Back to publications
Narrative 2026-03-06

আবাসনে কালো টাকা: কে কিনছে ফ্ল্যাট?

রিয়েল এস্টেট: কালো টাকা সাদা করার সবচেয়ে সহজ পথ

আবাসনে কালো টাকা: কে কিনছে ফ্ল্যাট?

পর্ব ১: রফিক সাহেবের ফ্ল্যাট

গুলশানের একটা নতুন অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। চকচকে কাচের বিল্ডিং, সুইমিং পুল, জিম, ২৪ ঘণ্টা সিকিউরিটি। ১৮ তলা, মোট ৫৪টা ফ্ল্যাট। প্রতিটার দাম ৩ থেকে ৫ কোটি টাকা। বিল্ডিংটা তৈরি হয়েছে ২০২২ সালে। তিন বছর হয়ে গেছে।

কয়টা ফ্ল্যাটে মানুষ থাকে? ১৮টা। বাকি ৩৬টা খালি। অন্ধকার। রাতে বিল্ডিংয়ের দিকে তাকালে দেখবেন দুই-তৃতীয়াংশ জানালায় আলো নেই। কেউ থাকে না। কিন্তু প্রতিটা ফ্ল্যাটের মালিক আছে। রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে। টাকা দেওয়া হয়ে গেছে।

এই দাম বাড়ছে, অথচ ঢাকায় ফ্ল্যাটের চাহিদা কি সত্যিই এত বেশি?
৩ থেকে ৫ কোটি টাকা
রফিক সাহেবের ফ্ল্যাট
২৫-৩০%
সাদা হওয়ার কারখানা
৩-৫ কোটি
ফ্ল্যাটের দাম কার জন্য

এই ফ্ল্যাটগুলো কারা কিনেছে? আর কেন তারা সেখানে থাকে না?

রফিক সাহেব ঢাকার একজন ব্যবসায়ী। কাগজে তাঁর আয় বছরে ১৫ লাখ টাকা। আয়কর দেন বছরে দেড় লাখ। কিন্তু গত পাঁচ বছরে তিনি তিনটা ফ্ল্যাট কিনেছেন, মোট দাম ৯ কোটি টাকা। কীভাবে সম্ভব? কাগজে ১৫ লাখ আয়, আর ৯ কোটি টাকার ফ্ল্যাট?

উত্তরটা সবাই জানে, কিন্তু কেউ বলে না। রফিক সাহেবের আসল আয় কাগজে দেখানো আয়ের চেয়ে অনেক বেশি। সেই আয়ের বড় অংশ কর ফাঁকি দিয়ে জমানো। অথবা ঘুষ, কমিশন, বা অন্য কোনো অঘোষিত উৎস থেকে আসা। এই টাকার একটা নাম আছে: কালো টাকা। আর এই কালো টাকা সাদা করার সবচেয়ে সহজ, সবচেয়ে নিরাপদ, আর সবচেয়ে জনপ্রিয় পথ হলো ফ্ল্যাট কেনা।

বাংলাদেশ পৃথিবীর সেই অল্প কয়েকটা দেশের একটা, যেখানে সরকার নিজেই কালো টাকা সাদা করার আইনি সুযোগ দেয়। প্রতি বছরের বাজেটে একটা ধারা থাকে: যে কেউ, যেকোনো পরিমাণ অঘোষিত আয়ের ওপর মাত্র ১০% কর দিয়ে ফ্ল্যাট বা জমি কিনতে পারবে। কোনো প্রশ্ন করা হবে না। টাকার উৎস জানতে চাওয়া হবে না। আয়কর বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করবে না।

এটা কোনো গোপন ব্যাপার না। এটা জাতীয় বাজেটে লেখা থাকে। সংসদে পাস হয়। পত্রিকায় ছাপা হয়। আর প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা এই পথে "সাদা" হয়ে যায়।

এই গল্পটা শুধু রফিক সাহেবের না। এটা বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট সেক্টরের গল্প। চলুন সংখ্যাগুলো দেখি।


