Back to publications
Narrative 2026-03-06

চিনি সস্তা, ইনসুলিন মহার্ঘ

ডায়াবেটিস মহামারী ও স্বাস্থ্য ব্যয়ের সংকট

চিনি সস্তা, ইনসুলিন মহার্ঘ

পর্ব ১: নীরব মহামারী

আবদুর রহিম চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে একটা মুদি দোকান চালায়। বয়স ৪৫। গত দুই বছর ধরে তার চোখে ঝাপসা দেখা শুরু হয়েছে। পায়ে মাঝে মাঝে ঝিনঝিন করে। ক্লান্তি লাগে সারাদিন। সে ভেবেছিল বয়সের ধর্ম, ডাক্তার দেখায়নি। একদিন দোকানে বসে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়লো। হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার বললেন, "ডায়াবেটিস। রক্তে চিনির মাত্রা অনেক বেশি। আগে ধরা পড়লে ভালো হতো।"

আবদুর রহিম জানতোও না যে তার ডায়াবেটিস আছে। সে একা না। বাংলাদেশে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছে, কিন্তু তারা জানে না। কারণ তারা কখনো পরীক্ষা করায়নি।

মানে এই অঞ্চলে সবাই খারাপ, কিন্তু বাংলাদেশের সমস্যাটা বিশেষভাবে গুরুতর।
প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ
নীরব মহামারী
৩,৫০০ কোটি টাকা
থালায় বিষ
১,৫০০ টাকা
ইনসুলিনের দাম

এই সংখ্যাটা কতটা বড়, সেটা বুঝতে পুরো ছবিটা দেখতে হবে।

এই চার্টটা দেখুন:

২০০০ সালে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৩ লাখ। ২০১০ সালে ৫৬ লাখ। ২০২৫ সালে সেটা ১ কোটি ৩১ লাখ। প্রতি দশকে সংখ্যাটা প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (IDF) হিসাবে ২০৪৫ সালে এই সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। মানে প্রতি সাতজন প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশির একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত থাকবে।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্যটা এই সংখ্যায় নেই। ভয়ংকর তথ্যটা হলো: যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাদের অর্ধেকও জানে না যে তারা অসুস্থ।

এই চার্টটা দেখুন:

বাংলাদেশে মোট ডায়াবেটিস রোগীর মাত্র ৫০% রোগনির্ণয় হয়েছে। বাকি ৫০% সম্পূর্ণ অজানা। মানে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে, কাজ করছে, খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে, কিন্তু তাদের শরীরে একটা রোগ ধীরে ধীরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নষ্ট করে ফেলছে। চোখ, কিডনি, স্নায়ু, হৃদযন্ত্র, পা, সব। তারা জানবে যখন ক্ষতি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। আবদুর রহিমের মতো।

ভারতে রোগনির্ণয়ের হার ৫৭%। পাকিস্তানে ৪৫%। চীনে ৫৬%। মানে এই অঞ্চলে সবাই খারাপ, কিন্তু বাংলাদেশের সমস্যাটা বিশেষভাবে গুরুতর। কারণ বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামোই দুর্বল। রোগনির্ণয় হলেও চিকিৎসা পাওয়া আরেক যুদ্ধ।

প্রশ্ন হলো, কেন এত দ্রুত বাড়ছে ডায়াবেটিস? উত্তরটা শুরু হয় আমাদের খাবারের থালায়।


পর্ব ২: থালায় বিষ

তিরিশ বছর আগে একটা গ্রামের পরিবারের সকালের নাশতা ছিল পান্তা ভাত, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, আর থাকলে একটুকরো শুঁটকি। দুপুরে ভাত, ডাল, শাক। রাতে আবার ভাত, তরকারি। চিনি? চায়ে একটু। মিষ্টি? ঈদে, পূজায়, বিয়েতে।

আজকের ছবিটা একদম আলাদা। সকালে রুটি আর চায়ের সাথে বিস্কুট। দুপুরে ভাত, কিন্তু সাথে কোমল পানীয়। বিকেলে চানাচুর, চিপস, সিঙ্গারা। রাতে ফাস্টফুড, না হলে তেলে ভাজা কিছু। আর চিনি? সর্বত্র। চায়ে, ফলের জুসে, এনার্জি ড্রিংকসে, প্যাকেটজাত খাবারে, এমনকি লবণাক্ত খাবারেও লুকানো চিনি আছে।

