সুন্দরবন: কত বছর বাকি?
পর্ব ১: শেষ বন
সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ। ভোর সাড়ে চারটা। মোতালেব গাজী তার ছোট নৌকায় উঠে বসেছে। গন্তব্য সুন্দরবনের ভেতরে, মধু সংগ্রহ করতে। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। তিন পুরুষ ধরে তার পরিবার এই কাজ করে আসছে। বাবা করতেন, দাদা করতেন।
"আগে এক মৌসুমে ৫০-৬০ কেজি মধু পেতাম," মোতালেব বলেন। "এখন ২০ কেজি পেলে ভাগ্য। মৌচাক কমে গেছে। ফুল কমে গেছে। গাছ কমে গেছে। সব কমে গেছে।"
মোতালেব একা না। সুন্দরবনের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ। মধু সংগ্রহকারী, কাঁকড়া শিকারি, জেলে, গোলপাতা কাটার শ্রমিক। এদের জীবন আর জীবিকা, দুটোই সুন্দরবনের সাথে বাঁধা।
কিন্তু সুন্দরবন নিজেই এখন হুমকিতে। সংখ্যা দিয়ে দেখা যাক।
সুন্দরবন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন। মোট আয়তন প্রায় ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার, যার ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার বাংলাদেশে। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের শেষ আশ্রয়স্থল। ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, ২৯১ প্রজাতির পাখি। পৃথিবীতে এরকম আর একটি বন নেই।
কিন্তু এই বন ছোট হয়ে আসছে।
গত চার দশকে সুন্দরবনের ঘন ম্যানগ্রোভ আচ্ছাদন ক্রমাগত কমেছে। ১৯৮৫ সালে যেখানে ঘন বনভূমি ছিল ৪,১৪৩ বর্গ কিলোমিটার, ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৩,৫৫৫ বর্গ কিলোমিটারে। চল্লিশ বছরে প্রায় ৫৮৮ বর্গ কিলোমিটার ঘন বন হারিয়ে গেছে। এটা ঢাকা শহরের প্রায় দ্বিগুণ আয়তন।
"হারিয়ে গেছে" মানে কী? মানে গাছ মরে গেছে। শিকড় পচে গেছে। জায়গাটা খালি হয়ে গেছে, কোথাও পানি ঢুকে গেছে, কোথাও লবণাক্ত মাটি পড়ে আছে। নতুন গাছ জন্মাচ্ছে না, কারণ মাটিতে এত লবণ যে চারা টিকতে পারে না।
আর এই লবণই হলো সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় শত্রু।
পর্ব ২: লবণের আগ্রাসন
ম্যানগ্রোভ গাছ লবণাক্ত পানিতে বাঁচতে পারে। এটা তাদের বিশেষত্ব। কিন্তু "লবণাক্ত পানিতে বাঁচতে পারে" আর "যেকোনো মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে," এই দুটো এক কথা না।
সুন্দরবনের প্রধান গাছ সুন্দরী (Heritiera fomes)। এই গাছের নামেই সুন্দরবন। সুন্দরী গাছ ৫-১৫ পিপিটি (parts per thousand) লবণাক্ততায় সবচেয়ে ভালো বাড়ে। ২০ পিপিটির বেশি হলে বৃদ্ধি থেমে যায়। ২৫ পিপিটির ওপরে? গাছ মরতে শুরু করে।
সুন্দরবনের পূর্বাংশে (খুলনা-বাগেরহাট দিক) লবণাক্ততা এখন গড়ে ২২-২৮ পিপিটি। তিন দশক আগে এটা ছিল ১২-১৫ পিপিটি। প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। পশ্চিমাংশেও (সাতক্ষীরা দিক) লবণাক্ততা বাড়ছে, যদিও এখনো তুলনামূলক কম।
কেন বাড়ছে? তিনটি কারণ।
