Back to publications
Narrative 2026-03-06

১০ কোটি স্মার্টফোন, শূন্য ডিজিটাল অর্থনীতি

সংযোগ আছে, উৎপাদনশীলতা নেই

১০ কোটি স্মার্টফোন, শূন্য ডিজিটাল অর্থনীতি

পর্ব ১: রিকশাওয়ালার টিকটক

মিরপুরের রিকশাওয়ালা জব্বার মিয়া। বয়স ৪৫। রিকশা চালায় সকাল থেকে রাত। দিনে আয় ৫০০-৬০০ টাকা। কিন্তু রিকশার হ্যান্ডেলে একটা মোবাইল ফোন ক্লিপ দিয়ে আটকানো। যাত্রী না থাকলে জব্বার মিয়া টিকটক দেখে। ফানি ভিডিও, গান, ড্রামা। ডেটা প্যাক কেনে মাসে ৩০০ টাকা, প্রায় এক দিনের আয়ের সমান।

জব্বারের মেয়ে রুমা, বয়স ১৭। ক্লাস নাইনে পড়ে। প্রতিদিন গড়ে চার ঘণ্টা ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে কাটায়। রিলস দেখে, স্ট্যাটাস দেয়, কমেন্ট করে। কিন্তু রুমাকে যদি বলেন, "একটা ইমেইল পাঠাও", সে পারবে না। "গুগল ম্যাপসে রাস্তা খোঁজো", পারবে না। "একটা এক্সেল শিটে হিসাব করো", পারবে না। সে জানে না এগুলো কী, কেন দরকার, কীভাবে কাজ করে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো: এই ১৩ কোটি মানুষ অনলাইনে কী করছে? এই সংযোগ কি দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে?
১৩ কোটি মানুষ
রিকশাওয়ালার টিকটক
প্রায় ২,৮০০ বিলিয়ন টাক
সাফল্যের মুখোশ
১.৮ বিলিয়ন ডলার
আসল ব্যবধান

জব্বার মিয়া আর রুমা দুজনেই "ইন্টারনেট ব্যবহারকারী"। সরকারি হিসাবে এরা দুজনেই "ডিজিটাল বাংলাদেশ"-এর অংশ। কিন্তু ইন্টারনেট দিয়ে কী করছে? ভিডিও দেখা, সোশ্যাল মিডিয়া, গান শোনা। ব্যস।

বাংলাদেশে এখন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় ১৩ কোটি। জনসংখ্যার প্রায় ৭৫%। এটা শুনলে মনে হয় বিশাল সাফল্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো: এই ১৩ কোটি মানুষ অনলাইনে কী করছে? এই সংযোগ কি দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে? নাকি আমরা শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সময় কাটাচ্ছি?

এই চার্টটা দেখুন:

২০১০ সালে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল ৫০ লাখ। ২০২৫ সালে ১৩ কোটি। পনেরো বছরে ২৬ গুণ বৃদ্ধি। যেকোনো হিসাবে এটা অসাধারণ। আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশ, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ এখনো এই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

কিন্তু একটু গভীরে তাকালে ছবি বদলে যায়।

বাংলাদেশের ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ৯৪% শুধু মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ব্রডব্যান্ড সংযোগ আছে মাত্র ৮০ লাখ পরিবারে। মানে ১৩ কোটির মধ্যে ১২ কোটি ২০ লাখ মানুষ ছোট একটা স্ক্রিনে, ধীর গতিতে, সীমিত ডেটায় ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। একটা ৫ ইঞ্চি স্ক্রিনে আপনি টিকটক দেখতে পারবেন, কিন্তু কোডিং শিখবেন কীভাবে? ডেটা এন্ট্রি করবেন কীভাবে? অনলাইন কোর্স করবেন কীভাবে?