পর্ব ২: সাদা হওয়ার কারখানা

বাংলাদেশে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নতুন কিছু না। ১৯৭৫ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ২০০৯ সালের পর থেকে এটা প্রায় স্থায়ী নীতি হয়ে গেছে। প্রতিটা বাজেটে এটা থাকে। আর রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করলে সবচেয়ে কম কর দিতে হয়, মাত্র ১০%।

তুলনা করুন: একজন সৎ চাকরিজীবী তাঁর আয়ের ওপর ২৫-৩০% কর দেন। আর একজন দুর্নীতিবাজ কালো টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনলে দেন মাত্র ১০%। কে বেশি লাভবান?

গত দশ বছরে কালো টাকা সাদা করার পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েছে। ২০১৫ সালে যেখানে প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা সাদা হয়েছিল, ২০২৪ সালে সেই পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে ৮,০০০ কোটি টাকা। আর এর সিংহভাগ গেছে রিয়েল এস্টেটে। কারণ সেখানে করের হার সবচেয়ে কম, আর প্রশ্ন করা হয় সবচেয়ে কম।

এই "সাদা করা" থেকে সরকার কিছু রাজস্ব পায়। কিন্তু সেই রাজস্ব কত?

সরকার বলে, এই নীতি থেকে "অতিরিক্ত" রাজস্ব আসে। কিন্তু যে পরিমাণ রাজস্ব আসে, সেটা মোট কর রাজস্বের ১% এরও কম। আর বিনিময়ে কী হারাচ্ছে? কর ব্যবস্থার ন্যায্যতা। একজন সৎ করদাতা যখন দেখেন যে দুর্নীতিবাজ ১০% দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন তিনিও কর ফাঁকি দেওয়ার প্রেরণা পান। এটা একটা বিষাক্ত চক্র: কালো টাকার সুযোগ দিলে আরো কালো টাকা তৈরি হয়।

আর এই কালো টাকার সবচেয়ে বড় গন্তব্য হলো ঢাকার ফ্ল্যাট বাজার।


পর্ব ৩: ফ্ল্যাটের দাম কার জন্য?

ঢাকায় একটা ১,২০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের দাম কত? এলাকার ওপর নির্ভর করে ৬০ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকা। গুলশান, বনানী, বারিধারায় ৩-৫ কোটি। উত্তরা, মিরপুরে ৬০ লাখ থেকে ১.৫ কোটি। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডিতে ১-২.৫ কোটি।

আর ঢাকায় একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক আয় কত? গড়ে ৫০-৬০ হাজার টাকা। বছরে ৬-৭ লাখ।

ঢাকায় একটা মাঝারি মানের ফ্ল্যাটের দাম একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের বার্ষিক আয়ের ১৫-২০ গুণ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে, একটা শহরে আবাসন "সাশ্রয়ী" হতে হলে বাড়ির দাম বার্ষিক আয়ের ৫ গুণের মধ্যে থাকতে হয়। ঢাকায় এটা ১৫-২০ গুণ। মুম্বাই, হংকং, লন্ডনের সাথে তুলনীয়। কিন্তু সেই শহরগুলোর আয়ের স্তর ঢাকার চেয়ে ১০-২০ গুণ বেশি।

তাহলে কে কিনছে এই ফ্ল্যাটগুলো? মধ্যবিত্ত তো কিনতে পারছে না। ব্যাংক লোন নিয়েও পারছে না, কারণ ইএমআই-ই মাসিক আয়ের চেয়ে বেশি হয়ে যায়।

উত্তর: কালো টাকার মালিকরা। সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, যাদের আয়ের বড় অংশ অঘোষিত। তারা ক্যাশে ফ্ল্যাট কেনেন। রেজিস্ট্রি হয় সরকারি মূল্যে, যেটা বাজার মূল্যের অর্ধেকেরও কম। আর বাকি টাকা? সেটা হিসেবের বাইরে।

আর এই অর্থের প্রবাহ ফ্ল্যাটের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

ঢাকায় ফ্ল্যাটের দাম গত দশ বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৫ সালে গুলশানে প্রতি বর্গফুট ছিল ১২-১৫ হাজার টাকা, এখন ২৫-৩০ হাজার। উত্তরায় ছিল ৪-৫ হাজার, এখন ৮-১০ হাজার। এই দাম বাড়ছে, অথচ ঢাকায় ফ্ল্যাটের চাহিদা কি সত্যিই এত বেশি?

