Back to publications
Narrative 2026-03-06

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষা না ব্যবসা?

১১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়, কত গুণমান?

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষা না ব্যবসা?

পর্ব ১: একটা স্বপ্ন, একটা লোন, একটা সার্টিফিকেট

নাসরিনের বাবা গাজীপুরে একটা ছোট মুদি দোকান চালান। মাসে আয় বিশ থেকে পঁচিশ হাজার টাকা। পরিবারে চারজন। নাসরিন এইচএসসি পাশ করলো জিপিএ ৪.৫০ নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হলো না। জাহাঙ্গীরনগরেও না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারতো, কিন্তু "প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়লে ভালো চাকরি হয়" এই কথা শুনে বাবা ব্যাংক থেকে লোন নিলেন। তিন লাখ টাকা। সুদসহ ফেরত দিতে হবে সাড়ে চার লাখ।

নাসরিন ভর্তি হলো ঢাকার একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। BBA প্রোগ্রাম। ক্যাম্পাস বলতে মিরপুরের একটা দশতলা ভবনের তিনটা ফ্লোর। লাইব্রেরিতে বই আছে তিনশোর মতো। ল্যাব নেই। ক্যাফেটেরিয়া নেই। খেলার মাঠ তো দূরের কথা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটা কি শিক্ষার বিস্তার, নাকি ব্যবসার সম্প্রসারণ?
প্রায় ২,৮০০ ডলার
টাকার খেলা
৬৫ থেকে ৭৫%
গ্র্যাজুয়েটদের কী হচ্ছে
প্রায় ৬০%
সংখ্যায় বিস্ফোরণ

চার বছর পরে নাসরিন গ্র্যাজুয়েশন শেষ করলো। সিজিপিএ ৩.৪৫। এখন দেড় বছর হয়ে গেছে, চাকরি হয়নি। বাবার লোনের কিস্তি চলছে। নাসরিন একটা কল সেন্টারে কাজ করছে, মাসে বারো হাজার টাকা বেতন। BBA ডিগ্রির কোনো ব্যবহার নেই সেখানে।

নাসরিনের মতো লাখ লাখ তরুণ-তরুণী আজ একই পরিস্থিতিতে। বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাত গত তিন দশকে বিস্ফোরিত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটা কি শিক্ষার বিস্তার, নাকি ব্যবসার সম্প্রসারণ?


পর্ব ২: সংখ্যায় বিস্ফোরণ

১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাশ হওয়ার পর বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে। তারপর থেকে যা হয়েছে সেটা একটা সুনামি ছাড়া আর কিছু না।

১৯৯৫ সালে ছিল মাত্র ১৬টা। ২০০৫ সালে ৫৩। ২০১৫ সালে ৯৫। আর ২০২৫ সালে? ১১৫টা। তিন দশকে সাত গুণেরও বেশি বৃদ্ধি। প্রতি বছর গড়ে ৩ থেকে ৪টা নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে। এই গতি দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম দ্রুত।

এই বৃদ্ধির সাথে সাথে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও বেড়েছে নাটকীয়ভাবে।

২০০৫ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিল প্রায় দুই লাখ। এখন সেই সংখ্যা প্রায় সাড়ে আট লাখ। একই সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়েছে তিন লাখ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখে। মানে উচ্চশিক্ষার মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৬০% এখন বেসরকারি খাতে।

কিন্তু এই ১১৫টা বিশ্ববিদ্যালয়ে কী পড়ানো হচ্ছে? সবাই কি একই জিনিস পড়াচ্ছে?

এই চার্টটা দেখুন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮% প্রোগ্রাম ব্যবসায় প্রশাসন (BBA/MBA)। আরো ২২% কম্পিউটার সায়েন্স ও আইটি। ইংরেজি ১২%। আইন ৯%। বাকি সব মিলিয়ে ১৯%। মানে বেশিরভাগ প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি আসলে BBA আর CSE পড়ানোর দোকান। কেন? কারণ এই দুটো বিষয়ে ল্যাব, যন্ত্রপাতি, ব্যয়বহুল অবকাঠামো কম লাগে। মুনাফা বেশি। মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজ্ঞান পড়াতে গেলে বিনিয়োগ লাগে। সেটা কে করবে?


পর্ব ৩: টাকার খেলা

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ নিয়ে কথা বলা যাক। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বছরে প্রায় ২,৮০০ ডলার। এই প্রেক্ষাপটে টিউশন ফি কত?

একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছরের অনার্স ডিগ্রিতে মোট খরচ ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে ১৫ থেকে ২৫ হাজার। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে? নিম্নমানের প্রতিষ্ঠানে ২ থেকে ৪ লাখ। মধ্যম মানের প্রতিষ্ঠানে ৫ থেকে ৮ লাখ। শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে (BRAC, NSU, IUB) ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় ১০০ থেকে ৫০০ গুণ বেশি। এই টাকা কোথায় যাচ্ছে?

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী এগুলো "অলাভজনক" প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। UGC-র রিপোর্ট অনুযায়ী, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আয়ের ৮৫ থেকে ৯২% আসে টিউশন ফি থেকে। শিক্ষক বেতনে যায় মাত্র ৩০ থেকে ৩৫%। অবকাঠামোতে ১০ থেকে ১৫%। গবেষণায়? ১ থেকে ৩%। বাকি ২০ থেকে ৩০% কোথায় যায় সেটা "প্রশাসনিক ব্যয়" নামে লুকানো থাকে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা নিজেরা বা তাদের পরিবারের সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের মালিক। ভাড়া দিচ্ছেন নিজেদেরকেই। একটা চমৎকার বৃত্তাকার ব্যবসা মডেল।


পর্ব ৪: মানের সংকট

টাকা অনেক নিচ্ছে। কিন্তু কী দিচ্ছে বিনিময়ে? শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত দিয়ে শুরু করা যাক।

UGC-র মানদণ্ড অনুযায়ী, একজন পূর্ণকালীন শিক্ষকের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০ জন শিক্ষার্থী থাকা উচিত। বাস্তবে কী হচ্ছে? শীর্ষ ১০টা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপাত ১:২৫, যেটা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। মধ্যম মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে ১:৪৫। আর নিম্নমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে? ১:৮০ থেকে ১:১২০। একজন শিক্ষক ১২০ জন ছাত্রকে পড়াচ্ছেন। সেটাও আবার পার্ট-টাইম শিক্ষক, যিনি হয়তো তিনটা বিশ্ববিদ্যালয়ে একসাথে পড়াচ্ছেন।

আর UGC-র নিয়মকানুন কতটা মানা হচ্ছে?

UGC প্রতি বছর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কিছু মানদণ্ডে মূল্যায়ন করে। নিজস্ব ক্যাম্পাস আছে কি না, পর্যাপ্ত শিক্ষক আছে কি না, গবেষণা হচ্ছে কি না, অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা আছে কি না। ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, মাত্র ২৮% বিশ্ববিদ্যালয় সব মানদণ্ড পূরণ করে। নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস আছে ৪৫% এর। বাকি ৫৫% ভাড়া ভবনে চলছে। গবেষণা বরাদ্দ জিরোর কাছাকাছি এমন বিশ্ববিদ্যালয় ৬৫%। তাহলে যে ৭২% বিশ্ববিদ্যালয় মানদণ্ড পূরণ করে না, তাদের কী হচ্ছে? কিছুই না। সতর্কতা পায়, সময় পায়, চলতেই থাকে। গত ৩০ বছরে UGC মাত্র দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন বাতিল করেছে। দুটি। ১১৫টার মধ্যে।

গবেষণার কথা আলাদা করে বলা দরকার।

বাংলাদেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে ২০২৩ সালে Scopus-indexed জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা ছিল প্রায় ২,৮০০। পুরো ১১৫টা বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে। তুলনা করুন: মালয়েশিয়ার শুধু একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় (Taylor's University) বছরে প্রায় ১,৫০০ পেপার প্রকাশ করে। ভারতের Manipal Academy একাই প্রকাশ করে ৩,৫০০। বাংলাদেশের ১১৫টা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা আউটপুট একটা মাঝারি মানের ভারতীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কম।


পর্ব ৫: গ্র্যাজুয়েটদের কী হচ্ছে?

শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বের হওয়া গ্র্যাজুয়েটদের কী হচ্ছে?

শীর্ষ ৫টা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় (BRAC, NSU, IUB, AIUB, EWU) থেকে বের হওয়া গ্র্যাজুয়েটদের এক বছরের মধ্যে চাকরি পাওয়ার হার ৬৫ থেকে ৭৫%। এটা মোটামুটি ভালো। কিন্তু মধ্যম মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে? ৩৫ থেকে ৪৫%। আর নিম্নমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে? ১৫ থেকে ২৫%। মানে প্রতি চারজনের তিনজন গ্র্যাজুয়েশনের এক বছর পরেও বেকার বা অর্ধ-বেকার।

তুলনা করুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিকেল কলেজগুলো থেকে চাকরি পাওয়ার হার ৮০ থেকে ৯৫%। মানে পাবলিকে ফ্রিতে পড়ে ভালো চাকরি পাচ্ছে, আর প্রাইভেটে লাখ লাখ টাকা খরচ করে চাকরি পাচ্ছে না। এটাই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

আর আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কোথায়?