মোবাইল ইন্টারনেট ভোগের হাতিয়ার। ব্রডব্যান্ড উৎপাদনশীলতার হাতিয়ার। বাংলাদেশ ভোগে ডুবে আছে।


পর্ব ২: সাফল্যের মুখোশ

সংখ্যা দিয়ে শুরু করলে বাংলাদেশের ডিজিটাল গল্পটা দারুণ। ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। বিকাশ আর নগদ মিলিয়ে ২০ কোটির বেশি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) অ্যাকাউন্ট। মোবাইলে টাকা পাঠানো, বিল দেওয়া, কেনাকাটা করা, এগুলো এখন সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ।

এই চার্টটা দেখুন:

MFS লেনদেনের পরিমাণ ২০১৬ সালে ছিল ১৮০ বিলিয়ন টাকা। ২০২৫ সালে প্রায় ২,৮০০ বিলিয়ন টাকা, মানে ২.৮ লাখ কোটি টাকা। নয় বছরে পনেরো গুণ বৃদ্ধি। বিকাশ একাই বছরে প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন টাকার লেনদেন প্রক্রিয়া করে। এটা বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

এই সংখ্যাগুলো দেখলে মনে হয় বাংলাদেশ ডিজিটাল বিপ্লবে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার "স্মার্ট বাংলাদেশ" বলছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রশংসা করছে। কিন্তু থামুন। এই সাফল্যের পেছনে কী আছে?

বিকাশে কী হচ্ছে? ৮০% লেনদেন হলো ক্যাশ-ইন আর ক্যাশ-আউট। মানে মানুষ এটিএমের বিকল্প হিসেবে বিকাশ ব্যবহার করছে। টাকা ঢোকাও, টাকা বের করো। ই-কমার্স পেমেন্ট? মোট লেনদেনের ২-৩%। বিল পেমেন্ট? ৫-৬%। স্যালারি ডিসবার্সমেন্ট? ৩-৪%। বাকিটা শুধু টাকা আদান-প্রদান।

বিকাশ একটা আধুনিক হুন্ডি সিস্টেম। টাকা পাঠানোর জন্য দারুণ। কিন্তু এটা ডিজিটাল অর্থনীতি না। এটা ডিজিটাল ক্যাশ ট্রান্সফার।

আসল ডিজিটাল অর্থনীতির পরিমাপ কী? ই-কমার্স। আর সেখানে বাংলাদেশের অবস্থা লজ্জাজনক।

বাংলাদেশে মোট খুচরা বিক্রয়ে ই-কমার্সের অংশ মাত্র ২%। চীনে ৩০%। ভারতে ৮%। যুক্তরাষ্ট্রে ১৫%। এমনকি ভিয়েতনাম, যাদের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের কাছাকাছি, তাদেরও ৫.৫%।

১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী আছে, কিন্তু অনলাইনে কিনছে কতজন? বড়জোর ৩০-৪০ লাখ নিয়মিত ক্রেতা। বাকিরা? অনলাইনে জিনিস দেখে, তারপর দোকানে গিয়ে কেনে। কারণ? বিশ্বাসের অভাব। ডেলিভারি সিস্টেম খারাপ। রিটার্ন পলিসি নেই। অনলাইন পেমেন্টে ভয়। প্রোডাক্ট কোয়ালিটির গ্যারান্টি নেই।


পর্ব ৩: আসল ব্যবধান

ই-কমার্স তো ভোক্তার দিক। উৎপাদনের দিকটা আরো ভয়াবহ।

বাংলাদেশ থেকে আইটি ও আইটি-সক্ষম সেবা (IT/ITES) রপ্তানি কত? ১.৮ বিলিয়ন ডলার। শুনতে বড় লাগে। এবার তুলনা করুন:

ভারত রপ্তানি করে ২০০ বিলিয়ন ডলার। ফিলিপাইন ৩০ বিলিয়ন ডলার। ভিয়েতনাম ৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ? ১.৮ বিলিয়ন। ভারতের একশো ভাগের এক ভাগেরও কম। ফিলিপাইনের ষোল ভাগের এক ভাগ।

"কিন্তু বাংলাদেশ ছোট দেশ, তুলনা ঠিক না।" ভুল। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ভিয়েতনামের দেড় গুণ। কিন্তু ভিয়েতনামের আইটি রপ্তানি বাংলাদেশের প্রায় তিন গুণ। জনসংখ্যা সম্পদ না, দক্ষতা সম্পদ।

