Back to publications
Narrative 2026-03-06

রিকশার রাজ্য: ১০ লাখ রিকশাচালকের জীবন

ঢাকার অনিবন্ধিত পরিবহন ও অদৃশ্য শ্রমশক্তি

রিকশার রাজ্য: ১০ লাখ রিকশাচালকের জীবন

পর্ব ১: প্যাডেল মারো

সকাল ছয়টা। ঢাকার মিরপুরে একটা ছোট টিনের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে জামাল। বয়স ৩৮। মাদারীপুর থেকে এসেছে ১২ বছর আগে। সেদিন পকেটে ছিল ৫০০ টাকা, আর একটা চাচাতো ভাইয়ের ফোন নম্বর। আজ সে ঢাকার রাস্তায় রিকশা চালায়। প্রতিদিন।

জামাল সকাল ছয়টায় রিকশা নেয় গ্যারেজ থেকে। দৈনিক ভাড়া ১২০ টাকা। এটা মালিককে দিতেই হবে, সওয়ারি পাক বা না পাক। সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত সে প্যাডেল মারে। ভরদুপুরে ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায়। বর্ষায় হাঁটুজলে। শীতের কুয়াশায়। ১৩ ঘণ্টা। প্রতিদিন।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা এই না যে রিকশা থাকবে কি থাকবে না।
১০ লাখ মানুষ
৮৫ হাজার বনাম ১০ লাখ
১০ লাখ শ্রমিক
পৃথিবীর অন্য শহরগুলো কী করলো
৪৫০-৫০০ টাকা
প্যাডেল মারো

দিনশেষে জামালের পকেটে থাকে গড়ে ৪৫০-৫০০ টাকা। গ্যারেজ ভাড়া বাদ দিলে নিট আয় ৩৩০-৩৮০ টাকা। মাসে ১০,০০০-১১,৫০০ টাকা। এই টাকায় সে নিজে খায়, মাদারীপুরে বউ-দুই ছেলেমেয়েকে পাঠায়, আর ঢাকায় একটা ছোট ঘরের ভাড়া দেয়।

জামাল একা না। ঢাকায় তার মতো রিকশাচালক আছে অন্তত ১০ লাখ।

দশ লাখ। এই সংখ্যাটা একটু ভাবুন। ঢাকা শহরে প্রতি ২০ জন মানুষের মধ্যে ১ জন রিকশাচালক। এরা ঢাকার সবচেয়ে বড় পরিবহন কর্মীবাহিনী। বাস, সিএনজি, উবার, সব মিলিয়ে যত লোক আছে, তার চেয়ে বেশি শুধু রিকশাচালক।

এই চার্টটা দেখুন। ১৯৮০ সালে ঢাকায় রিকশা ছিল আনুমানিক ৮০,০০০। ২০০০ সালে সেটা দাঁড়ায় ৪ লাখে। ২০১০ সালে ৬ লাখ। আর ২০২৫ সালে? সবচেয়ে রক্ষণশীল হিসাবেও ১০ লাখের বেশি। কিছু গবেষণায় এই সংখ্যা ১৮ লাখ পর্যন্ত।

কিন্তু সরকারি কাগজে কত রিকশার লাইসেন্স আছে?


পর্ব ২: ৮৫ হাজার বনাম ১০ লাখ

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের আইনি সীমা হলো ৮৫,০০০ রিকশা। এটা ১৯৮৬ সালে নির্ধারণ করা হয়েছিল। তখন ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ৪০ লাখ। আজ ২ কোটি। কিন্তু আইনি সীমা সেই ৮৫,০০০ই আছে।

বাস্তবে রাস্তায় চলছে ১০ লাখের বেশি। মানে ৯ লাখ ১৫ হাজার রিকশা সম্পূর্ণ অবৈধ। কোনো নম্বরপ্লেট নেই। কোনো লাইসেন্স নেই। কোনো বীমা নেই। কোনো দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ নেই। পুলিশ ধরলে ঘুষ দিতে হয়, মানে জামাল প্রতি সপ্তাহে ১০০-২০০ টাকা "ম্যানেজ" এ খরচ করে।

এটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় অনিবন্ধিত পরিবহন ব্যবস্থা। একটা পুরো শিল্প, যেটায় ১০ লাখ মানুষ কাজ করে, সেটার ৯২% সরকারের খাতায় নেই। ট্যাক্স নেই, রেকর্ড নেই, পরিকল্পনা নেই।

কিন্তু রিকশাচালকরা কত আয় করে? আর সেই আয় কি টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট?

