ্যাগুলো কী বলছে? বলছে যে ২০৭৫ সালে প্রতি ৩ জন কর্মক্ষম মানুষকে ১ জন প্রবীণের দায়িত্ব নিতে হবে। ট্যাক্সের মাধ্যমে হোক, পরিবারের মাধ্যমে হোক, কোনো না কোনোভাবে।

জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, এই দেশগুলোও বুড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা ধনী হয়ে বুড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের পেনশন ব্যবস্থা আছে, স্বাস্থ্যসেবা আছে, সঞ্চয় আছে, উন্নত প্রযুক্তি আছে যেটা কম শ্রমিক দিয়ে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ? গরিব থাকা অবস্থায় বুড়িয়ে যাচ্ছে। পেনশন ব্যবস্থা তৈরি করার আগেই বৃদ্ধ জনসংখ্যার বোঝা এসে পড়ছে।

এটাকে জনতাত্ত্বিকরা বলেন "getting old before getting rich"। চীনও এই সমস্যায় আছে, কিন্তু চীনের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের ছয় গুণ। বাংলাদেশের হাতে সময় অনেক কম, আর সম্পদ আরো কম।

আর এই বুড়িয়ে যাওয়ার সাথে যুক্ত হচ্ছে প্রবীণ দারিদ্র্যের সমস্যা।

বাংলাদেশে ৬০ বছরের উপরে মানুষের প্রায় ৪৬% দারিদ্র্যসীমার নিচে বা ঠিক কিনারায় আছে। জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০%। মানে প্রবীণদের মধ্যে দারিদ্র্য জাতীয় হারের দ্বিগুণেরও বেশি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে দরিদ্র হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। কারণ আয় কমে, চিকিৎসা খরচ বাড়ে, সঞ্চয় থাকে না।

এবার আরেকটা সংখ্যা দেখুন। কত মানুষ নিজে থেকে অবসরের জন্য সঞ্চয় করে?

বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার মাত্র ৩% কোনো না কোনো ধরনের অবসর সঞ্চয় পরিকল্পনায় আছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে ৫৩% প্রাপ্তবয়স্কের, কিন্তু সেখানে গড় ব্যালেন্স এত কম যে অবসর সঞ্চয় বলা যায় না। বেশিরভাগ মানুষ মাসে মাসে আয় করে, মাসে মাসে খরচ করে। কিছু জমে না। জমানোর মতো আয়ই নেই।

তাহলে সামনে কী অপেক্ষা করছে? একটা দেশ যেখানে ৩.৬ কোটি প্রবীণ থাকবে ২০৫০ সালে, তাদের অর্ধেকের কাছাকাছি দরিদ্র, তাদের পেনশন নেই, সঞ্চয় নেই, পরিবারের সাহায্য কমে আসছে, আর সরকার ভাতা দিচ্ছে মাসে ৫০০ টাকা।

এটা একটা আসন্ন মানবিক বিপর্যয়। আর আমরা এটা নিয়ে কথাও বলছি না।


পর্ব ৪: সার্বজনীন পেনশন স্কিম, স্বপ্ন নাকি বাস্তব?

২০২৩ সালের আগস্টে বাংলাদেশ সরকার "সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৩" পাশ করলো। চারটা স্কিম চালু করলো: "প্রবাস" (প্রবাসীদের জন্য), "প্রগতি" (বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য), "সুরক্ষা" (অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য), "সমতা" (নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য, সরকারি ভর্তুকিসহ)।

ধারণাটা চমৎকার। ১৮-৫০ বছর বয়সী যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক মাসে ১,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা জমা দিতে পারবে। ৬০ বছর বয়সে মাসিক পেনশন পাবে। সরকার "সমতা" স্কিমে অর্ধেক চাঁদা দেবে।

কিন্তু দুই বছর পরে কী অবস্থা?

চালু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট নিবন্ধন প্রায় ৩২ লাখ। লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রথম বছরেই ১ কোটি। কেন এত কম?

প্রথমত, সচেতনতা নেই। গ্রামের মানুষ জানেই না এই স্কিম চালু হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আস্থা নেই। সরকারকে মাসে মাসে টাকা দিলে ৩০ বছর পর ফেরত পাবো, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। সরকার বদলায়, নীতি বদলায়, আইন বদলায়। আজকের স্কিম কালকে থাকবে কি না, কেউ জানে না। তৃতীয়ত, সামর্থ্য নেই। যে মানুষ মাসে ৮,০০০-১০,০০০ টাকা আয় করে, সে মাসে ১,০০০ টাকা পেনশনে দেবে কীভাবে? ভাত কিনবে না পেনশনে দেবে?

চতুর্থত, ডিজিটাল বাধা। নিবন্ধন অনলাইনে। ই-কেওয়াইসি দরকার। গ্রামের একজন রিকশাচালক বা দিনমজুর কীভাবে অনলাইনে নিবন্ধন করবে?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: সরকার কি এই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারবে? যদি ৫ কোটি মানুষ নিবন্ধিত হয় আর ৩০ বছর পর তাদের পেনশন দিতে হয়, সেই টাকা কোথা থেকে আসবে?

