Back to publications
Narrative 2026-03-06

হাজারীবাগ থেকে সাভার: চামড়া শিল্পের বিষ

ট্যানারি স্থানান্তরের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা

হাজারীবাগ থেকে সাভার: চামড়া শিল্পের বিষ

পর্ব ১: হাজারীবাগের গলিতে

মোহাম্মদ আলম। বয়স ৪৫। হাজারীবাগের ট্যানারিতে কাজ শুরু করেছিলেন ১৪ বছর বয়সে, ১৯৯৫ সালে। তিন দশক ধরে খালি হাতে চামড়া ভেজাতেন ক্রোমিয়াম সালফেটের দ্রবণে। হাতের চামড়া পুড়ে গেছে, নখ ক্ষয়ে গেছে, শ্বাসকষ্ট লেগেই আছে। ডাক্তার বলেছেন ফুসফুসে সমস্যা, কিডনিতে সমস্যা। চিকিৎসার টাকা নেই।

"আমরা চামড়ার কারখানায় কাজ করি, আমাদের নিজের চামড়া পচে যায়।" আলমের এই কথাটা শুনলে হাসি পায়। কিন্তু এটা হাসির বিষয় না।

ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে ২৫ হেক্টর জায়গায় ছিল ১৫৫টিরও বেশি ট্যানারি।
বছরে ৫০-১০০ কোটি টাকা
কমপ্লায়েন্সের গল্প ও বাস্তবতা
বছরে ১ বিলিয়ন ডলার
বিলিয়ন ডলারের চামড়া
২০%
সরানোর হিসাব

হাজারীবাগ। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে ২৫ হেক্টর জায়গায় ছিল ১৫৫টিরও বেশি ট্যানারি। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই এলাকা ছিল বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের রাজধানী। প্রতিদিন প্রায় ২২,০০০ ঘনলিটার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়তো। ক্রোমিয়াম, সীসা, ক্যাডমিয়াম, সালফিউরিক এসিড, অ্যামোনিয়া। Pure Earthের (আগের Blacksmith Institute) ২০১৩ সালের প্রতিবেদনে হাজারীবাগকে পৃথিবীর পঞ্চম সবচেয়ে দূষিত স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

সরকার ১৯৯৩ সাল থেকে বলে আসছিল ট্যানারি সরাবে। ২৪ বছর লেগেছে। ২০১৭ সালে অবশেষে জোর করে হাজারীবাগের ট্যানারি বন্ধ করা হলো। গন্তব্য: সাভারের হেমায়েতপুর।

কিন্তু এই "স্থানান্তর" কি সত্যিই সমাধান এনেছে? নাকি দূষণকে শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরানো হয়েছে?

সেই গল্প বলতে হলে আগে বুঝতে হবে, চামড়া শিল্প বাংলাদেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।


পর্ব ২: বিলিয়ন ডলারের চামড়া

বাংলাদেশের চামড়া শিল্প ছোট না। মোট রপ্তানি আয়ে গার্মেন্টসের পর এটি দ্বিতীয় সারির খাত। কাঁচা চামড়া, প্রক্রিয়াজাত চামড়া, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট মিলিয়ে এই খাত থেকে বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হয়। এক সময় এই খাতের লক্ষ্য ছিল ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি।

গত দুই দশকে চামড়া রপ্তানি বেড়েছে, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি থমকে গেছে। ২০১৭ সালে ট্যানারি স্থানান্তরের পর অনেক কারখানা উৎপাদন পুরোপুরি শুরু করতে পারেনি। কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, রপ্তানি অর্ডার হারিয়ে গেছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

বিশ্বের চামড়া বাজারে ইতালি, ভারত, চীন, ভিয়েতনাম ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে। বাংলাদেশের বাজার ভাগ ২%-এরও কম। ভিয়েতনাম আর ইথিওপিয়া দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে কারণ তারা আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশ মান বজায় রেখে উৎপাদন করছে। ইউরোপীয় ক্রেতারা এখন REACH compliance চায়, Leather Working Group (LWG) সার্টিফিকেশন চায়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ ট্যানারি এসব মান পূরণ করতে পারে না।

স্থানান্তরের গল্পটা এবার বিস্তারিত বলি।


পর্ব ৩: সরানোর হিসাব

২০১৭ সালের এপ্রিল। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে হাজারীবাগের ট্যানারি বন্ধের চূড়ান্ত সময়সীমা শেষ হলো। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, সাভারের হেমায়েতপুরে ২০০ একর জায়গায় তৈরি হয়েছে আধুনিক চামড়া শিল্পনগরী। সেখানে আছে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধন কেন্দ্র (CETP), যেটা প্রতিদিন ২৫,০০০ ঘনমিটার বর্জ্য পরিশোধন করতে পারবে। পরিকল্পনা চমৎকার ছিল। বাস্তবায়ন? বিপর্যয়।

