Back to publications
Narrative 2026-03-06

শেয়ার বাজার: বিনিয়োগ না জুয়া?

২০১০ সালের ধস, খুচরা বিনিয়োগকারীর ক্ষতি, আর বাজার কারসাজি

শেয়ার বাজার: বিনিয়োগ না জুয়া?

পর্ব ১: রহিমের গল্প

২০১০ সালের নভেম্বর মাস। ঢাকার মতিঝিলে DSE ভবনের সামনে মানুষের ভিড়। সবার চোখে স্বপ্ন। শেয়ার বাজার তখন আকাশ ছুঁচ্ছে। DGEN সূচক ৮,৯১৮ পয়েন্টে। প্রতিদিন বাড়ছে। চায়ের দোকানে, রিকশায়, অফিসের ক্যান্টিনে একটাই কথা: "শেয়ার বাজারে টাকা রাখো, দুই মাসে দ্বিগুণ।"

রহিম মিয়া কুমিল্লার একজন স্কুলশিক্ষক। মাসে বেতন পান ১৮,০০০ টাকা। তার শ্যালক ফোন করলো: "ভাইজান, বাজারে সব বাড়তেছে। আমি ৫০,০০০ লাগাইছিলাম, এখন ১ লাখ ২০ হাজার। আপনিও আসেন।" রহিম মিয়া সঞ্চয়পত্র ভাঙলেন ২ লাখ টাকা। স্ত্রীর গয়না বন্ধক রেখে আরো ১ লাখ জোগাড় করলেন। মোট ৩ লাখ টাকা নিয়ে BO অ্যাকাউন্ট খুললেন।

এর মাঝে কিছু উত্থান, কিন্তু সেগুলো টেকেনি। একটা প্যাটার্ন দেখতে পাচ্ছেন?
৩০ লাখ মানুষ
যদি বদলাতে চাই
১৮,০০০ টাকা
রহিমের গল্প
১৫-২০%
২০১০-এর ধস ও লুটপাট

প্রথম দুই সপ্তাহে তার পোর্টফোলিও হয়ে গেলো ৩ লাখ ৮০ হাজার। রহিম মিয়া ভাবলেন, আরেকটু অপেক্ষা করি। ৫ লাখ হলে বের করে নেবো।

তারপর ১৯ ডিসেম্বর, ২০১০।

একদিনে সূচক পড়লো ৫৫১ পয়েন্ট। পরের দিন আরো। তারপর আরো। জানুয়ারি ২০১১ এর মধ্যে সূচক ৮,৯১৮ থেকে নেমে এলো ৫,২০৩ এ। রহিম মিয়ার ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকার পোর্টফোলিও কমে দাঁড়ালো ৯০ হাজার টাকায়। সঞ্চয়পত্রের টাকা শেষ। স্ত্রীর গয়না শেষ। আর বাজার ওঠার কোনো লক্ষণ নেই।

রহিম মিয়ার মতো প্রায় ৩০ লাখ খুচরা বিনিয়োগকারী সেদিন সর্বস্বান্ত হয়েছিল।

এবার এই চার্টটা দেখুন:

এটা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সূচকের ইতিহাস। ১৯৯৬ সালে প্রথম বুদবুদ, তারপর ধস। ২০১০ সালে আরেকটা বুদবুদ, আরো বড় ধস। এর মাঝে কিছু উত্থান, কিন্তু সেগুলো টেকেনি। একটা প্যাটার্ন দেখতে পাচ্ছেন? বুদবুদ, ধস, বুদবুদ, ধস। এটা কি বিনিয়োগের বাজার, নাকি জুয়ার আড্ডা?