এই চার্টটা দেখুন। বাংলাদেশ পেনশন ও সামাজিক সুরক্ষায় জিডিপির মাত্র ১.৭% ব্যয় করে। ভারত ২.৮%। থাইল্যান্ড ৪.১%। ভিয়েতনাম ৬.৫%। ইউরোপীয় গড় ১২%+। শুধু সরকারি কর্মচারীদের পেনশনেই বাংলাদেশের বাজেটের প্রায় ১৬% চলে যায়। সার্বজনীন পেনশন চালু হলে এই ব্যয় কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

এটা সমালোচনা না। এটা বাস্তবতা। সার্বজনীন পেনশন দরকার, কিন্তু সেটা সফল হতে গেলে শুধু আইন পাশ করলে হবে না। আরো অনেক কিছু করতে হবে।


পর্ব ৫: অন্যরা কী করেছে?

বাংলাদেশের একার সমস্যা না এটা। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বেশিরভাগই একই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি: বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাত, কম আয়, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। কিন্তু কিছু দেশ এই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করেছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রম যোগী মান-ধন (PM-SYM) স্কিম দেখুন। ২০১৯ সালে চালু হয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য। মাসে ৫৫ থেকে ২০০ রুপি চাঁদা (বয়সের উপর নির্ভর করে)। সরকার সমান চাঁদা দেয়। ৬০ বছর বয়সে মাসে ৩,০০০ রুপি পেনশন। ৫ কোটিরও বেশি মানুষ নিবন্ধিত। পুরোটা আধার কার্ড আর Jan Dhan অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে।

থাইল্যান্ডের "Old Age Allowance" ব্যবস্থা সত্যিকারের সর্বজনীন। ৬০ বছরের উপরে প্রতিটা থাই নাগরিক ভাতা পায়। পরিমাণ বয়স বাড়ার সাথে বাড়ে। আর National Savings Fund চালু করেছে অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের জন্য, সরকারি ম্যাচিং কন্ট্রিবিউশনসহ।

ভিয়েতনামের VSS (Vietnam Social Security) দেখুন। ২০০৮ সালে স্বেচ্ছাসেবী পেনশন চালু করেছে অনানুষ্ঠানিক খাতের জন্য। ভর্তুকি দিয়ে, সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়ে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে কাভারেজ ৩২%-এ নিয়ে গেছে।

কেনিয়ার M-Pesa-ভিত্তিক মাইক্রোপেনশন দেখুন। মোবাইল মানি দিয়ে ক্ষুদ্র পরিমাণে সঞ্চয়। সাপ্তাহিক ৫০ কেনিয়ান শিলিং (০.৪০ ডলার) থেকে শুরু। নমনীয়, কারণ আয় অনিয়মিত হলে চাঁদাও অনিয়মিত দেওয়া যায়।

এই দেশগুলোর কাছ থেকে তিনটা শিক্ষা:

এক. পেনশন চাঁদা অবশ্যই কম হতে হবে, আর সরকারকে ম্যাচিং কন্ট্রিবিউশন দিতে হবে। অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকের পক্ষে বড় অঙ্কের চাঁদা দেওয়া অসম্ভব।

দুই. মোবাইল টেকনোলজি ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশে বিকাশ আর নগদে ২০ কোটি অ্যাকাউন্ট আছে। এটাই পেনশন চাঁদা সংগ্রহ আর বিতরণের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। অফিসে যেতে হবে না, ফর্ম ভরতে হবে না।

তিন. আস্থা তৈরি করতে হবে। ভিয়েতনাম যেটা করেছে, প্রথম কয়েক বছর প্রতিশ্রুতি রেখেছে। সময়মতো পেনশন দিয়েছে। মানুষ দেখেছে, বিশ্বাস করেছে, তারপর আরো মানুষ যোগ দিয়েছে।


পর্ব ৬: ২০৫০ সালে দুটো পথ

আসুন দুটো ভবিষ্যৎ কল্পনা করি।

পথ ১: কিছু না করলে। ২০৫০ সাল। ৩.৬ কোটি প্রবীণ। তাদের অর্ধেকের বেশি দরিদ্র। পেনশন কাভারেজ ১০%-এর নিচে (কারণ সার্বজনীন পেনশন স্কিম কম নিবন্ধনের কারণে কার্যকর হয়নি)। বয়স্ক ভাতা মাসে ১,০০০ টাকা (মূল্যস্ফীতির পর প্রায় অর্থহীন)। হাসপাতালে প্রবীণদের ভিড়, কিন্তু চিকিৎসা খরচ দেওয়ার সামর্থ্য নেই। গ্রামে একা থাকা বৃদ্ধদের সংখ্যা বাড়ছে। কেউ দেখার নেই। এটা একটা নীরব মানবিক সংকট।