এই চার্টটা দেখুন:

বাংলাদেশে মাথাপিছু চিনি ব্যবহার ২০০০ সালে ছিল বছরে ৬.৫ কেজি। ২০২৫ সালে সেটা প্রায় ১৫ কেজি। মানে আড়াই গুণের বেশি বেড়েছে। পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত খাবারের বাজার বিস্ফোরিত হয়েছে। বাংলাদেশে কোমল পানীয়ের বাজার ২০১৫ সালে ছিল ৮০০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে সেটা ৩,৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চার গুণেরও বেশি।

শুধু চিনি না। জীবনযাত্রার পুরো ধরনটা বদলে গেছে। গ্রামের মানুষ মাঠে কাজ করতো, হাঁটতো, শারীরিক পরিশ্রম করতো। এখন? রিকশা থেকে অটো, অটো থেকে বাস। শহরে অফিসে বসে আট ঘণ্টা, বাসায় এসে টিভি বা ফোন। শারীরিক পরিশ্রম কমেছে নাটকীয়ভাবে।

আর এই দুটো জিনিস, বেশি চিনি আর কম পরিশ্রম, ডায়াবেটিসের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। কিন্তু একটা তৃতীয় বিষয় আছে যেটা বাংলাদেশকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে: জেনেটিক্স। দক্ষিণ এশীয়রা জেনেটিক কারণে ডায়াবেটিসের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। পশ্চিমা দেশগুলোতে যেখানে BMI ৩০ হলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে, দক্ষিণ এশিয়ায় সেটা BMI ২৩ থেকেই শুরু হয়। মানে একজন বাংলাদেশি "স্বাভাবিক" ওজনেও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারে।

আর ডায়াবেটিস শুধু শহরের রোগ না। এই চার্টটা দেখুন:

শহরে ডায়াবেটিসের প্রকোপ বেশি, সেটা সত্য। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রকোপ প্রায় ১৩-১৫%। কিন্তু গ্রামে? ৭-৮%। এটাকে "কম" ভাবলে ভুল হবে। গ্রামের জনসংখ্যা অনেক বেশি, তাই পরম সংখ্যায় গ্রামেও লাখ লাখ রোগী। আর গ্রামে রোগনির্ণয়ের হার শহরের তুলনায় অনেক কম, তাই প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গ্রামে প্রকোপ বাড়ছে শহরের চেয়ে দ্রুত গতিতে। কারণ গ্রামেও এখন প্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমল পানীয়, ফাস্টফুড ঢুকে গেছে, কিন্তু সচেতনতা ঢোকেনি।

আর আরেকটা বিপদের লক্ষণ দেখুন। এই চার্টটা দেখুন:

ডায়াবেটিস আর শুধু বয়স্কদের রোগ নেই। বাংলাদেশে নতুন ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ৩০ বছরের কম বয়সীদের অনুপাত ক্রমাগত বাড়ছে। ২০১০ সালে নতুন রোগীদের ১২% ছিল ৩০ এর নিচে। ২০২৫ সালে সেটা ২২%। তরুণরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি হারে। এটা বিশেষভাবে ভয়ংকর, কারণ অল্প বয়সে ডায়াবেটিস মানে দীর্ঘ সময় ধরে জটিলতা বাড়তে থাকবে। ৩০ বছর বয়সে ডায়াবেটিস ধরা পড়লে ৪০ বছর বয়সে কিডনি সমস্যা, ৫০ বছরে হৃদরোগ, ৫৫ বছরে অন্ধত্ব। সারাজীবন ওষুধ আর চিকিৎসার খরচ বহন করতে হবে।

কিন্তু সেই চিকিৎসার খরচ কত? সেটাই আসল সংকট।


পর্ব ৩: ইনসুলিনের দাম

আবদুর রহিমের কাছে ফিরে যাই। ডাক্তার তাকে বললেন, প্রতিদিন মেটফর্মিন ট্যাবলেট খেতে হবে, তিন মাস পর পর রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে, খাবার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, আর ইনসুলিন লাগতে পারে কিছুদিন পর।