এই চার্টে দেখুন, ২০১০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত রিকশাচালকদের দৈনিক আয়ের ধারা। ২০১০ সালে গড় দৈনিক আয় ছিল ২৫০ টাকা। ২০২৫ সালে সেটা ৫০০ টাকা। দ্বিগুণ হয়েছে, তাই না? কিন্তু এই সময়ে ঢাকায় ভাত-ডালের দাম তিনগুণ বেড়েছে। ঘরভাড়া চারগুণ। মূল্যস্ফীতি সামঞ্জস্য করলে, রিকশাচালকের প্রকৃত আয় কমেছে।


পর্ব ৩: কে এই ১০ লাখ মানুষ?

জামালের গল্পটা আসলে লাখো রিকশাচালকের গল্প। তারা কারা? কোথা থেকে আসে? কেন এসেছে?

গবেষণার তথ্য বলছে: রিকশাচালকদের ৯৫% পুরুষ। গড় বয়স ৩৫। ৭০% এর বেশি বিবাহিত, কিন্তু পরিবার গ্রামে থাকে। শিক্ষাগত যোগ্যতা? ৪৫% এর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। আরো ৩৫% পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। মাত্র ৫% অষ্টম শ্রেণির উপরে পড়েছে।

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: তাদের প্রায় সবাই গ্রামীণ অভিবাসী।

এই মানচিত্রটা দেখুন। ঢাকার রিকশাচালকদের ৭৩% আসে চারটি বিভাগ থেকে: বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ। এগুলো বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চল। নদীভাঙন, মঙ্গা, ভূমিহীনতা, এসব কারণে এরা ঢাকায় আসে। রিকশা চালানোর জন্য কোনো শিক্ষা লাগে না, কোনো দক্ষতা লাগে না, কোনো পুঁজি লাগে না। শুধু শরীর লাগে।

এটাই রিকশার সবচেয়ে বড় সত্য: এটা পরিবহন ব্যবস্থা না, এটা দারিদ্র্যের শেষ আশ্রয়। যখন আর কিছু করার থাকে না, তখন মানুষ রিকশা চালায়।

কিন্তু এই "শেষ আশ্রয়" এর মূল্য কী?

ভয়াবহ। গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচ বছরের বেশি রিকশা চালানো মানুষদের মধ্যে ৬৮% এর দীর্ঘস্থায়ী পিঠের ব্যথা আছে। ৫৫% এর হাঁটুর সমস্যা। ৪২% শ্বাসকষ্টে ভোগে (ঢাকার বায়ুদূষণ)। ৩৮% এর উচ্চ রক্তচাপ। ৩০% এর ঘুমের সমস্যা। গড় কর্মজীবন? ১২-১৫ বছর। তারপর শরীর আর সায় দেয় না। ৫০ বছর বয়সে একজন রিকশাচালকের শরীর ৬৫ বছর বয়সী মানুষের মতো হয়ে যায়।

আর এদের কোনো স্বাস্থ্যবীমা নেই। পেনশন নেই। দুর্ঘটনা বীমা নেই। অসুস্থ হলে কোনো আয় নেই। রিকশাচালক অসুস্থ হওয়া মানে তার পরিবার না খেয়ে থাকা।


পর্ব ৪: ভাড়া বনাম মালিকানা

জামাল রিকশার মালিক না। সে প্রতিদিন ১২০ টাকা দিয়ে গ্যারেজ থেকে রিকশা ভাড়া নেয়। এটা ঢাকার রিকশা অর্থনীতির সবচেয়ে শোষণমূলক কাঠামো।