পথ ২: এখনই শুরু করলে। ২০৫০ সাল। সার্বজনীন পেনশন স্কিমে ৫ কোটি মানুষ নিবন্ধিত। বিকাশ/নগদের মাধ্যমে চাঁদা সংগ্রহ, প্রতি মাসে। সরকারি ম্যাচিং কন্ট্রিবিউশন নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য। ২৫ বছর ধরে জমানো তহবিল পেশাদারভাবে বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রতিটা প্রবীণ ন্যূনতম মাসিক পেনশন পাচ্ছে যেটা দিয়ে মৌলিক চাহিদা মেটানো সম্ভব। প্রবীণ দারিদ্র্য অর্ধেকে নেমে এসেছে।

দ্বিতীয় পথটা কি অসম্ভব? না। ভারত ৫ কোটি মানুষকে PM-SYM-এ নিবন্ধিত করেছে ৫ বছরে। থাইল্যান্ড সত্যিকারের সর্বজনীন বয়স্ক ভাতা চালু করেছে। ভিয়েতনাম ৩২% কাভারেজে পৌঁছেছে। এগুলো উন্নত দেশ না। এগুলো বাংলাদেশের মতোই উন্নয়নশীল দেশ। তাদের সম্পদ সীমিত, কিন্তু ইচ্ছা ছিল।

বাংলাদেশের জন্য পাঁচটা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ:

এক. বিকাশ/নগদ ইন্টিগ্রেশন। পেনশন চাঁদা জমা দেওয়া আর পেনশন গ্রহণ, দুটোই মোবাইল মানির মাধ্যমে। সাপ্তাহিক ৫০ টাকা থেকে শুরু করা যাক, মাসে ২০০ টাকা। নমনীয় কারণ অনানুষ্ঠানিক আয় অনিয়মিত।

দুই. ম্যাচিং কন্ট্রিবিউশন বাড়ানো। "সমতা" স্কিমে সরকার ৫০% দেয়। এটা ১০০% করুন সবচেয়ে দরিদ্রদের জন্য। ভারতের PM-SYM মডেল: সরকার সমান চাঁদা দেয়। এটা ব্যয়বহুল, কিন্তু বিকল্প কী? ৩.৬ কোটি দরিদ্র প্রবীণ?

তিন. পেনশন তহবিলের পেশাদার বিনিয়োগ। সরকারি বন্ড, অবকাঠামো প্রকল্প, ইক্যুইটি, মিশ্র পোর্টফোলিও। মালয়েশিয়ার EPF মডেল অনুসরণ করা যায়, যেটা বিশ্বের সেরা পেনশন তহবিলগুলোর একটা।

চার. সচেতনতা প্রচারাভিযান। প্রতিটা ইউনিয়ন পরিষদে, প্রতিটা উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে, প্রতিটা বাজারে পেনশনের তথ্য পৌঁছাতে হবে। মসজিদের ইমাম, স্কুলের শিক্ষক, ইউপি চেয়ারম্যান, সবাইকে যুক্ত করতে হবে।

পাঁচ. আইনি সুরক্ষা। পেনশন তহবিল সরকারের সাধারণ বাজেট থেকে আলাদা রাখতে হবে। স্বাধীন বোর্ড। স্বচ্ছ হিসাব। যাতে সরকার বদলালেও তহবিল নিরাপদ থাকে। মানুষের আস্থা তৈরি হবে তখনই যখন তারা জানবে তাদের টাকা রাজনীতির হাত থেকে সুরক্ষিত।


আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।

আব্দুর রহিম আজকে সকালে উঠে ছেলের ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকবে। এই মাসে টাকা পাঠাবে কি না? গত মাসে পাঠায়নি। ছেলের মেয়ের স্কুলের বেতন ছিল। আব্দুর রহিম কিছু বলেনি। বলার কিছু নেই। ছেলেরও সামর্থ্য নেই। কারোরই দোষ নেই।

দোষটা একটা ব্যবস্থার। যে ব্যবস্থা একজন মানুষকে ৪০ বছর কাজ করায়, কিন্তু তার জন্য অবসরের কোনো ব্যবস্থা রাখে না। যে ব্যবস্থায় ৮৫% শ্রমশক্তি অদৃশ্য। তাদের শ্রম অর্থনীতিতে আছে, কিন্তু অধিকারের হিসাবে তারা নেই। পেনশন নেই, বিমা নেই, ছুটি নেই, সুরক্ষা নেই। কাজ করতে পারলে বেঁচে থাকো, না পারলে সন্তানের দয়ায়।

বাংলাদেশের ১.৫ কোটি প্রবীণ এই ব্যবস্থার শিকার। ২০৫০ সালে সংখ্যাটা হবে ৩.৬ কোটি। আমাদের হাতে এখনো সময় আছে। সেই সময়টুকু নষ্ট করলে, ২০৫০ সালে আমরা নিজেরাই হবো সেই প্রবীণ, যাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই।

আব্দুর রহিম একটা নিরাপদ বৃদ্ধবয়স ডিজার্ভ করে। সে সারাজীবন খেটেছে। এবার তার পালা বিশ্রামের। শুধু দয়া না, ন্যায্যতা।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50