Back to publications
Narrative 2026-03-06

প্যাকেটে খাবার: ফুড প্রসেসিং বিপ্লব

নুডলস থেকে ফ্রোজেন পরোটা: খাদ্যাভ্যাস বদলাচ্ছে বাংলাদেশ

প্যাকেটে খাবার: ফুড প্রসেসিং বিপ্লব

পর্ব ১: শামীমের রান্নাঘর

শামীম ঢাকার উত্তরায় থাকে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করে। সকাল সাতটায় বেরিয়ে যায়, ফেরে রাত আটটায়। দুটো বাচ্চা, একজন ক্লাস ফোরে, আরেকজন টু-তে। বাচ্চাদের স্কুলের টিফিনে কী দেয় শামীম? Mr. Noodles। দুই প্যাকেট নুডলস সিদ্ধ করে, একটু সবজি দিয়ে নেড়ে, দুটো টিফিন বক্সে ভরে দেয়। সময় লাগে আট মিনিট। খরচ? ত্রিশ টাকা।

রাতের খাবারে? ফ্রোজেন পরোটা ফ্রাইপ্যানে দিয়ে গরম করা, সাথে প্যাকেটের ডাল গরম করা। মাঝে মাঝে ফ্রোজেন চিকেন নাগেটস। রবিবারে হয়তো রান্না হয়, ঠিকমতো মাছের ঝোল বা মুরগি রান্না। বাকি ছয়দিন প্যাকেটের খাবার চলে।

তদারকির হার বছরে বছরে কমছে, কারণ রেজিস্টার্ড প্রতিষ্ঠান বাড়ছে কিন্তু BSTI-র জনবল বাড়ছে না।
১৭ কোটি মানুষ
প্রতিবেশীরা কোথায় আর আমরা কী করতে পারি
১৫-২০%
শামীমের রান্নাঘর
১,২০০ কোটি টাকা
নুডলস আর ফ্রোজেন পরোটার সাম্রাজ্য

শামীম জানে এটা "ভালো খাবার" না। কিন্তু শামীমের কাছে সময় নেই। ভোর পাঁচটায় উঠে রান্না করবে? সে রাত বারোটায় ঘুমায়। গৃহকর্মী রাখবে? মাসে আট-দশ হাজার টাকা। সেই টাকা নেই। তাই Mr. Noodles, তাই ফ্রোজেন পরোটা, তাই প্যাকেটের চানাচুর।

শামীম একা না। বাংলাদেশে কোটি কোটি পরিবার এখন এই পথে হাঁটছে। প্রক্রিয়াজাত খাবারের বাজার প্রতি বছর ১৫-২০% হারে বাড়ছে। এটা শুধু শহরের গল্প না। গ্রামেও এখন মুদি দোকানে ঝুলছে ম্যাগি নুডলস, চানাচুর, চিপস, বিস্কুটের প্যাকেট। মফস্বলের হাটে, চরের বাজারে, পাহাড়ের গায়ের দোকানে, সব জায়গায় প্যাকেটজাত খাবার পৌঁছে গেছে।

এই চার্টটা দেখুন।

২০১৫ সালে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বাজারের আকার ছিল প্রায় ৩.২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে সেটা ১৩.৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। দশ বছরে চার গুণেরও বেশি। যে হারে এই বাজার বড় হচ্ছে, সেটা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে দ্রুত। নগরায়ণ, নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আর তরুণ জনগোষ্ঠীর পশ্চিমা খাদ্যাভ্যাসের প্রতি আকর্ষণ, তিনটা মিলে এই বিপ্লব ঘটিয়েছে।

কিন্তু এই বিপ্লবের ভেতরে একটা গল্প আছে যেটা কেউ বলে না। সেটা হলো: বাংলাদেশের মানুষ কী খাচ্ছে, সেটা আমূল বদলে যাচ্ছে। আর এই বদলটা সবসময় ভালো দিকে না।


পর্ব ২: নুডলস আর ফ্রোজেন পরোটার সাম্রাজ্য

বাংলাদেশে ইনস্ট্যান্ট নুডলসের গল্পটা একটা কেস স্টাডি। ২০১০ সালে বাংলাদেশে মাথাপিছু ইনস্ট্যান্ট নুডলস খাওয়ার পরিমাণ ছিল বছরে ০.৫ প্যাকেট। ২০২৫ সালে সেটা প্রায় ১২ প্যাকেট। পনেরো বছরে চব্বিশ গুণ বৃদ্ধি। ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানের পরে এশিয়ায় সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি।