একটা সাধারণ রিকশা তৈরি করতে খরচ হয় ১৫,০০০-২০,০০০ টাকা। গ্যারেজ মালিক সেটা কিনে ভাড়া দেয় দৈনিক ১২০ টাকায়। মানে ৫-৬ মাসেই রিকশার পুরো দাম উঠে যায়। তারপর? বাকি ৩-৪ বছর পুরোটাই মুনাফা। একজন গ্যারেজ মালিকের ৫০-১০০টা রিকশা থাকে। দৈনিক আয় ৬,০০০-১২,০০০ টাকা। মাসে ১.৮-৩.৬ লাখ।

রিকশাচালক চায় নিজের রিকশা কিনতে। কিন্তু ২০,০০০ টাকা একসাথে জোগাড় করা তার পক্ষে অসম্ভব। ব্যাংক তাকে লোন দেয় না, কারণ তার কোনো জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা ঢাকায় নেই, কোনো জামানত নেই। মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান? তাদের সুদের হার ২০-৩০%। এটা আরেক ফাঁদ।

ফলে জামালের মতো ৭৫% রিকশাচালক আজীবন ভাড়াটে থেকে যায়। প্রতিদিন ১৩ ঘণ্টা প্যাডেল মেরে প্রথম ৩-৪ ঘণ্টার আয় চলে যায় গ্যারেজ মালিকের পকেটে।

এবার প্রশ্ন: রিকশায় চড়তে যাত্রীর কত খরচ হয়? অন্য পরিবহনের তুলনায় এটা কি সস্তা?

উত্তর জটিল। ২ কিলোমিটার যাত্রায় রিকশা ভাড়া ৩০-৫০ টাকা। সিএনজিতে ৫০-৮০ টাকা (মিটার চললে)। উবার/পাঠাওয়ে ৭০-১২০ টাকা। বাসে ১০-১৫ টাকা। মানে রিকশা বাসের চেয়ে ৩-৪ গুণ দামি, কিন্তু উবারের চেয়ে সস্তা। রিকশা আসলে মধ্যবিত্তের "শেষ মাইল" পরিবহন। বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসা, বাজার থেকে বাসা, এই ছোট দূরত্বে রিকশাই একমাত্র বিকল্প, কারণ ঢাকার গলিতে বাস ঢোকে না।


পর্ব ৫: ব্যাটারি বিপ্লব

এবার একটা বড় পরিবর্তনের কথা বলি। গত পাঁচ বছরে ঢাকার রাস্তায় একটা নীরব বিপ্লব ঘটেছে: ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজি বাইক।

২০১৫ সালে ঢাকায় ব্যাটারি রিকশা ছিল প্রায় শূন্য। ২০২০ সালে ৫০,০০০। ২০২৫ সালে? আনুমানিক ৩ লাখ। এবং এই সংখ্যা প্রতি বছর ৩০-৪০% হারে বাড়ছে।

ব্যাটারি রিকশা জামালের জীবনে কী বদল আনছে? অনেক কিছু। প্যাডেল রিকশায় দিনে ১০-১২ ট্রিপ করা যায়। ব্যাটারি রিকশায় ২০-২৫ ট্রিপ। শারীরিক কষ্ট অনেক কম। দৈনিক আয় ৬০০-৮০০ টাকা, মানে প্যাডেল রিকশার চেয়ে ৫০-৬০% বেশি।

কিন্তু সমস্যাও আছে। ব্যাটারি রিকশার দাম ৮০,০০০-১,২০,০০০ টাকা। প্যাডেল রিকশার চার থেকে ছয় গুণ। গ্যারেজ ভাড়াও বেশি, ২৫০-৩৫০ টাকা দৈনিক। ব্যাটারি চার্জ করতে খরচ হয় দৈনিক ৫০-৮০ টাকা। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা: ব্যাটারি রিকশা আইনত নিষিদ্ধ। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এগুলোর রেজিস্ট্রেশন দেয় না। তাহলে ৩ লাখ ব্যাটারি রিকশা চলছে কীভাবে? উত্তর সেই একই: অবৈধভাবে, ঘুষের মাধ্যমে, সরকারের চোখ এড়িয়ে।