পর্ব ২: ২০১০-এর ধস ও লুটপাট

২০১০ সালের ধসটা একটু বিস্তারিত দেখা যাক। কারণ এটা শুধু বাজারের ওঠানামা ছিল না। এটা ছিল পরিকল্পিত লুটপাট।

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে DGEN সূচক ছিল ২,৮০০ পয়েন্টের কাছে। দুই বছরে সেটা উঠে গেলো ৮,৯১৮ এ। তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি। এই সময়ে কী হয়েছিল? অর্থনীতি কি তিন গুণ বেড়ে গিয়েছিল? কোম্পানিগুলোর মুনাফা কি তিন গুণ হয়েছিল? না। কিছুই হয়নি। যেটা হয়েছিল সেটা হলো কারসাজি।

বড় বিনিয়োগকারীরা, ব্রোকার হাউসগুলো, আর কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি মিলে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়েছিল। তারা ছোট কোম্পানির শেয়ার কিনতো, দাম বাড়াতো, মিডিয়ায় গুজব ছড়াতো: "এই কোম্পানি বিদেশে কন্ট্র্যাক্ট পেয়েছে," "ওই কোম্পানির জমি আছে ঢাকায়।" খুচরা বিনিয়োগকারীরা সেই গুজবে শেয়ার কিনতো, দাম আরো বাড়তো। তারপর বড়রা নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যেত। দাম পড়তো। ক্ষতি হতো ছোটদের।

এটা পুঁজিবাজারের ভাষায় "পাম্প অ্যান্ড ডাম্প।" বাংলাদেশের ভাষায় "বাজার কারসাজি।"

কিন্তু শুধু ব্যক্তিদের দোষ দিলে ভুল হবে। ব্যবস্থাটাই এমন ছিল। ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার কমিয়ে রেখেছিল। ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করছিল, যেটা নিয়মবিরুদ্ধ ছিল কিন্তু কেউ ঠেকায়নি। মার্জিন লোন সহজলভ্য ছিল। একজন ১ লাখ টাকা রাখলে ব্রোকার তাকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ধার দিতো শেয়ার কিনতে। বাজার উঠলে সবাই খুশি। কিন্তু বাজার পড়লে? মার্জিন কল। ব্রোকার জোর করে শেয়ার বিক্রি করে দিতো। দাম আরো পড়তো। একটা চেইন রিঅ্যাকশন।

ধসের পর কী হলো? সরকার একটা তদন্ত কমিটি করলো। ইব্রাহীম খলিল কমিটি। তারা রিপোর্ট দিলো: হ্যাঁ, কারসাজি হয়েছে। কিন্তু শাস্তি? প্রায় শূন্য। কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হলো, বছরের পর বছর আদালতে ঘুরছে। কেউ জেলে যায়নি। কারো টাকা ফেরত আসেনি।

রহিম মিয়ার ২ লাখ ১০ হাজার টাকা কোথায় গেলো? যারা আগে থেকে জানতো ধস আসছে, তাদের পকেটে।

এবার একটু বড় ছবি দেখি। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অর্থনীতির তুলনায় কতটা বড়?

মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন-টু-জিডিপি অনুপাত, যেটাকে "বাফেট ইন্ডিকেটর"ও বলে। উন্নত দেশে এই অনুপাত ১০০% এর বেশি। ভারতে ১১০%। আমেরিকায় ১৫০% এর বেশি। বাংলাদেশে? মাত্র ১৫-২০%। মানে বাংলাদেশের শেয়ার বাজার অর্থনীতির তুলনায় খুবই ছোট। অর্থনীতি বড় হচ্ছে, কিন্তু পুঁজিবাজার সেই গতিতে বাড়ছে না। কেন? কারণ মানুষ বিশ্বাস করে না। ২০১০ এর ধস সেই বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছে।


পর্ব ৩: কারা খেলছে, কারা হারছে

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দুই ধরনের খেলোয়াড় আছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী: ব্যাংক, বিমা কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড, বিদেশি ফান্ড। আর খুচরা বিনিয়োগকারী: রহিম মিয়ার মতো সাধারণ মানুষ।

একটা অস্বাভাবিক ছবি দেখবেন এখানে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে টার্নওভারের (দৈনিক কেনাবেচার) প্রায় ৮০% আসে খুচরা বিনিয়োগকারীদের থেকে। প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ মাত্র ২০%। উন্নত দেশে ছবিটা উল্টো। আমেরিকায় প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ৭০%। ভারতে ৫৫%। কেন এটা সমস্যা?