প্রথম মাসে খরচ হলো কত? ওষুধ: ১,৫০০ টাকা। পরীক্ষা (HbA1c, রক্তে চিনি, কিডনি ফাংশন): ২,৫০০ টাকা। ডাক্তারের ফি: ১,০০০ টাকা। মোট: ৫,০০০ টাকা। মাসে।

আবদুর রহিমের দোকান থেকে আয় মাসে ১৫,০০০-১৮,০০০ টাকা। পরিবারে পাঁচজন। মাসে ৫,০০০ টাকা চিকিৎসায় দিলে বাকি টাকায় সংসার চালানো অসম্ভবের কাছাকাছি।

এই চার্টটা দেখুন:

বাংলাদেশে একজন ডায়াবেটিস রোগীর বার্ষিক চিকিৎসা ব্যয় শুধু ওষুধ ও পরীক্ষায় ১৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা। জটিলতা দেখা দিলে (কিডনি, চোখ, হৃদরোগ) সেটা ১ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত যেতে পারে। ডায়ালাইসিস লাগলে? মাসে ৩০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা। শুধু ডায়ালাইসিস। বছরে ৪ থেকে ৬ লাখ টাকা।

আর ইনসুলিন? এটা ডায়াবেটিস চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ। টাইপ ১ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব না। টাইপ ২ এর অনেক রোগীরও একসময় ইনসুলিন লাগে।

এই চার্টটা দেখুন:

বাংলাদেশে ইনসুলিনের এক ভায়ালের দাম ৫৫০ থেকে ১,২০০ টাকা, ব্র্যান্ড ও ধরন অনুযায়ী। একজন রোগীর মাসে ২-৩টা ভায়াল লাগতে পারে। মানে শুধু ইনসুলিনেই মাসে ১,১০০ থেকে ৩,৬০০ টাকা। এর সাথে সুই, গ্লুকোমিটার স্ট্রিপ, অন্যান্য ওষুধ। আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশে ইনসুলিনের দাম ক্রয়ক্ষমতার অনুপাতে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। ভারতে সরকারি ভর্তুকিতে ইনসুলিন পাওয়া যায়, বাংলাদেশে কোনো ভর্তুকি নেই।

আর শুধু ওষুধের দাম না। ডায়াবেটিস একটা দীর্ঘমেয়াদি রোগ। এটা সারে না। সারাজীবন চিকিৎসা নিতে হয়। ৪৫ বছর বয়সে ধরা পড়লে আর ৩০-৩৫ বছর বাকি জীবন প্রতিদিন ওষুধ খেতে হবে, পরীক্ষা করাতে হবে, জটিলতা সামলাতে হবে। মোট খরচ? ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। একটা মুদি দোকানদারের সারাজীবনের আয়ের সমান।

ফলাফল? বেশিরভাগ রোগী চিকিৎসা ছেড়ে দেয়। ওষুধ কেনে না, পরীক্ষা করায় না, ডাক্তারের কাছে যায় না। বছর দুয়েক পর জটিলতা নিয়ে আসে। তখন খরচ আরো বেশি, কষ্ট আরো বেশি, আর ফলাফল আরো খারাপ।

এই চার্টটা দেখুন:

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি (চোখের সমস্যা) ২১%, ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি (কিডনি সমস্যা) ২৭%, নিউরোপ্যাথি (স্নায়ু সমস্যা) ৩০%, আর হৃদরোগের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি। পা কেটে ফেলার (amputation) হার প্রতি ১,০০০ রোগীতে ১৪। এই জটিলতাগুলোর বেশিরভাগই প্রতিরোধযোগ্য, যদি সময়মতো রোগনির্ণয় হয় আর নিয়মিত চিকিৎসা চলে। কিন্তু যখন অর্ধেক রোগী জানেই না যে তার ডায়াবেটিস আছে, আর যারা জানে তাদের অর্ধেক চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারে না, তখন জটিলতা অনিবার্য।