এটা একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি। একটা শিল্প যেটা নিজে থেকেই বৈদ্যুতিক যানে রূপান্তরিত হচ্ছে (যেটা সারা বিশ্ব করতে চাইছে), সেটাকে সরকার নিষিদ্ধ করে রেখেছে। কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, কোনো মান নেই, কোনো নিরাপত্তা পরীক্ষা নেই। সস্তা চীনা ব্যাটারি ব্যবহার হচ্ছে, যেগুলো বিস্ফোরিত হওয়ার ঝুঁকি আছে। চার্জিং স্টেশনগুলো অননুমোদিত বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবহার করে, যেটা আগুনের ঝুঁকি তৈরি করে।

নিষেধ করে কোনো লাভ হয়নি। নিয়ন্ত্রণ করলে হতো।


পর্ব ৬: পৃথিবীর অন্য শহরগুলো কী করলো?

ঢাকাই একমাত্র "রিকশার শহর" না। এশিয়ার অনেক শহরেই রিকশা ছিল বা আছে। কিন্তু তারা এই খাতটাকে কীভাবে সামলালো?

ঢাকায় ১০ লাখের বেশি রিকশা, কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। হ্যানয়ে রিকশা (সাইক্লো) পর্যটকদের জন্য সীমিত, সংখ্যা ৫,০০০ এর কম। কলকাতায় হাতে টানা রিকশা নিষিদ্ধ, তবে ই-রিকশা নিবন্ধিত ও নিয়ন্ত্রিত, সংখ্যা প্রায় ৫০,০০০। বেইজিংয়ে সাইকেল রিকশা পর্যটন খাতে সীমাবদ্ধ। টোকিওতে জিনরিকিশা সম্পূর্ণ পর্যটন পণ্য।

কলকাতার উদাহরণটা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তারা হাতে টানা রিকশা বন্ধ করেছে (মানবিক কারণে), কিন্তু ই-রিকশাকে বৈধ করেছে। প্রতিটা ই-রিকশার রেজিস্ট্রেশন আছে, চালকের লাইসেন্স আছে, যাত্রী বীমা আছে, নির্দিষ্ট রুট আছে। ফলে চালকও সুরক্ষিত, যাত্রীও।

ঢাকা কি এটা করতে পারে? অবশ্যই পারে। কিন্তু প্রথমে ৪০ বছরের পুরনো ৮৫,০০০ এর সীমা বাতিল করতে হবে। বাস্তবতাকে স্বীকার করতে হবে। ১০ লাখ রিকশা আছে, এটা সত্য। এদের নিবন্ধন করুন, লাইসেন্স দিন, নিয়ন্ত্রণ করুন। ব্যাটারি রিকশার জন্য নিরাপত্তা মান তৈরি করুন। চালকদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু করুন। গ্যারেজ ভাড়ার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করুন।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা এই না যে রিকশা থাকবে কি থাকবে না। প্রশ্নটা হলো: ১০ লাখ মানুষ, যাদের জীবিকা এই রিকশা, তাদের ভবিষ্যৎ কী?


জামাল আজ রাতেও মিরপুরের টিনের ঘরে ফিরবে। ক্লান্ত শরীরে ভাত খাবে। মাদারীপুরে ফোন করবে, ছেলের পরীক্ষার খবর জানবে। কাল সকালে আবার সেই গ্যারেজ, সেই রিকশা, সেই রাস্তা।

সে জানে না তার রিকশা অবৈধ। সে জানে না সরকারি হিসাবে তার অস্তিত্ব নেই। সে শুধু জানে এই রিকশাটাই তার আর তার পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়।

ঢাকা শহর রিকশা ছাড়া চলতে পারবে না। ঢাকার ৩০% অভ্যন্তরীণ যাত্রী পরিবহন রিকশায় হয়। গলিঘুপচি, সরু রাস্তা, শেষ মাইল সংযোগ, এগুলোতে রিকশার কোনো বিকল্প নেই। তাহলে যে শিল্প ছাড়া শহর চলে না, সেই শিল্পের ১০ লাখ শ্রমিককে অদৃশ্য রেখে কী লাভ?

তাদের দেখুন। তাদের গণনা করুন। তাদের অধিকার দিন। কারণ প্রতিটা রিকশার পেছনে একটা জামাল আছে, আর প্রতিটা জামালের পেছনে মাদারীপুরে একটা পরিবার অপেক্ষা করছে।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50