কারণ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা পেশাদার। তাদের গবেষণা দল আছে, ডেটা আছে, বিশ্লেষণ ক্ষমতা আছে। তারা কোম্পানির ব্যালেন্স শিট পড়ে, ভবিষ্যৎ আয়ের পূর্বাভাস করে, ঝুঁকি হিসাব করে। খুচরা বিনিয়োগকারী? রহিম মিয়া তার শ্যালকের ফোনের উপর ভরসা করে শেয়ার কেনেন। চায়ের দোকানের গুজবে কেনেন। ফেসবুক গ্রুপের "টিপস" এ কেনেন।

যখন বাজারের ৮০% লেনদেন এই অপ্রশিক্ষিত মানুষদের হাতে, তখন বাজার অস্থির হবেই। গুজবে বাড়বে, গুজবে পড়বে। আর যারা তথ্য আগে পায়, তারা সবসময় জিতবে।

আর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা? তারা কি বাংলাদেশের বাজারে আসছে?

দুঃখজনক সত্য হলো: বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আসছে না। বরং যাচ্ছে। DSE তে বিদেশি বিনিয়োগের অংশ ৪-৫% এর মধ্যে আটকে আছে। ২০১৩ সালে এটা ছিল প্রায় ৮%। তারপর থেকে কমছে। কেন?

কারণ একটা বাজারে বিনিয়োগ করতে হলে তিনটা জিনিস লাগে: স্বচ্ছতা, আইনের শাসন, আর বিশ্বাসযোগ্য নিয়ন্ত্রক। বাংলাদেশে তিনটার কোনোটাই নেই। কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন অনেক সময় সঠিক না। ইনসাইডার ট্রেডিং হরহামেশা হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা BSEC রাজনৈতিক চাপে কাজ করে। একজন বিদেশি ফান্ড ম্যানেজার কেন এমন বাজারে টাকা রাখবে?


পর্ব ৪: আইপিও লটারি আর নিয়ন্ত্রকের ব্যর্থতা

বাংলাদেশে আইপিও (প্রাথমিক পাবলিক অফারিং) একটা লটারির মতো। কোম্পানি শেয়ার বাজারে আসে, মানুষ আবেদন করে, লটারিতে বরাদ্দ পায়। আর লিস্টিং হওয়ার দিনেই দাম দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে যায়। তারপর? ধীরে ধীরে কমতে থাকে।

গত দশ বছরে DSE তে লিস্টেড হওয়া কোম্পানিগুলোর আইপিও পারফরম্যান্স দেখুন। প্রথম দিনে গড়ে ১৫০-৩০০% রিটার্ন। কিন্তু এক বছর পর? অধিকাংশ শেয়ার আইপিও মূল্যের কাছে বা নিচে। মানে যারা লটারিতে পায় তারা প্রথম দিনে বিক্রি করে লাভ করে। যারা পরে কেনে, তারা হারে। এটা বিনিয়োগ না, এটা একটা খেলা।

কেন এমন হয়? কারণ আইপিও মূল্য নির্ধারণ হয় বইয়ের মূল্যের (বুক ভ্যালু) ভিত্তিতে, যেটা প্রায় সবসময় কোম্পানির প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম। ফলে প্রথম দিনে "আন্ডারপ্রাইসিং গ্যাপ" তৈরি হয়। এটা নিয়ন্ত্রকের ব্যর্থতা। ভারত বা থাইল্যান্ডে আইপিও মূল্য বাজারভিত্তিক, বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে নির্ধারণ হয়। বাংলাদেশে সেই সংস্কার আসেনি।

আর বাজারের তারল্য কেমন? কত কেনাবেচা হচ্ছে?