স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম? আরো করুণ দশা।

বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে গত দশ বছরে সঞ্চিত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডিং প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার। ভারতে ১২০ বিলিয়ন। ইন্দোনেশিয়ায় ১৫ বিলিয়ন। এমনকি পাকিস্তানেও ৮০০ মিলিয়ন। বাংলাদেশ পাকিস্তানের আট ভাগের এক ভাগ।

এর কারণ কী? বাংলাদেশিরা কি কম মেধাবী? না। কারণটা হলো ডিজিটাল সাক্ষরতার ব্যবধান। বাংলাদেশে মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু কাজের জন্য ডিজিটাল টুল ব্যবহার করতে পারে না।

এই চার্টটা দেখুন, এটাই আসল গল্প:

বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৭৮% ফেসবুক ব্যবহার করতে পারে। ৬৫% ইউটিউব দেখে। ৫২% বিকাশে টাকা পাঠাতে পারে। কিন্তু ইমেইল পাঠাতে পারে মাত্র ১২%। স্প্রেডশিট ব্যবহার করতে পারে ৫%। অনলাইনে চাকরি খুঁজতে পারে ৮%।

এটাই স্মার্টফোন প্যারাডক্স। আমরা ডিজিটাল ভোক্তা তৈরি করেছি, ডিজিটাল কর্মী তৈরি করিনি। ফেসবুক আমাদের শিখিয়েছে স্ক্রল করতে, কিন্তু কেউ শেখায়নি প্রোডাক্টিভ হতে।

একটা দেশের ১৩ কোটি মানুষ অনলাইনে আছে, কিন্তু তাদের বেশিরভাগ শুধু কন্টেন্ট গিলছে। তৈরি করছে না। বিক্রি করছে না। শিখছে না। উপার্জন করছে না। এটা সংযোগ না। এটা আসক্তি।


পর্ব ৪: ফ্রিল্যান্সার প্যারাডক্স

"কিন্তু বাংলাদেশ তো ফ্রিল্যান্সিংয়ে দ্বিতীয়!" এই কথাটা আপনি শুনেছেন। সরকার বলে, মিডিয়া বলে, সবাই গর্ব করে বলে। Upwork, Fiverr, Freelancer.com, এসব প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা বিশ্বে দ্বিতীয়, ভারতের পরেই।

সংখ্যাটা সত্য। কিন্তু আধা-সত্য মিথ্যার চেয়ে বিপজ্জনক।

এই চার্টে দুটো জিনিস দেখুন। নীল বার হলো ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা। লাল লাইন হলো গড় ঘণ্টাপ্রতি আয়। বাংলাদেশের বার উঁচু, কারণ সংখ্যা বেশি, প্রায় ৬.৫ লাখ সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার। কিন্তু লাইনটা? মাটিতে। বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের গড় ঘণ্টাপ্রতি আয় ৪ ডলার। ভারতীয়দের ১৫ ডলার। ফিলিপাইনের ১২ ডলার। আমেরিকান ফ্রিল্যান্সারদের ৪৫ ডলার।

কেন এত কম? কারণ বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের বেশিরভাগ নিম্নমানের কাজ করে। ডেটা এন্ট্রি, সাধারণ গ্রাফিক ডিজাইন, কপি-পেস্ট আর্টিকেল লেখা, সিম্পল ওয়েবসাইট, এই ধরনের কাজ। যেখানে দক্ষতা কম লাগে, প্রতিযোগিতা বেশি, দাম কম।

উচ্চমানের কাজ, যেমন সফটওয়্যার আর্কিটেকচার, AI/ML ডেভেলপমেন্ট, ক্লাউড ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রোডাক্ট ডিজাইন, এগুলো করার মতো দক্ষতা বাংলাদেশের বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সারের নেই। কারণ এই দক্ষতা অর্জনের জন্য দরকার ভালো ইন্টারনেট (ব্রডব্যান্ড), ভালো কম্পিউটার, ইংরেজি দক্ষতা, আর মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ। বাংলাদেশের বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সার ফোনে কাজ করে। ফোনে।

তাহলে বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সিংয়ে "দ্বিতীয়" মানে কী? মানে আমাদের অনেক মানুষ অল্প টাকায় কাজ করছে। সংখ্যায় বেশি, মূল্যে নগণ্য। এটা গর্বের বিষয় না। এটা ডিজিটাল দিনমজুরি।