পর্ব ৪: প্রতিবেশীদের সাথে তুলনা

বাংলাদেশ কি একা এই সমস্যায়? না। ডায়াবেটিস দক্ষিণ এশিয়ার সবার সমস্যা। কিন্তু সবাই একইভাবে মোকাবেলা করছে না।

এই চার্টটা দেখুন:

ভারতে ৭ কোটি ৭০ লাখ ডায়াবেটিস রোগী, সবচেয়ে বেশি। কিন্তু জনসংখ্যার অনুপাতে (প্রকোপ হার) বাংলাদেশ, ভারত, আর পাকিস্তান প্রায় কাছাকাছি, ৮ থেকে ১০% এর মধ্যে। চীনে সংখ্যা বিশাল (১৪ কোটি ১০ লাখ), কিন্তু প্রকোপ হার ১১%।

পার্থক্যটা হলো মোকাবেলায়। ভারত ২০১৭ সালে National Programme for Prevention and Control of Cancer, Diabetes, CVD and Stroke (NPCDCS) চালু করেছে। জেলা পর্যায়ে NCD ক্লিনিক বসিয়েছে। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং চলে। জন ঔষধি কেন্দ্রে ভর্তুকি মূল্যে ইনসুলিন পাওয়া যায়। শ্রীলঙ্কা আরো এগিয়ে, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ডায়াবেটিসের ওষুধ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। থাইল্যান্ড তার সর্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজের মাধ্যমে ডায়াবেটিস চিকিৎসা কভার করে, রোগীর পকেট থেকে প্রায় কিছুই যায় না।

বাংলাদেশে? কোনো জাতীয় ডায়াবেটিস কর্মসূচি নেই যেটা কার্যকরভাবে চলছে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (BADAS) দুর্দান্ত কাজ করছে, কিন্তু তারা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। সরকারি পর্যায়ে NCD (অসংক্রামক রোগ) বাজেট কত? এই চার্টটা দেখুন:

বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ২-৩% অসংক্রামক রোগে (NCD) যায়। অথচ দেশে মোট মৃত্যুর ৬৭% হয় NCD তে: ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যান্সার, শ্বাসকষ্ট। মানে যে রোগগুলো সবচেয়ে বেশি মানুষ মারছে, সরকার সেগুলোতে সবচেয়ে কম খরচ করছে। বাজেটের সিংহভাগ যাচ্ছে সংক্রামক রোগে, যেটা এখনো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ডায়াবেটিস এখন মারছে বেশি। WHO বলছে, স্বাস্থ্য বাজেটের অন্তত ২০% NCD তে দেওয়া উচিত।


পর্ব ৫: কী করা যেতে পারে?

সমস্যাটা বিশাল, কিন্তু সমাধান অসম্ভব না। অন্য দেশেরা দেখিয়েছে, সঠিক পদক্ষেপ নিলে ডায়াবেটিসের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো যায়।

প্রথম পদক্ষেপ: গণস্ক্রিনিং। ৬৫ লাখ মানুষ জানে না যে তাদের ডায়াবেটিস আছে। এটা অগ্রহণযোগ্য। প্রতিটা কমিউনিটি ক্লিনিকে, প্রতিটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, প্রতিটা সরকারি হাসপাতালে ৩৫ বছরের বেশি সবার জন্য বিনামূল্যে রক্তে চিনি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করুন। একটা সাধারণ ফাস্টিং গ্লুকোজ টেস্টের খরচ মাত্র ৫০-১০০ টাকা। সরকার এটুকু বহন করতে পারে। শুধু এই একটা পদক্ষেপে লাখ লাখ মানুষের ডায়াবেটিস আগে ধরা পড়বে, জটিলতা কমবে, চিকিৎসা খরচ কমবে।

দ্বিতীয় পদক্ষেপ: ইনসুলিন ভর্তুকি। ভারতের জন ঔষধি মডেল অনুসরণ করুন। সরকারি সংগ্রহে ইনসুলিন কিনে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করুন। ইনসুলিনের উৎপাদন খরচ ভায়ালপ্রতি ১০০ টাকারও কম। বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ১,২০০ টাকায়। এই পার্থক্যটা অন্যায়। সরকার নিজে উৎপাদন করুক বা বাল্কে আমদানি করুক, ইনসুলিনের দাম ভায়ালপ্রতি ২০০ টাকার নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব।