প্রথমত, ফারাক্কা বাঁধ। ১৯৭৫ সালে ভারত গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ চালু করে। এতে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি প্রবাহ বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে কমে যায়। গঙ্গা থেকে যে মিঠা পানি সুন্দরবনে আসতো, সেটা কমে গেলে সমুদ্রের নোনা পানি ভেতরে ঢুকে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। গত ২০ বছরে বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রায় ৩-৫ মিলিমিটার/বছর হারে বেড়েছে। বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশি। সমুদ্র উঠলে নোনা পানি আরো ভেতরে ঢুকে।
তৃতীয়ত, উজানে পানি প্রত্যাহার। শুধু ফারাক্কা না, ভারতে আরো বেশ কিছু সেচ প্রকল্প গঙ্গা অববাহিকার পানি ব্যবহার করে। ফলে ভাটিতে পানি কমে যাচ্ছে।
এই লবণাক্ততা বৃদ্ধির সরাসরি শিকার সুন্দরী গাছ। একসময় সুন্দরবনের ৭০% এলাকায় সুন্দরী গাছ ছিল। এখন সেই আধিপত্য কমে আসছে। "টপ ডাইং" রোগে সুন্দরী গাছের ডগা থেকে মরতে শুরু করে। বন বিভাগের হিসাবে, সুন্দরবনের প্রায় ২০% সুন্দরী গাছ টপ ডাইং-এ আক্রান্ত।
কিন্তু লবণাক্ততা একমাত্র হুমকি না। আরেকটি হুমকি এসেছে মানুষের হাত ধরে। এটি আসছে সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূর থেকে।
পর্ব ৩: রামপালের ছায়া
২০১০ সালে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার যৌথভাবে ঘোষণা করলো: সুন্দরবনের ১৪ কিলোমিটার উত্তরে রামপালে ১,৩২০ মেগাওয়াটের একটি কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। নাম: মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট।
এই ঘোষণায় পরিবেশবিদরা আতঙ্কিত হলেন। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করলো। বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করলেন। কিন্তু সরকার সিদ্ধান্তে অটল রইলো।
সমস্যাটা কোথায়?
একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে যা বের হয়: সালফার ডাই-অক্সাইড (SO2), নাইট্রোজেন অক্সাইড (NOx), পারদ (Mercury), ছাই (Fly Ash), উষ্ণ পানি (Thermal Discharge)। প্রতিটির আলাদা আলাদা প্রভাব আছে সুন্দরবনের ওপর।
সালফার ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে মিশে এসিড বৃষ্টি তৈরি করে। এসিড বৃষ্টি ম্যানগ্রোভের পাতা পোড়ায়, মাটির pH কমায়। নাইট্রোজেন অক্সাইড শ্বাসকষ্ট তৈরি করে, মানুষ ও প্রাণী উভয়ের জন্য। পারদ পানিতে মিশে খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে যায়, মাছে জমা হয়, মানুষ সেই মাছ খায়। ছাই বাতাসে ভেসে বনের ওপর জমে, গাছের সালোকসংশ্লেষণ বাধাগ্রস্ত করে। উষ্ণ পানি নদীতে ছাড়লে জলজ প্রাণীর বাসস্থান নষ্ট হয়।
সরকার বলেছে: আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, দূষণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশে শিল্প দূষণ নিয়ন্ত্রণের ট্র্যাক রেকর্ড কেমন? বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, এই নদীগুলো কি "নিয়ন্ত্রণে" নেই? সাভারের CETP কি "পরিকল্পনা অনুযায়ী" চলছে? ঢাকার বায়ু দূষণ কি "মানদণ্ডের মধ্যে" আছে?