গার্মেন্টস খাতের সাথে মিল দেখুন। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস রপ্তানিকারক। কিন্তু প্রতিটা শার্টে বাংলাদেশের ভাগ কত? ৫-১০%। বাকিটা যায় ব্র্যান্ড, ডিজাইন, মার্কেটিং, লজিস্টিকসে। আমরা সেলাই করি, অন্যরা মুনাফা করে। ফ্রিল্যান্সিংয়েও একই গল্প। আমরা ডেটা এন্ট্রি করি, অন্যরা সফটওয়্যার বিক্রি করে।


পর্ব ৫: অন্যরা কী করলো?

বাংলাদেশের অবস্থা বোঝার জন্য দুটো দেশের দিকে তাকানো যাক।

এস্তোনিয়া। জনসংখ্যা ১৩ লাখ। বাংলাদেশের একটা উপজেলার সমান। কিন্তু ডিজিটাল গভর্নেন্সে বিশ্বের এক নম্বর। ২০০০ সালে এস্তোনিয়া সিদ্ধান্ত নিলো: সরকারি সেবার ৯৯% অনলাইনে দেবে। আজ এস্তোনিয়ায় জন্ম নিবন্ধন থেকে ট্যাক্স রিটার্ন, ব্যবসা নিবন্ধন থেকে ভোট দেওয়া, সব অনলাইনে হয়। একজন এস্তোনিয়ান নাগরিক বছরে গড়ে ৫ দিন বাঁচায় শুধু সরকারি সেবা অনলাইনে পাওয়ার কারণে। আর e-Residency প্রোগ্রামের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো মানুষ এস্তোনিয়ায় ডিজিটাল ব্যবসা খুলতে পারে।

ভারত। UPI (Unified Payments Interface)। ২০১৬ সালে চালু হয়েছে। আজ মাসে ১২ বিলিয়নের বেশি লেনদেন হয়। বছরে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার। বিকাশের মতো, কিন্তু অনেক বড় পার্থক্য আছে। UPI একটা ওপেন প্ল্যাটফর্ম, যেকোনো ব্যাংক, যেকোনো অ্যাপ UPI ব্যবহার করতে পারে। ফি প্রায় শূন্য। আর UPI শুধু টাকা পাঠানো না, এটা পুরো ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি। ই-কমার্স, বিল পেমেন্ট, সাবস্ক্রিপশন, সরকারি ভর্তুকি, সবকিছু UPI দিয়ে হয়। ভারতের ই-কমার্স বিস্ফোরণের পেছনে UPI একটা বড় কারণ।

বাংলাদেশে বিকাশ আর নগদ প্রোপ্রায়েটারি সিস্টেম। বিকাশ থেকে নগদে সরাসরি টাকা পাঠানো যায় না। দুটো আলাদা দ্বীপ। কোনো ওপেন ইকোসিস্টেম নেই। ফলে ডিজিটাল পেমেন্ট আছে, কিন্তু ডিজিটাল অর্থনীতি নেই।

ই-গভর্নেন্স সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৪৪.৮%। এস্তোনিয়া ৯১.২%। সিঙ্গাপুর ৯৫.৫%। ভারতও ৬৫.৩%। বাংলাদেশ বৈশ্বিক গড়ের নিচে।

সরকারি সেবা এখনো কাগজনির্ভর। জমির রেকর্ড? ম্যানুয়াল। জন্ম নিবন্ধন? লাইনে দাঁড়ান। ব্যবসা নিবন্ধন? দালাল ধরুন। ট্যাক্স রিটার্ন? অনলাইন সিস্টেম আছে, কিন্তু এত জটিল যে বেশিরভাগ মানুষ এখনো কাগজে করে অথবা কাউকে দিয়ে করায়।

ডিজিটাল সংযোগ আর ডিজিটাল রূপান্তর এক জিনিস না। সংযোগ মানে ইন্টারনেট পাওয়া। রূপান্তর মানে ইন্টারনেট দিয়ে জীবন, কাজ, সরকার, ব্যবসা বদলে ফেলা। বাংলাদেশ সংযোগে এগিয়েছে, রূপান্তরে পিছিয়ে আছে বিশাল ব্যবধানে।


তাহলে কী করতে হবে?