QS World University Rankings 2025-এ বাংলাদেশের মাত্র ৩টা বিশ্ববিদ্যালয় আছে (সব পাবলিক)। বেসরকারি? একটাও না। ভারতের ২৮টা আছে, যার মধ্যে ৮টা বেসরকারি। মালয়েশিয়ার ২৪টা, ১২টা বেসরকারি। থাইল্যান্ডের ১৮টা, ৫টা বেসরকারি। বাংলাদেশের ১১৫টা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটাও আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে নেই। শূন্য।


পর্ব ৬: সমাধান কোথায়?

সমস্যাটা পরিষ্কার। ১১৫টা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষা দিচ্ছে না, সার্টিফিকেট বিক্রি করছে। কিন্তু সমাধান কি সব বন্ধ করে দেওয়া? না। বেসরকারি উচ্চশিক্ষা দরকার। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সীমিত। চাহিদা বিশাল। কিন্তু মান নিশ্চিত করতে হবে।

প্রথম পদক্ষেপ: UGC-কে শক্তিশালী করা। UGC-র এখন যে ক্ষমতা আছে সেটা কাগজে আছে, বাস্তবে নেই। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই, পর্যাপ্ত পূর্ণকালীন শিক্ষক নেই, গবেষণা বরাদ্দ নেই, তাদের তিন বছরের মধ্যে মানোন্নয়ন করতে হবে, নতুবা নতুন ভর্তি বন্ধ। ভারতের UGC এটা করে। মালয়েশিয়ার MQA (Malaysian Qualifications Agency) আরো কঠোরভাবে করে।

দ্বিতীয় পদক্ষেপ: গ্র্যাজুয়েট কর্মসংস্থান তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা। প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থান হার প্রকাশ করতে হবে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা যেন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কোথায় টাকা খরচ করবেন। যুক্তরাজ্যে TEF (Teaching Excellence Framework) এটা করে। অস্ট্রেলিয়ায় QILT (Quality Indicators for Learning and Teaching) এটা করে।

তৃতীয় পদক্ষেপ: গবেষণা বরাদ্দ বাধ্যতামূলক করা। মোট আয়ের ন্যূনতম ৫% গবেষণায় ব্যয় করতে হবে। এটা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহারের অধিকার থাকবে না। "কলেজ" বা "ইনস্টিটিউট" নামে চলতে পারবে।

চতুর্থ পদক্ষেপ: শিল্প-সংযোগ বাধ্যতামূলক করা। প্রতিটা প্রোগ্রামে ইন্টার্নশিপ থাকতে হবে। কারিকুলাম ডিজাইনে শিল্প প্রতিনিধি থাকতে হবে। মালয়েশিয়ায় প্রতিটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প উপদেষ্টা বোর্ড বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশে? ঐচ্ছিক।

১১৫টা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে হয়তো ২০ থেকে ২৫টা সত্যিকারের শিক্ষা দিচ্ছে। বাকিগুলো মূলত সার্টিফিকেট কারখানা। প্রতি বছর এই কারখানাগুলো থেকে হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে যাদের ডিগ্রির বাজার মূল্য শূন্যের কাছাকাছি। তাদের পরিবার ঋণগ্রস্ত হচ্ছে। তারা নিজেরা হতাশ হচ্ছে। দেশের শ্রমবাজার দক্ষ কর্মী পাচ্ছে না।

নাসরিনের বাবা এখনো ব্যাংকের কিস্তি দিচ্ছেন। নাসরিন এখনো কল সেন্টারে কাজ করছে। তার BBA ডিগ্রিটা দেয়ালে ফ্রেম করে টাঙানো আছে। সেটা একটা সুন্দর ফ্রেম, একটা সুন্দর কাগজ। কিন্তু কাগজটার পেছনে লুকানো আছে তিন লাখ টাকার ঋণ, চার বছরের সময়, আর একটা ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন।

এই স্বপ্ন ভাঙার দায় কার? নাসরিনের? তার বাবার? নাকি সেই ব্যবস্থার, যেটা অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের নামে লাভজনক ব্যবসা চালাতে দিচ্ছে, আর কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছে মূল্যহীন সার্টিফিকেট?

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50