রামপাল ইতিমধ্যে আংশিকভাবে চালু হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রভাবের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়নি, কারণ পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন এখনো শুরু হয়নি। কিন্তু কয়লা পরিবহনের জন্য পশুর নদী দিয়ে বড় জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। আর জাহাজ মানে তেল ছড়ানোর ঝুঁকি।
সুন্দরবনে তেল ছড়ানোর ঘটনা নতুন না। ২০১৪ সালে শ্যালা নদীতে একটি ট্যাঙ্কার ডুবে ৩৫০ টন ফার্নেস অয়েল ছড়িয়ে পড়ে। সেই তেল ৩৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে যায়। পানি কালো হয়ে যায়। মাছ মরে। ডলফিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূল তেলে ঢেকে যায়। গাছ শ্বাস নিতে পারে না।
সেই দুর্ঘটনার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো? প্রায় কিছুই না। জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়নি। ট্যাঙ্কারের ডবল-হাল (double hull) বাধ্যতামূলক হয়নি। পর্যাপ্ত তেল পরিষ্কারের সরঞ্জাম মজুদ রাখা হয়নি। আর এখন রামপালের কারণে কয়লাবাহী জাহাজ আরো বেশি চলাচল করবে।
কিন্তু এই সবকিছুর সবচেয়ে দৃশ্যমান শিকার কে? পৃথিবীর সবচেয়ে আইকনিক প্রাণীদের একটি: রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
পর্ব ৪: বাঘ গুনতি
২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা প্রায় ১১৪। এটা বাংলাদেশ অংশের হিসাব। ভারতের অংশে আরো প্রায় ১০০। মোট মিলিয়ে দুই শতাধিক।
২০০৪ সালে বাংলাদেশ সরকার বলতো সুন্দরবনে ৪৪০টি বাঘ আছে। সেই সংখ্যা বিজ্ঞানীরা প্রশ্ন করেছিলেন, পদ্ধতিগত দুর্বলতার কারণে। ২০১৫ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপে সংখ্যা এলো ১০৬। ২০১৮ সালে পাগমার্ক পদ্ধতিতে ১১৪। ২০২৪ সালেও প্রায় একই সংখ্যা।
একটা ভালো খবর হলো: সংখ্যা স্থিতিশীল আছে, কমছে না। কিন্তু ১১৪ একটি বিপজ্জনকভাবে কম সংখ্যা। জেনেটিক বৈচিত্র্যের দিক থেকে, এত কম জনসংখ্যায় ইনব্রিডিং ঝুঁকি তৈরি হয়। একটি মহামারি বা বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই পুরো জনগোষ্ঠীকে মুছে দিতে পারে।
বাঘের সমস্যা শুধু সংখ্যা না। তাদের বাসস্থান সংকুচিত হচ্ছে। ম্যানগ্রোভ কমলে বাঘের চলাচলের জায়গা কমে। শিকার (হরিণ, বনমোরগ, বানর) কমলে বাঘের খাদ্য সংকট হয়। আর খাদ্য সংকট হলে বাঘ লোকালয়ে আসে। মানুষ-বাঘ সংঘর্ষ বাড়ে। প্রতি বছর সুন্দরবনের আশপাশে ২০-৩০ জন মানুষ বাঘের আক্রমণে নিহত বা আহত হয়। আর প্রতিশোধমূলকভাবে বাঘ হত্যাও হয়, বিষ দিয়ে, ফাঁদ পেতে।
কিন্তু বাঘ শুধু একটি প্রজাতি। সুন্দরবনের পুরো জীববৈচিত্র্য কেমন আছে?
সুন্দরবনে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে অন্তত ১৭ প্রজাতি হুমকিতে আছে। ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর মধ্যে অনেক প্রজাতির সংখ্যা কমেছে। ইরাবতী ডলফিন, যা সুন্দরবনের নদীতে দেখা যেত, এখন "বিপন্ন" তালিকায়। লোনাপানির কুমির প্রায় বিলুপ্ত। ম্যানগ্রোভ হরিণের সংখ্যা কমছে।
জীববৈচিত্র্য সূচকে সুন্দরবন ক্রমশ নিচে নামছে। এটা শুধু পরিবেশবিদদের সমস্যা না। জীববৈচিত্র্য কমলে বনের পুরো ইকোসিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্বল ইকোসিস্টেম ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত সহ্য করতে পারে না। আর ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত সহ্য করাটাই সুন্দরবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
পর্ব ৫: ঢাল যখন ভাঙে
২০০৭ সাল। ঘূর্ণিঝড় সিডর। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়। বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার। জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ছিল ৫-৬ মিটার। ৩,৪০৬ মানুষ মারা গিয়েছিল (সরকারি হিসাব)।
কিন্তু একটা প্রশ্ন: সুন্দরবন না থাকলে মৃতের সংখ্যা কত হতো?
গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের গতি ২০-৩০% এবং জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ৫০% পর্যন্ত কমাতে পারে। ২০০৭ সালে সিডরের সময় সুন্দরবনের পেছনের জেলাগুলোতে (বাগেরহাট, খুলনা) ক্ষয়ক্ষতি ছিল, কিন্তু উপকূলবর্তী অরক্ষিত এলাকার তুলনায় অনেক কম।
সুন্দরবন একটি জীবন্ত ঢাল। প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের সময় এটি লক্ষ লক্ষ মানুষকে রক্ষা করে। এই ঢালের অর্থনৈতিক মূল্য কত? বিভিন্ন গবেষণায় সুন্দরবনের বার্ষিক ইকোসিস্টেম সেবার মূল্য ধরা হয়েছে ১.৫ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার। ঘূর্ণিঝড় প্রতিরক্ষা, মাছ প্রজনন ক্ষেত্র, কার্বন শোষণ, জীবিকা সহায়তা, সব মিলিয়ে।
৩ বিলিয়ন ডলার। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট নির্মাণ ব্যয় ২ বিলিয়ন ডলার। মানে সুন্দরবনের এক বছরের ইকোসিস্টেম সেবা রামপালের পুরো নির্মাণ খরচের চেয়ে বেশি।
কিন্তু সুন্দরবন কমলে এই ঢাল দুর্বল হবে। আর ঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বঙ্গোপসাগরে ক্যাটাগরি ৪ এবং ৫ ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বেড়েছে। ২০ বছর আগে এমন ঘূর্ণিঝড় গড়ে দশকে একটি আসতো। এখন তিন-চার বছরে একটি আসছে।
ঢাল দুর্বল হচ্ছে, আর ঝড় শক্তিশালী হচ্ছে। এই সমীকরণের পরিণতি ভয়াবহ।
আর এই সবকিছুর মাঝেও সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল ৩৫ লাখ মানুষ কেমন আছে?
সুন্দরবন-নির্ভর জনগোষ্ঠীর ৬৫% দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। জাতীয় গড়ের (২০.৫%) তিনগুণ বেশি। এদের বিকল্প জীবিকা নেই। মধু, কাঁকড়া, মাছ, গোলপাতা, এগুলোই তাদের আয়ের উৎস। বন কমলে আয় কমে। আয় কমলে বনের ওপর চাপ আরো বাড়ে, কারণ কম সম্পদ থেকে বেশি আহরণ করতে হয়। একটি দুষ্টচক্র।
পর্যটনও একটি সম্ভাবনা ছিল। সুন্দরবনে প্রতি বছর প্রায় ২-৩ লাখ পর্যটক আসে। কিন্তু পর্যটন রাজস্বের বেশিরভাগ স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছায় না। অবকাঠামো নেই, প্রশিক্ষিত গাইড নেই, নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল। কোস্টারিকা বা কেনিয়ার মতো ইকো-ট্যুরিজম মডেল এখানে গড়ে ওঠেনি। কোস্টারিকার ম্যানগ্রোভ পার্কে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে যে পর্যটন রাজস্ব আসে, সুন্দরবনে তার দশ ভাগের এক ভাগও আসে না।
পর্ব ৬: কাউন্টডাউন
সুন্দরবন কি টিকবে?
সরাসরি উত্তর: হ্যাঁ, টিকবে। কিন্তু কোন সুন্দরবন? সেটাই প্রশ্ন।
যদি বর্তমান হারে লবণাক্ততা বাড়তে থাকে, সুন্দরী গাছ কমতে থাকে, ম্যানগ্রোভ আচ্ছাদন হারাতে থাকে, তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে সুন্দরবন একটি "degraded mangrove"তে পরিণত হবে। গাছ থাকবে, কিন্তু ঘনত্ব কম। প্রজাতি থাকবে, কিন্তু বৈচিত্র্য কম। ঘূর্ণিঝড় ঠেকানোর ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু অনেক কম।
আর বাঘ? ১১৪ বাঘ নিয়ে আর ২৫-৩০ বছর চালানো যাবে না, যদি না বাসস্থান সুরক্ষিত হয়।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশ তাদের ম্যানগ্রোভ রক্ষায় কী করছে?