সমস্যাটা এখন পরিষ্কার। বাংলাদেশের ১৩ কোটি মানুষ অনলাইনে আছে, কিন্তু বেশিরভাগ শুধু ভোগ করছে। ই-কমার্স ক্ষুদ্র, আইটি রপ্তানি নগণ্য, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ভ্রূণ অবস্থায়, ফ্রিল্যান্সাররা ডিজিটাল দিনমজুরি করছে, সরকারি সেবা কাগজে আটকে আছে।

তিনটা কাজ করলে পাঁচ বছরে ছবি বদলে যেতে পারে।

এক: ডিজিটাল সাক্ষরতা, ফেসবুক না, কাজের দক্ষতা। স্কুলে কম্পিউটার ক্লাস মানে এখন "কম্পিউটারের পরিচিতি" আর "MS Paint"। এটা বদলাতে হবে। ক্লাস ৬ থেকে স্প্রেডশিট, ইমেইল, ক্লাউড ডকুমেন্ট, বেসিক কোডিং শেখাতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল দক্ষতা কেন্দ্র খুলতে হবে, যেখানে মানুষ শিখবে অনলাইনে চাকরি খুঁজতে, ফর্ম পূরণ করতে, ই-কমার্সে পণ্য বিক্রি করতে। টার্গেট: ২০৩০ সালের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৩০% যেন প্রোডাক্টিভ ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন করে।

দুই: ওপেন পেমেন্ট ইকোসিস্টেম, ভারতের UPI মডেল। বাংলাদেশ ব্যাংককে একটা ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট সিস্টেম তৈরি করতে হবে। বিকাশ, নগদ, রকেট, ব্যাংক, সব একই নেটওয়ার্কে। ফি কমাতে হবে শূন্যের কাছে। ই-কমার্স পেমেন্ট সহজ করতে হবে। ছোট ব্যবসার জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করা যেন ফ্রি হয়। ভারত UPI দিয়ে দেখিয়েছে: পেমেন্ট সহজ করলে ই-কমার্স নিজে থেকেই বাড়ে।

তিন: ব্রডব্যান্ড বিস্তার, মোবাইল-অনলি থেকে বেরিয়ে আসা। সরকারকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে বিদ্যুতের মতো মৌলিক অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক পৌঁছাতে হবে। কমিউনিটি ব্রডব্যান্ড সেন্টার খুলতে হবে, যেখানে কম্পিউটার আছে, দ্রুত ইন্টারনেট আছে, আর প্রশিক্ষক আছে। টার্গেট: ২০৩০ সালের মধ্যে ব্রডব্যান্ড সংযোগ বর্তমান ৮০ লাখ থেকে ৩ কোটিতে নিয়ে যাওয়া।


আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।

মিরপুরের জব্বার মিয়া আজ রাতেও রিকশা চালাবে। যাত্রী অপেক্ষায় টিকটক দেখবে। তার মেয়ে রুমা ফেসবুকে চার ঘণ্টা কাটাবে। দুজনের হাতেই স্মার্টফোন আছে। দুজনেই "অনলাইনে" আছে।

কিন্তু রুমা যদি ওই চার ঘণ্টার একটা ঘণ্টাও গ্রাফিক ডিজাইন শিখতো? ডেটা এন্ট্রি শিখতো? বেসিক ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শিখতো? পাঁচ বছরের মধ্যে সে ঘরে বসে মাসে ২০-৩০ হাজার টাকা আয় করতে পারতো। জব্বার মিয়ার পুরো মাসের আয়ের সমান।

বাংলাদেশে ১৩ কোটি মানুষের হাতে ইন্টারনেট আছে। এটা বিশাল সম্ভাবনা। কিন্তু সম্ভাবনা আর বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান পাটাতে হবে। সেটা হবে না শুধু ফোন আর ডেটা প্যাক দিয়ে। দরকার দক্ষতা, অবকাঠামো, আর একটা ইকোসিস্টেম যেটা ভোগ না, উৎপাদনশীলতাকে পুরস্কৃত করে।

১৩ কোটি স্মার্টফোন আছে। এখন দরকার ১৩ কোটি স্মার্ট ব্যবহারকারী।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50