টার্নওভার রেশিও, যেটা দেখায় বাজারে কত ঘনঘন শেয়ার হাত বদল হচ্ছে। বাংলাদেশে এই হার অত্যন্ত অস্থির। ২০১০ সালে যখন বুদবুদ ছিল, টার্নওভার ছিল আকাশচুম্বী। ধসের পর একেবারে তলানিতে। এই অস্থিরতা দেখায় যে বাজার মৌলিক বিশ্লেষণে চলে না, আবেগে চলে। ভালো সময়ে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে, খারাপ সময়ে সবাই পালায়।

আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা BSEC কী করছে?

BSEC এর এনফোর্সমেন্ট অ্যাকশনের ইতিহাস দেখুন। তদন্ত হয়, শুনানি হয়, কিন্তু চূড়ান্ত শাস্তি খুবই কম। জরিমানার পরিমাণ হাস্যকর। একজন কারসাজিকারী ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিলে তার জরিমানা হয় ৫ লাখ টাকা। এটা শাস্তি না, এটা লাইসেন্স ফি। "এত টাকা দিয়ে কারসাজি করো, এটুকু সরকারকে দাও।"

BSEC এর চেয়ারম্যান সরকার নিয়োগ করে। কমিশনাররা রাজনৈতিক বিবেচনায় আসে। একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী যখন বাজার কারসাজি করে, BSEC তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, পারে না।


পর্ব ৫: প্রতিবেশীরা এগিয়ে, আমরা কোথায়

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সাথে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনা করলে ছবিটা আরো স্পষ্ট হয়।

বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (BSE) ভারতের অর্থনীতির ১১০% এর বেশি মার্কেট ক্যাপ নিয়ে বসে আছে। কলম্বো স্টক এক্সচেঞ্জ শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির ২০%। আর ঢাকা? ১৫%। ভারত, যেটা ১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করেছিল, তাদের পুঁজিবাজার এখন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম। SEBI (ভারতের BSEC) একটা স্বাধীন, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক। ইনসাইডার ট্রেডিং ধরা পড়লে জেল হয়, কোটি কোটি টাকা জরিমানা হয়। ভিয়েতনামের পুঁজিবাজার গত দশ বছরে তিন গুণ বড় হয়েছে। তারা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নিয়ম সহজ করেছে, ডিজিটাল ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ? আমরা এখনো ১৯৯৬ সালের ধস আর ২০১০ সালের ধসের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

DSE তে কোন সেক্টরের শেয়ার কেমন পারফর্ম করছে, সেটাও দেখা দরকার।

ব্যাংকিং আর আর্থিক সেবা খাত পুরো বাজারের প্রায় অর্ধেক দখল করে আছে। এটা স্বাস্থ্যকর না। একটা বৈচিত্র্যময় পুঁজিবাজারে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য, সব সেক্টরের প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত। বাংলাদেশে প্রযুক্তি খাতের শেয়ার? প্রায় নেই। স্বাস্থ্যসেবা? নগণ্য। মানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অর্থনীতির আয়না না, এটা শুধু ব্যাংকিং সেক্টরের আয়না।


পর্ব ৬: যদি বদলাতে চাই

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার একটা ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান হতে বাধ্য না। এটাকে বদলানো সম্ভব। অন্য দেশেরা করেছে, আমরাও পারি। কিন্তু কয়েকটা সংস্কার অপরিহার্য।

প্রথমত, BSEC কে স্বাধীন করতে হবে। সরকারের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে। ভারতের SEBI মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। BSEC এর নিজস্ব তদন্ত ক্ষমতা, জরিমানা আরোপ ক্ষমতা, আর আদালতে মামলা করার ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারসাজিকারীর জরিমানা ৫ লাখ না, ৫ কোটি হতে হবে। জেলও হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পেনশন ফান্ড, ইনস্যুরেন্স কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড, এদের পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতে হবে। খুচরা বিনিয়োগকারীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। "শেয়ার বাজার মানে জুয়া" এই ধারণা বদলাতে হলে বাজারকে আগে জুয়ার আড্ডা হওয়া থেকে বের করতে হবে।