বৈশ্বিকভাবে ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পৃথিবীর প্রায় ৩৫% ম্যানগ্রোভ হারিয়ে গেছে। কিন্তু কিছু দেশ এই প্রবণতা উল্টে দিয়েছে। থাইল্যান্ড ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগ করে ২০১০ সাল থেকে নেট পজিটিভ গ্রোথ দেখিয়েছে। ভিয়েতনাম ম্যানগ্রোভ-ভিত্তিক চিংড়ি চাষ মডেলে (silvo-fishery) সাফল্য পেয়েছে, যেখানে বন আর জীবিকা একসাথে চলে। ফিলিপাইন সম্প্রদায়-ভিত্তিক ম্যানগ্রোভ ব্যবস্থাপনায় (CBFM) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
বাংলাদেশ কী করতে পারে?
প্রথমত, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ। গঙ্গা পানি চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। ভারতের সাথে পানি কূটনীতি বাংলাদেশের পরিবেশ নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। উজানে মিঠা পানির প্রবাহ না বাড়লে সুন্দরবনকে বাঁচানো কঠিন।
দ্বিতীয়ত, রামপালের দূষণ পর্যবেক্ষণ স্বচ্ছ করা। স্বাধীন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল রাখা দরকার যারা ক্রমাগত বায়ু ও পানির মান পরিমাপ করবে এবং তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করবে। সরকার নিজে পর্যবেক্ষণ করে নিজে রিপোর্ট দিলে বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না।
তৃতীয়ত, সুন্দরবন-নির্ভর জনগোষ্ঠীর বিকল্প জীবিকা তৈরি করা। ভিয়েতনামের silvo-fishery মডেল বাংলাদেশে কাজ করতে পারে। ম্যানগ্রোভের ভেতরে নিয়ন্ত্রিত চিংড়ি চাষ, যেখানে বন কাটতে হয় না। কোস্টারিকার ইকো-ট্যুরিজম মডেল অনুসরণ করে সুন্দরবনে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গড়ে তোলা সম্ভব। ১১৪ বাঘ দেখতে পৃথিবী থেকে মানুষ আসবে, যদি অবকাঠামো থাকে।
চতুর্থত, কার্বন ক্রেডিট। ম্যানগ্রোভ স্থলজ বনের চেয়ে তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি কার্বন শোষণ করে। সুন্দরবনের কার্বন শোষণ ক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে বিক্রি করা সম্ভব। এতে সুন্দরবন রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন আসবে।
আসুন শেষ করি যেখানে শুরু করেছিলাম।
সাতক্ষীরার মোতালেব গাজী আজও ভোরে নৌকা নিয়ে বের হন। তার বাবা এই বন থেকে জীবিকা অর্জন করেছেন। তার দাদা করেছেন। কিন্তু মোতালেবের ছেলে এই কাজ করবে না। ছেলে ঢাকায় গেছে, একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। মধু সংগ্রহ করে সংসার চালানো যায় না আর।
সুন্দরবন একটি সংখ্যা না। ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার, এই সংখ্যাটি একটি বনের আয়তন মাত্র। সুন্দরবন হলো ৩৫ লাখ মানুষের জীবিকা। উপকূলের কোটি মানুষের ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষাকবচ। ১১৪ বাঘের শেষ বাড়ি। ২৯১ প্রজাতির পাখির আশ্রয়। পৃথিবীর ফুসফুসের একটি অংশ।
আমরা এই বনকে চারদিক থেকে আক্রমণ করছি। উজান থেকে পানি কেড়ে নিচ্ছি। পাশে কয়লা পোড়াচ্ছি। ভেতরে তেল ফেলছি। চারপাশ থেকে লবণ ঢুকিয়ে দিচ্ছি। আর তারপর জিজ্ঞেস করছি, "সুন্দরবন কেন মরে যাচ্ছে?"
প্রশ্নটা হওয়া উচিত: আমরা কি সত্যিই চাই সুন্দরবন বাঁচুক? যদি চাই, তাহলে এখনই কাজ শুরু করতে হবে। কারণ প্রকৃতি অপেক্ষা করে না। ঘড়ি চলছে।