স্থানান্তরের সময়রেখা দেখুন। ১৯৯৩ সালে প্রথম সিদ্ধান্ত, ২০০৩ সালে জমি অধিগ্রহণ, ২০০৯ সালে নির্মাণ শুরু, ২০১৭ সালে জোরপূর্বক স্থানান্তর। ২৪ বছরের পথ। কিন্তু CETP? সেটা এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। সরকারি হিসেবে চালু হয়েছে, কিন্তু ক্ষমতা ব্যবহারের চিত্র ভিন্ন কথা বলে।

CETP-র ডিজাইন ক্ষমতা ছিল দৈনিক ২৫,০০০ ঘনমিটার। বাস্তবে এটি কখনো পূর্ণ ক্ষমতায় চলেনি। শুরুতে ক্ষমতা ব্যবহার ছিল ২০%-এরও কম। ২০২৫ সাল নাগাদ সেটা বেড়ে ৪০%-এর কাছাকাছি এসেছে, কিন্তু এখনও অর্ধেকের নিচে। কেন? নকশায় ত্রুটি, যন্ত্রপাতির সমস্যা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, আর রাসায়নিক সরবরাহের অভাব। ফলে বাকি বর্জ্য কোথায় যাচ্ছে? ধলেশ্বরী নদীতে।

ট্যানারি মালিকদেরও অভিযোগ আছে। তারা বলেন প্লট ছোট, রাস্তা ভাঙা, গ্যাসের সমস্যা, পানির সমস্যা। অনেকে এখনও পুরো উৎপাদন শুরু করতে পারেনি। কেউ কেউ আবার হাজারীবাগে ফিরে গোপনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ আছে।

কিন্তু পরিবেশের হিসাবটা কী বলছে?


পর্ব ৪: ক্রোমিয়ামের ছায়া

ট্যানারি শিল্পের সবচেয়ে বিষাক্ত রাসায়নিক হলো ক্রোমিয়াম। চামড়া ট্যানিংয়ের জন্য ক্রোমিয়াম সালফেট অপরিহার্য। সমস্যা হলো, ক্রোমিয়াম-III (যেটা ট্যানিংয়ে ব্যবহার হয়) পরিবেশে জমে ক্রোমিয়াম-VI-তে রূপান্তরিত হতে পারে, যেটা WHO-র তালিকায় Group 1 carcinogen, অর্থাৎ নিশ্চিত ক্যান্সার সৃষ্টিকারী।

হাজারীবাগের মাটি ও পানিতে ক্রোমিয়ামের মাত্রা WHO-র অনুমোদিত সীমার ২০ গুণেরও বেশি ছিল। ট্যানারি চলে যাওয়ার পরও মাটিতে জমে থাকা ক্রোমিয়াম কমেনি। এটা দশকের পর দশক ধরে থাকবে। সাভারেও ইতিমধ্যে ক্রোমিয়ামের মাত্রা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, কারণ CETP পুরোপুরি কাজ করছে না।

একটা বিষয় পরিষ্কার করি: হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরানোর পর হাজারীবাগের পরিবেশ কতটা বদলেছে?

স্থানান্তরের আগে ও পরে তুলনা করলে দেখা যায়: বায়ু দূষণ কিছুটা কমেছে (কারখানার ধোঁয়া বন্ধ হয়েছে), কিন্তু মাটি ও পানির দূষণ প্রায় অপরিবর্তিত আছে। কারণ দশকের পর দশক ধরে মাটিতে জমেছে ভারী ধাতু। সেটা কেউ পরিষ্কার করেনি। হাজারীবাগের মাটিতে এখনও শিশুরা খেলছে, মানুষ বাস করছে, কিন্তু সেই মাটিতে ক্রোমিয়াম, সীসা, ক্যাডমিয়ামের পরিমাণ বিষাক্ত মাত্রায়।


পর্ব ৫: শ্রমিকের শরীর, শিল্পের মুনাফা

চামড়া শিল্পে সরাসরি কর্মরত প্রায় ৭৫,০০০ থেকে ১,০০,০০০ শ্রমিক। পরোক্ষভাবে আরো কয়েক লাখ মানুষ এই খাতের সাথে জড়িত। এদের বেশিরভাগই অদক্ষ, স্বল্পশিক্ষিত, দরিদ্র পরিবার থেকে আসা।

শ্রমিক সংখ্যার ধারাবাহিক চিত্র দেখলে একটা জিনিস পরিষ্কার: স্থানান্তরের পর শ্রমিক সংখ্যা কমেছে। অনেক শ্রমিক সাভারে যেতে পারেনি (দূরত্ব ও যাতায়াত খরচ), অনেকে পেশা ছেড়ে দিয়েছে। যারা আছে তাদের মজুরি কেমন?