PRAN-এর Mr. Noodles এই বাজারের রাজা। ৪০% বাজার শেয়ার। তারপর Cocola-এর Tastee Noodles (২০%), Nestle-এর Maggi (১৫%), আর বাকিরা ভাগ করে নেয়। একটা Mr. Noodles প্যাকেটের দাম ১৫ টাকা। একটা ডিমের দাম ১৬ টাকা। একই দামে একটা বাচ্চা কোনটা বেছে নেবে? নুডলস। কারণ নুডলসের স্বাদ, প্যাকেটের রঙ, টিভিতে বিজ্ঞাপন, বন্ধুদের মধ্যে জনপ্রিয়তা, সব মিলিয়ে একটা আকর্ষণ তৈরি হয়েছে যেটা ডিমের নেই।

কিন্তু একটা Mr. Noodles প্যাকেটে কী আছে? ময়দা (refined flour), পাম তেল, লবণ (১.৮ গ্রাম, দৈনিক চাহিদার ৩৬%), MSG (মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট), আর কিছু কৃত্রিম স্বাদ। প্রোটিন? প্রায় শূন্য। ভিটামিন? নেই। আঁশ (fiber)? নেই। এটা মূলত empty calories, যেটা শুধু শক্তি দেয়, পুষ্টি দেয় না। একটা বাড়ন্ত বাচ্চার শরীর গড়তে যে প্রোটিন, আয়রন, জিংক দরকার, তার কোনোটাই নুডলসে নেই।

ফ্রোজেন খাবারের বাজারটাও একই গতিতে বাড়ছে।

ফ্রোজেন পরোটার বাজার ২০১৫ সালে ছিল প্রায় ৮০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে ১,২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ফ্রোজেন সমুচা, চিকেন নাগেটস, ফ্রোজেন ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, সব মিলিয়ে পুরো ফ্রোজেন ফুড মার্কেট ২,৫০০ কোটি টাকার উপরে। PRAN, Golden Harvest, Kazi Food Industries এই বাজারের প্রধান তিন খেলোয়াড়।

কে কিনছে এসব? শুধু শামীমের মতো কর্মজীবী মা না। গ্রামের বিয়েবাড়িতে এখন ফ্রোজেন চিকেন বল পরিবেশন হয়। ছোট শহরের চায়ের দোকানে ফ্রোজেন সিঙ্গারা ভেজে বিক্রি হয়। মফস্বলের স্কুলের সামনে চিপসের প্যাকেট ঝুলছে। সুপার শপ থেকে মুদি দোকান, সর্বত্র ফ্রোজেন পণ্যের বিস্তার।


পর্ব ৩: কে রাজত্ব করছে?

বাংলাদেশের ফুড প্রসেসিং শিল্পে কয়েকটা নাম বারবার আসে। PRAN-RFL Group, ACI Foods, Square Food & Beverage, Akij Food, Meghna Group, Bashundhara Food। এরাই বাজার দখল করে আছে।

PRAN একাই বাজারের প্রায় ২২% ধরে আছে। তাদের পণ্যের তালিকা দেখলে অবাক হতে হয়: জুস, নুডলস, বিস্কুট, চিপস, আচার, সস, ফ্রোজেন ফুড, ডেইরি, মসলা। তারা ১৪৫টি দেশে রপ্তানি করে। PRAN-এর বার্ষিক রাজস্ব ৫,০০০ কোটি টাকার বেশি। একটা বাংলাদেশি কোম্পানির জন্য এটা অসাধারণ অর্জন। ACI Foods দ্বিতীয় অবস্থানে, ১৪% শেয়ার নিয়ে। তাদের Fun, Savour, ACI Pure ব্র্যান্ডগুলো ঘরে ঘরে পরিচিত। Square Food-এর Radhuni মসলা, Ruchi জুস বাংলাদেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে পড়ে।