না। আর সেটাই সবচেয়ে আশ্চর্যজনক অংশ।


পর্ব ৪: খালি ফ্ল্যাটের শহর

ঢাকায় কত ফ্ল্যাট খালি পড়ে আছে? সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না, কারণ সরকার এই তথ্য সংগ্রহ করে না। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণা ও REHAB (Real Estate and Housing Association of Bangladesh) এর তথ্য থেকে একটা আন্দাজ পাওয়া যায়।

ঢাকায় আনুমানিক ৫০,০০০ থেকে ৮০,০০০ ফ্ল্যাট খালি পড়ে আছে। বিক্রি হয়েছে, কিন্তু কেউ থাকে না। এটা মোট আবাসন স্টকের ১৫-২০%। কেন? কারণ এই ফ্ল্যাটগুলো কেনা হয়েছে থাকার জন্য না। কেনা হয়েছে কালো টাকা লুকানোর জন্য, বিনিয়োগ হিসেবে দাম বাড়ার অপেক্ষায় রাখার জন্য, বা সম্পদ পাচারের মাধ্যম হিসেবে।

পৃথিবীর অনেক শহরে এই সমস্যা আছে, "ঘোস্ট অ্যাপার্টমেন্ট"। লন্ডনে আছে, ভ্যানকুভারে আছে, সিডনিতে আছে। কিন্তু সেই শহরগুলো এটা সমাধান করতে পদক্ষেপ নিয়েছে: খালি ফ্ল্যাটের ওপর অতিরিক্ত কর, বিদেশি ক্রেতাদের ওপর বাড়তি ট্যাক্স, মালিকানার স্বচ্ছতা বাধ্যতামূলক। ঢাকায়? কিছুই হয়নি।

আর এই বাজারটা নিয়ন্ত্রণ করে কারা?

ঢাকার রিয়েল এস্টেট বাজার অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। শীর্ষ ১০-১৫টা ডেভেলপার কোম্পানি মোট বাজারের ৫৫-৬০% নিয়ন্ত্রণ করে। এই কোম্পানিগুলোর মালিকদের বেশিরভাগই রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত। অনেকে সরাসরি সংসদ সদস্য বা সংসদ সদস্যদের পরিবারের সদস্য। REHAB-এর নেতৃত্বে থেকেছেন একাধিক সংসদ সদস্য। এই রাজনৈতিক সংযোগ মানে কী? মানে জমি অধিগ্রহণে সুবিধা, নির্মাণ অনুমতিতে সুবিধা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখ বন্ধ থাকা, আর কালো টাকা সাদা করার নীতি বছরের পর বছর বহাল রাখা।

রিয়েল এস্টেট সেক্টর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটা বড়?

রিয়েল এস্টেট ও নির্মাণ খাত মিলে জিডিপির প্রায় ৭-৮%। আর এই খাতের সাথে যুক্ত আছে সিমেন্ট, রড, ইট, বালু, টাইলস, স্যানিটারি, ইলেকট্রিক্যাল সামগ্রী, এমন আরো অনেক শিল্প। একত্রে হিসাব করলে জিডিপির ১২-১৫%। ফলে সরকার এই খাতে নাড়া দিতে চায় না। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করলে ফ্ল্যাট বিক্রি কমবে, ডেভেলপাররা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, নির্মাণ শ্রমিকরা বেকার হবে, এই যুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু এই যুক্তি কি সত্যি?