ট্যানারি শ্রমিকদের গড় মজুরি গার্মেন্টস শ্রমিকদের চেয়েও কম, অথচ তারা অনেক বেশি বিপজ্জনক রাসায়নিকের সংস্পর্শে কাজ করে। ন্যূনতম মজুরি কাগজে আছে, কিন্তু বাস্তবে অনেক কারখানায় সেটাও দেওয়া হয় না। ওভারটাইমের টাকা মেলে না। ছুটি নেই। স্বাস্থ্য বীমা? রসিকতা মনে হয়।

WHO-র একটি গবেষণায় হাজারীবাগ ট্যানারি শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছিল।

চামড়া কারখানার শ্রমিকদের ৯০% চর্মরোগে ভোগেন। ৬০%-এর বেশি শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত। গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টাইনাল রোগ, চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, এগুলো নিত্যসঙ্গী। গড় আয়ু সাধারণ জনসংখ্যার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। Human Rights Watch-এর ২০১২ সালের "Toxic Tanneries" প্রতিবেদনে এই শ্রমিকদের জীবনকে বলা হয়েছে "slow poisoning", ধীরে ধীরে বিষক্রিয়া।

কিন্তু এসব শ্রমিক কি আরো ভালো পরিবেশে কাজ করতে পারতো না? আন্তর্জাতিক মান মেনে চললে কি শিল্প টিকতো না?


পর্ব ৬: কমপ্লায়েন্সের গল্প ও বাস্তবতা

চামড়া শিল্পে পরিবেশগত ও সামাজিক মান মেনে চলার (compliance) একটা আন্তর্জাতিক কাঠামো আছে। Leather Working Group (LWG) সার্টিফিকেশন, REACH রেগুলেশন, ZDHC (Zero Discharge of Hazardous Chemicals) মান। ইউরোপীয় ও আমেরিকান ক্রেতারা ক্রমশ এসব মান বাধ্যতামূলক করছে।

বাংলাদেশের ট্যানারিগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক মান পূরণ করে এমন কারখানার হার অত্যন্ত কম। LWG সার্টিফায়েড ট্যানারি হাতে গোনা কয়েকটা। বেশিরভাগ কারখানা মৌলিক পরিবেশগত নিয়মও মানে না। ভারত ও ভিয়েতনাম এদিক দিয়ে অনেক এগিয়ে।

তাহলে সমাধান কী? সাভারের চামড়া শিল্পনগরী যেটা হওয়ার কথা ছিল, সেটা হতে হলে তিনটা জিনিস দরকার:

প্রথমত, CETP পূর্ণ ক্ষমতায় চালু করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন প্রকৌশলগত সংস্কার, নিয়মিত রাসায়নিক সরবরাহ, আর অবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ।

দ্বিতীয়ত, ক্রোমিয়াম রিসাইক্লিং বাধ্যতামূলক করতে হবে। আধুনিক ট্যানারিতে ক্রোমিয়ামের ৯৫% পুনঃব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশে সেটা প্রায় শূন্য।

তৃতীয়ত, শ্রমিকদের সুরক্ষা সরঞ্জাম (গ্লাভস, মাস্ক, বুট, গগলস) ও স্বাস্থ্য বীমা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

খরচ? প্রতি ট্যানারিতে বছরে কয়েক লাখ টাকা। মোট শিল্পের জন্য বছরে ৫০-১০০ কোটি টাকা। একটা বিলিয়ন ডলারের শিল্পের জন্য এটা কিছুই না। কিন্তু এই বিনিয়োগ হচ্ছে না, কারণ শ্রমিকের জীবনের দাম হিসাবের খাতায় ওঠে না।


আসুন যেখানে শুরু করেছিলাম সেখানে ফিরি।

মোহাম্মদ আলম এখন সাভারের একটা ট্যানারিতে কাজ করেন। নতুন জায়গা, পুরনো বিষ। এখনও খালি হাতে কাজ করেন, কারণ গ্লাভস দেওয়া হয় না। এখনও ক্রোমিয়ামের গন্ধে মাথা ঘোরে। পার্থক্য একটাই: আগে বাসা থেকে কারখানা পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ ছিল, এখন দেড় ঘণ্টা বাসে যেতে হয়।

হাজারীবাগের মাটিতে এখনও ক্রোমিয়াম আছে। সাভারের ধলেশ্বরীতে নতুন করে বিষ জমছে। CETP অর্ধেক ক্ষমতায় চলছে। শ্রমিকরা অসুস্থ হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। আর আমরা চামড়ার জুতা পরে হাঁটছি।

একটা বিলিয়ন ডলারের শিল্প তার শ্রমিকদের গ্লাভস কিনে দিতে পারে না। একটা দেশ তার নদী রক্ষা করতে পারে না। এটা সম্পদের অভাব না, এটা ইচ্ছার অভাব।

প্রতিটা চামড়ার পণ্যের পেছনে একটা গল্প আছে। সেই গল্পে আছে ক্রোমিয়ামে পোড়া হাত, দূষিত নদী, আর অকালে শেষ হয়ে যাওয়া জীবন। সেই দাম কে দিচ্ছে? মোহাম্মদ আলম আর তাঁর মতো হাজারো শ্রমিক। আর সেই দাম কত? সেটা কোনো হিসাবের খাতায় লেখা নেই।

Created: 2026-03-07 03:06:27 Updated: 2026-03-07 14:41:50