এই শিল্প উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানও তৈরি করছে।

প্রক্রিয়াজাত খাদ্য শিল্পে সরাসরি কর্মসংস্থান ২০১৫ সালে ছিল প্রায় ৮ লাখ। ২০২৫ সালে সেটা ১৮ লাখ ছাড়িয়েছে। পরোক্ষ কর্মসংস্থান (পরিবহন, প্যাকেজিং, খুচরা বিক্রি, কাঁচামাল সরবরাহ) যোগ করলে সংখ্যাটা ৪০ লাখের কাছে। গার্মেন্টস-এর পরে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে এটাই সবচেয়ে বড় নিয়োগকর্তা। বিশেষ করে নারী কর্মসংস্থানে এই খাতের ভূমিকা বড়, কারখানার শ্রমিকদের ৪৫% নারী।

তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো এই শিল্প যা উৎপাদন করছে তার পুষ্টিগত মান নিয়ে। বাজারে যে পণ্যগুলো সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়, সেগুলোর অধিকাংশই উচ্চ চিনি, উচ্চ লবণ, উচ্চ চর্বিযুক্ত। পুষ্টিকর প্রক্রিয়াজাত খাবার (যেমন ফর্টিফায়েড সিরিয়াল, প্রোটিন বার) বাজারের ২%-এরও কম।


পর্ব ৪: পুষ্টি রূপান্তরের অন্ধকার দিক

পুষ্টিবিদরা একটা শব্দ ব্যবহার করেন: "nutrition transition" বা পুষ্টি রূপান্তর। এর মানে হলো একটা দেশ যখন দরিদ্র থেকে মধ্যম আয়ে যায়, তখন মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলায়। তারা কম চাল-ভাত খায়, বেশি চিনি খায়, বেশি তেল খায়, বেশি প্রক্রিয়াজাত খাবার খায়। এটা প্রতিটা উন্নয়নশীল দেশে ঘটেছে। ব্রাজিলে ঘটেছে, মেক্সিকোতে ঘটেছে, ভারতে ঘটছে। বাংলাদেশেও ঘটছে, তবে ভয়াবহ গতিতে।

গত দশ বছরে বাংলাদেশে মাথাপিছু চাল খাওয়া ৮% কমেছে। এটা ভালো খবর হতে পারতো, যদি মানুষ চালের বদলে মাছ, সবজি, ফলমূল বেশি খেত। কিন্তু বাস্তবে চিনি খাওয়া বেড়েছে ৪৫%, ভোজ্যতেল ৫৫%, প্রক্রিয়াজাত খাবার ১২০%। এটাই nutrition transition-এর অন্ধকার দিক। চাল থেকে সরে গিয়ে মানুষ যাচ্ছে নুডলস, চিপস, কোমল পানীয়, বিস্কুটের দিকে।

ফলাফল? চিনি, লবণ, আর চর্বির মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) দৈনিক সর্বোচ্চ ৫ গ্রাম লবণ খাওয়ার পরামর্শ দেয়। বাংলাদেশের গড় ৯.৮ গ্রাম, প্রায় দ্বিগুণ। চিনিতে WHO সুপারিশ দৈনিক ২৫ গ্রাম। বাংলাদেশে গড় ৩৮ গ্রাম, ৫২% বেশি। স্যাচুরেটেড ফ্যাট দৈনিক ক্যালরির ১০%-এর নিচে থাকা উচিত। বাংলাদেশে সেটা ১৩.৫%। প্রতিটা সূচকে বাংলাদেশ WHO-এর সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

এর পরিণতি ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ২০১০ সালে ছিল ৫৬ লাখ। ২০২৫ সালে সেটা ১ কোটি ৩০ লাখ। পনেরো বছরে দ্বিগুণেরও বেশি। IDF (International Diabetes Federation) অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যায় অষ্টম। উচ্চ রক্তচাপ আক্রান্তের সংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়েছে। হৃদরোগে মৃত্যু গত দশ বছরে ৩৫% বেড়েছে। এটা শুধু প্রক্রিয়াজাত খাবারের দোষ না, অবশ্যই জীবনযাত্রার অন্য পরিবর্তনও দায়ী। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত খাবার এই সংকটকে ত্বরান্বিত করছে, সেটা গবেষণায় প্রমাণিত।


পর্ব ৫: BSTI, ভেজাল, আর আমদানি

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) হলো সেই সংস্থা যার কাজ খাদ্যপণ্যের মান নিশ্চিত করা। তত্ত্বে, কোনো প্রক্রিয়াজাত খাবার BSTI-এর অনুমোদন ছাড়া বাজারে বিক্রি হওয়ার কথা না। বাস্তবে?