নির্মাণ অনুমতির সংখ্যা গত কয়েক বছরে কমেনি। বরং বেড়েছে। নতুন নতুন প্রকল্প আসছে, যদিও আগের প্রকল্পের ফ্ল্যাট এখনো বিক্রি হয়নি। কেন? কারণ ডেভেলপারদের কাছে আসল ব্যবসা হলো জমি দখল করে প্রকল্প ঘোষণা করা, ক্রেতাদের কাছ থেকে অগ্রিম নেওয়া, আর সেই টাকা দিয়ে আরেকটা জমি কেনা। এটা একটা পিরামিড কাঠামো, যেখানে নতুন ক্রেতার টাকায় আগের প্রকল্প শেষ হয়।

আর এই পুরো ব্যবস্থার জ্বালানি হলো কালো টাকা। যদি কালো টাকার প্রবাহ বন্ধ হয়, এই পিরামিড ভেঙে পড়বে। সরকার সেটা জানে। ডেভেলপাররা জানে। ব্যাংকগুলো জানে। তাই কেউ কিছু করে না।


পর্ব ৫: ব্যাংকের ভূমিকা

রিয়েল এস্টেটে কালো টাকার প্রবাহ শুধু ক্যাশে হয় না। ব্যাংকিং ব্যবস্থাও এতে গভীরভাবে জড়িত।

ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ৮-১০% যায় রিয়েল এস্টেটে। আর এই ঋণের প্রবৃদ্ধি গত দশ বছরে সামগ্রিক ঋণ প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি। কেন? কারণ ব্যাংকের কাছে রিয়েল এস্টেট ঋণ "নিরাপদ" মনে হয়। জামানত হিসেবে ফ্ল্যাট আছে। কিন্তু ব্যাংকগুলো একটা প্রশ্ন করে না: ঋণগ্রহীতার যে আয় দেখানো হচ্ছে, সেটা কি তাঁর আয়কর রিটার্নের সাথে মেলে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেলে না। কিন্তু ব্যাংক চোখ বন্ধ করে রাখে, কারণ লোন ডিসবার্সমেন্ট বাড়ানোর চাপ আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম আছে: ৫০ লাখ টাকার ওপরে যেকোনো লেনদেনে CTR (Cash Transaction Report) জমা দিতে হবে। ১০ লাখের ওপরে সন্দেহজনক লেনদেনে STR (Suspicious Transaction Report) জমা দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এই রিপোর্ট কতটা জমা হয়? আর জমা হলেও কতটা তদন্ত হয়?

FATF (Financial Action Task Force) এর মানদণ্ডে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে?

বাংলাদেশের এন্টি-মানি লন্ডারিং (AML) সক্ষমতা বৈশ্বিক মানের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। FATF-এর ৪০টা সুপারিশের মধ্যে বাংলাদেশ অর্ধেকও পুরোপুরি মানে না। APG (Asia/Pacific Group on Money Laundering) এর মূল্যায়নে বাংলাদেশ বারবার "partially compliant" বা "non-compliant" রেটিং পেয়েছে। বিশেষত রিয়েল এস্টেট সেক্টরে "বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ" (প্রকৃত মালিক কে, সেই তথ্য) সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। একটা ফ্ল্যাট পাঁচজনের নামে রেজিস্ট্রি হতে পারে, কিন্তু আসল টাকা দিয়েছে অন্য কেউ, সেটা জানার কোনো উপায় নেই।

ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, এমনকি কেনিয়া, এই দেশগুলো রিয়েল এস্টেটে মানি লন্ডারিং ঠেকাতে পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ তাদের চেয়ে পিছিয়ে।


পর্ব ৬: কী করা যেত, কী করা হয়নি

সমাধান কি জটিল? না। সমাধানগুলো পরিষ্কার, পরীক্ষিত, আর বাস্তবায়নযোগ্য। অন্য দেশ করে দেখিয়েছে।