তৃতীয় পদক্ষেপ: চিনি কর। মেক্সিকো ২০১৪ সালে চিনিযুক্ত পানীয়ের উপর ১০% বিশেষ কর বসিয়েছে। ফলে সেবন ১২% কমেছে। যুক্তরাজ্যের Sugar Levy তেও একই ফল। বাংলাদেশেও কোমল পানীয় আর প্যাকেটজাত মিষ্টি খাবারের উপর ২০% স্বাস্থ্য সারচার্জ বসান। সেই অর্থ সরাসরি NCD তহবিলে যাক। এতে দুটো কাজ হবে: চিনিযুক্ত খাবারের সেবন কমবে, আর ডায়াবেটিস চিকিৎসার জন্য তহবিল তৈরি হবে।

চতুর্থ পদক্ষেপ: কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণ। বাংলাদেশে কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার নেটওয়ার্ক আছে, যারা টিকাদান আর মাতৃস্বাস্থ্যে অসামান্য কাজ করেছে। একই মডেলে তাদের ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং আর বেসিক ম্যানেজমেন্ট শেখান। গ্লুকোমিটার দিন, প্রশিক্ষণ দিন, তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরীক্ষা করবে। টিকাদানে বাংলাদেশ ৯৭% কভারেজ অর্জন করেছে। ডায়াবেটিস স্ক্রিনিংয়ে কেন পারবে না?


পর্ব ৬: হিসাবটা পরিষ্কার

আসুন শেষ করি একটা হিসাব দিয়ে।

বাংলাদেশে ১ কোটি ৩১ লাখ ডায়াবেটিস রোগী। তাদের গড় বার্ষিক চিকিৎসা ব্যয় ধরুন ২৫,০০০ টাকা (রক্ষণশীল হিসাব)। মোট: ৩২,৭৫০ কোটি টাকা। প্রতি বছর। শুধু ডায়াবেটিস। এই টাকার বেশিরভাগ আসছে রোগীদের নিজের পকেট থেকে, পরিবারের সঞ্চয় ভেঙে, জমি বিক্রি করে, মহাজনের কাছ থেকে ধার করে। এই বোঝা প্রতি বছর বাড়ছে, কারণ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, জটিলতা বাড়ছে, ওষুধের দাম বাড়ছে।

এর বিপরীতে, একটা গণস্ক্রিনিং কর্মসূচির খরচ বছরে ৫০০-৭০০ কোটি টাকা। ইনসুলিন ভর্তুকির খরচ বছরে ৩০০-৫০০ কোটি টাকা। মানে ১,০০০-১,২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে ৩২,৭৫০ কোটি টাকার বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। আগে ধরা পড়লে জটিলতা কম হবে, জটিলতা কম হলে ব্যয় কম হবে।

হিসাবটা পরিষ্কার। অর্থনৈতিকভাবেও, মানবিকভাবেও।

আবদুর রহিম এখন ইনসুলিন নেয়। মাসে ৪,০০০ টাকা খরচ হয়। দোকানের আয়ের প্রায় এক চতুর্থাংশ। তার ছেলে, বয়স ১৮, সেও ঝুঁকিতে আছে। কারণ বাবার ডায়াবেটিস থাকলে সন্তানের ঝুঁকি দুই গুণ।

চিনি সস্তা। এক কেজি ১০০ টাকা। কোমল পানীয় ২০ টাকা। চিপস ১০ টাকা। কিন্তু ইনসুলিন? মাসে ২,০০০-৪,০০০ টাকা। গ্লুকোমিটার স্ট্রিপ? প্রতিটা ৪০-৫০ টাকা। ডায়ালাইসিস? মাসে ৩০,০০০-৫০,০০০ টাকা।

যেটা রোগ আনে সেটা সস্তা। যেটা রোগ সামলায় সেটা মহার্ঘ।

এটাই বাংলাদেশের ডায়াবেটিস সংকটের সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্য। আর যতদিন আমরা প্রতিরোধে বিনিয়োগ না করবো, এই সত্য বদলাবে না।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50