তৃতীয়ত, লিস্টেড কোম্পানির মান বাড়াতে হবে। কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড কঠোর করতে হবে। আর্থিক প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক মানের (IFRS) হতে হবে। অডিটরদের জবাবদিহি আনতে হবে। ভুয়া ব্যালেন্স শিটে শেয়ার বিক্রি হলে সেটা প্রতারণা, শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে হবে।

চতুর্থত, নতুন সেক্টর আনতে হবে। প্রযুক্তি কোম্পানি, ফিনটেক, ই-কমার্স, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এই কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনতে হবে। গ্রামীণফোন আর রবি ছাড়া আর কোনো টেক-অ্যাডজেসেন্ট কোম্পানি নেই বাজারে। বিকাশ, শপআপ, পাঠাও, এরা কেউ বাজারে আসেনি। কেন? কারণ তাদের জন্য এই বাজার আকর্ষণীয় না।

পঞ্চমত, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দরজা খুলতে হবে। প্রত্যাবাসন নিয়ম সহজ করতে হবে, ডলারে লেনদেনের সুবিধা দিতে হবে, ট্যাক্স ইনসেনটিভ দিতে হবে।

এই সংস্কারগুলো হলে ২০৩৫ সালে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার কোথায় থাকতে পারে? মার্কেট ক্যাপ জিডিপির ৪০-৫০% হতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ ১৫-২০% হতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ৫০% হতে পারে। আর রহিম মিয়ার মতো মানুষেরা তখন পুঁজিবাজারে গিয়ে ভয় পাবে না।


কিন্তু সংস্কার হবে কি?

এখানেই আসল প্রশ্ন। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সমস্যা প্রযুক্তিগত না, রাজনৈতিক। যারা কারসাজি করে, তারা প্রভাবশালী। যারা নিয়ন্ত্রক সংস্থায় বসে, তারা রাজনৈতিক নিয়োগ। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারা রহিম মিয়ার মতো সাধারণ মানুষ, যাদের কোনো রাজনৈতিক আওয়াজ নেই।

২০১০ সালের ধসে ৩০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তারা রাস্তায় নেমেছিল, প্রতিবাদ করেছিল, মানববন্ধন করেছিল। তারপর? জীবন চলে গেছে। কেউ কেউ আবার বাজারে ফিরেছে, কারণ বিকল্প নেই। সঞ্চয়পত্রের সুদ কমে গেছে, ব্যাংকে সুদ মুদ্রাস্ফীতির চেয়ে কম, জমির দাম নাগালের বাইরে। শেয়ার বাজার ছাড়া সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের জায়গা কোথায়?

রহিম মিয়া এখন ৫৬ বছর বয়সী। অবসরের কাছাকাছি। সেই ২ লাখ ১০ হাজার টাকা কোনোদিন ফেরত আসেনি। স্ত্রীর গয়না আর কেনা হয়নি। তিনি এখনো মাঝে মাঝে DSE এর সূচক দেখেন ফোনে। আর ভাবেন, "যদি সেদিন বিক্রি করে দিতাম।"

কিন্তু "যদি" দিয়ে কিছু হয় না। যেটা দরকার সেটা হলো এমন একটা বাজার যেখানে রহিম মিয়াকে "যদি" ভাবতে না হয়। যেখানে নিয়ম সবার জন্য সমান। যেখানে কারসাজি করলে শাস্তি হয়। যেখানে বিনিয়োগ মানে সত্যিই বিনিয়োগ, জুয়া না।

সেই বাজার তৈরি করা সম্ভব। প্রশ্ন হলো: আমরা কি চাই?

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50