প্রথমত, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করা। এটা সবচেয়ে মৌলিক পদক্ষেপ। যতদিন এই সুযোগ থাকবে, ততদিন কালো টাকা তৈরির প্রেরণা থাকবে। ভারত ২০১৬ সালে কালো টাকা সাদা করার একটা সময়সীমা দিয়ে তারপর কঠোর শাস্তির বিধান করেছে (Black Money Act, 2015)। বাংলাদেশে বছরের পর বছর এই সুযোগ চলতে থাকে, কোনো সময়সীমা নেই, কোনো শাস্তি নেই।

দ্বিতীয়ত, সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন বাজারমূল্যে করা। এখন ঢাকায় ২ কোটি টাকার ফ্ল্যাট ৬০ লাখে রেজিস্ট্রি হয়। এই গ্যাপটা কালো টাকা লুকানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ। যদি রেজিস্ট্রেশন বাজারমূল্যে হয়, তাহলে ক্রেতাকে পুরো টাকার উৎস দেখাতে হবে। সরকারও বেশি রেজিস্ট্রেশন ফি পাবে।

তৃতীয়ত, খালি ফ্ল্যাটের ওপর কর। কানাডার ভ্যানকুভার "Empty Homes Tax" চালু করেছে: খালি ফ্ল্যাটের ওপর বছরে ৩% কর। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ১%। ফ্রান্সে ১২.৫% পর্যন্ত। ঢাকায় এটা চালু হলে দুটো জিনিস হবে: খালি ফ্ল্যাট ভাড়ায় আসবে (সাশ্রয়ী আবাসন বাড়বে), আর বিনিয়োগ হিসেবে ফ্ল্যাট কেনার প্রবণতা কমবে।

চতুর্থত, বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ রেজিস্ট্রি। প্রতিটা সম্পত্তির আসল মালিক কে, কোন টাকায় কেনা হয়েছে, সেটা একটা কেন্দ্রীয় ডেটাবেসে থাকতে হবে। যুক্তরাজ্য এটা করেছে। EU এটা বাধ্যতামূলক করেছে।

এই চারটা পদক্ষেপের কোনোটাই নতুন আবিষ্কার না। এগুলো পৃথিবীর অনেক দেশে চলছে। বাংলাদেশে চলে না, কারণ যারা নীতি তৈরি করেন, তাঁদের অনেকেই এই ব্যবস্থার সুবিধাভোগী।


গুলশানের সেই বিল্ডিংটার কথা মনে আছে? ৫৪টা ফ্ল্যাট, ৩৬টা খালি?

ঐ ৩৬টা খালি ফ্ল্যাটে যদি মানুষ থাকতো, ৩৬টা পরিবার ঢাকায় একটা আধুনিক, নিরাপদ বাড়ি পেত। তাদের সন্তানরা কাছের স্কুলে যেত। বয়স্করা লিফটে ওঠানামা করতে পারতেন। কিন্তু সেটা হয়নি। কারণ ঐ ফ্ল্যাটগুলো বাড়ি না। ঐগুলো ব্যাংক ভল্ট। কালো টাকা রাখার ইটের ভল্ট।

রফিক সাহেবের মতো মানুষেরা কর দেন ১০%। শামিম মিয়া, যিনি মিরপুরে মুদি দোকান চালান, তিনি ভ্যাট দেন ১৫%। রফিক সাহেবের ফ্ল্যাটের দাম বছরে ৮-১০% বাড়ে। শামিমের দোকানের ভাড়া বছরে ১৫-২০% বাড়ে।

এটাই বাংলাদেশের আবাসন বাস্তবতা: যার কালো টাকা আছে, তাঁর ফ্ল্যাট আছে। যার সাদা টাকা আছে, তিনি ভাড়াটে। আর যার টাকাই নেই, তিনি বস্তিতে।

এই ব্যবস্থা কোনো দুর্ঘটনা না। এটা নকশা করা। আর নকশাকার কারা, সেটা জানতে ফ্ল্যাট ডেভেলপারদের মালিকানা আর সংসদ সদস্যদের তালিকা পাশাপাশি রাখলেই বুঝবেন।

প্রশ্ন হলো: কতদিন আর এই নকশা চলবে?

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50