BSTI-এর জনবল ৪৫০ জনের কাছাকাছি। বাংলাদেশে রেজিস্টার্ড খাদ্য প্রস্তুতকারক ১২,০০০-এর বেশি। অর্থাৎ প্রতি ২৭টি কারখানার জন্য একজন BSTI কর্মকর্তা। বছরে তারা পরিদর্শন করতে পারে মোট প্রতিষ্ঠানের ১৫-২০%। বাকি ৮০%? কোনো তদারকি নেই। তদারকির হার বছরে বছরে কমছে, কারণ রেজিস্টার্ড প্রতিষ্ঠান বাড়ছে কিন্তু BSTI-র জনবল বাড়ছে না।

ফলে কী হয়? ভেজাল তেলে ভাজা চিপস বাজারে আসে। নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি লবণ আর MSG দেওয়া নুডলস বিক্রি হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য পুনরায় প্যাকেটজাত করে বিক্রি হয়। Textile dye দিয়ে রঙ করা চানাচুর বাজারে ঘোরে। ২০২৩ সালে একটি গবেষণায় ঢাকার রাস্তার পাশের দোকান থেকে সংগৃহীত ১০০টি প্যাকেটজাত খাবারের ৩৮%-এ মেয়াদোত্তীর্ণ বা ভেজাল পণ্য পাওয়া গেছে। কয়েকবার ধরা পড়ে, খবর হয়, তারপর আবার চলতে থাকে।

ভারতে FSSAI (Food Safety and Standards Authority of India) একই রকম চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল। কিন্তু তারা ২০১১ সালে কঠোর Food Safety Act বাস্তবায়ন শুরু করে। লাইসেন্সিং ডিজিটাল করেছে। ল্যাব নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছে। জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়েছে। Nestle Maggi-তে অতিরিক্ত সীসা (lead) পাওয়া গেলে ২০১৫ সালে পুরো দেশে Maggi নিষিদ্ধ করেছিল, ৩২০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য ধ্বংস করেছিল। বাংলাদেশে এরকম পদক্ষেপ কল্পনাও করা যায় না।

এদিকে বাংলাদেশ প্রক্রিয়াজাত খাবার আমদানিও করছে প্রচুর।

প্রক্রিয়াজাত খাদ্য আমদানি ২০১৫ সালে ছিল ৬০ কোটি ডলার। ২০২৫ সালে সেটা ১৮০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তিন গুণ বৃদ্ধি। চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত থেকে আসছে বিস্কুট, চকলেট, এনার্জি ড্রিংকস, ক্যান্ড ফুড। এই আমদানি পণ্যগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ আরো দুর্বল। অনেক পণ্যে বাংলায় লেবেল থাকে না। উপাদান তালিকা পড়া যায় না। মেয়াদের তারিখ অস্পষ্ট। বন্দরে নমুনা পরীক্ষার হার ৫%-এরও কম।


পর্ব ৬: প্রতিবেশীরা কোথায় আর আমরা কী করতে পারি?

বাংলাদেশের ফুড প্রসেসিং শিল্প দ্রুত বাড়ছে, সেটা সত্য। কিন্তু আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে।

থাইল্যান্ডে মোট কৃষি উৎপাদনের ৩০% প্রক্রিয়াজাত হয়। ভারতে ১০%। বাংলাদেশে? মাত্র ৪%। থাইল্যান্ড প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি করে বছরে ৩৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। বাংলাদেশ? ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এই ফারাকটা বিশাল।

কেন এই পার্থক্য? কয়েকটা কারণ আছে।

প্রথমত, কোল্ড চেইন অবকাঠামো। বাংলাদেশে উৎপাদিত ফল, সবজি, মাছের ২০-৩০% পচে নষ্ট হয় পর্যাপ্ত হিমায়ন ব্যবস্থা না থাকায়। থাইল্যান্ডে এই অপচয় ৫%-এর নিচে। কোল্ড চেইন থাকলে কাঁচামালও সস্তায় পাওয়া যায়, আর প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মানও ভালো হয়।

দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি। বাংলাদেশের বেশিরভাগ ছোট ও মাঝারি খাদ্য প্রস্তুতকারক এখনো ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ায় কাজ করে। অটোমেশন কম, হাইজিন স্ট্যান্ডার্ড দুর্বল, প্যাকেজিং প্রযুক্তি পুরনো। বড় কোম্পানিগুলো (PRAN, Square) আধুনিক, কিন্তু শিল্পের ৮০% ছোট প্রতিষ্ঠান যেগুলো এখনো আধা-ম্যানুয়াল।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন। থাইল্যান্ডের খাদ্য কারখানাগুলোর বেশিরভাগের HACCP, ISO 22000 সার্টিফিকেশন আছে। বাংলাদেশে? ১০%-এরও কম। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ঢুকতে পারে না। ইউরোপ, জাপান, আমেরিকার বায়ারদের মান পূরণ করতে পারে না।

কিন্তু সম্ভাবনাটা প্রবল। বাংলাদেশে কাঁচামাল আছে: চাল, মাছ, সবজি, ফল, মসলা। শ্রমিক আছে, তুলনামূলক সস্তায়। অভ্যন্তরীণ বাজার দ্রুত বাড়ছে, ১৭ কোটি মানুষের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। দরকার তিনটা জিনিস: BSTI-কে শক্তিশালী করা যাতে ভেজাল বন্ধ হয়, কোল্ড চেইন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ যাতে অপচয় কমে, আর পুষ্টিকর প্রক্রিয়াজাত খাবার উৎপাদনে প্রণোদনা যাতে শিল্প শুধু চিপস আর নুডলস না বানিয়ে পুষ্টিসমৃদ্ধ পণ্যও বানায়।


আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।

শামীমের ছোট ছেলে রাফিদ এই বছর ক্লাস টু-তে পড়ে। তার ওজন বয়সের তুলনায় কম। ডাক্তার বলেছেন, "বাচ্চাকে পুষ্টিকর খাবার দিন। ডিম, দুধ, মাছ, ফলমূল।" শামীম জানে এটা দরকার। কিন্তু সকালে রাফিদের হাতে তুলে দেওয়ার মতো সময় শামীমের কাছে আছে শুধু আট মিনিট। সেই আট মিনিটে ডিম ভাজা যায়, কিন্তু রাফিদ ডিম খেতে চায় না। সে চায় Mr. Noodles। কারণ টিভিতে তাই দেখে। বন্ধুরা তাই খায়। প্যাকেটে কার্টুন আঁকা।

বাংলাদেশের ফুড প্রসেসিং শিল্প একটা অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প। কর্মসংস্থান হচ্ছে, রপ্তানি বাড়ছে, বিনিয়োগ আসছে। কিন্তু এই সাফল্যের বিনিময়ে একটা প্রজন্ম বড় হচ্ছে নুডলস, চিপস, আর ফ্রোজেন স্ন্যাকসের উপর। তাদের শরীরে ঢুকছে অতিরিক্ত লবণ, চিনি, ট্রান্স ফ্যাট। আর বের হচ্ছে সেই পুষ্টি যেটা তাদের মস্তিষ্ক, হাড়, পেশী গড়ে তোলার জন্য দরকার ছিল।

প্রশ্নটা সরল: বাংলাদেশ কি এমন একটা ফুড প্রসেসিং শিল্প গড়ে তুলতে পারবে যেটা লাভজনকও হবে, আবার পুষ্টিকরও হবে? থাইল্যান্ড পেরেছে। ভিয়েতনাম পারছে। এমনকি ভারতও FSSAI-এর মাধ্যমে দিকবদল করছে। বাংলাদেশও পারবে, যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই। কারণ রাফিদ বড় হয়ে যাচ্ছে। আর প্রতিটা Mr. Noodles প্যাকেট তাকে একটু একটু করে সেই পুষ্টি থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে যেটা তার মস্তিষ্ক আর শরীর গড়ে তোলার জন্য দরকার ছিল।

এই বিপ্লব থামানোর দরকার নেই। দরকার এর দিক ঠিক করা।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50